আসফিয়া জান্নাত তুরফা
আসফিয়া জান্নাত তুরফা

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

বিষাক্ত অনুরাগ | একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন

সমাপ্ত

বিষাক্ত অনুরাগ | সিজন ১ | পর্ব - ৬

১১ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

তুর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় রোদ্দুরের দিকে। রোদ্দুর জেগে থাকলে নিশ্চই এটা বলতো ‘ শুনেছি ধ্রুপদী (সঠিক নাম জানা নেই আমার) নামক এক রমণীর বস্ত্রহরণ করা হয়েছিলো আজ এই কলিযুগে রোদ্দুরের বস্ত্রহরণ করতে আপনার কি একটুও লজ্জা করছে না মিসেস তুর? ‘ এটা কল্পনা করেই আনমনে হেসে ওঠে তুর। পরক্ষণেই সে হাসি বিলীন হয়ে যায়। ও কেন এসব ভাবছে? কেন ওর মনে রোদ্দুর নামক ব্যক্তিটির কথা, চাহুনি ফুটে উঠছে। মাত্র দুদিনের আলাপে তুর কিভাবে একজনকে এতোটা অনুভব করতে পারে?

তুর রোদ্দুরের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে নিজের মনকে প্রশ্ন করলো,

– ” আমি কি ঠিক করছি? আমার ভেতরে এই অদ্ভুত দোটানা কিসের? কিভাবে একজন বিবাহিত মানুষের প্রতি আমি আকৃষ্ট হতে পারি? অনন্তকে মারতেও এতোটা কষ্ট হয়নি যতটা এখন রোদ্দুরকে এই অবস্থায় দেখে হচ্ছে। আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাবো। উফ মাথা ছিড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে, প্রচন্ড রাগ হচ্ছে নিজের প্রতি। রোদ্দুরকে দ্রুত আমার কাছ থেকে সড়াতে হবে। ও সুস্থ হলেই ওকে ওর বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে।”

তুর শার্ট খুলে তোয়ালে ভিজিয়ে আনলো। চোখ বুজে রোদ্দুরের সারা শরীর মুছিয়ে দিলো তুর। লাইট অফ করা ছিলো এবার তুর উঠে গিয়ে ড্রিমলাইট জ্বালিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো রোদ্দুরের পাশে। মাঝে অনেকটা দূরত্ব রেখে শুয়েছে ও।

সকালে ঘুম ভাঙতেই রোদ্দুর টের পেলো ওর সারা শরীরে তীব্র ব্যাথা। চুলগুলোতেও কেমন অদ্ভুত টান অনুভব হচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখলো তুর এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে। ও উঠে বসলো খাটে। খাটের সামনেই ড্রেসিংটেবিল! আয়নায় চোখ যেতেই রোদ্দুর ভয়ে আৎকে ওঠে। নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না। মাথায় ঝুটি, মুখে অদ্ভুত জোকার মেক আপ। নাকে গালে লিপস্টিক দিয়ে মেক আপ সম্পূর্ণ করা, গায়ে জামা নেই, এবার রোদ্দুরের কপালে ভাঁজ পড়ে, ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয়। ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তুরের দিকে তাকালো। ডাক দিলো তুরকে,

– ” তুর উঠুন! ”

রোদ্দুরের ডাক কানে পৌঁছাতেই তুর হুরমুর করে উঠে বসলো, আধবোজা চোখে সামনে হাতরে কাতর কন্ঠে বললো,

– ” হ্যাঁ হ্যাঁ। কোথায় ব্যাথা করছে আপনার? খারাপ লাগছে? জলপট্টি দেবো? কই আপনি? ”

তুরের কান্ড দেখে রোদ্দুর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তুর বিছানা হাতাচ্ছে। রোদ্দুর তুরের হাত চেপে ধরে ওকে শান্ত করলো, তুর ঢুলে পড়ে রোদ্দুরের কোলে। রোদ্দুর তুরের কপালে হাত রেখে চেক করলো ওর’ও জ্বর এসেছে কিনা। এরপর নার্ভ চেক করে, চোখ চেক করে।

– ” ইশ! মেয়েটা বোধ হয় সারা রাত ঘুমায়নি। সেবা করার পাশাপাশি সঙ সাজিয়েছে এভাবে? জোকার কেন? কোনো ফিল্মস্টারের মতো মেক আপ করাতো, চেহারা কি আমার ওতোটাই খারাপ? যে পাত্তা দেয়না।”

তুর বিরবির করে বলে,

– ” রোদ্দুর ঘুমান তো। বিরক্ত করবেন না একদম।”

রোদ্দুর হেসে বলে,

– ” আজ সেবা করে জেগেছেন, পরবর্তীতে সেবা নিয়ে জাগবেন। অভ্যাস গড়ে তুলুন মিসেস তুর! আপনার রাত জাগার সময় যে অতীব সন্নিকটে। ”

তুর চোখ কচলে তাকালো। রোদ্দুরের কথার অর্থ বুঝতেই ওর চোখে মুখে ক্রোধ ফুটে উঠলো। রোদ্দুরের এতো আমোদ কিসের? খুজে পায় না ও। তুর উঠে ফ্রেস হয়ে নিলো, এরপর নিচে চলে যায়, মিনি খালাকে দিয়ে খাবার পাঠায় রোদ্দুরের জন্য। গোসল সেড়ে রোদ্দুর সবে বাইরে এসেছে, তুরকে না দেখতে পেয়ে সে ভীষন ক্রোধিত! ও সেই অসুস্থ শরীর নিয়ে নিচে আসে। তাহমিনা উত্তেজিত হয়ে রোদ্দুরকে দেখতে থাকে। তুর সবেমাত্র মুখে রুটি দিয়েছে, মায়ের ননস্টপ কথা ‘ জ্বর কমেছে, খেয়েছো? কিছু লাগবে? ‘ রোদ্দুর কঠোর স্বরে বলে,

– ” তুর উপরে আসো। ”

তাহমিনা অবাক হলেন রোদ্দুরের গলার স্বর শুনে। মেয়ের দিকে তাকাতেই দেখলেন তুর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে, যার অর্থ রোদ্দুরের রাগ সম্পর্কে এবং কথা বলার ধরণ তার অজানা। তুর হাত ধুয়ে উপরে চলে আসে। রোদ্দুর উপরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়।

– ” আমি আপনার হাতে খাবো।”

রোদ্দুরের নিঃসংকোচ আবেদন! তুর চমকে তাকালো রোদ্দুরের দিকে। এক অদ্ভুত ভালোলাগার শিহরণে শিহরিত হলো সে। রোদ্দুর এসে ওর কোলে মাথা রেখে মেঝেতে বসে। তুর মৃদু হেসে ওর চুলের মাঝে হাত ঢুকিয়ে দিলো, রেশম-কোমল চুলগুলো নেড়ে চেড়ে ঠিক করলো! মুহূর্তেই আবারও তুরের মধ্যে এক নতুন ভাবনার সৃষ্টি হতে লাগলো, বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে যেটা ওরা যে যার স্থান থেকে, নিজেদের স্বার্থে আবদ্ধ হয়েছে! সেটার মায়াজালে কি ওরা জড়িয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে? মানুষ বলে প্রথম প্রেম নাকি ভোলা যায় না। কিন্তু অনন্তর কথা তো তুরের দিনে একবারও মনে পড়ে না। সেদিন কেঁদেছিলো অনামিকার কথা ভেবে, বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভেবে। কিন্তু রোদ্দুরের কথা ওর কেন বারবার মনে পড়ছে, কেন? তুর হাত সড়িয়ে দ্রুতগতিতে বললো,

– ” আমার হাতে ব্যাথা! আমি কিভাবে খাওয়াবো? নিজে খান। ”

রোদ্দুর তুরের দিকে তাকালো, তুর রোদ্দুরকে দেখে বেশ অবাক হয়। কারন রোদ্দুরের নয়নযুগল অশ্রুসিক্ত ছিলো। রোদ্দুরকে কাঁদতে দেখে তুরের বুকের ভেতর মোচর দিয়ে উঠলো।

– ” অজুহাত দেখালেন? আমাকে একটু খাইয়ে দিতেও আপনার সমস্যা হবে? ”

– ” না, আসলে! ”

– ” থাক! আপনি যেতে পারেন। আমি নিজে খেয়ে নিবো।”

কথাগুলো তুরের মোটেও পছন্দ হলো না। নিজেই যখন খাবে তখন তুরকে ডেকে আনলো কেন? আরে ভাই মেয়েরা দু একবার না বলবে, স্বাভাবিক। তো তোরা মেয়েটাকে একটু জোর করবি না? লজ্জা, ভয় ইত্যাদি কারনে মেয়েরা প্রথম দিকে না না করে, সেটা বুঝবি না? আহাম্মক কোথাকার। তুরের হাত নিশপিশ করছে! রোদ্দুরকে আচ্ছা করে দু ঘা লাগিয়ে দিতে পারলে বড্ড শান্তি পেত ও।

– ” বললাম তো আমি একা খেতে পারবো। আপনি আপনার কাজে যান। ”

তুর রুটি ছিড়ে রোদ্দুরের মুখে ঠেসে দিয়ে রাগি গলায় বললো,

– ” খেতেই যখন পারবেন তখন ডেকে আনলেন কেন? আমি তো নিজের কাজই করছিলাম।এবার এই সবটুকু গিলবেন। নাহলে বেত দিয়ে পেটাবো আপনাকে। ”

রোদ্দুর খেতে খেতে বলে,

– ” আমাকে বাচ্চাদের মতো শাসন করছেন কেন? ওগুলো জমিয়ে রাখুন! আমাদের বাচ্চা হলে তাকে এভাবে শাসন করতে হবে তো। ”

তুর কিছু না ভেবেই বলে দিলো,

– ” তখন বাপ-বাচ্চা দুটোকেই এভাবে পিটাবো। ”

রোদ্দুর ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তুর জিভে কামড় দিয়ে অন্যদিকে চোখ রেখে বসে আছে, যেন সে কিছুই বলেনি। রোদ্দুর সন্দিহান কন্ঠে বলে,

– ” বাহ। বেশ ভালো। আমি যখন বাচ্চার কথা বলি তখন আমি লুচ্চা! আর আপনি যখন আমার বাচ্চা এবং আমার, দুজনের কথা একসাথে বলেন তখন? ”

– ” বেশি বকবক না করে খান তো। ”

– ” কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন ঠিক আছে। কিন্তু বাচ্চা না নিয়ে আমি এখান থেকে যাবো না। ”

– ” আমাদের মিনি খালা আছে না? ওনার স্বামীর কিছু সমস্যা আছে, বাচ্চা হয় না। আপনি বললে আমি খালার সাথে কথা বলে দেখতে পারি। ”

রোদ্দুর তুরের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে উঠে বসলো, তুর সোজা হয়ে বসে। রোদ্দুর তুরের দিকে এগিয়ে যায়। ঠোটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলে,

– ” সেটা খালার এবং তার স্বামীর ব্যক্তিগত সমস্যা জান! তুমি বারবার উল্টাপাল্টা কথা বলে কথা ঘুরাও ক্যান? তোমার কি মনে হয়? তোমার এই বাচ্চামি, দুষ্টুমিতে আমি ক্রোধিত হবো? তুমি আমার মুগ্ধতার স্থান, ক্রোধের নয়। রোদ্দুর একশটা বিয়ে করলেও তার সন্তান শুধু জানের গর্ভে আসবে। অন্যকারোর নয়। আর খালার জন্য নাহয় আমি খালু এনে দিবো, তোমাকে খালার চিন্তা করতে হবে না, নিজের চিন্তা করো। আজ রাতে তোমার হচ্ছে। ”

তুর নির্নিমেষে তাকিয়ে কথাগুলো শুনলো। এই লোক পাল্টিবাজিতে ওস্তাদ! তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু রুহানি, রুহানি কেসটা তুরের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে অনন্তর লাশ অন্যদিকে রুহানি। সব ভুলে তুরের মগজ শুধু এইদুটো জিনিস মনে রেখেছে। তুর রোদ্দুরে নিজেকে ঝলসানোর আগে ওকে সবটা জানতে হবে, ও কি চায়? ওর মন কি চায়? রুহানি কে? সেই পাঁচজন কারা? সব জানতে হবে ওকে।

– ” আমার কিছুটা সময় লাগবে রোদ্দুর ! আমি ভেবেচিন্তে বলছি সন্তান দেওয়ার ব্যাপারটা। ”

– ” যা ইচ্ছা ভাবো! কিন্তু সময় থাকতে বুঝতে শেখো। ”

– ” মানে? ”

– ” মন! আমি বলতে চেয়েছি মন বুঝতে এবং পড়তে শেখো। আর কতো মুখে মুখে সব বলবো? এই লুচ্চা নামক তকমা সড়িয়ে আমায় রোম্যান্টিক ভাবতে শেখো। দেখবে আর কোনো জড়তা কাজ করবে না তোমার মাঝে। ”

– ” হুহ! ”

– ” ফুহ। ”

রোদ্দুর খেয়ে শুয়ে পড়ে। হসপিটাল থেকে ছুটি নেওয়া আছে বলে চিন্তা নেই ওর। ওদিকে তুর নিজের ল্যাপটপ বের করে অফিসের সিসি টিভি ফুটেজ চেক করছে। আবিদ অনামিকার সমস্ত কথা শুনছে, তুরকে দূরে ল্যাপটপে মগ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখে রোদ্দুর নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে,

– ” জান একটু পানি দাও তো। ”

– ” ওই নামে ডাকবেন না আমায়। আর পাশের টেবিলে পানি রাখা আছে, হাত বাড়িয়ে নিন। ”

– ” এতো মনোযোগ দিয়ে কি দেখছো? আমাকেও দেখাও। ”

– ” নাহ, এগুলো আপনাকে দেখানো যাবে না। ”

– ” কেন? খারাপ কিছু দেখছো নাকি? ছি! ছি! হালাল কাজ থাকতে তুমি হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছো? ”

– ” আপনি চুপ করতে কি নিবেন? ”

– ” গিভ মি এ বাচ্চা জান। ”

তুর কপাল চাপড়ে বিরবির করে বললো,

– ” আবার বাচ্চা! এই লোক বাচ্চা বাচ্চা করে আমার মাথা খারাপ করে দিলো। সাধ্য থাকলে এখুনি একে বাচ্চা দিয়ে বিদায় করে দিতাম। অসহ্যকর। ”

বছর খানেক পর! আজ রোদ্দুর এবং তুরের বিবাহ বার্ষিকী! তুর ছ’মাসের প্রেগনেন্ট! রোদ্দুর তুরের হাত ধরে ওকে সিড়ি দিয়ে নামাচ্ছে। তুর একহাত পেটে দিয়ে সন্তর্পণে হাটছে।

ঠিক এমন সময় তুরের ঘুম ভেঙে গেলো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পাশে ঘুমন্ত রোদ্দুর। আজ তুর এবং রোদ্দুরের বিয়ের ছ’মাস পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু স্বপ্নটা?

– ” এই লোকের সাথে থাকতে থাকতে আজ আমার এই দশা। কিছু না করেও ভুলভাল স্বপ্ন দেখছি । কিন্তু যত যাই বলি আজ অনুভব করি আমি, যে সেই রাগি জান, আজ তার রাগ সংবরণ করতে শিখেছে। ভালোবাসা চিনতে শিখেছে, ভালোবাসতে শিখেছে। থ্যাংকস রোদ্দুর আমার জীবনে আসার জন্য। থ্যাংকস এ লট। ”

তুর উঠে পানি খেয়ে নিলো। এরপর এসে আবারও শুয়ে পড়লো! রোদ্দুর তুরের গা ঘেসে শুয়ে ওকে জরিয়ে ধরে। অস্ফুট স্বরে বলে,

– ” উফ মেরি জান! কতবার বলেছি আমাকে বিছানায় রেখে যাবে না, কত শত ওয়াদা করলে তাও কিছু মনে রাখছো না, রাখতে চাইছো না। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি চলে যাবো। ”

– ” ঠ্যাং ভেঙে রেখে দিবো। চুপচাপ ঘুমান। ”

– ” হ্যাঁ! ঘুম ছাড়া আছেটা কি? এক মিথ্যা বলার সুবাদে বউকে আদর করা থেকে বঞ্চিত হয়েছি, বউ নয় ঘুমই আমার একমাত্র সঙ্গী। আই নো ইট। ”

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!