এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা | পর্ব – ১৫

নড়াইল জেলার এক ঐতিহ্যবাহী মেলার নাম “সুলতান মেলা”চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান কে কেন্দ্র করেই এ মেলার আয়োজন করা হয়।এইদিনে সব কাজিনরা মিলে আমরা নৌকা ভাড়া করে নৌকা বাইচ দেখতে যায়।শহর জুড়ে মানুষের ছড়াছড়ি থাকে।সকাল সকাল বিহান ভাই এর দেওয়া শাড়ি,চুড়ি গুলা পরে সুন্দর ভাবে সাজগোজ করলাম। উদ্দেশ্য বিহান ভাই কে তাক লাগিয়ে দিবো ভীষণ ভাবে।কপালে কালো ব্লু টিপ,পরনে ব্লু শাড়ি,দু হাত ভর্তি কাচের চুড়ি মাথায় গাজরা ঠোটে লিপিস্টিক দিয়ে পরিপূর্ণ সাজ দিলাম।সুন্দর করে কয়েক টা ছবি তুলে বিহান ভাই এর হোয়াটস এপ এ পাঠিয়ে দিলাম।অনেকক্ষণ রিপ্লের অপেক্ষা করে ব্যার্থ হলাম।মেসেজ তো সিন ই করেন না।এক ঘন্টা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিন্তু সে মেসেজ ই সিন করে না কিন্তু কেনো?অবশেষে মেসেজ দিলাম তোমার দেওয়া শাড়িতে শুভ্র রঙে রাঙিয়েছি নিজেকে।বিহান-দিয়া থেকে দিহান হয়েছি। ভাবতে ভাবতে দেখি আকাশের কোনায় কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছে।আকাশ পানিতে ভরপুর এক্ষুণি বৃষ্টিকন্যারা মাটিতে এসে লুটিয়ে পড়বে।
আধভেজা হয়ে তোহা আপু,রিয়া আর মেহু আপু আমার রুমে এসে প্রবেশ করলো।আমরা অনলাইনে লালশাড়ির অর্ডার দিয়েছিলাম।সবাই এক কালারের শাড়ি পরবো সেই প্লান ই ছিলো।
“রিয়া,মেহুপু,তোহাপু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো।তিনজনে কি ভূত দেখছে নাকি।রিয়া বলে উঠলো,কিরে দিয়া যে শাড়ি নিয়ে এত কাহিনী সেই শাড়ি পরেছিস।”
“হ্যাঁ পরেছি।উনার দেওয়া গিফট বলে কথা।তোদের বিচারক বিহান ভাই কে ডেকে নিয়ে আয়।আমি ভয় পায় নাকি হুহ।”
“মেহুপু বলে উঠলো,দেখ দিয়া কথা ছিলো তিনজনে এক কালার শাড়ি পরবো আর তুই প্রিয়জনের দেওয়া শাড়ি তাতো হবে না।”
“আমার পক্ষে একটুও শাড়ি খোলা সম্ভব নয়।আমার উনি আসবে আজ মেলায়।আমাকে এ শাড়িতে না পেলে কষ্ট পাবে সে।”
“দিয়া প্রেম করলে কিন্তু প্রিয়জন কে যত্ন করতে হয়।তার দেওয়া গিফট সারাজীবন যত্ন করে রাখতে হয়।বাইরে এই বৃষ্টি কাঁদায় এই শাড়ি পরে গেলে শারীটার বারোটা বাজবে।এটা দেখে তোর প্রিয়জন আরো কষ্ট পাবে।ভাববে তার জিনিসের কোনো গুরুত্ব নেই তোর কাছে।এই শাড়ি টা যত্ন করে তুলে রাখ।বিশেষ কোনো দিনে তার সামনে পরে যাস।”
বাইরে আসলেই অনেক বৃষ্টি কাঁদা বিহান ভাই এর শাড়ি টা নষ্ট হয়ে যাবে। শাড়িটার গুরুত্বের কথা ভেবে অন লাইন থেকে আনা লাল শাড়ি টা পরে নিলাম।তিনজনে সেইম সাজে বেরোলাম।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাজিন গুষ্টি।সবার চোখ এড়িয়ে আমার চক্ষুযুগলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়লো বিহান ভাই দিকে।কালো জিন্স পরা গায়ে কালো হুডি টাইপ গেঞ্জি যার সামনে পকেট।বিহান ভাই হুডির পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছেন।বাতাসে চুল গুলো সামনে থেকে উড়ছে।ফর্সা শরীরে কালো জিন্স আর গেঞ্জি আহা দেখলেই প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।।হাতে থাকা কালো হেলমেট টা মাথায় পরে নিলেন।
বিহান ভাই আড়চোখে বার বার চাইছেন আমার দিকে।
“তিয়াস ভাইয়া বললো, আটা ময়দা যা ছিলো সব মেখেছিস তো তোরা।মনে হচ্ছে একটু কম হয়ে গিয়েছে।”
“মেহু আপু বললো,ভদ্র ভাবে কথা বল মহিলা কোথাকার।”
“তিয়াস ভাইয়া ভড়কে গেলেন আপুর কথা শুনে ‘মহিলা কে মহিলা’”
“মহিলা ছাড়া কি মহিলাদের প্রতি আসক্ত পুরুষ তুই।এই নিয়ে কয় হালি স্যাকা খাইলি বল তো মহিলাদের দ্বারা।”
“বিহান ভাই আপনি কিছু বলেন, আজকালকার মহিলাদের চেনার উপায় আছে বলেন বিবাহিত অবিবাহিত সব নাক ফুল পরে সব শাড়ি পরে।এই যে তিন মহিলা যাচ্ছে কে বুঝবে বিবাহিত নাকি অবিবাহিত।”
“বিহান ভাই বললেন,মেহু,তোহা,রিয়া ঠিক আছে বাট সাংঘাতিক হলো দিয়া।শুধুই সাংঘাতিক হলে ভুল হতো সাংঘাতিক মহিলা একটা।কাল রাতে পড়াতে গেছিলাম যা করেছে আমার সাথে।”
“আমি চট করে বলে উঠলাম,একদম বাজে কথা বললেন মিথ্যাবাদী একটা।যা করার আপনি করেছেন।এখন বলছেন আমি করেছি।”
“তুই এমন ভাবে চিল্লায়ে বলছিস আমি করেছি এটার মিনিং কি হয় বুঝিস। আশে পাশে এত মানুষ তারা কি ভাববে আমাকে নিয়ে।দেখ সাইডের এই কিউট মেয়ে গুলো তাকিয়ে আছে।ওরা কি ভাবছে আমাকে নিয়ে আমি ঠিক কি করেছি। ছিঃহেট ইওর মাইন্ড দিয়া।”
“আমার মাইন্ড হেট করবেন কি জন্য শুনি।আমি বলেছি একটা আপনি ভেবেছেন অন্যর টা হেট করে নিজের মাইন্ড করুন না।”
আমাদের সাইড দিয়ে হেটে যাওয়া মেয়ে গুলো খলখল করে হেসে উঠলো।আর বিহান ভাই এর দিকে লাজুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।আচ্ছা রস্তা ভরা ছেলে তা রেখে উনার দিকেই বা তাকিয়ে আছে ক্যানো?মেজাজ প্রচন্ড খারাপ হচ্ছে।আমাদের ঝগড়া দেখে বিভোর ভাই রা আমাদের থেকে হাত দূরে সামনে চলে গিয়েছে। ওদের পিছ পিছ আমরা।
“বিহান ভাই কে বললাম,আপনার দিকে তারা তাকিয়ে আছে কেনো?”
“আই থিংক ক্রাশড তারা।”
“নিজেকে কি ভাবেন কি? আপনার দিকে মেয়েরা তাকালেই সেটা ক্রাশ হয়ে যায় অদ্ভুত ব্যাপার।”
মেয়ে গুলো আমার কথা শুনে আমাদের দিকে তাকিয়ে আরো হাসছিলো।তাদের কি খেয়ে কাজ নেই আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
“বিহান ভাই বলে উঠলেন,আচ্ছা মহিলা মানুষ এত জোরে কথা বলিস ক্যানো?শহরের সব মানুষ এর এটেনশন তোর দিকে।”
“মেয়ে গুলা বিহান ভাই কে বললো আপনার ওয়াইফ নাকি।”
“না”
“তাহলে ”
“আমি বলে উঠলাম বোন।আমি উনার একমাত্র বোন।”
“বিহান ভাই বললেন না আপু তিনি আমার বোন না এটা তার রাগ হলেই বলে।”
“আচ্ছা তাহলে গফ বুঝছি।”
“আমি রেগে মেগে বলে উঠলাম,এই আপু আপনাদের প্রব্লেম কি?কি দেখে মনে হচ্ছে আমি উনার গফ। ”
“এই যে উনি উনি করছো।মেয়েরা উনি কাকে বলে সেটা সবাই জানে।”
কি আজব উনিতে কি সমস্যা বুঝলাম না।
“এমন সময় আলিপ পেছন থেকে এসে আমার আর বিহান ভাই এর সাথে হাঁটতে শুরু করলো।”
“বিহান ভাই কেমন আছেন?”
“ভাল।তুমি?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া।আজ দিয়াকে ভীষণ সুন্দর লাগছে তাইনা ভাইয়া।”
“বিহান ভাই ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আর ব্যাকা হাসি দিলেন।যে হাসির মানে আলিপের এই প্রশংসা তার পছন্দ নয়”
“আলিপ আবার বলে উঠলো,দিয়া তোমার দিক থেকে চোখ সরানো যাচ্ছে না।আজ তো খুব সুন্দর সেজেছো চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।”
“বিহান ভাই একবার রাগি মুডে তাকিয়ে দ্রুত হেঁটে বিভোর ভাই দের সাথে হাঁটতে শুরু করলো।এটার মানে আলিপের এইসব প্রশংসায় সে বিরক্র তাই আমাকে আলিপের কাছে রেখেই নিজে দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন।”
“আমিও দ্রুত হেঁটে ওদের সাথে হাঁটা শুরু করলাম।কারণ এই আলিপের সাথে হাঁটলে আজ নৌকার নিচে ডুবিয়ে মারবেন উনি।”
“বিভোর ভাই বললেন, ঝগড়া শেষ।”
বিহান ভাই অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে এটা বুঝালেন টপিক্স টা চেঞ্জ করতে।
“বিভোর ভাই আবার ও বলে উঠলেন, এইজন্য আটার এত দাম বেড়েছে।দেখ মাইয়া গুলা মুখের শ্রি কি করেছে।”
“রিয়া বললো,এইজন্য আপনাদের প্রেম জীবনেও হবে না বলে দিলাম।এত দামি মেকাপ কে ত্রিশ টাকার ময়দার সাথে তুলনা করছেন।একটা ব্রান্ডের মেকাপ কিনে তারপর বইলেন।”
“বউ কে মেকাপ এর পরিবর্তে খাটি সয়াবিল তেল কিনে দিবো মুখে মাখতে।”
বিভোর ভাই এর কথা শুনে এক গাল হেসে দিলাম।
“তিয়াস ভাই বলে উঠলেন,কি ব্যাপার আলিপ শুধু মেয়েদের শাড়ি গিফট করছিস ব্যাপার কি?আমরা কি ফাউ নাকি।”
“বিভোর ভাই বলে উঠলেন,আলিপ কি আর সাধে দিছে সিওর দিয়াকে পটানোর জন্য বাকি গুলারেও দিছে।ঘুষ দিছে সবাইকে”
বিহান ভাই স্হির চোখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।আলিপের দিকে তাকিয়ে বলেন,আলিপ শাড়ি গিফট করেছো।
আলিপ ভাইয়া লজ্জা ভাব নিয়ে বললেন ইয়ে ভাইয়া।
বিহান ভাই আলিপ কে থামিয়ে দিয়ে বলেন বুঝেছি।
বিহান ভাই এর চোখে মুখে অগ্নিরুপ।এই শাড়ির টাকা আলিপ দিছে আগে জানতাম না।এটা আবার বিহান ভাই এর সামনে ফাঁশ হলো।এখন কি হবে।বিহান ভাই মাথা থেকে হেলমেট টা জাস্ট খুললেন চোখে মুখে কি প্রচন্ড রাগ।হেলমেত খুলে খুল গুলো হাত দিয়ে উজিয়ে দিচ্ছেন।বিহান ভাই এর চোখ মুখ সবার সাথে হাসি খাশি থাকলেও আমার দিকে তাকানোর সময় অগ্নিরুপ তার।কেউ না বুঝলেও আমি বুঝছি বিহান ভাই এর ব্যাপার টা।
এরই মাঝে শুভ ভাইয়া হাজির হলো।শুভ ভাইয়াকে মেহু আপু ধরলো ফুচকা খাবে।তাদের মাঝে যে একটা ভাব চলে আমরা বুঝি।সবাই ইনজয় করলেও বিহান ভাই এর মুড ভীষণ অফ।এইযে উনার মুড অফ হয়েছে আর ঠিক ই হবে না।শুভ ভাইয়া ফুচকার অর্ডার দিলেন সবাই খেলেও বিহান ভাই খাবেন না।আমি ইচ্ছা করে প্রচুর ঝাল দিলাম বিহান ভাই এর ফুচকাতে।ঝাল লাগলে যদি একটু কথা বলেন।নাহ তাও কথা বলেন না।প্রচন্ড ঝাল দেওয়া ফুচকা দস পিছ খেয়ে উনার এক ফ্রেন্ড কে ফোন দিলেন।সে বাইক নিয়ে এলে বিহান ভাই তার বাইকে উঠে চলে গেলেন।মনের মাঝে খুব খারাপ লাগছে।উনার রাগ কে তো কোনোভাবে কনভাইস করা যাবে না।তাহলে কি করবো আমি।
বাড়িতে অনেক মন খারাপ নিয়ে ফিরলাম।বাড়ি ফেরার সাথে বিভোর ভাই এর আম্মু ফোন দিলো আমাকে।
আমি হ্যালো বলতেও মামি বললো দিয়া আজ কি কিছু হয়েছে?
কেনো মামি?
বিহান বাড়িতে ঢুকেই ফুলদানি লাথি মেরে ফেলে দিছে।বক্সিন রুমে প্রচন্ড রাগি মুডে বক্সিন করেই যাচ্ছে।বিহানের চোখ মুখ রাগে যেনো বেরিয়ে যাচ্ছে।ফর্সা মানুষ রাগে চোখ মুখের বেহাল অবস্থা। রাগে ওয়ালে নিজের হাত নিজেই ঘুষি দিচ্ছে।ছেলের টোটাল মুড অফ।কারো সাথে কোনো কথা নেই।সকালেই নাকি ঢাকা ফিরে যাবে।দিয়া তুই কি কিছুই জানিস।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম না মামি কিছুই জানিনা আমি।
ঘুম আসছে না রাত বারোটা বাজে।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি বিহান ভাই অফ লাইনে আছেন।
উনার ফোন নাম্বারে ফোন দিলাম।
“ফোন টা কয়েক বার কেটে দেওয়ার পর রিসিভ করেই বলে উঠলেন, ফোন দিয়েছিস ক্যানো?”
“কি করছেন?”
“মাঝ রাতে এটা বলতে কল দিয়েছিস।”
“রেগে আছেন?”
“যা বলার এক মিনিটের মাঝে বলবি জাস্ট এক মিনিট।”
“না তখন ওভাবে চলে আসলেন যে।”
“তোর সাহস হয় কিভাবে মধ্য রাতে কল দিয়ে আজাইরা প্রশ্ন করার।তোর এসব ফাউ বক বক শোনার মতো টাইম আমার হাতে নেই।নেক্সট যদি এভাবে কল দিস ব্লক দিয়ে রাখবো।”
“এত বাজে বিহ্যাভ করছেন কেনো বিহান ভাই?সব সময় কিছু না শুনেই বকাবকি করেন শুধু।আপনি কি আলিপ এর ব্যাপারে রেগে আছেন”
“জাস্ট সাট আপ।মধ্য রাতে প্রেম কাহিনী শোনার মতো ইচ্ছা আমার নেই।তোর প্রেম কাহিনী শুনে আমি কি করবো।আমি একটুও ইন্টারেস্টেড নয় দিয়া।তুই কি আমার গফ না বউ কোনটায় তো না।তাহলে আমার জেলাসি আসবে কেনো?আমার সময়ের অনেক মূল্য। তোর মতো একবার আলিপ,একবার আহিন,একবার বিভা আপুর ফ্রেন্ড এইগুলা করার টাইম নেই আমার।জাস্ট ফোন রাখ।”

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।