এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা | পর্ব – ৩৫

“প্রিয় “B”
মধ্যরাতে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তোমাকে দেখে ভীষণভাবে মন হারিয়েছে আমার।তোমার হাসিটা মারাত্মক সুন্দর।তুমি বিবাহিত না এটা আমি জেনেই প্রেমপত্র লিখতে বসেছি।তুমি কি রাগ করবে আমার এই পত্র পেয়ে।হয়তো ভাববে এইভাবে কিভাবে প্রেম হয়।এমি এক দেখায় তোমার প্রেমে পড়িনি।আমি হাজার বার দেখেছি তোমাকে।তোমার চোখের তারায় নিজেকে দেখে বুঝে নিয়েছি তুমিই আমার সেই জন যার চির অপেক্ষায় এতদিন ছিলাম আমি।সেদিন পিকনিকে না গেলে আমি আমার জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষ টাকে খুজেই পেতাম ন।তুমি ওখানে না এলে আমাকে বোধহয় আজন্ম কাল একাই থাকতে হতো।আচ্ছা ওকানে এলে আর আমার মন কেড়ে নিয়ে শান্তিতে ঘুমোচ্ছো তাইনা।আমার ঘুম না হওয়া রাত কি একবার ও তোমাকে মনে করিয়েছে অজান্তে কেউ তোমাকে ভেবেছে।আচ্ছা তোমার ঘুমন্ত স্বপ্নে কি নির্ঘুম এই আমাকে মনে পড়েছে একবার ও।তোমার স্বপ্নে কি হাতছানি দিয়েছে একবার ও এই আমার তোমাকে ভেবে রাত জাগা প্রহরের স্মৃতি। কিসব লিখে ফেললাম।বাকি টা পরে একদিন লিখবো।নিচে আমার ফোন নাম্বার টা দিয়ে দিলাম।ফোন দিও।
ইতি তোমার প্রিয়তমা
~~সানজি~~~
চিঠিটা যে সিওর বিহান ভাই কে লিখেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার।আমি আর রিয়া দুজন দুজনের দিকে রিতিমত অবাক।রাগে শরীর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে।চিঠিটা খাম সহ দুমড়ে মুচড়ে হাতের মাঝে মুঠো করে রাগে ফুঁসছি আমি।রিয়া সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে কিরে দিয়া প্রেসার বেড়ে গেলো নাকি তোর।অগ্নিমূর্তির ন্যায় তাকালাম রিয়ার দিকে।রিয়াকে বললাম পানির পট টা দে।রিয়া পানির পট আমার দিকে এগিয়ে দিলো।রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঢক ঢক করে এক লিটার এর একটু কম হবে পানি খেয়ে ফেললাম।রিয়া অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে কিরে দিয়া এক পট পানি খেয়ে ফেললি।ওইদিকে বিহান ভাই যখন বলে দিয়া পানি খা পানি খা এক ঢোক পানিও খাস না তুই।এখন এত পানি খেয়ে ফেললি।পানির পট টা গাছের দিকে জোরে ছুড়ে মেরে বললাম কি এত বিহান ভাই বিহান ভাই করিস বলতো।আর একবার ও ওর নাম নিবি না আমার সামনে।রিয়া ভ্যাবাচেকা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উনি থেকে “ওর”
কাহিনী ইজ ভেরি জ্বলতেছে।
“রিয়ার দিকে আবার ও রেগে মেগে তাকালাম আমি।কার জ্বলতেছে রিয়া।তুই কি আমাকে বললি।আমার কেনো জ্বলবে রিয়া।”
“আচ্ছা জ্বলতেছে না তাইতো।তাহলে বিহান ভাই যে সেদিন আসার সময় বললো সানজি মেয়েটা দেখতে তো ভালোই। তুই সেখান থেকে বিহান ভাই এর সাথে কথা বলা অফ করেছিস কেনো?”
“আজব তো উনি কাকে ভাল বললো না জুস বললো না পেপসি বললো না আইসক্রিম বললো আই ডোন্ট কেয়ার রিয়া।”
“তাইনা দিয়া আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি।বিহান ভাই এর ফোন রিসিভ করছিস না দেখে ভাই আমাকে ফোন দিয়েছিলো।আর জানিয়েছে তোর রাগের কারণ।আচ্ছা দিয়া তুই রাগ করলে বিহান ভাই এর কি বলতো।উনি এতটা উতলা কেনো?”
“ঢং করে কি দেখে মেয়েদের রুপ গুনের প্রশংসা করে দেখিস না।এতই যদি মেয়েসের জুস লাগে আমার খোজ নেওয়া লাগে ক্যানো?আমি কি খোজ নিতে বলেছি।বাহ বাহ!দ্যা গ্রেট বিহান ভাই কে দেখো ডাক পিওন বাড়ি বয়ে এসে চিঠি দিয়ে যাচ্ছে।উনি কি এ যুগের মজনু হয়েছে।”
“আচ্ছা দিয়া চিঠি দিয়েছে বিহান ভাই এর কি দোষ। বিহান ভাই কি দিতে বলেছেন।এনি ওয়ে চিঠি নিয়ে তোর রাগ হচ্ছে কেনো?হায় প্রেম হায় ভালবাসা। ”
“তুই কি ফিডার খাস রিয়া।উনার নাম ঠিকানা না জানলে চিঠি টা পাঠালো কিভাবে শুনি।”
“আসলেই তো ব্যাপার টা জটিল লাগছে।”
“রিয়া চল আমার সাথে।”
“কোথায়?”
“মামাদের বাড়িতে।যাবো আর আসবো।”
“ওকে চল।”
হন হন করে মামাদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম।মামি দুপুরে রান্নার জন্য তরকারি কাটছে।আমাদের দেখেই মামি হেসে দিয়ে বললেন,একি তোরা আয় এদিকে আয় কোচিং গেছিলি নাকি।আমার মন আর মুড কোনটাই ঠিক নেই।রিয়া উত্তর দিলো হ্যাঁ মামি আমরা কোচিং গেছিলাম।টুল এগিয়ে দিলো মামি দুজনের দিকে।ডায়নিং এর চেয়ারে ব্যাগ রেখে টুলের উপর বসলাম দুজনে।এ বাড়িতে দিনে একবার করে আসা হয় বলতে গেলে তাই নিজের বাড়ির মতোই হয়ে গিয়েছে।খুব একটা আত্মীয় আত্মীয় ভাব নেই।মামি আমাদের রেখে রান্না ঘরে প্রবেশ করলেন, ট্রে তে করে দু’ গ্লাস লেবু চিনির সরবত, কেক,কলা,পায়েস নিয়ে এলেন।মামিকে বললাম এগুলোর কি প্রয়োজন ছিলো মামি।মামি বললেন রোদ থেকে এসছিস খেয়ে নে ক্লান্তি দূর হবে।খাওয়া শেষে মামির সাথে মরিচের বোটা ছড়াচ্ছি আর লাল শাক বেছে দিচ্ছি।রিয়া বললো মামি কি রান্না করবেন দুপুরে।মামি বললো বিহান আমড়ার টক খাবে ওর জন্য আমড়ার টক রান্না করবো,লাল শাক ভাজি করবো,বেগুন আর ইলিশ মাছ, পিয়াজ কেটে ছোট মাছের ঝোল।রিয়া বললো মামি বিহান ভাই কোথায়?মামি বললো ঘুমোচ্ছে ওয়েট ডেকে দিচ্ছি।মামি ডাকাডাকি না করে ফোন করলো বিহান ভাই কে।দেখলাম যে ভদ্র লোক হোয়াইট থ্রি কোয়ার্টার গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে ব্রাশ করতে করতে বের হয়েছেন।আমার দিকে তাকিয়ে ব্রাশ করছেন আমার উনার চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিলাম।নবাব জাদা এত বেলা হয়েছে ঘুমোচ্ছে।
বিহান ভাই মামির দিকে তাকিয়ে বলেন,মা তোমার ননদের মেয়ে পেত্নি প্যাচাদের মতো মুখ করে রেখেছে ক্যানো।ওর বাপের জামাই কি ওকে রেখে অন্য কারো সাথে ভেগে গিয়েছে।
উনার কথা শুনে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো আমার।কি আজব ব্যাপার সব সময় এসব আধ্যাতিক কথা কি না বললেই নয়।
মামি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,
কি হয়েছে দিয়া মা মন খারাপ।
কই নাতো মামি।মানুষ বললেই তো আর হয়ে যাবে না।আমি কি কাউকে বলেছি নাকি আমার মন খারাপ।
মামি বিহান ভাই কে ধমক দিয়ে বললেন মেয়েটাকে বিরক্ত করবি না অযথা বিহান।তোর জন্য দিয়া এ বাড়িতে আসতে চায় না।রিয়া মা লেখাপড়া কেমন চলছে।
জ্বী মামি ভালো।
বিহান ভাই আবার ও বললেন,মা দিয়াকে বিয়ে দাও।ওর মুড আজ কাল বেশী খারাপ থাকে।দেখো ক্ষেপীর রূও ধারণ করে আছে।ওর বাবার জামাই কে ও রেগুলার মারবে।ওর হাতের মার খেয়ে বেচারার কি অবস্থা হবে কি জানি।
চট জলদী উঠে দাঁড়িয়ে হাতের মধ্য থাকা দলা করা চিঠিটা উনার মুখে ছুড়ে মেরে দিয়ে মামিকে বললাম এখন আসি মামি।কাল আবার আসব।মামিও অবাক আমার এমন আচরণ দেখে।
বিহান ভাই আমার সাথে কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না।আমি মনে মনে উনার সাথে ঝগড়া চালিয়েই যাচ্ছি।
বিকাল বেলা বিভোর ভাই আমাদের বাড়িতে এলেন।রিয়ার আম্মুকে দেখেই বিভোর ভাই বললেন,
“হাই শাশুমা কেমন আছেন?”
“জামাই এর মিষ্টি ছাড়া ভাল থাকি কিভাবে।”
“আগে বলবেন না আজ চিনির দাম ভালোই সস্তা।”
“কিপটা জামাই এর সাথে মেয়ে দিবো না।”
“শ্বশুর বিদেশ এত টাকা কে খাবে।সব তো আমার ই।জামাই কে টাকা দিতে পারেন না।তাহলে মিষ্টি কিনে আনতে পারে।”
“থাক বাবা মিষ্টি আর খাবো না।”
“কি আর মিষ্টি আনবো বলুন আপনার মেয়ে তো পাত্তাই দেয় না।এ জীবন রেখে কি লাভ বলুন শাশুমা।”
“মেয়ে তো আমার দুইটা।ছোট মেয়ে আছে না।ছোট জামাই বানাবো।”
এমন সময় রিয়া এসে বলে আম্মু এই বুইড়া বেটার সাথে আমার বোন দিবো না।
বিভোর ভাই বললেন,,রিয়া এই হ্যান্ডসাম ছেলেকে হাত ছাড়া করো না একদিন আফসোস করবে বলে দিলাম।
বিভোর ভাই রিয়ার আম্মুর সাথে অলওয়েজ ই এমন ফান করে।
বিভোর ভাই আমার রুমে এসে বলেন এই দিয়া বিহান তোকে আমার সাথে রাস্তায় যেতে বলেছে।তুই তোর ফোন অফ রেখেছিস কেনো?বিভোরকে জানিয়ে দিলাম আমি একটুও উনার সাথে দেখা করতে চাই না।এমন সময় তোহা আপু এসে হাজির।তোহা আপু বলে দিয়া আমার জান্টুস টা কে দেখলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।আজ যা সুন্দর লাগছে বলার বাইরে।খানিক টা বিরক্তি নিয়ে বললাম উনাকে অসুন্দর কখনো লেগেছে তোহা আপু।নাহ তবুও।আচ্ছা দিয়া বিহান এর যে হাইট সত্যি করে বল কোনো খাটো মেয়ে কি মানায় ওর সাথে।বিহান যে সুন্দর একটা পারফেক্ট মেয়েই লাগবে ওর জন্য।
এবার আরো বিরক্ত হয়ে বললাম বাহ তোহা আপু মামাতো ভাই আমার টেনশন তোমার।আমি তো কখনো এতটা টেনশন করি না উনি কাকে বিয়ে করবে না করবে।উনি খাটো মেয়ে বিয়ে করলে কি তুমি আটকাতে পারবে।কি মানাবে না মানাবে উনার জীবন উনি ভাল বুঝবেন।তোহা আপু বললো দিয়া তোর কি হয়েছে আজ।কিছু হয়েছে।তোহা আপুকে বললাম নাহ কিছুই না।
বিভোর ভাই যাওয়ার সময় আমার হাতের ভেতরে একটা চিরকুট দিয়ে গেলেন।চিরকুট টা খুলে দেখি লেখা আছে,,
“মিসেন বিহান! রাগ করে আছেন কেনো?আপনার এই সদ্য বিবাহিত হাজবেন্ড কে এতটা ইগনোর করছেন কেনো?চিঠিতে নামের অক্ষর আমার হলেই কি সেই মানুষ টা আমি হয়ে গেলাম।আমি তো তারায় তারায় রটিয়ে দিয়েছি এই আমিটা এই রাগিনী দিয়ার।এই রাগের কারণ কারণ হিসাবে কি ধরে নিবো আমাকে কাছে পাচ্ছেন না বলে রাগ করছেন।আমি সিওর এটাই কারণ।আমার সাথে কথা না বললে কিন্তু আমি এটাই বুঝে নিবো।”

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।