এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা | পর্ব – ৪৯

আমার সাথে কথা না বলার কারণ কি দিয়া বেশ শান্ত কন্ঠে বলে দুই প্যান্টের পকেটে হাত গুজে ক্ষুদ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলেন বিহান ভাই।ইগনোর জিনিস টা উনি নিতে পারেন না।বিভোর ভাই এর মামাবাড়ি থেকে বেশী কিছু খান ও নি উনি।আমি উনার কথা শুনেও না শোনার ভান ধরে রইলাম।বিহান ভাই দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,আমার ধৈর্যর পরীক্ষা নিস না দিয়া তাহলে কিন্তু খারাপ কিছু হয়ে যাবে।উনার চোখ রক্তজবার মতো হয়ে আছে।আমি এখন ও চুপ আছি।বিহান ভাই আবার ও প্রশ্ন ছুড়লেন আরিফ কে পছন্দ হয়েছে?কপালে দুইটা ভাজ পড়ে গিয়েছে উনার।উনার কথায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কি হলো আরিফ কে পছন্দ হয়েছে।প্রেম করতে চাস ওর সাথে।কাপল পিক তুলতে চাস,হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে চাস কি হলো বল।রাগে উনি ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছেন উনার চোখ ছুটে যাচ্ছে রাগে।কোনো উত্তর দিচ্ছিনা দেখে খাটের সামনে রাখা টি- টেবিলে জোরে লাথি মেরে দিলেন।টে-টিবের উপর রাখা পানির জগ আর কাঁচের গ্লাস ছুটে দূরে গিয়ে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে গেলো চারদিকে।জগের পানিতে রুমে ভেসে গেলো।এই মুহুর্তে কি নিয়ে অভিমান করেছিলাম সেটা ভুলে ভয়ে কাঁপছি।বুক দুরু দুরু করছে আমার ভয়ে।উনার চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছি না।উনি আবার ও ক্ষিপ্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন,আরিফ নাম্বার চাইলে নাম্বার দিলি কি জন্য?হাউ চিপ ইউ দিয়া।এত সস্তা,এত সস্তা তুই।কেউ নাম্বার চাইলে নাম্বার দিয়ে দিবি,কেউ পিকচার তুলতে চাইলে তার সাথে পিকচার তুলবি নিজের কোনো দাম নেই তোর। তোকে নিয়ে কি ভাবলো আরিফ যে তোকে চাইলে ইজিলি পাওয়া যায়।ছেলেরা একটা মেয়ে হাই বলতে দশ মিনিট ভাবে যে মেয়েটার কেমন রিয়াকশন হবে আর তুই এমন একটা মেয়ে ছেলেরা হাই তো দূরে থাক দশ মিনিটের মাঝে তোর সাথে পিকচার তোলার প্রপোজাল দিতে পারে। তোকে আলাদা ডেকে নিতে পারে গল্প করার জন্য, আবার তোর নাম্বার চাইতে পারে।তুই একটা ছেলে ডাকলেই চলে গেলি ওর যদি অন্য ইনটেনশন থাকতো।

উনার কথার উত্তর না দিয়ে নিচে নেমে কাঁচের টুকরো গুলো তুলছি আমি।বিহান ভাই ওয়ালে নিজের হাত ঘুষি দিয়ে বললেন বাড়াবাড়ির লিমিট আছে দিয়া এখনো কোনো কথার উত্তর পাই নি আমি।এবার কিন্তু সব ভেঙে ফেলবো আমি।উনার দিকে খেয়াল দিতে গিয়ে কাঁচের টুকরো তে পা কেটে গেলো কুকিয়ে উঠলাম ব্যাথায়।বিহান ভাই এসে হাত শক্ত করে চেপে ধরে ওয়ালের সাথে নিয়ে চেপে ধরলেন।ওয়ালে পিঠ ঠেকে আছে আমার পায়ের ব্যাথায় যন্ত্রণা করছে, এইদিকে উনার তান্ডব চোখ খিচে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি আমি।আমার এক হাত ওয়ালের সাথে চেপে ধরে রেখেছেন উনি।আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, আমার হেচকি উঠে গিয়েছে কাঁন্নায়।বিহান ভাই আমাকে কাঁদতে দেখে বললেন,আমি কি তোকে মেরেছি কথায় কথায় প্যান প্যান করে আমাকে দূর্বল করার মিথ্যা চেষ্টা অফ কর প্লিজ।তুই কি ভেবেছিস তোর চোখের পানি দেখলে আমি ইমোশনাল হয়ে যাবো।আমার মোটেও খারাপ লাগছে না বরং এই অহেতুক কাঁন্নায় আরো বেশী বিরক্ত হচ্ছি আমি।আই সে স্টপ ইওর ক্রায়িং।আমি এখন ও চুপ আছি।আমি বুঝতে পারছি আমার কথা না বলাতে উনি আরো রেগে যাচ্ছেন।আমি কথা বলছি না দেখে উনি আমার পা চেপে ধরলেন উনার পা দিয়ে,কাটা পায়ে আরো বেশী ব্যাথা পেলাম।এবার খুব জোরে কেঁদে দিয়ে বললাম প্লিজ ছাড়ুন আমায় আমি আর সহ্য করতে পারছি না। উনি আরো জোরে চেপে ধরে বললেন কি সমস্যা?আমার স্পর্শ ভালো লাগে না তাইনা।আমি স্পর্শ করলে খুব সমস্যা। আমার স্পর্শতে তোর শরীরে ঘিন ঘিন করে।আমি বাদে পৃথিবীর সবার স্পর্শ তে অন্য রকম ফিলিংস আসে তাইনা?আমার স্পর্শ তে কোনো ফিলিংস নেই এইজন্য আমার স্পর্শ ভালো লাগে না তাইনা?হোয়াট দ্যা হেল কি আছে অন্যদের মাঝে যার জন্য অন্যরা কয়েক সেকেন্ড এ তোর এত প্রিয় হয়ে ওঠে।হুয়াই ইউ ইগনোর মি।আই কান্ট টলরেট দিস।ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে উনাকে গায়ের স্ব-জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বললাম,ছাড়ুন আমাকে।আমি বাড়ি যাবো এক্ষুণি বাড়ি যাবো।আপনার কাছে আর এক সেকেন্ড এ থাকবো না।আপনি একটা পাষাণ,আপনি রেগে গেলে আমি মরে গেলেও আপনার হুঁশ থাকে না।আমার জীবনের কোনো দাম নেই আপনার কাছে।আমার কষ্ট দেখেও আপনার রাগের কোনো পরিবর্তন আসে না।আপনার রাগ নিয়ে ই থাকুন আপনি।আমার রাগ,মান, অভিমান, কষ্ট কোনো কিছুর দাম নেই আপনার কাছে।আমি খুড়িয়ে হেঁটে রওনা দিলাম দু’পা বাড়াতেই বিহান ভাই আমার হাত টেনে ধরে বললেন,আমাকে অপরাধী করে কোথায় যাচ্ছিস তুই।আর এগুলা কে বুদ্ধি দিচ্ছে তোকে?যে ঝগড়া হলে রাগ দেখিয়ে চলে যাবি।তুই কি তাদের বউ যারা রাগ হলে বউ কে বলে চলে যা বা তাড়িয়ে দেয়।তুই বিহানের বউ,বিহানের লাইফ স্টাইল,লাইফ রুলস,সম্পূর্ণ আলাদা।বিহানের ডিকশনারিতে সেসব কিছুই নেই যা অন্যদের আছে।রাগ করবো,মারবো,বকবো,আমি আবার আদর করে কাছে টানবো এখানে চলে যাওয়া, ছেড়ে যাওয়ার কথা ভুলেও ভাববেন না মিসেস বিহান।
‘ছাড়ুন বলছি আমার হাত,আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

‘এই কথা টা আগে বললেই হতো তাহলে আমার রাগ এত তীব্র মাত্রায় বেড়ে যেতো না।ভালো করেই জানিস রাগলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। জেনে বুঝে আমাকে রাগিয়ে দিয়ে নিজে কেঁদে আমাকে হার্ট করে শান্তি পাস তুই দিয়া।আমি তোকে বকলে তোর যতটা কষ্ট হয় আমার তার থেকে হাজার গুন বেশী কষ্ট হয়।তুই আমার সাথে কথা বলছিলি না আমার দম আটকে আসছিলো না।আমি হাজার বার চেষ্টা করলেও তুই কথা বলিস নি।ইউ নো হোয়াট দিয়া তুই শালিক পাখির মতো আমার কানের কাছে কিচির মিচির না করলে আমার ভালো লাগে না।তুই যে প্রচুর কথা বলিস, তেজস্রী হয়ে আমার সাথে তর্ক করিস এটা আমি উপভোগ করি ভীষণ ভাবে।তুই কথা বলার পর দেখ আমার রাগ কমে গেছে আই এম কুল নাউ।আমাকে কেউ কোনদিন শাস্তি দিতে পারে নি কিন্তু আজ তোর নিরবতা আমাকে যে শাস্তি দিয়েছে তা আমার জন্মের পরে পাই নি আমি।’

আমি ফুঁফিয়ে কেঁদে দিলাম।বিহান ভাই তাকিয়ে দেখেন ফ্লোরে পানির সাথে রক্ত মিশে লাল হয়ে গিয়েছে পানি।আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন রক্তের ছড়াছড়ি।বিহান ভাই কপালে হাত দিয়ে বললেন ওহ মাই গড।আমাকে দ্রুত কোলে তুলে নিয়ে বেডের উপর বসিয়ে দিলেন।আমি কেঁদেই যাচ্ছি।আমার পায়ের নিচে বসলেন উনি।পা ধরে দেখলেন পা খানিক টা কেটে গিয়েছে দেখে উনি অস্হির হয়ে পড়লেন।কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষ টা ব্যাথা দিয়েছে তার চোখে মুখে আমার ব্যাথার জন্য অস্হিরতা।আশে পাশে তাকালেন কিছু না পেয়ে গায়ের৷ ওড়নার এক সাইড ছিড়ে নিয়ে পা বেঁধে দিলেন।উনার উপর রাগ নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায় উনার ভীষণ কেয়ারিং এ।উনি সেই মানুষ যে ভালবাসলে সব টা দিয়েই বাসেন।উনার কথা শুনে চললে উনার মতো ভাল মানুষ দুনিয়ায় একটাও নেই।এখন কেমন যেনো বাচ্চাদের মতো করছেন।দ্রুত উনার রুমে গেলেন একটা মলম নিয়ে এলেন খানিক সময় পরে পায়ের বাঁধন খুলে মলম লাগিয়ে ওড়না থেকে আরেক টু ছিড়ে আবার বেঁধে দিলেন।ওর আগেও একবার একবার পা কেটে গিয়েছিলো আমার উনি এমন ই ব্যাকুল ছিলেন সেদিন ও।মাঝে মাঝে ভাবি ওই রাগি মানুষ টার সাথে আর কথায় বলবো না কিন্তু উনি এমন করেন রাগ কোথায় হাওয়া হয়ে যায়।আমার পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছেন খুব লেগেছে তাইনা?এত বেখায়ালি কেনো তুই?আর এত কাজ কতে যাস কেনো?তুই বড় হবি কবে দিয়া।হাত কেটে ফেলিস,পা কেটে ফেলিস আর আশে পাশের মানুষ গুলোকে কষ্ট দিস। তুই দিন দিন এত জেদি হয়ে যাচ্ছিস ক্যানো দিয়া?কতটা জেদী হলে একটা দিন আমার ইগনোর করতে পারিস।এখন কি বলা যাবে এই অপরাধী কি অপরাধ করেছে।আমার পায়ে চুম্বন করে মাথা নিচু করে বললেন,আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দিন মহারাণী আমি মাথা পেতে নিচ্ছি।তবুও চুপ থাকার মতো ভয়ংকর শাস্তি দিবেন না।বলুন আপনার বাবার একমাত্র জামাই কি অপরাধ করেছে তার মেয়ের কাছে।উনার দেওয়া চুম্বনে শিউরে উঠলাম আমি।বিহান ভাই এইভাবে মাথানত করতে পারেন।উনি পায়ে চুম্বন এটা ভাবা যায়।আমি সিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে।এই মানুষ টা দিন দিন এত চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।উনি এইভাবে চুম্বন ও করতে পারেন।উনার দিকে তাকিয়ে বললাম এটা কি করছেন আপনি?আমাকে পাপী বানাচ্ছেন কেনো?আর আপনি আমার পায়ের কাছে কেনো বিহান ভাই।প্লিজ উঠুন আমার খারাপ লাগছে এইভাবে আপনাকে দেখতে।

‘তাহলে বল কি করেছি আমি?’

‘আমি ভেবেছি আপনি আমাকে ভালবাসেন না।আপনি যে বলেছিলেন,আমাকে দেখে আপনার ফিল আসে না।আমার খারাপ লেগেছিলো এই কথাটা।আমাকে দেখে কোনো ফিল আসে ক্যানো আপনার বিহান ভাই।আমি দেখতে সুন্দর না আপনার মতো কিন্তু এতই কি বিশ্রি যে ফিল আসে না।
বিহান ভাই সামনের চুল পেছনে দিতে দিতে বললেন,ওহ নো তুই তো পুরাই ড্যাশিং রে দিয়া।বুঝাই কেমনে,এই মেয়ে কি সত্যি অবুঝ।ওইটা তোকে রাগানোর জন্য বলেছি।ভেবেছিলাম বললে তুই ফিলিংস ক্রিয়েট করবি।তা না উলটা রেগে গেলি।ইউ নো তখন আমি ফুল ফিলিংসে ছিলাম।মধ্যরাতের সাওয়ার নেওয়া বউ কোনো পুরুষ এর পক্ষে সম্ভব নয় নিজের ভালবাসার ফিলিংস ধরে রাখা।তোকে তো সব সময় ভালবাসতে ইচ্ছা করে বলিনা কারণ তুই আসলেই পিচ্চি।কথাটা কাল রাতে বললেই হতো এতগুলা বকা খাওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো।’

‘আপনি তো এমনিতেই বকেন,এ আর নতুন কি।আপনই রোমান্টিক কিছু বললে নতুন লাগে।’

‘সিরিয়াসলি আমাকে এতটাই আনরোমান্টিক লাগে।’

‘জ্বী এটা সবাই বলে।এমন কি বলে আমি কিভাবে আছি আপনার সাথে।এমন ভয়ানক রাগী মানুষের সাথে।’

‘এখন কি রাগি লাগছে আমাকে?’

‘এখন দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটা কত্ত বউ সোহাগী।বউ কে বকতেই জানেনা।অথচ কিছুক্ষণ আগে বাবাহ রে বাবা।’

‘তখন খুব রেগে ছিলাম।ওইযে আরিফ ওর সাথে কেনো তোকে হেসে হেসে কথা বলতে হবে।তোর হাসি আমার নামে কেনা।এই হাসিতে অন্য কেউ ভুলবে কেনো?দিয়া আমি এটা কখনো সহ্য করতে পারবো না যে তুই অন্য ছেলের সংস্পর্শ তে।’

‘আমি ও ইচ্ছা করেই এমন করেছিলাম।যাতে আপনি রেগে যান আর বকেন আমায়।আপনি এত জেলাস বিহান ভাই ভাবা যায়।’

‘হুম এতটাই জেলাস।’

‘আমি তো আসমার প্রতি জেলাস হলাম না।’

‘আসমা আবার কে?’

‘মেয়েটা দেখতে কিউট কিন্তু।গোলাপি ড্রেসে ভালোই লাগছিলো।’

‘হুম কে সেই মেয়ে।’

‘বিভোর ভাই এর কাজিন।’

ওহ আচ্ছা গোলাপি ড্রেস পরা ছিলো বুঝি।আমি তো খেয়াল ই করি নি।আমি তো ওখানে শুধু তোকেই দেখছিলাম।বাই দ্যা ওয়ে তুই জেলাস হস নি।’

‘উহু মোটেও না।’

‘আমি কত টা লয়াল দেখ,আমি এমন কিছু করি নি যার জন্য তোর জেলাসি আসবে।
করলেও আসবে না।’

‘উমম ট্রাই করি তাহলে।’

‘হুম ট্রাই ক্যানো সত্যি করেন।’

হুম ট্রাই আজ সিওর করবো তবে অন্য কিছু।

চলবে,,

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।