এই অচেনা শহরে শাড়ির কুচি ধরে চেনা মানুষটার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি।লাখ লাখ মানুষের ভীড়ে এই দুটো হাত ই আমাকে নিরাপদ রাখতে ব্যাস্ত।তার নিজের দিকে কোনো খেয়াল নেই,সমস্ত খেয়াল আমার দিকে।আমি এদিক, ওদিক তাকিয়ে দেখছি কিন্তু বিহান তাকিয়ে দেখছে আমাকে।কি দেখে সারাক্ষণ সে আমার মাঝে।তার প্রতিটা চাহনি এমন যেনো দীর্ঘকাল পরে দেখা হয়েছে আমাদের।মাথার উপর উত্তপ্ত সূর্য,চারপাশে মানুষের সংগম,ভ্যাপসা গরমে নাক আর কপাল ঘেমে যাচ্ছে আমার তার মাঝে গরমে শাড়ি আর নিজেকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছি আমি।বিহান বার বার টিস্যু দিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছে।রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি দুজনে।অথচ বিহান খুব শক্ত ভাবে আমার হাত চেপে ধরে রেখেছে।বিহান খুব খেয়াল দিয়ে তাকিয়ে আচগে রোডের দিকে রাস্তা ক্রস করার সুযোগ খুজছে।প্রচন্ড গাড়ির জ্যাম এখানে।
আমি বিহানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"এইভাবে হাত চেপে ধরে রেখেছেন কেনো?ভ্রু নাচিয়ে নাচিয়ে বললাম।"
বিহানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।ঘামে ভেজা কপাল বেশ টান টান করে আমার দিকে তাকালো।অতঃপর বললো,
"রাস্তা পার হতে পারবে না তুমি।"
"আমিও বেশ ভাব নিয়ে বললাম,কে বলেছে পারবো না?"
"উনি খানিক টা হেসে বললেন,নড়াইলের ওই টুকু রাস্তা তুমি পার হতে ঘন্টা কাটিয়ে দাও।আর এখানে পারবে দেখেছো জ্যামের গাড়ির অবস্থা। "
"খুব পারবো,হাত ছেড়েই দেখুন।আমি দশ সেকেন্ডে রাস্তা পার হয়ে দেখাবো।"
"হাত ছাড়ছি না পুচকি।রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন।"
আমাদের পাশেই দুটো মেয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।তারা মুখে হাত চেপে হেসেই যাচ্ছে।তারা হাসছে কেনো।বিহান আমার হাত ধরে রেখেছে বলে।আমি বিহান কে বললাম শুনুন একটু।বিহান মাথা একটু কাত করলো নিচু হয়ে।আমি বিহানের কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললাম,
"এইভাবে হাত ধরে রাখলে মানুষ কি ভাববে, আপনি একটা বউ পাগল লোক।"
"উনি ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বললেন,হু কেয়ারস!আই ডোন্ট কেয়ার!মানুষ কি ভাবলো সেটা আমার ভাবার বিষয় নয়।আর একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস আমার খুব ভালো লাগে।সেটা হলো, সারাজীবন মানুষ আমাকে নিয়ে ভেবে গিয়েছে অথচ আমি মানুষ নিয়ে ভেবে অযথা সময় নষ্ট করিনি।ব্যাপার টা ভেরি ইন্টারেসটিং।আমি মানুষ টায় এত ইন্টারেস্টিং মানুষ আমাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য, কিন্ত আমার ভাবনায় কোনো আজাইরা জিনিস নেই।মানুষ কত বোকা হলে অন্যকে নিয়ে ভাবতে পারে তাইনা দিয়া।আদেও ভেবে কোনো লাভ আছে।মানুষের উন্নতি কিভাবে হবে বলোতো।অন্যকে নিয়ে ভেবে এত সময় নষ্ট না করে সে সময় টা নিজেকে নিয়ে ভাবতো নিজের জন্য ভালো কিছু শিওর করতে পারতো।"
আমি আশ্চর্যজনক ভাবে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।আমি বা কি বললাম আর উনি বা কি বুঝলেন আর কি বললেন।এক গাদা কথা শুনিয়ে দিলেন।এইসব কথাবার্তা কি অলওয়েজ টাইম উনার মাথায় ঘুরতে থাকে।আবার ও বললাম,
"মানুষ কিন্তু সত্যি বউ পাগল ভাবছে।ভাবা যায় আমাদের কাজিনদের বস বিহান ভাই কে মানুষ বউ পাগল ভাবছে।কি লজ্জার কথা।"
"উনি ভ্রু কুচকে তাকালেন আমার দিকে।তারপর বললেন,মানুষ যদি ভাবতো আমি বউ পাগল না তাহলে আমার খুব রাগ হতো।মানুষ যদি এটা ভাবে আমি খুব খুশি হবো।বিকজ একথা সত্য আমি বউ পাগল লোক।"
"বউ পাগল হলেও কেউ মুখের উপর বলে যে আমি বউ পাগল লোক।"
"আমি বলি বিকজ আমি সত্য বলতে ভালবাসি।মিথ্যা বলে আগে পিছে কি কোনো লাভ আছে মহারাণী।"
"আপনি না দিন দিন কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছেন।লজ্জা টজ্জা সব খেয়ে ফেলেছেন।।"
"ছেলেদের আবার লজ্জা আছে নাকি।নানি বলেছে ছেলেরা বিয়ের পর সম্পূর্ণ লজ্জাহীন হয়ে যায়।"
"অন্য ছেলে আর আপনি অনেক আলাদা।আপনি একজন আশ্চর্যজনক ছেলে,আধ্যাতিক ছেলে।জীবনে দেখেন নি রোমান্টিক মুভি,কোনো সিরিজ,কোনো সং।বিয়ের আগে একটা রোমান্টিক কথা ও বলেন নি।
--উনি হাসলেন
--আবাক হয়ে বললাম হাসছেন যে।
"সব ই দেখেছি,সব ই বুঝি,ছেলেরা সব ই দেখে বলেই বাঁকা হাসলেন উনি।তবে বস্তাপঁচা কিছুই দেখে চোখ আর কানের অপমান করিনি কখনো।আর হ্যাঁ তোমার বয়সের সাথে তখন রোমান্টিক কথা যেতো না তাই বলতাম না।"
"শুধু বলেছিলাম হাত ছাড়ুন শুনলাম কত কি।"
"তোমার জন্যই তো গাড়ি আনলাম না।তোমার শখ হয়েছে রিক্সা চড়ে ঢাকা শহর দেখবে।গাড়ি আনলে কি আর এভাবে রাস্তা পার হওয়া লাগতো।"
"নড়াইলে এখন সচরাচর রিক্সা পাওয়া যায় না।তাই আমি রিক্সা ই চড়বো।এখানে রিক্সা দেখে আমার চড়তে ইচ্ছা করছে খুব।"
"আগে খুব শখ করতো,প্রেমিক নিয়ে রিক্সায় ঘুরবো।কিন্তু প্রেমিক মহোশয় তো বিয়ে করলেন প্রেম তো করলেন না।
"আপনার প্রেমিক মহোশয় বিয়ে করেছো কি জন্য জানতে পারি?"
"আমিও প্রশ্ন ছুড়ে বললাম,কি জন্য?"
"উনি দুই ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,প্রশ্ন টা তো আমার। "
"তাতো জানিনা।"
"সে তো বিয়ে করেছে প্রেম করার জন্য।নিশ্চিন্তে প্রেম করার সার্টিফিকেট অর্জন করেছে বুঝেছো।"
উনার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।পৃথিবীর সব কঠিন কথার সুন্দর সমাধান তার কাছে আছেই।
"উনি একটা দোকান থেকে একটা পানির পট কিনে আমার হাতে দিয়ে বললেন,এই নাও পানি খাও।গলা শুকিয়ে গিয়েছে তোমার।"
"মুখ শিটকিয়ে বললাম,এই কেনা পানি আমি খেতে পারি না।"
"এখন টিউবওয়েল এর পানি কোথায় পাবো?"
"কোনো দোকানে আছে কিনা দেখুন।"
"ওই যে পান খাচ্ছে দেখেছো?ওই চাচা পান খাওয়া গালে পানির বোতল মুখে পুরে পানি খায়।উনার কাছে থেকে খাবে।"
"ইয়াক থু।সব সময় আমার পিছে লাগতে ভালো লাগে আপনার তাইনা?এনি ওয়ে স্পিড বা টাইগার খাবো এসব মিনারেল ফিনারেল খাবো না।"
"টাইগার স্পিড কি কোনো হেলদি খাবার।"
"ওসব হেলদি টেলদি ভাবার বয়স হয়নি আমার।ওগুলো আপনার মতো বয়স্ক মানুষের শরীরে ক্ষতিকর।"
"আমি বয়স্ক খুব অবাক হওয়ার ভাব উনার চোখে মুখে।"
"অভিয়াসলি।"
"আমার বয়স কত?"
"কতো আর ছেলেরা কুড়ি তে বুড়ি।"
"সিরিয়াসলি !উনার মুখে তাচ্ছিল্যর হাসি।ছেলেরা নাকি মেয়েরা।ছেলেরা আবার বুড়ো হয় নাকি।শুধু আমার শ্বশুর ই বুড়ো হয়েছে দেখলাম।পলিটিক্স বেশী করে করে বুড়ো হয়েছে।মেয়েকেও তাই শিখিয়েছে।"
"ভুলেও বাবাকে নিয়ে ফাউল কথা বলবেন না।"
"হাহাহাহা তোমাকে রাগানো এত সোজা কেনো?রাগলে গাল দুটো পাকা টমেটোর মতো হয়ে যায়।বেশ ইনজয় করি আমি।"
রাস্তা পার হলে একটা রিক্সা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম।রেস্টুরেন্টে যেতেই দেখি চারজন ছেলে আর দুইজন মেয়ে বসে আছে।অচেনা মানুষদের মাঝে কেমন আনইজি ফিল হয় আমার।এখানে আরো বেশী আনইজি ফিল হচ্ছে আমার।কেননা বিহানের ফ্রেন্ডরা সবাই বড় বড় ডাক্তার।তাদের সাথে গুছিয়ে কথা বলতে পারবো কিনা, কোনো লজ্জায় পড়তে হয় কিনা সেসব ই ভেবে যাচ্ছি।কেমন যেনো বুক ও কাঁপছে।আমাদের দেখেই বিহানের ফ্রেন্ডরা সালাম দিলো।আমরাও সালামের উত্তর দিলাম।
সবার মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিলো তারা এটা বলতে চাইছে ইনিই কি আমাদের ভাবী।আমাকে দেখে এটা ভাবাই স্বাভাবিক ছিলো।
বিহান সবাই কে বললো,
"যাকে দেখার জন্য এতদিন মন ব্যাকুল ছিলো তোদের তাকে নিয়ে এসছি।ওর নাম ই দিয়া আমার লাইফলাইন।"
সবার মুখে ভীষণ মিষ্টি হাসি ফুটলো।
সবাই বিনয়ের সাথে কথা বললো আমার সাথে।আমার এডমিশন কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলো।ঢাকায় এসে কেমন লাগছে কোনো অসুবিধা হচ্ছে নাতো।এক কথায় তারা এমন ভাবে কথা বলছে আমি ইজি হয়ে গেলাম কয়েক মিনিটের মাঝে।একে একে সবাই ফুলের তোড়া সহ একটা করে গিফট বক্স উপহার দিলো।তারা সবাই অত্যান্ত মিষ্ট ভাষীর মানুষ। তাদের সাথে পরিচয় হওয়ার এমন টা ভাবতে পারিনি হবে।আসলে তারা শুধু শিক্ষির নয় বরং স্বশিক্ষিত।
--একজন বললো,বিহান ভাবি কিন্তু সত্যি শ্যামাপাখি।
--বিহান বললো,শুধু আমার জন্য শ্যামাপাখি,আর তোদের ভাবি।
--ভাবি দেখতে কিন্তু খুব সুন্দর, তুই আসলেই লাকি।ভাবি অনেক ইনোসেন্ট মেয়ে।এই যুগে এমন মেয়ে পাওয়া মুশকিল।
--অন্য একজন বললো,তুই একা প্রশংসা করছিস কেনো সিফাত?বিহান আমার কাছে জানতে চাইবি না ভাবি কেমন হয়েছে।আমি বলছি।