নন্দিনী নীলা
নন্দিনী নীলা

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

এক চিলতে রোদ | রিকশায় নীরবতা ও অতীত

সমাপ্ত

এক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ১১

০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

আজকে ইহানকে বাসায় যাওয়ার অফার করলাম কিন্তু কিছু বললো না।‌ যে রিকশায় এসেছি সেটায়‌ই চলে গেলো। আমি তাকিয়ে ছিলাম রিকশা যতক্ষণ ছিলো ততক্ষণ। চোখের আড়াল হতেই ভেতরে চলে গেলাম। আম্মু আজ আমাকে বকলো আমি চুপ করে বকা হজম করে নিলাম দোষ আমার তাই হজম তো করতেই হবে। ইহানের সাথে এক রিকশায় আসতে খুব অস্বস্তি লেগেছে। ইহান হয়তো তা বুঝতে পেরেছিলো তাই বলেছিলো,

‘ আমার সাথে এক রিকশায় যেতে তোমার প্রবলেম হলে ও যেতে হবে। কারণ এখন আমি আরেকটা রিকশা খুঁজতে পারবো না।’

আমি খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি ইহানের কথায় আর উনি আমার দিকে বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি আমতা আমতা করে বলি,

‘ সমস্যা নাই। চলুন।’

বলেই আমি একদম কোনা ঘেঁষে বসে ছিলাম‌। রিকশা ছারতেই আমি কিনারায় বসার জন্য পড়ে যেতে নেয় তা দেখে ইহান আমার ডান বাহু চেপে ধরে টেনে নেয় নিজের দিকে আর বলে,

‘ প্রবলেম কি তোমার? রিকশার নিচে পরে মরতে চাও নাকি? একদিন ট্রাকের নিচে একদিন রিক্সায় নিচে যতসব ফালতু!’

আমি চমকে উঠে বললাম, ‘ আমি মরতে চাইনি সেদিন কতো বার বলবো!’

‘ ভালো। তো এখন এমন করছো কেন? আমার সাথে গা ঘেঁষলে কি তোমার গায়ে ফোসকা পরবে নাকি?’

‘ না মানে আসলে…

আমি চুপ করে যাই। কি বলবো? উনার কাছে থাকলে যে আমার বুক ধুকপুক করে, হাত পা কাঁপে, অস্থির লাগে তা উনাকে কি করে বুঝাবো। ইহান আমাকে আর কিছু বললো না। আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো।আমি কথা বললেও তিনি কিছু না বলে চলে গেলো।
স্কুল থেকে ও আমি আরো দুইবার গেছি হাসপাতালে। কিন্তু পরিবারের কারো সাথে তেমন দেখা হয়নি। ইহানের সাথেও না। একদিন ইমা আপুর বাবা ছিলো। তার সাথে হালকা কথা বলেছি। কথা বলার থেকে আমি তার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলাম বেশি।কারণ তিনি দেখতে একদম আমার আব্বুর মতো। আমি চমকে গেছিলাম। সেদিন বাসায় এসে রাতে আব্বুকে বললাম,

‘ জানো আব্বু আজ একদম তোমার মতো দেখতে একটা আঙ্কেল দেখেছি।’

আমার কথা শুনে আব্বু ও অবাক চোখে তাকালো। আমি বললাম,

‘ ওই সেদিন একটা আপুকে রক্ত দিয়েছিলে না। তার আব্বু তোমার মতো দেখতে অনেকটা।’

‘ ও আচ্ছা। এক রকম দেখতে অনেক মানুষ আছে এই পৃথিবীতে।’

‘ আমি ভেবেছিলাম যেন আমার কাকা ওটা। আচ্ছা আব্বু আমার কোন কাকা, দাদা দাদী নাই?’

‘ আছে থাকবে না কেন?’

‘ সত্যি তাহলে আমি তাদের চিনি না কেন?’

‘ একটা ঝামেলায় তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ নাই মা!’

‘ কি ঝামেলা আব্বু?’

‘ অন্য একদিন বলবো এখন যাও ঘুমাও।’

‘ আচ্ছা।’

এসব বিষয়ে যতবার জিজ্ঞেস করেছি এক কথায় বলেছে আব্বু। কিন্তু পরে আর কিছু জানায় নি।
ফেসবুক লগইন করে ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বললাম কিছুক্ষণ তারপর কি মনে করে যেন ইহানের নাম করে সার্চ করলাম আর পেয়েও গেলাম তার আইডি। আইডি চেক করলাম। প্রোফাইলে পিক নীল শার্ট পরে স্টাইল করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সানগ্লাস। হাতে ঘড়ি, ব্রাউন রঙের প্যান্ট। আমি এক দৃষ্টিতে কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থেকে অফ লাইন হয়ে গেলাম।

কয়েকদিন পর

রিমঝিম আপুর বিয়ে। রিমঝিম হচ্ছে আমাদের ফ্রেন্ড রিমার বড় বোন‌। বিয়েতে দাওয়াত করলো আমাদের ফ্রেন্ড সবাইকে গায়ে হলুদ থেকে। আমি রাজি আছি শুধু সমস্যা বাবা মা কে নিয়ে তারা থাকতে দিবে ত? রিমা কে বললাম তুই আম্মুকে রাজি করা প্লিজ। আমরা বিয়ে অনুষ্ঠানে খুব পছন্দ তাই যাওয়ার আগ্রহ অনেক।তুলি তো যাবেই আমিও রাজি বাকিরা সিউর নাই। রিমা আমার সাথে বাসা গিয়ে আম্মু কে কার্ড দিলো আর অনেক অনুরোধ করলো রাজি হতে। আম্মু রাজি হলো না। আমি মন খারাপ করে র‌ইলাম। তিন দিন পর গায়ে হলুদ। আমার যাওয়া হবে না। আম্মু বলেছে বিয়ের দিন সকাল গিয়ে বিকেলে আসবো। আমার ভালো লাগছে না।
রুমে এসে মন খারাপ করে র‌ইলাম। রাতে আমি মুখ গোমড়া করে র‌ইলাম। পরদিন ও আব্বু তা দেখে জিজ্ঞেস করলো আমার মন খারাপ কেন? আমি বলে দিলাম আর এবার আম্মুর জায়গায় আব্বু রাজি হলো আমাকে অবাক করে দিয়ে।আমি আব্বুকে জরিয়ে ধরে ধন্যবাদ দিলাম। একটা সুন্দর
গিফট কিনলাম।‌‌এদিকে রিমা ওর আব্বুকে দিয়ে আমার আব্বুর সাথে কথা বলিয়ে ছে। একদিন আগেই রিমা এসেই আমাকে নিয়ে গেলো। তুলি কাল আসবে ও ফুপির বাসায় গেছে নাকি।
রিমঝিম আপু ও বাসার সবার সাথে পরিচয় হলাম। সবাই খুব মিশুক আর ভালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সাথে মিশে গেলো যেন আমি তাদের বাড়ির মেয়ে আমিও তেমন করেই চলছি।
বাসায় অনেক আত্মীয় স্বজন আছে। অনেকে ভালো আবার অনেক ঝামেলা জনক। একজন আছে সারা ক্ষণ চিৎকার করতে থাকে সব কিছু নিয়ে। রিমঝিম আপু এই চেঁচামেচি তে তার হবু বর সাইদ ভাই এর সাথে কথা বলতে পারছে না তাই আমাকে টেনে ছাদে নিয়ে এলো। আপুদের বাসার সাথে একটা খেলার মাঠ আছে সেখানেই বিয়ের আয়োজন হবে। আমি সেই মাঠের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে পরিচিত কাউকে দেখছি। কিন্তু কে আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করছি পারছি না। আপু কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলেই যাচ্ছে।আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আবার মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখি নাই। কোথায় গেলো? খয়রে কালারের টি-শার্ট ছিলো। আমি উঁকি ঝুঁকি মেরে খুঁজছি তখন একটা পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে আসে কানে। আমি চমকে পেছনে তাকায়। আমার সামনে দাড়িয়ে আছে ইহান। আমি ভয় পেয়ে বুকে ফূ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলি,

‘ আপনি এখানে কি করছেন?’

‘ আমার ও তো এক‌ই প্রশ্ন তুমি এখানেই কি করছো? ‘

‘ রিমার আমার ফ্রেন্ড। সেই সুবাদে!’

‘ ওহ আচ্ছা। তা আমার দিকে ওমন হা করে তাকিয়ে ছিলে কেন?’ ভ্রু কুঁচকে বললো।

আমি অবাক গলায় বললাম, ‘ কি বলছেন? আমি আপনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কখন?’

‘ এই মাত্র ওই মাঠে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলে না তুমি?’

‘ আপনি ওইখানে ছিলেন?

বলেই ইহানকে ভালো করে দেখলো। খয়ের টি শার্ট ওনার গায়ে তার মানে উনি‌ই ওখানে ছিলো। আর আমার কাছে চেনা চেনা লাগছে। আমি তো বুঝতেই পারিনি।

রিমঝিম আপু এগিয়ে এসে বলল, ‘ ভাইয়া তুমি এখানে কি করছো?’

‘ কিছু না। আর তুই এতো রাতে এখানে কি করছিস যা রুমে যা। দুইদিন তর সইছে না!’

রিমঝিম আপু লজ্জা লাল হয়ে গেলো আর আমাকে টেনে নিচে চলে এলো।আমি জিজ্ঞেস করলাম ইহান উনার কি হয় বললো খালাতো ভাই।আমি ওহ আচ্ছা বলে বিছানায় পা গুটিয়ে বসলাম।
রিমা কি জানি কাজ করছে একটু পর এসে আমাকে নিয়ে খেতে গেলো। ইহান একপাশে বসে গপাগপ খাচ্ছে আমাকে তার সামনাসামনি বসতে হলো পাশে রিমা। আমি তার সামনে খেতে লজ্জা পাচ্ছি তাই খেতে পারছি না। একটু পর পর ইহানের দিকে তাকাচ্ছি কিন্তু ইহান একমনে খেয়ে যাচ্ছে। একবারও আমার দিকে বা আশেপাশে কোন দিকে তাকাচ্ছে না। আমি ভাতের মধ্যে শুধু আঙ্গুল চালাচ্ছি খেতে পারছি না তাই রিমা বলে উঠলো,

‘এই ঊষা খাচ্ছিস না কেন তাড়াতাড়ি খা। ঘুমাবো বারোটা বাজতে চলল প্রায়।’

ইহানসহ টেবিলের সবাই আমার দিকে তাকালো আমি ঢোক গিলে শুকনা ভাতে মুখে পুরে নিলাম। তা দেখে ইহান বললো,

‘বান্ধবীকে শুকনো ভাত দিয়ে রেখেছিস শুধু তরকারি দে ইডিয়েট।’

রিমা আমাকে গোস্ত মাছ সবকিছু দিয়ে দেখিয়ে বলেছে নিয়ে খেতে কিন্তু আমি নিজেই নিয়ে নি। এবার ইহানের কথা শুনে আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল ,

‘তোকে না ইচ্ছামতো নিয়ে খেতে বললাম কিছুই নিস নি কেন?’

বলেই চিংড়ি মাছ দিতে এলে আমি তাড়াতাড়ি প্লেট সরিয়ে বললাম, ‘চিংড়ি দিস না।’

‘কেন চিংড়িতে কি হইছে খুব টেস্টি হয়েছে খেয়ে দেখ!’

‘আমি চিংড়ি খাইনা! আমাকে অন্য কিছু দে!’

‘কি এত মজা চিংড়ি তুই খাস না! মিস করলি।’

বলেই গরুর দোস্ত দিলো। ইহান আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলো।
আমি গোস্ত দিয়ে গেয়ে নিলাম চলে এলাম রুমে আর ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পরলাম।

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!