প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | সাজেক যাত্রায় বাধ্যবাধকতা
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ১৬
জ্বরের জন্য রিমা আমাদের সাথে যেতে পারলো না। কাল বিকেলে আমরা ফ্রেন্ডরা গিয়েছিলাম ওকে দেখতে। বিছানা থেকেই উঠতে পারছে না। খারাপ লাগছে ওর জন্য কিন্তু কি করবো আর। অসুস্থতার জন্য তো কারো হাত নেয়। আর এই অবস্থা কোথায় যাওয়ার উপায় নাই। রিমা ও মুখটা একটু খানি করে রেখেছিলো। আমি আর তুলি আজ রিকশায় উঠে ওর কথা ভাবলাম। আবার কল ও করে কথা বললাম। অভিমান করে কথা বলছিলো।
‘ তোরা সবাই আমাকে রেখে চলে যাচ্ছিস।’ রিমা বললো।
‘ তো আর কি করবো। তুই তো সময় মতো বিছানায় পরেছিস।’ তুলি বললো।
‘ আমি কি ইচ্ছে করে অসুখ বানিয়েছি নাকি। হয়ে গেছে কি করবো। আমার যে কতো আফসোস হচ্ছে তোদের বুঝাতে পারবো না।’
‘ আচ্ছা রাখি রে এসে পরেছি।’
‘ রাখ।’
বলেই খট করে ফোন কেটে দিলো।
‘ বাবাগো কি রাগ। বলতে বলতেই কেটে দিছে।’ আমার দিকে তাকিয়ে বলল তুলি।
আমি কিছু বললাম না। ইহান দের ভার্সিটিতে আসতেই রিকশা থেমে গেলো। ব্যাগ হাতে নেমে পরলাম। ভাড়া মিটিয়ে তুলিও আমার পাশে দাঁড়ালো। পাঁচটা বাস। আমাদের ক্লাসের আরো স্টুডেন্ট আছে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। চার ইয়ারের চারটা বাস আর একটা আমাদের স্কুলের যারা যাবে তাদের জন্য। সবার সাথে বাসে উঠে বসলাম। বাম সাইডের তিন নম্বর সিটে বসলাম আমি আর তুলি। আমি জানালার কাছে বসেছি তুলি পাশে বসে ঝগড়া করে যাচ্ছে আমিয় নরছি না
‘ আমি কিন্তু উঠে অন্য সিটে বসবো। ‘ বলে উঠলো তুলি।
‘ এমন করছিস কেন? আমি জানালা পাশে ছাড়া বসতে পারি না জানিস তো।’ অসহায় মুখ করে।
তুলি বললো, ‘আমি ও তো পারিনা।’
‘ আচ্ছা অর্ধেক রাস্তা আমি থাকবে বাকি অর্ধেক রাস্তা তুই বসবি।’
‘ আচ্ছা।’
বলে স্কাপ ঠিক করে নিলাম। জানালা ভালো করে খুলে দিলাম। অনেকে আসে নি এক এক করে আসছে সবাই অনেক সেজেগুজে এসেছে দেখছি। আমি আর তুলি সবাকে দেখছি তুলি এটা ওটা বলছে আমি উওর দিচ্ছি।
আরো আধা ঘন্টা বসে থাকার পর গাড়ি ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলো। এর মাঝে একবার ও ইহান কে দেখি নি।
ওর কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। তুলি বলতেই মনে পরলো।
‘ এই ঊষা ইহান ভাইকে দেখলাম না ত। তুই কি দেখছিস?’
‘ নাহ।’ সাথে সাথেই উত্তর দিলাম।
‘তারা তো থার্ড ইয়ারে পড়ে তাই না। তাদের গাড়ি আমাদের পেছনের টা।’
বলেই আমার উপর দিয়ে জানালা দিয়ে পেছন এ তাকালো। আমি ধাক্কিয়ে সরিয়ে বললাম, ‘ কি হচ্ছে আমার উপরে ঝাপিয়ে পরছিস কেন?’
‘ আরে দেখলাম গাড়িটা। ইহান ভাই তোর সাথে দেখা করতে এলো না। উনার কাজ বোধহয় কথা লাগবে না তোর। বেঁচে গেলি।’
তুলির কথা শুনে ওর দিকে তাকালাম। এটা হলে তো বেঁচে যেতাম যাই হোক উনার সব খারাপ এর মধ্যে ও একটা দিক খুব ভালো লেগেছে তা হলো ওনার জন্য বেড়াতে যেতে পারছি।
গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার আগে স্যার ও ম্যাম গুনে দেখলো সবাই এসেছে নাকি। দেখে নিজেদের সিটে বসে পরলো। আমি জানালার বাইরে নিজের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। তখন ইহানকে দেখে চমকে উঠলাম। আকাশী রঙের শার্ট ও ব্রাউন প্যান্ট পড়ে আছে। চোখে কালো সানগ্লাস। অ্যাটিটিউড নিয়ে দাঁড়িয়ে সামনের জনের সাথে কথা বলে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি ইহান তাকাবে ভাবলাম কিন্তু ভুল করেও তাকালো না। গাড়ি চলে গেলো আমি চোখ সরিয়ে সামনে তাকালাম। ভালোই হয়েছে আমাকে দেখে নি আর না আমাকে ওইসব নিয়ে কিছু বলেছে উনি মনে হয় সব ভুলে গেছে তাহলে তো খুব ভালো। আমার আর ঝামেলা পোহাতে হবে না।
এক জোড়া চোখ তীক্ষ্ণ নজরে বাসটার দিকে তাকিয়ে ছিলো যা আমার নজরে পরলো না।
গাড়ি চলতে লাগলো। আমি বাইরের কোলাহল বিহীন রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। সকাল বলে মানুষের আনাগোনা খুবই কম। শুধু অফিসের লোক রা রাস্তা দাড়িয়ে আছে আর কিছু টিউশনির ছাত্র-ছাত্রী। আর আছে রিকশা, অটো মালামালের গাড়ি। সব কিছু পাস করে যাচ্ছি। পার্সের ভেতর থেকে ফোনটা বেজে ওঠলো। আব্বু কল করেছে। বাস ছেড়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলো। তারপর রেখে দিলো নিজের খেয়াল রাখতে বলে।
সকালের ঠান্ডা বাতাসে ভালোই লাগছে বসে থাকতে। তুলির সাথে গল্প, ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে গান শুনছি। এভাবেই সময় কাটছে। আমি ব্যাগ ভর্তি করে চকলেট, চিপস, সেন্টার ফুট নিয়ে এসেছি সেগুলো বের করে খাচ্ছি তুলিকে নিয়ে। দুই ঘন্টা পার হতেই তুলি একপ্রকার জোর করে আমাকে ঠেলে জানালার পাশে গিয়ে বসলো। আমাদের সিটের সোজা পাশের সিটে বসেছে আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে স্টাইলিশ মেয়ে মারুফা বসেছে সেখানে। হাহাহা করে হাসেন ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক দেওয়া। বিয়ে বাড়িতেও মানুষ এতো সাজে না ওর মতো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন মারুফার বান্ধবী শিলা আমার দিকে তাকালো। সাথে মারুফা ও। আমি ঠোঁটে হাসি টেনে বললাম,
‘ হাই তোমাদের অনেক সুন্দর লাগছে।’
আমার কথা শুনে মারুফা খুশিতে গদগদ কন্ঠে বলল, ‘ থ্যাঙ্কস।’
আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। তুলি আমার দিকে টেরা চোখে তাকিয়ে আছে আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলাম। আর বললাম, ‘ ঢপ মারলাম।’
তুলিও হেসে উঠলো।
একটার দিকে গাড়ি থেকে নামতে হলো সবার। খাওয়া-দাওয়া করার জন্য। রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। খাওয়া শেষ করে ওয়াশরুমে থেকে বের হলাম। তখন ইহানকে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ভ্রু কুটি করে চলে আসতে যাব ইহান আমাকে থামিয়ে দিলো। আর বললো,
‘ গাড়ি চেঞ্জ করতে হবে তোমার।’
আমি বললাম, ‘ মানে কি গাড়ি চেঞ্জ কেন করবো?’
‘ আমাদের গাড়িতে যাবে তাই।’
‘আমি আপনাদের গাড়িতে যাব কেন?’
‘ আমি বলেছি তাই যাবে। এখন স্যার দের গিয়ে রাজি করাও।’
‘ আপনার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে। কি যাতা বলছেন? আমি এটা কেন করবো আর বললেই স্যার রাজি হবে এমনটা আপনার কেন মনে হলো?’
‘ দেখো রাজি করানোটা তোমার ব্যাপার’
‘ আপনি কিন্তু রীতিমতো আমাকে টর্চার করছেন।’
‘ আমাকে ছুঁয়ে কথা দিয়েছিলে তুমি। এখন কি কথা
না রাখার ফন্দি আকছো নাকি?’
‘ আমি কথা দিলে রাখি ওকে। আর আপনার কাজটা করতে আমার এখন ওই গাড়িতে কেন যেতে হবে।’
‘ না গেলে করবে কি করে?’
‘ বলির পাঁঠা আমাকে না করলে হতো না আপনার!’
‘ রাগারাগী পরে করো।আগে ম্যানেজ করে আসো কুইক।’ বলেই তাড়া দেখাতে লাগলো ইহান।
আমি বললাম, ‘ আপনি বুঝার চেষ্টা করেন আপনাদের গাড়িতে আমাকে কেন ছাড়বে? যেখানে আমাদের গাড়িতে সিট ফাঁকা আছে। আমি কি করে রাজি করাবো?’
ইহান দুই সেকেন্ড চুপ থেকে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ তুমি কি জানালার পাশে বসেছো?’
‘ বসেছিলাম কিন্তু এখন তুলি সেখানে। আমাদের দুজনের ই জানালার পাশে বসতে চাই তাই হাঁফ করে নিয়েছি। কিন্তু ও আগে চলে গেছে।’
‘ তুলি কি বমি করে গাড়িতে? আর তোমার কি এমন অভ্যাস আছে?’
‘ না না আমার নেই। আমার তো গাড়িতে যাতায়াতের অভ্যাস আছে। তুলি আছে বেশি না ও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে।
‘ তোমার এখন মিথ্যে বলতে হবে।’
‘ মানেএএ?’
ইহান তারপর আমাকে বললো স্যারদের কিভাবে ম্যানেজ করবো। কিন্তু এতে কি হবে?
‘ আমি যদি আপনার কথা মতো বলিও তা ও তো স্যার আপনাদের গাড়িতে আমাকে পাঠাবি না। আমাদের গাড়ির অন্য কোন সিটে ব্যবস্থা করে দিতেই পারে।’
‘ দিলেও তোমার পাশে কেউ বসবে না। তুমি খালি বলো তোমার গাড়িতে অনেক বমি হয় শত চেষ্টা করেও কন্ট্রোল করতে পারো না। যেতে তোমার অনেকবার বমি হবে এবং এখন ও করেছো নেমে। এসব শুনলে কেউ তার পাশে তোমাকে বসাবে না কারণ বমি দেখতে কেউ পছন্দ করে না সবাই নাক ছিটকায়।’
‘ আপনার জন্য আমি এই ঘোর মিথ্যা বলতে পারবো না।’
‘ বলতে তো তোমাকে হবেই।’
‘ বলবো না কিছুই।’
‘ওকে এইটা আমি যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে ফেলে দেবো।’ বলেই নূপুর জোরা বের করে দুলাতে দুলাতে চলে গেলো। বাধ্য হয়ে আমাকে এই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হলো। আমার কথা শুনে ইহান এগিয়ে এসে বললো ওদের গাড়িতে একটা এক্সট্রা সিট আছে সেখানে আমাকে বসিয়ে দেবে। আমার এসব কথার মাঝে তুলি এগিয়ে আসলো। আর বললো,
‘না না ঊষা তুই ওই গাড়িতে যাস না। তুই আমার সাথে থাক। আমি আর জোর করে জানালার পাশে বসবো না। তুই বস তোর যে এত গাড়িতে বমি পাই আমি তো বুঝিনি। এতোক্ষণ তো ভালই দেখ…
ইহান এসে তুলিকে থামিয়ে দেয় আর চোখের ইশারায় কিছু বলে তাতেই তুলি পাল্টি খেলো।
‘ না না থাক আমার ও তো বমি হয়। দুজন এক
সাথে কি ভাবে কি করবো তুই ওই গাড়িতেই যা। আমি একাই ভালো আছি। বলেই ভেতরে চলে গেলো। স্যার রা রাজি হতে চাইছিলো না একটা ছেলের সাথে আমাকে ছাড়তে পারে না। তখন ইহানের ফ্রেন্ড মুক্তা আপু এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘স্যার চিন্তা করবেন না আমি আছি ঊষার সাথে।’
মুক্তাপুর কথা শুনে আমাকে ছাড়লো ইহান গিয়ে আমার ব্যাগ পত্র নিয়ে এলো। আমি তাদের সাথে তাদের বাসে গিয়ে উঠলাম। তখন ফারিয়াকে দেখে ঢোক গিললাম। আগুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আল্লাহ! এই চোখ দিয়ে আমাকে বষ্স করে দেবে। আমি চুপচাপ এগুতে লাগলাম। আমাকে বসতে দিলো লাস্টের দুই সিট আগে। জানালার পাশে বসলাম এবার। মুক্তা আপু আমাকে বসিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আমি বড় আপু ভাইয়াদের দিকে এক বার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম।
বাস চলতে শুরু করলো। আমি একাই সিটে বসে আছি। তারমানে এখানে একাই বসতে হবে আমি ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। আবার চোখ খোলে বাইরে তাকালাম। শহর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি অনেক আগেই। বাইরে তাকিয়ে আমি গান শুনছি। তখন ধপাস করে কেউ আমার পাশে বসলো আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আর তাকিয়ে দেখি ইহান বসেছে। আমি তাকাতেই দাঁত কেলিয়ে হাসলো। আমি চমকে উঠে দাঁড়ালাম।
‘ একি আপনি আমার পাশে বসেছেন কেন?’
‘ তো কোথায় বসবো এটা তো আমার সীট।’
‘ কি আপনার সীটে তাহলে আমাকে বসিয়েছেন কেন?’
‘ একসাথে বসবো তাই।’
‘মানে একসাথে বসবো কেন? আপনি উঠুন এখানে থেকে নাহলে আমি উঠে যাব।’
ইহান টান দিয়ে আমাকে বসিয়ে দিলো। আমি রেগে হাত ঝামটা দিয়ে ছাড়িয়ে বললাম,
‘ এইজন্য তাহলে এখানেই এনেছেন?’
‘ তুমি মনে হয় সব কথা ভুলে গেছো?’ বলেই আমার দিকে তাকালো। আমি কটমট চোখে তাকিয়ে আছি।
