প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | বাগানে ঈর্ষার আগুন
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ১৮
‘ এই ঊষা এমন হাপাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে?’ তুলি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো।
আমি বার কয়েক শ্বাস নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম। তুলি আমার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আমি শান্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘ কিরে এমন ঢাবঢাব করে তাকিয়ে আছিস কেন?’
‘ কোথায় গেছিলি। আর হাঁপাতে হাঁপাতে কোথা থেকে আসলি?’
‘ বলছি এতো পাগল হচ্ছিস কেন? এতো অধৈর্য কেন তুই!’ বিরক্ত হয়ে বললাম।
তুলি আমাকে ঠেলে বিছানায় জায়গা করে বসে বললো, ‘ আচ্ছা বল তুই কোথায় ছিলি?’
‘আমি ইহানের সাথে ছিলাম।’
‘বলিস কি? কোথায় ছিলি তোরা?’ চোখ বড় করে বললো তুলি।
আমি সব খুলে বললাম। ও শুনে হা করে বললো, ‘ ওই মাইয়ার সাথে ঝগড়া করছে তোরে না। ওরে খেলা তো জমে উঠেছে।’
‘ ধুর ওই ফারিয়া আমার দিকে যে ভাবে তাকায় আমার তো ভয়ে বুক ধুকপুক শুরু হয়ে যায়। চোখ দিয়ে আমাকে গিলে খাবে যেন।’
‘ এতো ভয় পাওয়ার কি আছে। ইহান তো আছেই তোর জন্য। শুধু শুধু চলে এসেছিস।’
‘ আমার ঘুম পাচ্ছে আর আমি কিনা ওখানে বসে তাদের পেছাল শুনবো।’ বিরক্ত মুখ করে বললাম।
তুলি আর কিছু বললো না। আমার পাশেই শুয়ে পরলো। ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলো। আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। চোখ বুজে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরলাম। ফোনের রিংটোন এ আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমঘুম চোখে ফোনে কানে তুলে নেয়। হ্যালো বলেই অপরপাশে থেকে বকা খেয়ে ঘুম উবে যায় আমার। চোখ কচলে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি ইহানের কল। বারোটা বাজে। এতো রাতে কল করেছে কেন? পাগল নাকি এই লোকটা।
আমি ফোন কানে নিতেই গম্ভীর গলায় ইহানের কথা শুনলাম। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খট করেই ফোন কেটে দিলো। কল লিস্ট এ গিয়ে আমার চোখ চড়কগাছ হয়ে গেলো। ইহানের অনেক কল দেখা যাচ্ছে। আমি না ধরা পর্যন্ত থামবে না ভেবেছিলো বোধহয়।
পরদিন তুলির ধাক্কায় উঠে বসলাম। এতো ভোরে কে উঠিয়েছে আমাকে ওকে জিজ্ঞাস করলাম,
‘ এখনো তো সকাল হয়নি ঠিকমতো। আমাকে এখনোই উঠালি কেন?
‘ তাড়াতাড়ি উঠ। ফ্রেশ হয়ে আয়।’
‘ কেন?’ সামনে তাকিয়ে দেখি বাকিরা ও উঠে গেছে। ওরা সাজু কাজু করছে দেখে বললাম, ‘ওরা রেডি হচ্ছে কেন?’
‘ ম্যাম বলে গেছে সবাইকে ফ্রেশ হয়ে বের হতে। এখনি বের হবে।’
‘ ওহ। আচ্ছা।’
আকাশ পাতাল চিন্তা করে উঠে দাঁড়ালাম। ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নিলাম। চুল আঁচড়ে কাঁকড়া দিয়ে বেঁধে নিলাম। মুখে পাউডার মেখে নিলাম। তুলির ও রেডি হওয়া শেষ আমরা বেরিয়ে এলাম। সবাই বের হচ্ছে। রিসোর্টে এর সামনে এসে দাঁড়ালাম সবার সাথে । আমার সাথেই তুলি আছে।
সবাই একসাথে যাত্রা শুরু করলাম। এখন আমাদের হ্যালিপ্যাডে যেতে হবে সেখানে থেকে সকালে সূর্যদদোয় দেখা হবে। আর মেঘ দেখা যাবে খুব নিকট থেকে। ম্যাম এসব বললো। বিরক্ত লাগছিলো এমন সাতসকালে উঠার জন্য কিছু ম্যাম এর কথা শুনে দেখার জন্য ছটফট করছি।
সাজেক শব্দটা মনে পরলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে এক মেঘময় একটা পৃথিবী।এখানে ক্ষনে ক্ষনে পৃথিবী তার রুপ বদলায়।কখনো তীব্র শীত আবার কখনো বৃষ্টি। চোখের পলকে ঘোমটা টানে সাদা কালো মেঘ। এ যেন মেঘের এক উপত্যকা, মেঘেদের রাজ্য আর নিজেকে মনে হয় মেঘের রাজ্যে বাসিন্দা।
হাঁটায় আমি সবক্ষন কাঁচা। বেশি হাঁটতে পারিনা। একটু হেঁটে আমার পা ব্যাথা হয়ে গেছে।সবাই কি সুন্দর হেসে খেলে যাচ্ছে। আমি তুলিকেও হারিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছি ওকে খোঁজতে। মারুফাকে পেলাম আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ দুই কদম এসেই হাঁপিয়ে গেলে ঊষা।’
আমি বললাম, ‘ না আসলে সকাল বেলা আমি কিছু করতে পারিনা অভ্যাস নাই।’
‘ আমাদের ও নাই তবুও তোমার মতো নেতিয়ে পরিনি।’
বলেই হেঁটে এগিয়ে গেলো। আমি কটমট করে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা খুব বেয়াদব। সবার সাথে বাজে বিহেভ করে ও কি শান্তি পায় আল্লাহ জানে। কেউ আমার হাত শক্ত করে ধরলো। চমকে পাশে তাকিয়ে দেখি ইহান ও ওর ফ্রেন্ডরা। ইহান আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ একা যাচ্ছ কেন? আমাকে রেখে এতো রাগ কেন তোমার?’
আমি হাঁ করে বোকা চোখে তাকিয়ে আছি ইহানের দিকে। মাথা গেলো নাকি উনার সাথে আমি রাগ করলাম কখন? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বাকিদের দিকে তাকালাম। তারা আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ফারিয়া রাগে গজগজ করছে। আমি চোখ সরিয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগলাম।
ইহান ছাড়লো না উল্টা আরো শক্ত করে ধরলো। তখন তুলি এলো আমার কাছে দৌড়ে। আর বললো, ‘ তুই খালি হারায় যাস কেন রে?
বলেই আমাদের হাতের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগলো। আমি ভয়ংকর চোখে ওর দিকে তাকালাম। ও তোয়াক্কা করলো না।আমরা চলে এলাম হ্যালিপ্যাডে এখানে এসেই আমার সমস্ত ক্লান্তি হাওয়া হয়ে গেল। ইহান এখনো হাত ধরে ছিলো আমি হাত ছাড়িয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতেছি মুগ্ধ চোখে।
সাদা মেঘ যেন আমার মাথার উপর। হাত বাড়ালেই তা আমি ছুঁয়ে দিতে পারবো। আমি হাত বাড়িয়ে বোকার মতো তা ছুয়ে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারিনি। তাই হাত বাড়িয়েছি। ফল স্বরূপ কিছু পাইনি। ইহানের ফিসফিস করে কথায় আমার হৃদপিন্ড কেঁপে উঠলো। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো।
বদমাইশ টা আমার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে আমি চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিয়ে তাকানোর আগে কিছু অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করলাম।
চোখ মেলে আর ইহানকে কড়া কথা শুনাতে পারলাম না। চোখের সামনে সূর্য দদোয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। সবাই মুগ্ধ নয়নে সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
ফুরফুরে মেজাজে আমরা ব্যাক করলাম। এখনো যেন ওই সৌন্দর্যের মধ্যে যেন আমি আটকে আছি। এবার হাঁটতে আর আমার বিরক্ত লাগছে না চারপাশের উঁচু নিচু পাহাড়, সবুজ গাছ গাছালির দেখতে দেখতে চলছি। আমার হাত এখনো ইহানের হাতের মুঠোয়। আমি ছাড়াতে চাইলেও ছাড়ে না। তাই বাধ্য হয়ে তার সাথে আমার আটকে চলতে হচ্ছে।
ব্রেকফাস্ট করতে আজ ইহানদের টেবিলেই বসতে হলো। আমার একপাশে তুলি ও অন্য পাশে ইহান।
তুলি আমার কানে ফিসফিস করে বললো,
‘ দোস্ত ফারিয়া তোর দিকে কেমন রাক্ষসীর মতো তাকিয়ে আছে দেখ।’
আমি ওর কথা শুনে সামনে তাকালাম। ফারিয়া আমার সোজা সামনে বসেছে। আমি তাকাতেই তার কঠিন দৃষ্টিতে দেখলাম। আমি মুখ নিচু করে বললাম,
‘ আমাকে চিবিয়ে খাচ্ছে রে। একবার একা পেলে আমার কি অবস্থা করবে তাই ভাবছে।’
‘ইহান তো আমাদের সাথে আছেই টেনশন কি?’
এই লোকটার পাল্লায় আমাকেই পরতে হলো। এর জন্য আমি একজনের চোখের বিষ হতে হলো। দোষ না করেও দোষী হলাম হায় কপাল আমার।
খাবার আসতেই সবাই খাওয়া শুরু করে দিলো। আমি সবার পরে খেতে শুরু করলাম। রিমার হাতে মেসেজ এ কথা বলছিলাম তাই। খাওয়ার মাঝে মুক্তা আপু বললো,
‘ হে ঊষা তোমার ভাই বোন কয় জন?’
আমি মুখের খাবার ফিনিশ করে বললাম, ‘ আব্বু আম্মুর একমাত্র মেয়ে আমি আপু। আমার ভাই বোন নাই।
‘ ওহ আচ্ছা। তাহলে তো তুমি খুব আদরের মেয়ে।’
‘ হুম।’
আর কেউ কোনো কথা বললো না। খাওয়া শেষে আমরা আবার বেরিয়ে পরলাম।
হাজাছড়া ঝর্না, দীঘিনালা ঝুলন্ত ব্রিজ ও দীঘিনালা বনবিহার গুলো ঘুরতে।
