নন্দিনী নীলা
নন্দিনী নীলা

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

এক চিলতে রোদ | পাহাড়ের চূড়ায় জবরদস্তি

সমাপ্ত

এক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ২১

০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

সাজেকের সবোর্চ্চ চূড়া কংলাক পাহাড়। চূড়ায় উঠতে উঠতে দেখতে পাই মিজোরাম সীমান্তের পাহাড় ও সবুজের মিতালি। চূড়ায় উঠে চারপাশে তাকাতেই আমার সমস্ত ক্লান্তি, কষ্ট নিমিষেই দূর হয়ে এক মিষ্টি সিগ্ধ হাওয়া আর অপূর্ব সৌন্দর্যের এই প্রকৃতির দেখে দেহ, মন পুলকিত হয়ে উঠে।
পাহাড়ের চূড়ায় থেকে নেমে সবাই গ্রাম কংলাক পাড়া ঘুরে আসি। কংলাক পাড়া লুসাই জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত এলাকা। কংলাক পাড়া থেকে কর্ণফলীর নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের লুসাই পাড়া দেখা যায়।
এরপর রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেনিং করে কমলক ঝর্না ভ্রমন করালাম। এই ঝর্নাটি অনেকের কাছে পিদাম তৈস ঝর্না বা সিকাম তৈসা ঝর্না নামেও পরিচিত।

বিকেলে বের হতে চাইলেও রেস্ট নিয়ে সন্ধায় পর আগেই ডিনার করে বের হতে হয় সবাইকে। বেড়ানোর পর আমার মনটা অনেকটায় ভালো হয়ে আছে। তবু্ও মনের এক কোণে কষ্ট লুকিয়ে আছে। ইহানের জন্য ই এই কষ্ট টা অনেকটাই কাটিয়েছি। আসার সময় আমার ইহান আমার সাথে ছিলো। কিন্তু যাওয়া থেকে শুরু করে সব জায়গায় ই আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছিলো। আধা ঘন্টার মতো রেস্ট নিয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। কোন গাড়িতে বসবো বুঝতে পারছি না। ইহানের আসার জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু দেখা পেলাম না। স্যাররা তারা দিচ্ছে উঠার জন্য তাই আর না দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়ির দিকেই হাঁটা ধরলাম।
বাসে উঠার সিঁড়িতে পা রাখতে যাব এমন সময় হাতে টান পরে চমকে পেছন ফিরে দেখি ইহান আমার হাত ধরে আছে। কিছু বলার আগেই টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠে গেলো ইহান।

আমার রাগ লাগলো এমন টেনে আনার জন্য কড়া কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে র‌ইলাম। আজকে তিনি আমার মন ভালো করেছে তাই শান্ত থাকলাম। আগের বারের সেই সিট টায় ই এনে থেমেছে।

‘ আমি তো আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আপনাকে কোথাও দেখলাম না তাই ওই গাড়িতে উঠছিলাম। এখন আমাকে ভালো করে বললেই তো আসতাম এমন টেনে আনার কি দরকার ছিলো?’

ইহান আমার পাশের সিটে ধপাস করে বসে বললো,

‘ শোনো তোমাকে আমার পাশে বসে যাওয়ার জন্য আমি পাগল হয়ে যায়নি। শুধু মাত্র ফারিয়ার জন্য আমাকে এই নাটক গুলো করতে হচ্ছে। নাহলে….

আমি রাগী গলায় বললাম, ‘ আমি আবার আপনার পাশে বসার জন্য দেওয়ানা হয়ে গেছি তাই না।আমি বাধ্য হয়ে এসব করছে মনে রাখবেন যতসব ফালতু।’

বলেই রাগে গজগজ করতে করতে জানালার দিকে ঘুরে গেলাম। আজকের ব্যবহারে একটু উনাকে ভালো মনে হয়েছিলো কিন্তু না উনার মতো বদ লোক দুটো নাই। আমি কি করে ভুশৈ গেলাম। প্রথম থেকেই যা না তাই বলে আমাকে অপমান হেনস্তা করবেই সে।

গাল ফুলিয়ে বসে র‌ইলাম। ফোন বের করে গান ছেড়ে ইয়ার ফোন কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে র‌ইলাম।
এবার পেছনের লম্বা ছিট দখল করে বসেছে ইহানের বন্ধুরা আমরা তাদের এক সিট আগে। ইহান ফট করেই উঠে চলে গেলো আর তার বন্ধুদের মধ্যে জায়গা করে বসে পরলো। আর শুরু হলো তাদের আড্ডা চিৎকার চেঁচামেচি।
ভেংচি কেটে একবার তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম।
হঠাৎ মিষ্টি কন্ঠের গান ভেসে এলো। আমি না চাইতেও পেছনে ঘুরে দেখলাম ইহান গান গাইছে আমি তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেলো।

তুমি হাসলে আমার ঠোঁটে হাসি, তুমি আসলে জোনাকি রাশি রাশি…
রাখি আগলে তোমায় অনুরাগে, বলো কিভাবে বুঝায় ভালোবাসি..
সব চিঠি সব কল্পনা জুড়ে, রঙ মিশে যায় রদ্ধ দুপুরে, সেই রঙ দিয়ে তোমাকেই আঁকি আর কিভাবে বলো ভালোবাসি,
প্রাণ দিতে চাই, মন দিতে চাই সবটুকু ধ্যান সারাক্ষণ দিতে চায় তোমাকে, ওওওতোমাকে, স্বপ্ন সাজাই নিজেকে হারাই, আর দুটি নয়নে রোজ শুতে যাই তোমাকে ওওও তোমাকে,
জেনেও তোমার আঁখি চুপ করে থাকি, রোজ দুই ফোঁটা যেন আর ভালো লাগে, লারে অভিসারে,চায় শুধু বারে বারে তোমাকে ওওও তোমাকে….
যেদিন কানে কানে সব বলবো তোমাকে, বুকের মাঝে জাপ্টে জরিয়ে ধরবো তোমাকে…
পথ চেয়ে র‌ই, দেরি করো না যত‌ই, আর ভুলা যাবে না জীবনে কখনো তোমাকে ওওও তোমাকে, ওওও তোমাকে..
জেনেও তোমার আঁখি চুপ করে থাকি, রোজ দুই ফোঁটা যেন আর ভালো লাগে, লারে অভিসারে,চায় শুধু বারে বারে তোমাকে ওওও তোমাকে….

রেগে থাকলেও তার গানের গলা শুনে আমার রাগ উবে গেলো। মুগ্ধ হয়ে গান শুনলাম। লোকটা বদ থাকলেও গানটা খুব‌ই ভালো গায়। আরো কয়েকটা গান গাইলো বন্ধুরা মিলে। বাসের সবাই দাঁড়িয়ে হ‌ইহুল্লা করলো সবাই ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিলো। আড্ডা বন্ধ করে লাইট অফ করে দিলো। আমি অন্ধকারে বাসের ভেতরে উঁকি ঝুঁকি মারলাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম একটার উপরে। দুই একজনের ফিসফিস ছাড়া আর কোনা কথা আসছে না।
সবার শ্বাস প্রশ্বাস শোনা যাচ্ছে শুধু ভয় লাগলো আমার সাথে চোখে রাজ্যের ঘুম। আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পরলাম আর আমাদের সামনের সিটে উঁকি মারলাম। বাইরে থেকে চাঁদের আলো হালকা উঁকি মারছে গাড়িতে তাতে যা দেখলাম তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। ছিঃ বলেই ঠাস করে আমার সিটে বসে পরলাম।
ছিঃ এটা আমি দেখলাম। চোখ মুখ ঢেকে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম।‌ সামনের সিটে দুজন নর নারী লিপকিস করছিলো তা স্পষ্ট দেখেছি আমি। আর কারো না দিকে উঁকি না মেরে চোখ বন্ধ করে র‌ইলাম। ঘুম চোখে আগে থেকেই ছিলো এবার চোখ বন্ধ করতে ঘুমিয়ে পরলাম।
পেছনে থেকে ইহান ঊষার দিকে নজর রাখছিলো। ঘুমিয়ে গেছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে ঊষার মাথা জানালায় বারি খাবে এমন সময় ইহান এসে ওর মাথা আটকে ধরলো। আর বিরক্ত হয়ে তাকালো ঊষার দিকে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই ইহান ঊষার মাথা কাঁধে থেকে সরিয়ে আগের সিটে চলে গেলো।
আর এদিকে আমি ঝাঁকুনি তে হেলে কপালে বারি খেয়ে উঠে পরলাম। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখি আমরা গাড়িতে আছি। কালকের কথা মনে পরলো। সাথে সামনের আপত্তি কর অবস্থা দেখেছিলাম। আমি আবার উঠে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম। তারা জেগে আছে দুজনেই ফোন টিপছে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। মেয়েটা আমার দিকে তাকালো ফট করেই আমি তা দেখে বসে পরলাম। সারা রাত কি একাই ছিলাম না সিটে! ভাবতে ভাবতে পেছনে তাকাতে যাব তার আগেই ইহান এসে আমার পাশে শব্দ করে বসে পরলো। আমি চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললাম,

‘ আপনার চোখ লাল হয়ে আছে কেন?’

ইহান সিটে হেলান দিয়ে চোখ করে র‌ইলো। আমি উত্তরের অপেক্ষায় চেয়ে র‌ইলাম কিন্তু হুনুটা আমার কথা শুনে নি এমন ভাব করে র‌ইলো। রাগে আমার শরীর জ্বলে উঠলো। এতো ভাব দেখাতে পারে। ভাবে মাটিতে পরে না এনার। বিরবির করে বকতে লাগলাম।

সাতটায় আমার ঢাকায় এসে পৌঁছালাম। তখনো ইহান চোখ বন্ধ করে আছে। আমি তাকিয়ে চেয়ে আছি ডাকবো কিনা ভাবছি‌। বাবার সাথে কথা বলেছি বাবা বাসায় আছে দুপুরের পর নানুবাসায় যাব। আম্মু সেখানে আছে। এদিকে আমার নূপুর এর কথাটাই মনে নাই। ভুলে বসে আছি। গাড়ি থামতেই ইহান চোখ মেলে তাকালো। আমি তখনও তারদিকেই তাকিয়ে ছিলাম। ইহান চোখ মেলে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ হা করে তাকিয়ে আছো কেন? জীবনে সুন্দর ছেলে দেখো নি?’

ইহানের কথা শুনে আমার মাথা গরম হয়ে গেলো। এতো বড় অপমান। আমি না হা করে তাকিয়ে আছি।
আমি রাগী চোখে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে ইহান হাত দিয়ে থামিয়ে বললো,

‘ এখন আমার ঝগড়া করার মুড নাই বাই!’

বলেই ব্যাগ হাতে বেরিয়ে গেলো। আমি রাগ নিয়ে নিজেও বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসেই আব্বুকে দেখে ইহানের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম।

.
বিকেলে নানুবাড়ি এলাম। প্রথম দিন কার সেই পিচ্চি কে দেখলাম। আব্বুর থেকে জানতে পেরেছি এটা আমার মামাতো ভাই। আমার তিন মামা। আমাদের তো নানা দেখতে পারতো না তাই তারা ও তাই তাদের সাথে সম্পর্ক ছিলো না। নানা জান মারা যাবার আগে নাকি সবাইকে বলে গেছেন আমার আম্মুকে যেন আর দূরে সরিয়ে না রাখে। তিনি আম্মুকে ক্ষমা করে দিয়েছে। নানা জানের কথা সবাই আমাদের আপন করে নিয়েছে। যার জন্য দূরে ঠেলে দিয়েছিলো তিনি যেহেতু ক্ষমা করেছে সেখানে আর কারো কথা থাকতে পারে না।

বড় মামার দুই মেয়ে লিজা ও লিনা। লিজা আপু মাস্টার্সে পরে। লিনা আমার সমবয়সী। মেজ মামার এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে আবির ভাইয়া অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, দুই মেয়ে জমজ( দিনা, নিসা) দুজনেই থ্রিরিতে পরে। ছোট মামার এক ছেলে যাকে আমি প্রথম দিন দেখছিলাম সামি ফাইভে পরে।
আমার এক খালা তার বিয়ে হয়েছিলো স্বামী নেশাখোর তাই ডির্ভোস দিয়ে আলাদা থাকে তিনি স্কুলের ম্যাডাম। তার সন্তান নেই।
আমি আর লিনা এক রুমে ঘুমালাম। সব ভাই বোনরা রাত জেগে আড্ডা দিলাম। এক দিনে সবাই আমাকে আপন করে নিয়েছে। সবাই এতো ভালো কি বলবো। এতো ভাই বোন আমার আর আমি কিনা এতো দিন নিঃসঙ্গ কাটিয়েছি।

এই বয়সেই আমাদের লিনা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলেছে তার ফেসবুক এ ঘুমাতে এলে আমাকে লুকিয়ে বললো। সাথে মেসেজ ও ছেলের ছবি দেখালো। ছেলেকে এখনো সামনে থেকে দেখে নি দেখবে কি করে ছেলের বাসা যে ঢাকায় আর আমাদের লিনার বাসা তো দিনাজপুর। একা একা ঢাকা যাবে কি করে?

তাই আমি বললাম, ‘ তাহলে আমার সাথে তুই চল আমাদের বাসায় তারপর দেখা করে নিবি।’

আমাদের মধ্যে তুই সম্পর্ক চলছে এসেছে। আমার কথা শুনে লিনা লাফিয়ে উঠে বললো,

‘ সত্যি। আচ্ছা আমি এক পায়ে খাড়া কিন্তু সামনেই তো পরিক্ষা যেতে দেবে না মনে হয়!’ মন খারাপ করে বললো।

‘ এখন না যেতে পারলেও সমস্যা নাই পরিক্ষার পর যাবি আর অনেকদিন থাকতে পারবি।’

‘ হ্যাঁ।’

পরদিন ও নানুবাড়িতে হেসে খেলে কাটিয়ে দিলাম। সাথে বিশাল আয়োজন হলো খাওয়ায় দাওয়া আত্নীয় স্বজন দিয়ে বাড়ি ভরে গেলো। পরদিন আমরা চলে এলাম বাসায় আমরা পরিক্ষা তাই আসতেই হলো।
এতো দিন পর নানু বাড়ি আদর খেলাম তাই আসতে মন চাইলো না।

বাসায় এসে ইহানকে ফোন করলাম রেগে নাম্বার বন্ধ। অসহ্য লোকটা আমার নূপুর দিবে বলেও দেয়নি। আমার না হয় মনে ছিলো না তার কি উচিত ছিলো না দায়িত্ব নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া। আর কখনো চাইবো না। পায়ে থেকে বাকিটাও খুলে রেখে দিলাম। আম্মু জিজ্ঞেস করলে বলেছি পরে থাকতে ভালো লাগে না তাই খুলে রেখেছি।
এস এস সি পরিক্ষা ঘনিয়ে এলো। মন দিয়ে পরতে লাগলাম। বিদায় অনুষ্ঠান এ ইহানের দেখা মিললো কথা বলতে চাইলাম কিন্তু সুযোগ হলো না।
দেখতে দেখতে এস এস সি পরিক্ষা শেষ হলো।
কাল লিনা আসবে বড় মামার সাথে। এর মাঝে নানু একবার এসেছে সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক হয়েছে তাই আসা যাওয়া ও হয়েই থাকে।

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!