নন্দিনী নীলা
নন্দিনী নীলা

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

এক চিলতে রোদ | উদ্ধার ও মিথ্যের আশ্রয়

সমাপ্ত

এক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ২৪

০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

লিনা চলে গেছে কাল। আমি ওর সাথে খুব একটা কথা বলিনি। ওর এই বিহেভিয়ার আমার খুব অপছন্দ ওর জন্য আমি আম্মুকে কাছে খুব বকা খেয়েছি। এতো বড় বিপদে পরেছিলাম। আম্মুর কাছে সেদিন মিথ্যা বলে ধরা খেয়ে গেছিলাম। কি একটা পরিস্থিতিতে পরেছিলাম আমি। ধরা খেয়ে ভয়ে লিনা কেঁদেই দিয়েছিলো। বকা খাওয়ার আগেই ও কেঁদে উঠে। আর আমি চোরের মত মুখ করে এদিক ওদিক তাকাতে ব্যস্ত হয়ে পরি। কোন দিক দিয়ে পালাবো ভাবছিলাম। আমি ইহানের দিকে তাকিয়ে দেখি মুখ টিপে হাসছে। আমি ভয়ার্ত চোখে একবার তাকিয়ে আম্মুর দিকে তাকায়,

‘ আমার মেয়ে তো কখনো আমাকে মিথ্যা বলেনা আজ কেন বললি? এটা আমি তোর থেকে আশা করিনি।’

আমি ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ সরি আম্মু। তোমাকে মিথ্যা বলার কোন ইচ্ছা আমার ছিলো না। কিন্তু লিনার জন্য আমি বলতে চেয়েছিলাম। ওতো চলেই যাবে তার আগেই তোমার চোখে ওকে খারাপ করতে চাইনি। তাই আমি…

আম্মুর ধমক খেয়ে কথা বন্ধ হয়ে যায়। আমি কাচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি। লিনা আম্মুর পায়ে পরে কান্না করে দিলো।

‘ ফুপি বাবাকে কিছু বলো না। আমি আর জীবনে ওই ছেলের সাথে কথা বলবো না। এই তোমায় ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি। বাবা এসব জানলে আমাকে মেরেই ফেলবে। বাবা কতো রাগি তুমি তো জানো বলো।’

কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। আমি ওর অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। আম্মু লিনাকে কঠিন কিছু কথা বলছে লিনা মাথা নিচু করে হ্যা বলছে।

ইহান এই সুযোগে আমার পাশে দাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ বাব্বারে কি সুন্দর একটা কাহিনী বানিয়ে ফেলেছিলে। তোমাকে ধরা কারো সাধ্য হতো না। যদি না এখানে আমি থাকতাম। জানতেই পারতাম না এতো সুন্দর গুছিয়ে গল্প বানাতে পারো। তুমি কিন্তু লেখক হতে পারবে।’

ইহানের টিটকারি মারা কথা শুনে আমি কড়া চোখে তাকালাম। তারপর মুখটা অসহায় করে বললাম,

‘ আপনি এই ভাবে আমাকে ফাঁসিয়ে দিলেন।’

‘আগে যদি জানতাম তুমি এমন সুন্দর একটা বানানো কাহিনী বলার প্লান করেছেন তাহলে…

‘তাহলে কি?’

‘থাক তাহলে আর শুনতে হবে না।বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে কতবার যে ঘুরতে গেছো। আর মাকে এমন কাহিনী শুনিয়ে বোকা বানিয়েছো সেটাই ভাবছি!’

‘একদম বাজে কথা বলবেন না! আমি আম্মুকে কখনোই মিথ্যে কথা বলি না। আজকে বলতাম না কিন্তু লিনা মিথ্যে বলে দিয়েছে আগে। আর আমাকে অনুরোধ করেছে ওকে বাঁচিয়ে দেবার জন্য এবারের জন্য। এজন্য আমি এটা করেছিলাম। কিন্তু কিছুই হলো না। মাঝখান থেকে আমি মিথ্যেবাদী প্রমাণ হয়ে গেলাম। আপনাকে এখানে আনা টাই আমার ভুল হয়েছে।বাঁচানোর জন্য আনলাম উল্টা আপনি আমাকে আরো ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের নাকানিচোবানি খাওয়া টা দেখছেন।’

এদিকে আম্মু মামাকে কল করার জন্য ফোন হাতে নিয়েছে। লিনা পারেনা অজ্ঞান হয়ে যায়। কেঁদে কেঁদে আম্মুকে কত কথাই না বলছে। আম্মু মানছে না। উল্টা বলে যাচ্ছে এখানে প্রেম করার জন্য এসেছি। ছেলেদের সাথে দেখা করছিস। এই বয়সে এতোসব। আবার আজকে তার সাথে দেখা করতে গেছিলি। ঊষার আজ কতো বড় বিপদ হয়েছিলো। সময় মত ইহান লক্ষী ছেলেটা না আসলে কি হতো আমার মেয়ের। তুই যে ছেলেটার সাথে কথা বলছিস সে ও তো খারাপ হতে পারে। তাহলে তোর ওতো বিপদ হতে পারে। আমার বাসাই এসে এসব করে বেড়াচ্ছি। এইসব জানার পর আমার ভাইয়ের সাথে আবার আমার সম্পর্ক খারাপ হোক সেটা আমি চাই না। এখন এই মুহূর্তে আমি সব জানিয়ে দেবো। যার মেয়ে সেই শাসন করুক।

লিনা দৌড়ে এসে আমাকে বললো,’ ঊষা ফুপিকে বলনা আব্বা কে জেনো এসব না জানায়। এইসবের একটা কথা যদি আব্বার কানে যায়। আমাকে আর পড়ালেখা করতে দেবে না রে‌। লিমা আপুর আগে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। আব্বু কত রাগী জানিস। আমাকে মেরে হাড্ডি ভেঙ্গে দেবে।আমি কথা দিচ্ছি জীবনে আর তুষারের সাথে কথা বলবা না‌। এক্ষুনি আমি ওর নাম্বার ব্লক করে দেবো। আর কোনদিন কোন ছেলের সাথে কথা বলব না। এবার মতো ক্ষমা করে দিতে বল না ফুপিকে। আমি আর কোনদিন কথা বলব না প্লিজ প্লিজ।’

কেঁদে-কেটে লিনার অবস্থা একদম নাজেহাল খুব ভয় পেয়েছে ভয় সারা শরীর কাঁপছে ওর। আমি ইহানের দিকে তাকালাম। আমি এখন কিছু বললে আম্মু আমাকে মেরে দেবে। আমার কথা তো শুনবে না তিনি ফুঁসছে।

‘এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আমার হেল্পের প্রয়োজন?’

‘হুম’ অসহায় মুখ করে বললাম।

‘ সরি আমি আর হেল্প করতে পারবো না। এমনিতেই আজ অনেক হেল্প করেছি। বিনিময়ে আমি তো কিছুই পেলাম না। আমার কাজ শেষ এবার গুড বাই। আমার লেট হয়ে গেছে।’

‘প্লিজ আম্মুকে একটু শান্ত করুন। মামাকে বললে সত্যিই খুব খারাপ হবে। লিনাকে ক্ষমা করে দেওয়াটা উচিত। ও ত ভুল করেছে আর এখন ভুল বুঝতে ও পারছে। এখন তোকে ক্ষমা করা উচিত তাই না।’

‘ অতো শত আমি বুঝিনা। আমি চলে যাচ্ছি।’

ইহান আমার কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলে যাওয়া ধরলো। আমি ছুটে গিয়ে তার হাত ধরলাম। এদিকে আম্মুর মামার সাথে কথা বলছে এখন ও লিনার ব্যাপারটা বলে নাই। লিনা ফ্লোরে বসে কাঁদছে।

আমি ইহানের হাত ধরে অনুরোধ করলাম, ‘আপনার সব কথা আমি শুনবো প্লিজ আম্মুকে বলা থেকে বিরত করুন!’

ইহান মুখে শয়তানী হাসি দিয়ে আম্মুর কাছে গিয়ে ফোনটা টেনে নিয়ে বন্ধ করে দিলো।

‘এটা কি করলে তুমি ছেলে।’ রেগে বললাম আম্মু।

‘ আন্টি আপনি একটু শান্ত হোন। রাগের মাথায় কিছু করবেন না। পড়ে না আপনার নিজের‌ই আফসোস করতে হয়। এমন কিছু করে অবশ্যই পরে আফসোস করতে চান না!’

‘কি বলতে চাইছো তুমি? আমার মেয়েকে দুই বার তুমি বাঁচিয়েছো বিপদ থেকে। আমি তোমার উপর অনেক কৃতজ্ঞ। তুমি সত্যিই খুব ভালো একটা ছেলে। আজ কালকার দিনে এমন ছেলে পাওয়া মুশকিল। তাই বলে তুমি আমার কোন কাজে বাধা দিতে পারো না।’

‘আন্টি আমার কথাটা শুনুন। আমি আপনার কোন কাজে বাধা দিয়ে বেয়াদবি করতে চাইনা।লিনা কাজটা খুবই খারাপ করেছে। এভাবে ওর ঊষাকে একা রেখে কোথায় যাওয়া উচিত হয় নাই। আবার অপেক্ষা করতে বলেছিলো। কোনটাই আমি ওকে সাপোর্ট করছি না। কিন্তু ও ভুল করে সেটা বুঝতে পারছে ভুল শুধরে নিতে চাচ্ছে। আমার মনে হয় আপনার লিনাকে ক্ষমা করা বিষয়টা আরেকটু ভাবা উচিত। ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবুন তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নেন কি করবেন। এভাবে রাগের মাথায় আরেকজনকে এসব বলে তাকে চিন্তায় ফেলা আমার মতে ঠিক হবে না।’

ইহান একদুমে তুমি কথাগুলো বলে থামল। আমি ভয়ার্ত চোখে আম্মুর দিকে তাকিয়ে আছি। আম্মু ইহানের কথা মেনে নেয় যেন।
চিন্তিত চোখের আম্মুর দিকে তাকিয়ে আছি। ইহান আরো কি কি যেন বলতে লাগলো। আম্মু মুখে রাগী ভাবটা কমতে লাগল। আম্মু ঠান্ডা হয়ে সোফায় বসে কি যেন ভাবছে। ইহান দিকে তাকিয়ে ইহানকে ও বসতে বললো।

এসব বিষয়ে আর কথা বললো না। আম্মু একবার আমার আর লিনার দিকে তাকিয়ে রুমে যেতে বললো। আমার সুরশুর করে রুমে চলে এলাম।
আমি দরজায় উঁকি মেরে দেখলাম ইহান আর আম্মু কি যেন বলছে। ইহান না না করে উঠে দাঁড়ালো তারপর চলে গেল।
আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ইহানের যাওয়া দেখছি। আজ এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে ইহানের জন্য। তার জন্য আমি এখন সুস্থ আছি। কত বড় বিপদ থেকেই না তিনি আমাকে বাঁচালো। আম্মুর সাথে কথা সুন্দর বিহেভ করল। ছেলেটা সত্যি খুব ভালো। আমার মনে অজানা এক ভালো লাগার অনুভূতি হতে লাগলো। আমি এক দৃষ্টিতে ইহানের দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ মনে পরলো ইহানের জ্যাকেটটা তো আমার কাছে। ইহানের পরনের একটা কালো টি শার্ট। হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছে। গেট ক্রস করার আগে একবার পেছন দিকে তাকালো। তাকিয়ে একটা হাসি দিলো। আমি নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে ছিলাম। ইহান বাইকে চড়ে চলে গেল। আমি ওর চলে যাওয়া দেখে মুখ মলিন করে চলে এলাম। আমি চাইলে চিৎকার করে জ্যাকেটের কথা বলতে পারতাম কিন্তু বললাম না।

আম্মু লিনাকে কড়া করে শাসন করেছে। এমন কাজ আবার করলে তখন আর ক্ষমা করবে না। লিনা মাথা ছুঁয়ে কথা দিয়েছে আর কখনও কোন ছেদের সাথে কথা বলবে না। আমার সাথে আম্মু কথাই বলেনা দুইদিন ধরে। কাল লিনা চলে গেছে। এখন আমি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছি। আম্মুকে দেখলাম কাথা হাতে সোফায় বসে আছে। আমি সেদিকে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম।

আম্মু কোন রিয়েক্ট করলো না। আমি আহ্লাদ গলায় বললাম,

‘আম্মু প্লিজ তুমি আমার সাথে কথা বল! তুমি কথা না বললে আমার একটু ভালো লাগে না। কিচ্ছু করে শান্তি পায় না!তুমি তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলো সবার আগে তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তোমার সাথে আমি এমন কোন কথা আছে যা অস্বীকার করেছি। বল! যত প্রপোজ পেয়েছি।সব তোমার কাছে বলেছি। আমি কখনো কোনো বিষয় তোমার কাছে গোপন করেনি। কিন্তু লিনার বিষয়টা বলে শুধুমাত্র তোমাকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি। আর তুমি লিনা কে বকা দিবে। দুই দিন পর ও চলে যাবে। এজন্য ওকে তোমার চোখে খারাপ করতে চাইনি। ও ভয় পেয়ে অনেক অনুরোধ করেছিল। আমি ফেলতে পারিনি।না হলে তোমাকে মিথ্যে বলার কথা ভাবতামও না। আর কখনো কোন কিছুর বিনিময় তোমাকে মিথ্যে বলব না । এবারের মত ক্ষমা করে দাও। প্রমিস করছি।’

.
লিনা যাওয়ার তিনদিন কেটে গেছে। বাসায় বসে বসে থেকে বা কার ভালো লাগে আমারও ভালো লাগেনা। ফেসবুক এ রিমা তুলি ওদের সাথে কথা হয়েছে। ওরা সবাই ওদের নানু বাড়ি আছে। আমি নানু বাড়ি যেতে চাইছিলাম কিন্তু আম্মু যেতে দেয় নি। আম্মু এখন যেতে পারবেনা এজন্য আমাকে একটা ছাড়বে না। আমিও আর জোর করিনি। আমার মনটা খারাপ হয়ে আছে। কেন জানি না। ইহানকে মিস করেছি। কেন করেছি তাও জানি না। সেদিনের পর থেকে অদ্ভুত ভাবেই ইহানকে মনে পরে। তাই তো বেহায়ার মত ফোন করে বসেছিলাম। কিন্তু ইহান পাত্তা দেয়নি। উল্টা ভাব দেখিয়েছে।

সেদিন ফোন দিয়ে সালাম দিলাম। আমার বুকের ভেতর ধুকপুক করছিলো। ইহান সালামের উত্তর দিয়ে বললো,

‘ কি দরকারে কল করেছো?’

আমি বললাম, ‘ না এমনি দিলাম। কেন আপনি কি বিজি?’

সাথে সাথে ওপাশ থেকে ইহান ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘ হ্যাঁ আমি খুব বিজি আছি দরকার না থাকলে ফোনটা রাখি।’

আমার মুখটা অপমানে লাল হয়ে গেছিলো। দরকার ছাড়া কি কল করা যায় না।কি মনে করে উনি নিজেকে আমার সমস্ত দরকারে উনি এছাড়া কি সাহায্য করার মত আর কেউ নাই? ভাব দেখলে বাঁচি না। উনাকে নিয়ে ভাবাটাই আমার উচিত হয়নি।এইভাবে কল কেটে দিলো। রাগে ছুঁড়ে ফোন বিছানায় ফেলে দিয়েছিলাম।

মনটা ভালো করার জন্য চলে এলাম ছাদে। রেলিং এ দাড়িয়ে আশেপাশে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ পাশের ছাদে চোখ গেল মুনিয়া আপু আর একটা ছেলে খুব ক্লোজ হয়ে বসে কি যেন কথা বলছে। আমাদের পাশের বিল্ডিং তাদের আমি চোখ ছোট ছোট করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে দুজনের হাত আবদ্ধ করা। মুনিয়া আপু খুব পর্দাশীল মেয়ে। অনার্সে পড়ে। সব সময় হাত-পায়ে মোজা ও মুখ ঢাকা থাকে। তিনিও যে প্রেম করে আর এইভাবে বয়ফ্রেন্ডের সাথে গল্প করতে পারে জানা ছিলনা। মাথায় হাত দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আমার দৃষ্টি ঘুরে নিচের দিকে গেলো একটা কাগজ আলাদা গায়ে কেউ ছুড়ে মারতেই..
আমি চমকে কাগজ হাতে নিচের দিকে তাকালাম। কে এন অসভ্যের মত কাগজ ছুড়ে মারল??

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!