নন্দিনী নীলা
নন্দিনী নীলা

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

এক চিলতে রোদ | কাগজের বল ও চায়ের আবদার

সমাপ্ত

এক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ২৫

০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

কুচকানো কাগজের বলটার হাতে নিয়ে নিচের দিকে উঁকি ঝুঁকি মারছি আমি। এই কাগজ কে ছুঁড়ল আমার দিকে? কাউকে দেখছি না। ছুড়ে মেরে লুকিয়ে পড়েছে। চিন্তিত চোখে কাগজ টার দিকে তাকিয়ে আছি। আদিম যুগের মত কি কাগজে প্রেমপত্র লিখে ছুড়ে মারল নাকি? আঙ্গুল চালিয়ে বল কাগজটা মেলে ধরলাম। খুব বড় না ছোট‌ই কিন্তু তার মাঝখানে দুইটা শব্দই লেখা আছে। আমি ভ্রু কুঁচকে লেখাটার দিকে তাকিয়ে আছি।
কাগজে লেখা আছে,

‘ নিচে আসো ‘

লেখাটা দেখে আমি আরো হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। নিচে আসো মানেটা কি? এটা কে লিখে পাঠালো আমাকে! আর নিচেই বা যেতে বলল কেন? আর আসেপাশে তো তেমন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। কি অদ্ভুত!
এমন অদ্ভুত কান্ড কি করলো! গিয়ে কি দেখব!সন্ধ্যা হয়ে আসছে এদিকে। এখন আবার নিচে যাব! যেতেও মন চাচ্ছে! কে এমন কান্ড করলো দেখার জন্য! আবার আম্মু কিছু যদি বলে! আগের মত আম্মু আর আমাকে স্বাধীনতার দেয়নি। কয়েক দিন ধরে বলে দিয়েছে বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ। সেদিনের জন্য আম্মু তো আমার উপর খুব রাগ ছিল। এখন মনটা ভালো হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে খুব কঠিন। আমাকে নিয়ে কোন রিক্স নিতে রাজি না তিনি।
কিন্তু নিচে যাওয়ার ইচ্ছাকে ধমাতে পারলাম না। নিচে এসে দেখলাম আম্মু বাইরে না রুমে বসে কি যেন করছে এই সুযোগ আম্মু মাগরিবের নামাজের আগে বের হবে না মনে হচ্ছে আমি। তারাতাড়ি মেইন দরজা খুলে দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে এলাম বাসা থেকে। দারোয়ান চাচার সাথে হাসি বিনিময় আর কেমন আছেন চাচা বলে গেটের বাইরে পা রাখতেই কেউ ছুটে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো। তাকিয়ে দেখি ইহান! ইরানের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। খয়রি শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। ফর্সা হাতে লোমগুলো লেপ্টে আছে শরীরে ঘামের জন্য। মনে হচ্ছে যুদ্ধ করে এসেছে কোথাও থেকে। আমি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। ঘামা ত্বক ভাবে যে কাউকে এত সুন্দর লিখতে পারি হ্যাঁ কি না দেখলে জানতে পারতাম না।
রুমাল বের করে ইহান কপালের ঘাম মুছে আমার হাত টেনে ধরলো। আমি চমকে উঠে হাতের দিকে তাকালাম। কিছু বলতে ভুলে গেছিলাম। এতোক্ষণ হা করে ইহানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলাম।

কিছু বলার আগেই ইহান আমাকে নিয়ে হাঁটতে লাগলো। আমি অনেক কথা বলতে চাইছি। এসব কি হচ্ছে আমাকে ইহান টেনে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেন নিয়ে যাচ্ছে? উনি এখানেই বা কেন? আর চিঠি ওয়ালা ক‌ই? আচ্ছা চিঠি কি ইহান দিয়েছে? এতো এতো প্রশ্ন আমার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু কিছুই মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। আমি রোবটের ন্যায় ইহানের সাথে হেঁটে যাচ্ছি। কতোদিন পর দেখলাম। এই কয়দিন তাকে আমি অসম্ভব মিস করেছি। আর এত্ত মিস করার পর আচমকা চোখের সামনে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। অতিরিক্ত উত্তেজনায় আমি কথা বলতে ভুলে গেছি।

ইহান আমাকে নিয়ে জামাল কাকার চেয়ার ছোট্ট দোকানে এসে থামলো। আর আমাকে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিলো ব্রেঞ্চে। আর নিজেও আয়েশ করে বসে কাকার কাছে চা চাইলো দুই কাপ। আমি ইহানের দিকে দৃষ্টি রেখেই বললাম,

‘ এসব কি হচ্ছে বলুনতো??’

ইহান উওর দিলো না কাকার কাজ থেকে পানি নিয়ে মুখ ধুয়ে দিলো‌। আর বললো,

‘ কি হচ্ছে?’ ইহান মুখ মুছতে মুছতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

আমি বোকা চোখে তাকিয়ে বললাম, ‘ কি হচ্ছে বুঝছেন না আপনি? আপনি এখানে কি করছেন? আর আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন? কিছু তো বুঝতে পারছি না আমি। সব আমার মাথা উপর দিয়ে যাচ্ছে।’

ইহান আমার কথা শুনে বললো, ‘কত হেল্প তোমার বিনিময়ে একটা ধন্যবাদও দিলিনা। তাই নিজেই ধন্যবাদ ও চা খেতে চলে এলাম।’

‘ এ্যা..

ইহান আমার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে হো হো করে হেসে উঠলো। আর বললো, ‘ কি হলো হা করে আছো কেন?’

আমি মুখ বন্ধ করে কটমট করে তাকিয়ে আছি।

‘ ওই কাগজ টা আপনার ছিলো?’

ইহান উত্তর দিল না। চা দিতেই তা হাতে নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে চুমুক দিতে লাগল। আমি উত্তরের আশায় তার দিকে তাকিয়ে আছি কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের কাজে মগ্ন হয়ে আছে।

‘ আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে ‘চা’ খাও! শরবত হয়ে গেল তো!!’

‘আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন?’

‘আমি খুব ক্লান্ত! আমাকে দেখে বুঝতে পেয়েছ নিশ্চয়ই।তাই এখন শান্তিমতো একটু চাও খেতে দাও।’

‘ আপনি এতো টায়ার্ড কেনো? কোন রাজকার্য করে এসেছিলেন শুনি?

‘আমি তোমার থেকে ধন্যবাদ ট্রিট হিসেবে চা খেতে এসেছি! তুমি নিজে থেকে আর ট্রিট দিবে না। তাই এইভাবে নিয়ে আসতে হলো।’

‘আপনি আমাকে কৃপণ বলছেন? আপনিই তো লাপাত্তা হয়ে গেছিলেন। কোন খোঁজ খবর নাই। এখন হঠাৎ করে এসে আমাকে কৃপণ বলেছেন?’ নাক ফুলিয়ে বললাম।

আমার কথা শুনে ইহান হো হো করে হেসে দিলো। আমি গাল ফুলিয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে আছি। ফট করেই হাসতে হাসতে ইহান আমার গাল টেনে দিলো। আর বললো,

‘ গাল ফুলিয়েছ কেন?’

আমি চমকে পিছিয়ে গালে হাত দিয়ে বললাম, ‘ এটা কি হলো আপনি আমার গাল টানলেন কেন?’

‘ পিচ্চি রা গাল ফুলিয়ে অভিমান করলে। দেখতে খুব ইনোসেন্ট কিউট লাগে‌ দেখতেই। তখন গাল না টেনে থাকতে পারিনা গো।’

আমি ইহানের কথা শুনে হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। আমাকে পিচ্চি বললো। আমাকে কোন দিক দিয়ে পিচ্চি লাগে। আমি তো যথেষ্ট বড়। আর কয়েকদিন পরে কলেজের স্টুডেন্ট হয়ে যাব‌। আর উনি আমাকে পিচ্চি বলছে! নিজের দিকে তাকিয়ে আছি আজকে আমি পড়ে আছি নীল প্লাজু, গোলাপি টপস ও ছোট জর্জেট গোলাপি ওরনা। পেছনে থেকে সামনে ঝুলিয়ে রেখেছি।
চুল গুলো খোলায় আছে বাসায় বেশির ভাগ সময় চুল খোলা রাখা হয় আজকে চুল খোলা রেখে ছাদে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই তো ছুটে বাইরে এসেছি তাই চুল বাধা হয়নি। কোমর পর্যন্ত চুল আমার পিঠে ছরিয়ে আছে আচ্ছা এই এলোমেলো চুলের জন্য কি আমাকে পাগল লাগছে দেখতে? আমি চায়ের কাপ পাশে রেখে দুই হাতে এলোমেলো চুল ঠিক করতে লাগলাম। না পেরে হাত খোপা করার চেষ্টা করছি তখন ইহান বলে উঠলো,

‘অগোছালো চুলে পিচ্চি তোমায় লাগছে বড়‌ই সুন্দরী। এইভাবেই থাকতে দাও না খারাপ লাগছে না তো পিচ্চি!!’

আমার হাত থেমে গেলো আমি কটমট করে ইহানের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বারবার আমাকে পিচ্চি বলছেন কেন? আমাকে কোন দিক দিয়ে আপনার পিচ্চি লাগে!’

‘ সব দিক দিয়েই তো লাগছে!’ বলেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরোক্ষ করতে লাগলো।

ইহানকে এভাবে তাকাতেই দেখে আমার খুব অস্বস্তি হতে লাগলো।

ইহান উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘ চলো সন্ধ্যা হয়ে গেল।’

সন্ধ্যা হয়ে গেল শুনতেই ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।আমার কথা তো মনেই ছিল না কখন বেরিয়ে এসেছিস অন্ধকার হয়ে এসেছে আমি এখানেই বসে নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে আছি।

হাঁটতে হাঁটতে আমি ইহানের সাথে বাসায় চলে এলাম। ইহানের পাশে হাটতে কেন যেন খুব ভালো লাগছিলো।মনে হচ্ছিল সময়টা যদি এখানেই থেমে যেতো। এভাবেই শত শত জনম ইহানের পাশে হাঁটতে পারতাম খুব ভালো হতো। আমি একটু পরপরই আড়চোখে অনেক দিকে তাকাচ্ছিলাম। কিন্তু ইহান একবার ও আমার দিকে তাকালো না। তার দৃষ্টি শুধু ফোনে নিবদ্ধ ছিলো।

গেটের ভেতরে ঢোকার আগে ইহান আমাকে ডেকে বলেছে,
‘বাই নেক্স টিট খুব তারাতারিই নেব।’

আমি কিছু বলবো তার আগে একটা বাইক এলো। বাইকে তার বন্ধু কে বসে থাকতে দেখলাম‌। আমার চোখের সামনে ইহান বাইকে উঠে চলে গেল। আমি কিছু বলার সুযোগই পেলাম না। আমি হতভম্ব হয়ে কতক্ষণ ঐখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম আবার ট্রিট নেবে মানেটা কি!!

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!