প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | ভাই ডাকার পরিণাম
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ২৭
আরমোড় ভেঙে বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ না হয়েই বাইরে চলে এলাম। আসার অবশ্য কারণ আছে।কারণটা হলো বাইরে আমি হাসির শব্দ পাচ্ছি জোরে জোরে। এই ভোরে কে এসেছে বাসায় যার সাথে আম্মু আব্বু এমন হাসাহাসি করছে। আব্বু বাসায় আছে কিন্তু হাসিতে আমি একটা অপরিচিত হাসির শব্দ পাচ্ছি ঠিক চিনে উঠতে পারছিনা। এটা আম্মু-আব্বুর না মনে হচ্ছে তিনজনের হাসি। হাসির রহস্য উদঘাটন করতে আমি বিছানা থেকে নেমে ড্রয়িং রুমে চলে এলাম। ড্রইং রুমে আসতেই ইহানের হাসি মাখা মুখটা ভেসে উঠলো। তিনজনে বসে কি যেন কথা বলছে আর গলা ফাঁটিয়ে হাসছে। আমি কপালে সুক্ষ্য চিন্তার ভাঁজ ফেলে ভাবছি,কি কথা বলে এত হাসছে তারা! আর সকাল সকাল ইহানই বা এখানে কি করছে?
কালকের রাতের কথা মনে পড়তেই রাগে আমার নাক লাল হয়ে গেল। দুই বার ফোন করেছিলাম রিসিভ করেনি। এত ভাব দেখাতে পারে। গা জ্বলে উঠে আমার।আমি কপালে আর মুখে এলোমেলো হয়ে আসা চুল গুলো সরাতে সরাতে রাগে ফুঁসছি।হঠাৎই ইহান হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকাল আর সাথে সাথে ওর হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। আমি চোখমুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছি। কিন্তু ইহানের চাহনি একদম আলাদা। হা করে তাকিয়ে আছে।পলক ফেলছে না। আমি কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছি। কিন্তু ইহানের দৃষ্টি আমার কাছে নেশাময় লাগছে। অপলক তাকিয়ে আছে। আমি ইহানের এমন দৃষ্টি দেখে কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। আমার চোখ রাঙ্গানি কি তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি এমন হা করে তাকিয়া আছে কেন?
আমি চিন্তা করতে করতে নিজে দিকে তাকালাম। আর দিলাম এক চিৎকার সাথে সাথে উল্টা ঘুরে ভৌ দৌড়। ওরনা বিহীন প্লাজো আর গেঞ্জি পরেই চলে গিয়েছিলাম ঘুমঘুম চোখে। ওই ভাবে দেখে নিয়েছি আমাকে ইহান তাই তো ওমন হা করে তাকিয়ে ছিলো। ছিঃ কি বেশরম ছেলে!! পেছনে থেকে আম্মুর ডাক শুনেছি কিন্তু আমি থামিনি।
ফ্রেশ হয়ে রুমেই বসে আছি আমার হাতে ফোন। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ইহানের নাম্বার। ইহান কল করছে আমি রিসিভ করছি না। করবো না। রুম থেকেও বের হবো না ভাবছি। ইহান না যাওয়া পর্যন্ত আমি রুমের বাইরে যাব না। কিন্তু আম্মুর ডাকে টিকতে পারলাম না। যেতেই হলো।
আব্বুর খাওয়া শেষ। আমার দেরি হলো কেন জিজ্ঞেস করেছে আমি কোন রকম কাটিয়েছি মিথ্যা বলে। তারপর আব্বু উঠে বেরিয়ে গেলো অফিসে। আমি ইহানের সামনের চেয়ার টেনে বসলাম। চুপচাপ খাচ্ছি। ইহান ফিসফিস করে কি যেন বলছে আমি পাত্তা দিচ্ছি না।
খেয়েই রুমে চলে এলাম। আমি আসার কিছুক্ষণ পরই ইহান ও রুমে এলো আর দরজা আটকে ফেললো। আমি লাফ দিয়ে নেমে পরলাম বিছানায় থেকে।
‘ এ-একি আপনি আমার রুমে এসেছেন কেন? আর দরজা আটকালেন কেন??’
আমার কথার উত্তর দিলো না ইহান। সারা রুমে চোখ বুলাতে লাগলো। তারপর বিছানায় গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে পরলো আয়েশি ভঙ্গিতে তারপর বললো,
‘ বাচ্চাদের মতো রুম সাজিয়ে রেখেছো দেখছি। এ রুমে আসলে তো সবাই বাচ্চা খুজবো কিন্তু তোমাদের বাসায় কোন পিচ্ছি বাচ্চা নাই। আছে সেতো বড় বাচ্চা।’
একথা শুনতেই আমার মনে পরে গেলো আমিও ইহানের রুম দেখতে গেছিলাম আর ইহান কি ভাবটাই না নিয়েছিলো।
আমি বললাম, ‘ বের হোন বলছি আমার রুম থেকে। আপনি কোন সাহসে আমার রুমে এসেছেন? নিজের রুমে গেছিলাম বলে কতো অপমান করেছেন এখন আবার আমার রুমে এসে আমার বিছানায় বসে আছেন উঠুন আর বের হোন।’
আমার কথা কানে নিলো না ইহান। ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পরলো।
‘ আরে আরে কি করছেন! বের হতে বলছি শুতে না। আমার বিছানায় শুচ্ছেন কেন? আমাকে অপমান করেছিলেন আপনার রুমে গিয়েছিলাম বলে এখন আমার রুমে আসতে লজ্জা করলো না আপনার।’
‘ না তো লজ্জা করবে কেন? আমি তো আর কারো ঘুমের সুযোগ নিয়ে আসে নি। আর তাছাড়া আমার এতো লজ্জা নাই। লজ্জা তো নারীর ভুষণ আমি নারী না।’
আমি তেরে বিছানায় কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। রাগ না আমার অভিমান হচ্ছে এখন।আমি অভিমানী গলাতেই বললাম, ‘ কি বললেন আমি সুযোগ নিয়েছি কি করেছি? আমি তো বলেছি আমি জানতাম না আপনি বাসায় আছেন জানলে কি যেতাম। আর তাছাড়া ও গিয়েছি বলে ওইভাবে অপমান করবেন কেন?’
ইহান কিছু বললো না। আমি আবার বললাম,
‘ কাল কল করলাম রিসিভ ও করলেন না এতো ভাব কেন আপনার। ভাবে মাটিতে পা পরে না যেন। কল করলে রিসিভ করেন না বাসায় আসলেও কথা বলতে চাইলে আমাকে এমনভাবে ইগনোর করেন যেন আমাকে চেনেন ই না। আর ভুল করেও যদি কখনো ফোন রিসিভ করেন যা তা বলে ফোন রেখে দেন। আপনি আমার সাথে এমন করেন কেন আপনি জানেন আপনি আমার সাথে এমন করলে কত কষ্ট লাগে আমার। সবকিছু অসহ্য লাগে। রাগ হয়। অভিমান হয়। কান্না পায়। আবার সব ভুলে সেদিন আপনাদের বাসায় গিয়েছি বলে কেমন করলেন। ওটাতো আমার ও দাদু বাসা। আমি কি সেখানে যেতে পারব না। আজ যদি আব্বুর সাথে চাচাজানের সমস্যা না হত তাহলে কি আমি ও বাসার বাইরে থাকতাম। আপনার মত আমিও ওই বাসায় বড় হতাম। আগে না হয় আপনি আমার অপরিচিত ছিলেন। কিন্তু এখন তো তা না এখন তো আপনি আমার সম্পর্কে ভাই হোন।এটা জানার পর থেকে আমি আপনার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করছি আর আপনি আমাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করছেন। কেউ তার বোনের সাথে এরকম করে বোনের সাথে কেউ ভাব দেখায়? আগে তো এমন করতেন না। আর এখন আমি আপনার পরিবারের কেউ জানার পর থেকেই এমন ভাব দেখানো শুরু করছেন কেন ? বড় ভাই কি বোনের সাথে এরকম করে বলুন!’ অভিমানে আমার চোখ দুটো ভড়ে উঠেছে। পলক ফেললেই তা গাল বেয়ে পরবে।
ইহান ফট করেই উঠে দাঁড়ালো। আর সোজা আমার সামনে এসে দাড়ালো। আমি গাল মুছে ইহানের দিকে তাকাতেই কেঁপে উঠলাম। ভয়ে পিছিয়ে গেলাম। ইহান রক্ত লাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ইহানের রাগের কারণটা বুঝতে পারছে না। আমি তো ভেবেছিলাম যে আমার কথা শুনে উনি ইমোশন হবেন আর আমার সাথে ভালো করে কথা বলবে। ক্ষমা চাইবে। কিন্তু এ তো দেখি উল্টা হলো উনি তো রেগে বোম হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
ইহান এগিয়ে আমার কাধ চেপে ধরলো শক্ত করে আর কঠিন গলায় বলল, ‘ কি বললে তুমি ভাই? বোন মাই ফুট! গাধা আরেকদিন ভাই বোনের ভালোবাসা দেখাতে ফোন বা কথা বলতে আসলে থাপ্পড়িয়ে গাল লাল করে ফেলবো ইডিয়েট। মাইন্ড ইট।’
বলেই গটগট করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। আমার আম্মু সাথে পাশের বাসার রিতা আন্টি দেখা করতে আসায় তাকে নিয়ে আম্মু রুমে গিয়ে কি যেন করছিলো। ইহানকে সোফায় বসিয়ে। তখন ইহান সুযোগ পেয়েই আমার রুমে এসেছিলো। এখনো আম্মু রুমেই আছে। ইহান রাগে গজগজ করছে সোফায় বসে। আম্মু আসলেই চলে যাবে তাই উপরের দিকে তাকাচ্ছে। আমি তো থ মেরে কতোক্ষণ ওইখানেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এদিকে আম্মু তাড়াতাড়ি চলে এলো রিতা আন্টি কে নিয়ে। তখন আম্মু কে ইহান বায় বলে হতদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।
আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সবটাই লক্ষ্য করলাম। আমার মাথায় হাত ইহান আমাকে ভাই বোনের ভালোবাসা দেখাতে মানা করলো কেন? আমাকে কি বোন ভাবা যায় না এতটাই অপছন্দ করেন উনি আমাকে।
নাকি???
তুলির সাথে সব শেয়ার করার পর জানতে পারলাম ইহান আমাকে হয়তো খুব ভালোবাসে এজন্য বোন বলায় রাগ করেছে নাহলে খুব অপছন্দ করে এজন্য কিছুই ভাবতে চায় না। আমি চিন্তায় পরে গেলাম। ইহান আমাকে কি সত্যি ভালোবাসে? আমার তো মনে হয় না। ভালো বাসলে এতোটা খারাপ বিহেভ করতে পারতো বলে মনে হয়না।
আমি আর তাকে নিয়ে ভাববো না বলে ভাবলাম। কিন্তু আমার ভাবনাকে সত্যি হতে দেবে না বোধহয় প্রকৃতি। ইহানের ওপর দুর্বলতা নিজের মধ্যে পেয়েছিলাম।
সেটা আমি কাটিয়ে নিতে চেয়েছিলাম দূরে থেকে কিন্তু এখন তো দেখছি একদম সারাদিন আমার তার সাথেই থাকতে হবে এমন বন্দোবস্ত হয়ে গেলো। চোখের সামনে তিনি ঘুরঘুর করবেন।কিন্তু নিজের দাদা বাড়ি আপন মানুষদের সাথে মেশার, থাকার লোভটা তো আমি সামলাতে পারলাম না এজন্যই তো ইমা আপুর বিয়ের খবর শুনেই আমি যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলাম। আব্বু আম্মুকে ও দাওয়াত করেছে ইমা আপু এসে। কিন্তু অদ্ভুত হলো ইমা আপু আব্বুকে চাচচু বলে নি। অপরিচিতদের মতো কথা বলেছে সৌজন্য নিয়ে। পরে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়েছে আপু যখন আব্বু আম্মুকে রাজি করালো তারপর যখন আমাকে ফিসফিস করে বলল,
‘ঊষা আমি কিন্তু জেনে গেছি তুই আমার চাচাতো বোন। আমার ছোট্ট মিষ্টি বোন। কিন্তু আমি
তাদের এখনই সবটা জানাতে চায় না যে আমি তাদের ভাইয়ের মেয়ে। জানলে তারা বিয়েতে কখনো যাবেনা। আর তারা না গেলে কখনই তারা মুখোমুখি হবেনা। আর তাদের মুখোমুখি হওয়া টা খুব দরকার।’
বিয়েটা যেহেতু কমিউনিটি সেন্টারে হবে এ জন্য একদিন আগে ইমা আপু দের সাথে আমার সেখানে যেতে হবে। আর আব্বু রাজি হয়েছে তারা শুধু বিয়ের দিন যাবে এর আগে যেতে পারবেন। ইমা আপু তাতে কোন আপত্তি করেনি।
১. মেহেন্দি, ২.গায়ে হলুদ, ৩. বিয়ে।
তিন দিনের অনুষ্ঠান। ইমা উডবি রিফাত ভাইয়া রা ও সেখানে উপস্থিত হবে খুব মজা হবে। ইমা আপুরা একদিন আগেই যাবে সেদিন আমাকে তাদের বাসায় যেতে হবে। সেখান থেকে কমিউনিটি সেন্টারে তাদের সাথে যাব। তার আগেরদিন একদিন আপু আমাকে নিতে এসেছিল বিয়ের শপিং করার জন্য। সেদিন ইহান ও ছিলো সেখানে আমার সাথে কথাও বলেছে স্বাভাবিক ভাবেই। সেদিনই রিফাত ভাইকে দেখেছি। আপু আমাকে জোর করে একটা ড্রেস কিনে দিয়েছে আমি অবশ্য নিতে চাইনি
কিন্তু এমন ভাবে জোর করলো না নিয়ে ও পারলাম না। ড্রেসটা আমি বাসায় আনিনি বিয়েতে যেতে হবে তখন যেন নিয়ে যায় সেটা বলে দিয়েছি।
আজই সেই দিন আমি ইমা আপুদের বাসায় চলে এলাম। বাসা ভর্তি লোকজন। সবাই কমিউনিটি সেন্টারে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। আমি ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি কাউকে চিনি না সবাই অপরিচিত। এ বাসায় আমি ইমা আপু, ইলা আপু, ইহান, চাচি জাদু আর চাচাকে ছাড়া কাউকে চিনি না। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটছি তখন কারো সাথে জোরে ধাক্কা খেলাম। আর ধাক্কা খেয়ে দুজনেই পরে গেলাম আমি অসাবধানতায় তার উপর পরলাম। আমি মানুষটার হাঁটুতে বসে পরেছি। তাকিয়ে দেখলাম একটা ফর্সা মেয়ে। বিদেশিদের মতো ফর্সা আমি আঁতকে ওঠে দাঁড়িয়ে পরলাম। আর মেয়েটা ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিয়েছে। আমি অসহায় মুখ কথূ তাকিয়ে সরি বলছি। মেয়েটা ভালোই ব্যাথা পেয়েছে কারণ তার কোলে বসে পরেছিলাম আমি। আমি ঢোক গিলে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখছি কেউ আমাকে লক্ষ্য করেছে কিনা আমি উল্টা ঘুরে দৌড় দিলাম।মেয়েটা আমাকে দেখে নি কারন সে হাঁটু ধরে কাঁদছে।
আমি দৌড়ে ইহানে সামনে এসে পরলাম ইহান কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ হোয়াট হ্যাপেন্ড? হুয়ে আর ইউ রানিং লাইক দ্যাট?’
আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম,
‘ কই কিছু না তো এমনি। সবাই আমাকে রেখে চলে গেল কিনা ভেবে দৌড়াচ্ছি।’
ইহান কতোটুকু বিশ্বাহ করলো জানি না বললো, ‘ মনে হল চুরি করে ধরা খাওয়ার ভয়ে দৌড়াচ্ছ!’
আমি কিছু বলতে যাব। পেছন থেকে চেঁচামেচি আসতেই ইহান আমাকে রেখে এগিয়ে গেলো আমিও গেলাম সেই মেয়েটাকে নিয়ে সবাই আদিখ্যেতা করছে। আর মেয়েটা ফর্সা মুখ লাল করে ফেলেছে কাঁদতে কাঁদতে।
ইহান ও মেয়েটার কাছে গিয়ে চোখের জল মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, ‘ কি হয়েছে মিষ্টি? কাঁদছিস কেন?’
ইহানের এত কেয়ার করা দেখে আমার রাগে সারা শরীরে আগুন ধরে উঠলো মনে হয়। আমি জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছি। ইহানের এমন কেয়ার করা আমার মোটেও ভালো লাগছে না একটুও না।
