নন্দিনী নীলা
নন্দিনী নীলা

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

এক চিলতে রোদ | এলার্জির প্রকোপ ও জোরপূর্বক ঔষধ

সমাপ্ত

এক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ২৮

০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

দুইটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে একটা চেয়ার নিয়ে ঝগড়া করছে। মেয়ে বাবুটা বসে ছিলো ছেলে বাবু টা মেয়ে বাবুটা কে থাপ্পর মেরে টেনে নিচে নামায়। এবার মেয়েটা কান্না করে দিয়ে খামচি দিল ছেলেবাবুকে তারপর তাকে ধরে টেনে নামায়। এবার দুজনেই টানাটানি করছে আর এক চেয়ারের দুজনের এক জন রাজত্ব করার জন্য ঝগড়া করছে। আমি বাচ্চা দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম এবার দুজনেই ভালো গড়াগড়ি খাচ্ছে এগিয়ে যাব ভাবছিলাম তখনই তাদের মা এলো দুজনকে বকতে বকতে। মেয়েটা তার মা’র কাছে গিয়ে ছেলেটার নামে বিচার দিলো। এবার ছেলেটার মা ও এলো দুজন দুজনের মায়ের কাছে গিয়ে বিচার দিতে লাগলো। দুজনের বিচার দেওয়া আর গাল ফুলিয়ে নিজেদের দিকে তাকাতে দেখে আমি হেসে দিলাম। কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছে গেছি দশ মিনিট হলো। সবাই রুম ঠিক করে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি একাই একজন রুমে ঢুকে ফ্রেশ না হয়েই আবার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কীর্তিকলাপ দেখছিলাম।

‘একা একা দাড়িয়ে হাসছো কেন?’ পুরুষালী কন্ঠ কানে এসে বারি খেতে আমার সমস্ত ধ্যান-ধারণা ভেঙে গেলো। চমকে পাশ ফিরে তাকাতেই ইহানকে ভ্রু যুগল কুটি করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থেকে থমকালাম। আস্তে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আচমকা কানের কাছে কারো কথার আওয়াজ পেয়ে ভয় পেয়ে গেছিলাম।

‘হুয়াই আরন্ট ইউ টকিং অ্যাবাউট ইউর প্রবলেম?’

‘নো প্রবলেম! একা কোথায় আমি তো ওই বাচ্চা দুটোর কান্ড দেখে হাসছিলাম।’ বলেই হাত বাড়িয়ে সামনে দেখলাম। ইহান ভ্রু কুটি করে সামনে তাকালো।
সামনে কাউকে না দেখে বলল, ‘আর ইউ ম্যাড? কি সব বলছো! ক‌ই বাচ্চা?’

আমি চমকে সামনে তাকিয়ে দেখলাম ফাঁকা কেউ নাই। এরা কোথায় গেল। সিওর মাকে বিচার দিতে দিতে চলে গেছে।

‘এখানেই ছিল। খুব ঝগড়া করছিলো। চলে গেছে এখন।’

‘ তো তারা চলে গেছে তুমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছো কেন? সবাই ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে আর তুমি তার কোন কিছু করছ না। উল্টা বাচ্চা দের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বাচ্চাদের কীর্তিকলাপ দেখছো? গাধা একটা। রুমে যাও আর ফ্রেশ হ‌ও গিয়ে।’

বলেই বড় বড় পা ফেলে সামনে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি নাকের পাটা ফুলিয়ে তাকিয়ে আছি‌। আমাকে গাধা বললো। গন্ডার কোথায় তুই গাধা তো ব‌উ গাধা। বিরবির করে বকতে বকতে রুমে চলে এলাম। রুমে আরেকজন আছে। ইহানের মামাতো বোন ফারজানা আপু। আমাকে তার সাথে থাকতেই দিয়েছে। তিনি বিছানায় শুয়ে হাট উঁচু করে পায়ের উপর পা তুলে ফোন টিপছে। আমাকে দেখেই মিষ্টি করে হেসে বললো,

‘ ঊষা তুমি কোথায় ছিলে তোমাকে ডাকলাম আমি যাও হাত মুখ ধুয়ে আসো।’

আমি বাথরুমে ঢুকে গোসল করতে গেলাম। ফারজানা আপুকে আমার প্রথম সাক্ষাতেই খুব ভাল পছন্দ হয়েছে। উনি ইহানের সেম ব্যাস। যাকে আমি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম সেই মেয়েটা হচ্ছে আমি আমার মেজ কাকার মেয়ে কলেজে পরে নাম জেরিন। সেই সেই ধাক্কা খেয়ে বাড়ি মাথায় তুলেছিলো আমি প্রথমে মেয়েটার উপর তীব্র রাগ প্রকাশ করলেও নিজেরই বড় বোন হয় জানার পরে রাগ মাটি হয়ে গেছিলো। ইহান তো বোন বলেই এতো কেয়ার করছিল আর আমি কিনা কি ভাবছিলাম।
নিজের বোকামী তিনি নিজেই অবাক।
বাইরে এসে দেখলাম ফারজানা আপু ঘুমিয়ে গেছে আমি তার পাশে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো দুপুরে। বাইরে আসতেই ইমা আপু টেনে আমাকে খাবার রুমে নিয়ে গেলো। আপুর সাথে আমাকে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু ওই জেরিন তা হতে দেয়নি। জোর করে আপু সাথে থেকেছে আপু তিনজন মিলে থাকতে চেয়েছিলো কিন্তু জেরিন আমাকে এলাও করলো না। আমিও আপুকে মানিয়ে ফারজানা আপুর সাথে তার রুমে চলে এলাম।

খাবার টেবিলে বসে আরেক ঝটকা খেলাম। আমার পাশের চেয়ারে জেরিন বসেছে। আমি বসতেই ফিসফিস করে কানের কাছে বললো,

‘ ইউ প্রসেড মি ইন দি মর্নিং। আই নো ইউ।’

জেরিনের কথা শুনে আমি বিহ্বল হয়ে তাকালাম ওর দিকে। জেরিন আমার দিকে বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে। আমি ঢোক গিলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি কেউ শুনে ফেললে সর্বনাশ হবে। আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা কিছুই দেখেনি এ তো দেখছি সব জানে। কিন্তু তখন মেয়েটা আমার কথা কাউকে বললে না কেন। সবাই জানলে খুব বকবে নিশ্চয়ই আমাকে। জেরিনকে নিয়ে সবাই কতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আমি দেখেছি। এখন আমার কি হবে। ধুর কি আবার হবে আমি ইচ্ছে করে পড়েছিলাম নাকি।

তখন ইহান এসে বসলো আমার ডান পাশের সিটে। আমি চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। আশেপাশে আর একটা সিট ও খালি ছিলো না তাই বোধহয় এখানে বসেছে। কিন্তু ইহানের পাশে বসে খেতে হবে ভেবেই অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। ইহানকে দেখে জেরিন কথা থামিয়ে দিলো। আর কিছু বললো না। আমি অবশ্য প্রথম কথা ছাড়া আর কোন কথাও শুনিনি ও।
আমি আড়চোখে ইহানের দিকে তাকাতে তাকাতে খাবার না দেখেই মুখে পুরে নিলাম। প্লেটে যে আমার জাত শত্রু আছে তা দেখলাম ও না। ওইভাবেই চিংড়ি মাছের বড়া দিয়ে খেয়েই যাচ্ছি। অন্য কিছু নিচ্ছি না। এতোটাই অন্য মনষ্ক ছিলাম যে চিংড়ি তে যে আমার মারাত্মক এলার্জি আছে মনেই ছিলো না। খাওয়ার মাঝেই আমার গলা গাল চুলকানি উঠলো। স্বাভাবিক ভাবেই চুলকাচ্ছি। এবার পিঠ হাত চুলকাচ্ছে ধ্যাত এতো চুলকাচ্ছে কেন শরীর। ঘুমানোর আগে তো গোসল ও করেছি। তাহলে চুলকানি হচ্ছে কেন? খাওয়া অফ করে চুলকাচ্ছি। হঠাৎ জেরিন চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ ও মাই গড কি হয়েছে এসব।’ বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পরলো। আমি বোকা চোখে তাকিয়ে আছি। হাত এখনো আমার গলায়। জেরিনের কথা শুনে সবাই আমার দিকে তাকাতেই আতকে উঠলো। আমি বুঝতে পারছি না এমন করে তাকিয়ে আছে কেন সবাই আমার দিকে। ফারজানা আপুর কথা শুনে আমি নিজের গলায় ও হাতের দিকে তাকালাম। লাল লাল ফোসকা পড়ে আছে। যেখানেই চুলকাচ্ছি সেখানেই এমন হয়ে যাচ্ছে
আমি চোখ বড় করে দেখছি এমন তো আমার চিংড়ি গেলে হয় এখন এমন হলো কেন? আমি তো আজ চিংড়ি খায়নি। প্লেটে তাকাতেই চমকে উঠলাম। ছিটে সরে গিয়ে বললাম,

‘ আমাকে চিংড়ি দিয়েছেন কেন এটাতে তো আমার খুব এলার্জি আমি সহ্য করতে পারিনা। এখন কি হবে।’
সারা শরীর লাল করে ফেলেছি আমি চুলকাতে চুলকাতে। ইহান একবার আমার প্লেট তো একবার আমার দিকে তাকিয়ে তেরে এলো আমার দিকে।আমার রেখে চিৎকার করে বললো,

‘ তোমার মতো অপদার্থ আমি আর একটাও দেখিনি। মাথা খারাপ নাকি তোমার। সমস্যা আছে তাও কোন সাহসে এটা মুখে দিয়েছো ইডিয়েট। কোন কমনসেন্স নাই তোমার!’

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে। ইমা আপু দৌড়ে আমার কাছে এসে পানি খাওয়ালো তারপর আমাকে নিয়ে রুমে এলো। ওষুধ বের করে হাতে দিলো। আমি ওষুধ খেয়ে ও শান্ত হতে পারছি না। শরীর ব্যাথা করছে। নিস্তেজ হয়ে আসছে।
ইহান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মনে মনে রাগে ফুঁসছে এতটা কেয়ারলেস কেন মেয়েটা!!

ঘুম ভাঙলো রাতে চুলকানি কমেছে ফোসকা ও চলে গেছে হালকা লাল হয়ে আছে শুধু এখন‌। ইমা আপুর রুমেই এখনো শুয়ে আছি। পাশে মলম রাখা আপু দিয়ে দিয়েছিলো বোধহয়। রুমে কেউ নাই আমি একাই তাই উঠে পরলাম ফটাফট।
বাইরে এসে দেখলাম সবাই গোল হয়ে বসে আছে। আর কালকের প্লান করছে রিফাত ভাইয়ার কাল আসবে এখানে। আমি ও তাদের যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। তাদের কাছ অবধি পৌঁছাতে পারলাম না। হঠাৎ কেউ আমার হাত শক্ত করে ধরে নিলো। হাঁটা থামিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ইহান। আমি বললাম,

‘ কি হয়েছে?’ প্রশ্নতুক চোখ তাকিয়ে বললাম।

‘ কোথায় যাচ্ছ?’ আমার কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ইহান পাল্টা প্রশ্ন করল।

‘ ওই যে ওইখানে। সবাই গল্প করছে আমি একাই রুমে শুয়ে ছিলাম। তাই তাদের সাথে গল্পে জয়েন করতে যাচ্ছি।’

‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে! এই শরীর নিয়ে এখন আড্ডা দিতে যাচ্ছ। চুপচাপ রাতের খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকো যাও।

কি আমি তো। তিন ঘণ্টার মত ঘুমিয়ে ছিলাম এখন আবার ঘুমাবো কেন? আর আমি এখন একদম ঠিক আছি।’

‘স্টুপিড গার্ল তোমার মত মাথামোটা আমি দুটো দেখিনি চিংড়িতে যেহেতু তোমার সমস্যা তারপরও তুমি ওইটা কোন আক্কেলে খেয়েছিলা?’

আমি ধপ করে মাথা নিচু করে ফেললাম আর ফ্লোরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। কি করে ইহানকে এখন বোঝাবো যে আমি শুধু মাত্র তার জন্য কতটা অস্বস্তি আর অন্যমনস্ক ছিলাম।এতটাই অন্যমনস্ক ছিলাম যে চিংড়ি মাছ খেয়ালই করিনি চিংড়ি মাছ কে অমৃত ভেবে খেয়ে গিয়েছে।

‘কি হল কথা বলছো না কেন? তোমার মত কেয়ারলেস মেয়ে আমি দুটো দেখি নাই!’

‘আচ্ছা আমি না হয় কেয়ারলেস তাহলে ইহান ভাইয়া আপনি না হয় আমার একটু টেক কেয়ার করুন! এখানে তো আর আমার আব্বু আম্মু নাই যে তারা টেক কেয়ার করবে। আর আপনি আমার বড় ভাই হিসেবে একটু না হয় আমার খেয়াল রাখুন‌।’

‘ আবার ভাইয়া বললে? তোমাকে আমি ভাইয়া বলতে মানা করেছিলাম না?’

‘কেন মানা করেছিলেন? আপনি তো আমার ভাই হোন। তাহলে ভাইকে কি আমি এখন মামা বলবো?’

‘ মামা!! হোয়াট? কিছুই বলার দরকার নাই।’

‘ কেন দরকার নাই। অফকোর্স দরকার আছে ভাইয়া আপনি এত বড় আমার থেকে আপনাকে কি নাম ধরে ডাকা যাবে। মামা, ভাইয়া, খালু, চাচা কিছু একটা তো বলতেই হবে তাই না। এখন আপনি বলুন আপনাকে আমি কি বলব? ভাইয়া বলতো যদি সমস্যা হয় তাহলে আমাকে মামা কাকাই বলতে হবে!!’

ইহান আমাকে টেনে রুমে নিয়ে আসলো। বিছানার উপর সাজানো প্লেট দেখতে পেলাম। মুরগির গোশত দিয়ে ভাত রাখা। আমাকে সামনে বসিয়ে খেতে বলল, আজেবাজে কথা বলা অফ করে।

আমি তাও বললাম, ‘ এত ইম্পর্টেন্ট একটা কথা আপনার কাছ আজেবাজে মনে হচ্ছে বলেন না আমি আপনাকে কি বলবো?

‘ উফফ এতো পাগলামো করছো কেন? আচ্ছা ভাই ই ব‌ইলো। মামা কাকা থেকে এটা বেটার।’

আমি দাঁত কেলিয়ে বললাম, ‘ ওক্কে ভাইয়া!’

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!