প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
এক চিলতে রোদ | ভালোবাসার প্রশ্ন ও এড়িয়ে যাওয়া
সমাপ্তএক চিলতে রোদ | সিজন ২ | পর্ব - ৩২
সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে ইমা আপুর রুমে পেয়েছি। রাতে আমি শেষ ইহানের গান শুনতে ছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নাই। তারমানে উনিই আমাকে এখানে দিয়ে গেছে তাই হবে হয়তো।
সকালে কোন রকম খাবার খেয়েই আমি চলে এলাম। ইহান আমার সাথে এলো। রিকশায় উঠে বসলাম দুজন। ইহান গাড়ি আনতে চেয়েছিলো আমি মানা করে দিছি। ইহান আর অমত করে নি।
আমি ইহানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘ আব্বু জেনে গেছে আমি আপনাদের বাসায় এসেছি। ইমা আপু আপনার বোন সব কিছু তাই না।’
ইহান আমার কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ হ্যাঁ।’
‘ আমি বাবার সামনের কি করে দাড়াবো। মিথ্যা বলা আমার উচিত হয়নি।’
ইহান আমার দিকে বিরক্তকর চাহনী দিয়ে বললো, ‘গাল ফুলালে এক থাপ্পর মারব ইডিয়েট।’
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
‘ মানে কি থাপ্পড় মারবেন কেন?’
‘ বাসায় কিছু বলবে না কাল আমি সব জানিয়েছি চাচু কে।’
‘ কিছু বলে নাই।’
‘ সেসব জানতে হবে না। কিছু বলবে না তাই চিন্তা করা অফ কর।’
‘ তো এমন গম্ভীর গলায় বলার কি দরকার? একটু নরম গলায় বলা যায় না। আর আমার দিকে একটু তাকান। সামনে তাকিয়ে কি দেখেন? কাল থেকে তো আর আমাকে দেখতে পাবেন না। এখন আমায় দেখবেন তা না সামনে তাকিয়ে আছেন। আপনি কি আমাকে একটুও মিস করবেন না?’
‘ আরেকটা কথা বললে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো রিকশা থেকে। যতসব আজাইরা কথা বার্তা!’ ধমক স্বরে বলল ইহান।
ইহান অন্যদিকে তাকিয়ে বললো বিরবির করে, ‘ এজন্য এই গাধাটাকে জানাতে চাইনি ভালোবাসি। এখন সারাক্ষণ এসব নিয়ে পেছাল পারবে। এদিকে আমার যে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে অন্যরকম বাজে চিন্তা মাথায় আসে। তাকিয়ে থাকতে পারিনা। খারাপ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। এই যে আজ কমলা রঙের থ্রী পিস পরেছে এই রং টাতেও কি অপূর্ব লাগছে আমি চোখ সরাতে পারছি না।
ইহান আমার কথায় রাগ দেখালো তাই রাগ করে পরে বসে আছি। হঠাৎ ইহান আমার কাঁধ চেপে নিজের দিকে টেনে আনলো। আমি চমকে উঠে ইহানের হাঁটু খামচে ধরলাম। ঝাঁকুনিতে এই মুহূর্তে পরতে নিচ্ছিলাম। সময় মতো ইহান আমাকে নিজের দিকে না আনলে আমি শেষ।
বুক এখনো ধুকপুক করছে ভয়ে।
‘ ননসেন্স। এখনি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলছিলে।
এতো কিনারায় কেন বসেছো আমার সাথে গা ঘেঁষে বসলে কি গায়ে ফোসকা পড়বে নাকি হোয়াই?’
আমি নিচে দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছি। ইহানের রাগী কথা শুনে তখন আমি একদম কিনারায় ঘেঁষে বসেছিলাম। তার জন্য ই এমন একটা কান্ড ঘটছিলো। বাসার সামনে আসতেই নেমে পরলাম। ভেতরে ঢুকার পর ইহান তারা দেখিয়ে চলে গেলো। আমি মলিন মুখে তাকিয়ে রইলাম।
বেলকনিতে গিয়ে তাকিয়ে রইলাম। ইহান কাকে যেনো ফোন করছে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কল করেছে। আমি ভ্রু কুটি করে তাকিয়ে আছি।
আমার হাতের ফোনটা বেজে উঠলো। আমি তাকিয়ে দেখি ইহানের নাম জ্বলজ্বল করছে আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। তার মানে তখন আমাকে কল করছে। আমি তারা তারি রিসিভ করলাম।
‘ হ্যালো। পেছনে ঘুরেন আমি বারান্দায় দাড়িয়ে আছি।’
‘ জানি। আর তখনকার ধমকানোর জন্য সরি। ‘
‘ এখন ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে। আপনি আমাকে ধমকালেন কেন?’
‘তো কি করতাম। তখন ভালোবাসা দেখাতে কি চুমু খাওয়া দরকার ছিলো।’
‘ ছিহ কি সব বলছেন?’
‘এখন ছিহ বলছো কেন তুমি এটাই চাইছিলে আমি জানি। ওকে আবার দেখা হলে উসুল করে দিবো।’
‘ আরে আমি।’
ইহান কল কেটে দিয়েছে। আমি গোল গোল করে তাকিয়ে আছি।
ইহান সামনে নাই কোথায় গেলো কথা বলায় এতোটাই মগ্ন ছিলাম কখন চলে গেছে টের পায় নি।
রাতে ডিনার টেবিলে মাথা নিচু করে বসে আছি। আব্বু কে মিথ্যা বলেছিলাম তাই খুব কষ্ট পাচ্ছি। আব্বু কিছু বলবে ভেবে কিন্তু এসব নিয়ে কিছুই বললো না তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই কথা বললো। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
নানু বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত হলো আমি আর আম্মু যাবো। আব্বু বাসায় থাকবে তার অফিস আছে।
ইহানকে কল করে জানিয়ে দিয়েছি। এক সপ্তাহের মতো থাকবো।
এই এক সপ্তাহ ইহানের সাথে দেখা হবে না ভাবতেই খারাপ লাগছে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু তা তো বলা যায় না কিছুদিন আগের যাওয়ার জন্য পাগল ছিলাম হঠাৎ না যেতে চাইলে কি বলবো।
নানু বাড়ি এসেই দুপুরের খাবার খেলাম। তারপর এক ঘুম দিলাম। বিকেলে উঠেই আমি আর লিনার সাথে হাঁটতে বের হলাম। সন্ধ্যায় বেরিয়েছি তাই একটু গিয়ে ফিরে এলাম। তখন জানতে পারলাম তুষারের সাথে ওর কথা বলা অফ হয়ে গেছে। ও তুষারের কথা বলতে গিয়ে মলিন মুখে ছিলো। পছন্দ করত বুঝা যাচ্ছে। আম্মুকে কথা দেওয়ায় সে পথে আর পা বাড়ায় নি। আমি ঢোক গিলে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। ইহানের কথা বলেও জানতে দেওয়া যাবে না।
এখন সমস্যা হলো ওর সাথে থেকে আমি ইহানের সাথে কথা বলবো কি করে? চিন্তায় নখ কামড়াচ্ছি।
তা দেখে লিনা জিজ্ঞেস করলো আমি এতো কি চিন্তা করছি।’
আমি থতমত খেয়ে বললাম কিছু না।
লিনার পাশে আমাকে সাবধানে থাকতে হবে। ও জানতে পারলে আম্মুকে জানাতে এক সেকেন্ড নিবে না। রাতে ইহানের কল এলো কিন্তু লিনার জন্য রিসিভ করতে পারলাম না। রাগে আমি দাঁত কিড়মিড় করে সামির রুমে এলাম। ছোট মামি ওকে বকা ঝকা করে পড়াচ্ছেন। আমি সেখানে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে দিনা নিসার রুমে গেলাম দুজনে কলম নিয়ে ঝগড়া করছে। আমি রুমে বড় কাউকে না দেখে সাথে পারত ইহান কে কল করলাম কিন্তু রিং হওয়ার আগেই দেখলাম মামা আসছে তারাতাড়ি ফোন লুকিয়ে ফেললাম। আর হাসার চেষ্টা করে মামাকে বললাম,
‘ এক কলম নিয়ে দু’জন কেমন ঝগড়া করছে দেখেন মামা।’
মামা বললো, ওদের ঝগড়ার কারণ নাই। শত এনে দাও তাও এরা ঝগড়া করবেই কিছু না কিছু নিয়ে। এই পাজির দল যা খেতে ডাকছে আম্মু খেয়ে আয়।’
দুজনেই মামার কথা শুনে ছুটে চলে গেলো। আমি ও বেরিয়ে এলাম। রাগ মাথায় নিয়ে শুয়ে আছি। লিনা বের হলে আমি কল করবো কিন্তু ও বের হলো না তুষারকে নিয়ে দুঃখের কথা বলছে আমি বিরক্ত হয়েই শুনছি কখন ঘুমিয়েছি জানি না।
সকালে উঠে অনেকগুলো মিসকল দেখলাম। আর সাথে সাথেই ঘুম ছুটে গেলো। আমি উঠে ফোন কানে নিলাম। কোন দিকে নজর না দিয়ে কল দিলাম কিন্তু নো রিসিভ। সামি দৌড়ে এসে বললো,
‘ বাইরে আসো তাড়াতাড়ি ঊষা আপু।’
আমি উঠে ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে দেখলাম সবাই খেতে বসে পরেছে। আটটা দশ বাজে সবাই খাওয়া শেষের দিকে। আমি যেতেই আম্মু বললো, খেয়ে নে ফ্রেশ হয়েছিস?
‘ হুম।’
খাওয়া হতেই দিনা নিসা আমার হাত ধরে বললো,
‘ আপু চলো পুকুর পাড়ে যাই। ছোটো কাকা মাছ ধরছে!’
আমি অবাক গলাতেই বললাম, ‘ কিহ? মামা মাছ ধরতাছে?’
‘ হুম চলো। দেখে আসি।’
‘ আচ্ছা।’
মামা মাছ ধরবে শুনে অবাক হয়েছি। নানু বাহির দক্ষিণ পাশে একটা পুকুর বেশি পানি নাই কাঁদা পানি সেখানে ছোটো মামা সাথে আর অনেকে আছে তাদের আমি চিনি না। সামি এসেই লাফিয়ে পরলো কাঁদাতে তা দেখে এক ধমক দিলো মামা।
দিনা নিসা ও একদম কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করছে। আমি উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছি। আগে কখনো নিজে চোখে মাছ ধরা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আজ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছি। তখন ইহানের কল এলো আমি রিসিভ করেই উৎসাহিত গলায় বললাম,
‘ আমি মাছ ধরা দেখছি। ছোট মামা কাঁদায় নেমে মাছ ধরছে।’
‘ তাই আমিও তো দেখছি। তোমার ও ধরার ইচ্ছে আছে নাকি?
‘ ধুর আমি কেন ধরবো? ছিহ কি ময়লা নোংরা পানি আমার তো দেখেই কেমন লাগছে। এটা দেখতেই আমার ভালো লাগছে নামার শখ নাই। কিন্তু আপনি দেখলেন কি করে?’
‘ ইটস ম্যাজিক!’
‘ কি আবুল তাবুল বলছেন। আপনি মাছ ধরা কোথায় দেখেছেন বলেন? কে ধরেছে?’
‘ তোমার মামা।’
‘ আপনার মাথা গেছে।আমার মামাকে আপনি মাছ ধরতে দেখলেন কি করে? এখন আপনি কিন্তু আমার সাথে ফাজলামি করছেন!’
‘ তাই। আচ্ছা কাল ফোন রিসিভ করলে না কেন?? সকালের কল করলাম পাত্তা নাই। মামা বাড়ি এসে ভাব বেড়ে গেছে তাই না আমাকে ভাব দেখাচ্ছ?’
‘ অনেক ঝামেলায় আছি আমি। আর যতদিন আছি আপনার সাথে কথা বলা যাবে না। ওই লিনাটা সারদিন আমার সাথে চিপকে থাকে। ‘
বলতে বলতে সামনে পা বাড়াচ্ছি। আমার সামনে যে এতো বড় পুকুর আমার খেয়াল নাই। এই ইহানের সাথে কথা বলতে গেলে আমি সব ভুলে খেয়ে ফেলি। এখনো তাই হচ্ছে। আমি পাটা ফেললেই পুকুরে গরিয়ে যাব। তখন ইহান চেঁচিয়ে উঠে বললো,
‘ তারাতাড়ি পিছনে যাও। স্টুপিড পরে গেলে তো!’
আমি বুঝতে না পেরে পা রেখে কিছু বলতে যাব পেছনে থেকে একটা হাত আমাকে টেনে পেছনে নিয়ে বললো,
‘ এই তোর মাথা গেছে নাকি এখনি তো গড়িয়ে পুকুরে পরতি। এতো অন্যমনষ্ক হয়ে কার সাথে ফোনে কথা বলছিলি হ্যা।
লিনার কথা শুনে ফোন লুকিয়ে বুকে ফূ দিতে থাকি। এখানে থেকে পরলে মরতাম না কিন্তু ব্যাথা পেতে আর কাঁদায় নাকানিচোবানি খেতাম। ইহান আমাকে সাবধান হতে বললো কি করছ উনি আমার এই খবর পেলো কিভাবে? কি হচ্ছে এসব?
আমি ফোন কানে নিতেও পারছি না। কিন্তু বুঝতে বাকি রইলো না। হঠাৎ সামনে পুকুরের অপর পাশে চোখ যেতে হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। ইহান দাঁড়িয়ে আছে কাঁধে একটা ব্যাগ আর মুখে হাসি আমি তাকাতেই হাই দিলো।
