নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ মার্চ ২০২৫

এক সমুদ্র প্রেম | শেষ রাতের স্পর্শ

সমাপ্ত

এক সমুদ্র প্রেম | সিজন ১ | পর্ব - ৪৩

২৬১ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

একটা পুরোনো গলির সামনে এসে মারিয়া গাড়ি থামাতে বলল। সাদিফ ব্রেক কষল তৎক্ষনাৎ। মারিয়া নেমে দাঁড়াতেই সে আশেপাশে চেয়ে বলল,

‘ এখানে আপনার বাসা?’

‘ জি।’

‘ কোন বাড়িটা?’

মারিয়া হাত লম্বা করে দেখাল,

‘ এই রাস্তার একটু সামনে। ওদিকে আর গাড়ি যাবেনা। রাস্তার কাজ চলছে তো ‘

‘ ওহ। ওকে, আপনি তাহলে বাড়ি চলে যান,আমিও যাই।’

পুরো কথাটা সে বলল হাসি ছাড়া,এবং রাশভারি গলায়। মারিয়া কাঁধব্যাগ বুকে চে*পে দাঁড়িয়ে রইল। সাদিফ বাইক ঘুরিয়ে ফের স্টার্ট দিতে গেলে ডাকল,

‘ শুনুন।’

সাদিফ ঘাড় কাত করে তাকায়,

‘ কিছু বলবেন?’

শ*ক্তপোক্ত চেহারা দেখে মেয়েটা গুলিয়ে ফ্যালে সব। এই ছেলে এমন কেন? একটু হাসলে কী হয়?

মিহি স্বরে বলল,

‘ ইয়ে,ধন্যবাদ! আপনি লিফট না দিলে আজ যে কী করতাম!’

‘ ইটস ওকে।’

সে আবার স্টার্ট দিতে গেলে মারিয়া আবার ডাকল,

‘ শুনুন। ‘

সাদিফ বিরক্ত হলো৷ তেমন কপাল কুঁচকেই তাকাল। মারিয়া নিভে গিয়ে বলল,

‘সরি!’

‘ বলুন কী বলবেন?’

মারিয়া রয়ে সয়ে বলল,

‘ আসলে বলতে চাইছিলাম যে….’

‘ আসল নকল বাদ দিন ম্যালেরিয়া,আগেই বলেছি আমার দেরী হচ্ছে!’

তার কণ্ঠ অধৈর্য।

মারিয়া ব্যকুল চোখে তাকায়। যেই চোখে অনেক কিছু বলতে চাওয়ার প্রবণতা। সাদিফ হয়ত বুঝে গেল। বাইক ফের স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে বলে,

‘ আচ্ছা,রিল্যাক্সে বলুন। ‘

মারিয়া বুকভরে শ্বাস নিলো এবার। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে খুব নরম গলায় বলল,

‘ আমি আসলে দুঃখিত! ‘

সাদিফ ভ্রু কোঁচকায়, ‘ কেন?’

মারিয়া চোখ নামিয়ে বলে,

‘ এমনিই। বলতে পারেন অনুশোচনা। আপনি মানুষটা এত ভালো,আর আমি সেই শুরু থেকে ঝ*গড়া করেছি। যা মুখে এসেছে তাই বলেছি। বয়সে ছোট হয়েও সম্মান দিইনি। বিচুটি পাতা দিয়ে কী অবস্থাটাই না করেছিলাম! আ’ম রেইলি ভেরী সরি ফর এভ্রিথিং! ‘

সাদিফের মুখমণ্ডল সবেগে মসৃন হলো। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপারটায় বিস্মিত সে।

‘ আপনি কি মন থেকে সরি বলছেন? না কি লিফট দিয়েছি, সেই সৌজন্যেতা রক্ষায়?’

মারিয়া উদ্বেগ নিয়ে বলল,

‘ মন থেকে বলছি। গড প্রমিস!’

সাথে গলার কাছটা চি*মটি দিয়ে দেখালো সে। বাচ্চাসুলভ আচরণ দেখে হেসে ফেলল সাদিফ।

‘ বেস। সরি এক্সেপটেড৷ ‘

মারিয়া মুগ্ধ হয়ে সেই হাসি দ্যাখে। নিজেও হাসল ঠোঁট চে*পে।

প্রস্তাব রাখল,’ অন্তত এক কাপ চা খেয়ে যেতেন যদি…’

‘ আজ নয়,অন্য দিন। বলেছেন এতেই হবে।’

‘ অন্যদিন সত্যিই আসবেন?’

‘ কথা দিচ্ছিনা,তবে চেষ্টা করব।’

‘ ঠিক আছে। সাবধানে যাবেন।’

প্রথম বার মেয়েটিকে ভালো লাগল সাদিফের। মনে হলো সে অতটাও অভদ্র নয়৷ একটু আকটু ভদ্রতাও জানে। হেসে বলল,

‘ থ্যাংক্স, এন্ড আম অলসো সরি! ‘

মারিয়া অবাক হয়,জানতে চায়,’ কেন?’

সাদিফ বলল,

‘ ম্যালেরিয়ার ডায়রিয়া বানানোর জন্য।’

তারপর ধোঁয়া ছুটিয়ে চলে গেল৷ মারিয়া প্রথম দফায় হতভম্ব হলেও পরপর হেসে উঠল। শান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে হাত ছোঁয়াল বক্ষে। এখনও কাঁ*পছে এখানে। সারা রাস্তা কেঁ*পেছে। ধুকপুক করছে ভীষণ । সাদিফের সাথে কথা বলতে গিয়ে প্রথম বার টের পেয়েছে কন্ঠরোধ হচ্ছে তার। প্রকান্ড জড়তা লাগছে। চোখের দিকে তাকাতে গিয়ে মিইয়ে এসেছে মনে মনে। এমন হওয়ার কারণ? সে কি তবে ছেলেটার প্রেমে পড়েছে?

***

মিরপুরের নামি-দামি,আর পরিচিত মুখ হলো “ইয়েলো নাইফ রেস্টুরেন্ট”। ছাদ ছুঁয়ে টাঙানো অসংখ্য ফুল দিয়ে স্বাজানো এটি। জাকজমক,আর শোধিত ভীষণ। সবথেকে বেশি মনকাড়া লাগে সন্ধ্যের পর। শহরের বুক চিড়ে যখন অন্ধকার নামে,তখন এই রেস্তোরা ঘিরে জ্বালানো কৃত্রিম আলোগুলো দেখলে গেঁথে থাকে চোখে।

ধূসরদের গাড়িটা, রাস্তার এক সাইড ধরে এর সামনে এসে থামল। মূলত এখানকার পিৎজ্জাটা ভালো। ইকবাল আর তার পছন্দের শীর্ষে। পিউ এসেছে প্রথম বার। পুষ্পর চোখ জ্ব*লে উঠল রেস্টুরেন্টের নাম দেখে। এখানে তার বেহিসেবী আগমন। অবশ্যই ইকবাল কে সাথে নিয়ে। আহা,নাগা উইংশটার যা স্বাদ! মুখে লেগে থাকার মতো প্রায়।

পিউ আগে আগে নামল। তিন তলার রেস্টুরেন্ট দেখতে নীচ থেকে চোখ আকাশে তুলতে হচ্ছে তাকে। ইয়েলো নাইফের নীচে ছোট করে লেখা ‘লাভ এ্যাট ফার্স্ট বাইট ‘দেখেই ফিক করে হেসে উঠল। আড়চোখে ধূসরের দিক দেখল একবার। এখানে লেখা লাভ এ্যাট ফার্স্ট বাইট,আর ধূসর ভাই তার লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট! কী সাংঘাতিক কম্বিনেশন!

ধূসর,ইকবাল, পুষ্প আর সে সিরিয়ালে সিড়ি বেয়ে উঠল।

ধূসর বেছে বেছে একটা টেবিল দেখে ওদের ইশারা করল। পিউ বসতে গেলে চেয়ার টেনে দিলো স্বহস্তে। পুষ্প তা দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

‘ ভাইয়া,আমাকে তো চেয়ার এগিয়ে দিলেনা। পিউকে দিলে? কেন এই একচোখামি ভালোবাসা?’

বলতে বলতে সে ঠোঁট চে*পে হাসে। ইকবাল বলল,

‘ তুমি আর পিউ কি এক হলে বলো? তুমি হলে আমার বউ,আর পিউ হলো…. ‘

ধূসর চোখ পাকিয়ে তাকাতেই ইকবাল মিটিমিটি হেসে বলল ‘ সরি! সরি!’

পিউ লজ্জা পেলো। নীচু কণ্ঠে শুধাল,

‘ আপনি বসবেন না ধূসর ভাই?’

ইকবাল ওকে অনকরণ করে বলল,

‘ আপনি বসবেন না ধূসর ভাই?’

‘ শাট আপ ইকবাল। ‘

‘ শাট আপ পিউ।’

পিউ বলল,’ আমি কী করলাম?’

‘ তাহলে আমিই বা কী করলাম?’

ধূসর গম্ভীর করল স্বর, ‘ ইকবাল,তোর কি বয়স দিনদিন কমছে না বাড়ছে?’

ইকবাল দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

‘ জানিনা। মনে হচ্ছে একই জায়গায় আটকে। দেখছিস না,দিন দিন কেমন ইয়াং হচ্ছি?’

পুষ্প মুখ ব্যাকায়, ‘ ইয়াং না ছাই। চুল পেঁকে যাচ্ছে তোমার!বুড়ো হচ্ছো।

পিউ বলল,

‘ এই বুড়োর জন্যেইত এত পাগলামি করলি। জানেন ভাইয়া,ওর যখন সাদিফ ভাইয়ার সাথে বিয়ে ঠিক হোলো, কী যে কেঁদেছে ! খালি হেচকি তুলে, কেঁ*দে কেঁদে বলেছে’ আমি ইকবালকে ছাড়া মরেই যাব।’

পুষ্প মৃদূ ধম*কে ওঠে, ‘ চুপ থাকবি তুই?’

ইকবাল ঠোঁট কাম*ড়ে হাসল। পুষ্প লজ্জায় আই-ঢাই করে তাকিয়ে থাকে আরেকদিক। বাঁচার চেষ্টা চালায়, প্রেমিকের মুগ্ধ,ঘায়েল দৃষ্টি থেকে।

ইকবালের হঠাৎ চোখ পড়ল ধূসরের দিকে। আশেপাশে দেখছে সে। চট করে দুষ্টু বুদ্ধি এলো মাথায়। ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই শুধাল,

‘ আচ্ছা পিউ,ধরো পুষ্পর মত তোমারও একটা ছেলের সাথে হুট করে বিয়ে ঠিক হয়েছে। তুমি ও কি কাঁ*দবে?’

পিউ কি দুষ্টু কম? ধূসর পাশে, এই সুযোগে তাকে জ্বালানোই যায়। সে অবাক হওয়ার ভাণ করে বলল,

‘ কাঁ*দব কেন? আমিত খুশি হব।’

ধূসর দৈবাৎ সজাগ চোখে তাকাল।

ইকবাল বলল,

‘ মানে,অন্য কারো সাথে বিয়ে ঠিক হলে তুমি খুশি হবে? কেন?’

‘ অন্য কারো কেন বলছেন? বিয়ে করে বাড়িটা ছাড়তে পারলেই আমি বাঁচি। এই বাড়িতে খালি বকা খাই। বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি গেলে জামাইয়ের আদর খাব।’

ধূসর চড়া কণ্ঠে ধমকে উঠল,,

‘ এক চ*ড় মা*রব।’

পিউ কেঁ*পে ওঠে। হতবাক হয়ে তাকায়। ইকবাল নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল,

‘ ওমা কেন? কী এমন বলল ও! ‘

ধূসর ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল কিছু সময়। তার ধম*কের জোর শুনে কাছাকাছি টেবিলের অনেকেই চেয়ে আছে। সে নিভল,শ্বাস ফেলে বলল,

‘কিছু না। অর্ডার দিয়ে আসি।’

তারপর দুম দুম করে পা ফেলে চলে গেল। আড়াল হতেই ইকবাল,পুষ্প আর পিউ স্বশব্দে হেসে উঠল। পুষ্প বলল,

‘ ভাইয়া জেলাসও হয়!’

‘ ব্যাটার বুক ফাঁটে তো মুখ ফোঁটেনা, বুঝলে শালিকা!’

পিউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আনমনে বলল ‘ তার মুখ ফোঁটার আশায় আমি বুড়ি হলাম বলে।’

**

ধূসর অর্ডার দিয়ে ফিরে এলো। এখানে খাওয়ার আগে টাকা দাওয়ার নিয়ম। সবটা সেড়ে এসে বসল। ইকবাল সে পাশাপাশি, পিউ -পুষ্প পাশাপাশি।

সে আসতেই ওদের ফিসফিস করা থামে। শশব্যস্ত ভঙিতে বসে থাকে। কিছুক্ষণের মাথায় খাবার এলো। একটা লার্জ সাইজ পিৎজ্জা, তিনটে বার্গার,চারটে কোল্ড কফি আর একটা মোটামুটি সাইজের নাগা উইংশে, ছোট খাটো টেবিলটা ভরে যায়।

পিৎজ্জাটা শুধুমাত্র পিউয়ের, এটা সবার জানা। গাড়িতে বসেই কে কী খাবে সেই আলোচনা শেষ। সেই মোতাবেক খাবার অর্ডার করেছে ধূসর। পুষ্প হামলে পরল নাগা উইংশের প্লেটের ওপর। ব্যস্ত হাতে ওটাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। এই খাবারটা মাত্রাতিরিক্ত ঝাল। অতিরিক্ত হজম ক্ষমতা আর অভ্যাস ছাড়া কার পক্ষেই সম্ভব নয় খাওয়া। সে যতবার এসেছে,খেয়েছে। ঝালে নীল হয়ে বসে থেকেছে আর চোখেমুখে বাতাস করেছে ইকবাল। আজকেও এরকম কিছু হবে,কিন্তু সে নিশ্চিন্ত। আজ বাতাস করার অনেকে আছে। তবুও এটা মিস দেয়া যাবেনা। সবাই যখন খাবারে হাত দেবে,ঠিক সেই সময়, ভেসে এলো,

‘ আরে ভাইয়া,ভাবি,তোমরা এখানে?’

চেনা কণ্ঠস্বর শুনে সকলে এক যোগে তাকাল। খাবারে রাখা হাত থেমে গেল। পুষ্প আর ইকবালের ঠোঁটে হাসি ফুটলেও ধূসরের চিবুক শক্ত হলো ওমনি।

একবার পিউয়ের দিক তাকাল সে। ইফতি হাসি হাসি মুখে এগিয়ে আসে। ইকবাল অবাক কণ্ঠে বলল,

‘ তুই এখানে? বলিসনি তো আসবি?’

‘ হঠাৎ প্ল্যানিং,ফ্রেন্ডদের নিয়ে এলাম। ওই যে ওই টেবিলে!’

সে হাত দিয়ে দূরের টেবিল দেখাল। অনেক গুলো ছেলে গোটা টেবিল ঘিরে বসে। এরপর পুষ্পকে জিজ্ঞেস করল,

‘ কী খবর ভাবি,কেমন আছো?’

সে হেসে জানায়,

‘ আলহামদুলিল্লাহ, তুমি? ‘

‘ ভালোই। পিউও আছে দেখছি,কী অবস্থা পিউ!’

ইফতি ভ্রুঁ নাঁচায়। তার হাসিতে উপচে পরা থোবড়াটা অসহ্য লাগে ধূসরের। একটা শ*ক্ত ঘু*ষিতে থেত*লে দিতে ইচ্ছে হয়।

পিউ গভীর দ্বিধাদ্বন্দে পরে গেল।

সে কি হেসে ভালো বলবে? না কী, না হেসে? গতকালকের কথা মনে পড়ল তখন,সেই হুম*কি,

‘ তোর হাসা বারণ পিউ!’

তারপর হাত মুচ*ড়ে ধরার নি*র্মম দৃশ্যটা মনে করেই ভেতর ভেতর গুটিয়ে গেল ত্রাসে। সিদ্ধান্ত নিলো, কিছুতেই হাসবে না। এমনি ‘ভালো আছে’ জানাবে। কিন্তু সৌজন্যতার বিবেকবোধ তা হতে দিলে তো? হাসিটা ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে বলল,

‘ ভালো। আপনার? ‘

‘ আমি তো অল টাইম ভালো থাকি। আজকে দেখছি ধূসর ভাইয়াও আছেন। আচ্ছা, তোমরা কি সবাই মিলে ঘুরতে এসেছো ?’

‘ হ্যাঁ,আমাদেরও হঠাৎ প্ল্যানিং। ভাইয়া নিয়ে এলেন। তুমিও জয়েন করোনা ইফতি।’

ধূসর কট*মট করে পুষ্পকে দেখল। মেয়েটা খুশির প্রকোপে খেয়ালই করেনি। ইফতিকে বলতে দেরী,পাশের খালি টেবিল থেকে চেয়ার এনে বসতে দেরী করলনা। আর বসলোও একেবারে পিউয়ের পাশে। চেহারা অচিরাৎ চুপসে যায় তার। উঠে যেতে মন চায়৷ সাহস হয়না ধূসরের দিক তাকাতে। তাকালে কী দেখবে? নাক ফুলছে? চোখমুখ লাল? বাবাহ! থাক বরং!

ইফতি গল্প জুড়ে দিলো। ভাই-ভাবির সাথে বিস্তর আলাপ। অথচ শেষ মাথায় পিউয়ের নাম ধরে থামে। যেমন, ‘

তাই না পিউ? কী বলো পিউ? ‘ মেয়েটা ভদ্রতার খাতিরে হু -হা করছে শুধু। ধূসরের রা*গে ব্রক্ষ্মতালু অবধি জ্বলে যায় তখন।

প্রচন্ড ক্রো*ধে হাঁস*ফাঁস করে। এই ছেলে এখানে কেন আসবে? পিউয়ের পাশে কেন বসবে?

বন্ধুর ভাই, এই একটা শব্দই তাকে তার গুণ্ডামি থেকে পিছিয়ে নিচ্ছে। নাহলে এক্ষুনি বুঝিয়ে দিতো ধূসর মাহতাব কী জিনিস! কিন্তু চুপচাপ বসে থেকেও লাভ হচ্ছেনা। হাঁটুর বয়সী ছেলেটাকে শত্রু ভাবতেও সম্মানে লাগছে তার।

কিন্তু রা*গ তো প্রকাশ করা দরকার। এভাবে চুপচাপ বসে থাকা অসম্ভব। তক্ষুনি নজর পড়ল পুষ্পর সামনে রাখা মাংসের টুকরো গুলোর দিকে।

‘ ওটা এদিকে দে।’

কথাটায় আলাপ থামল তাদের। পুষ্প, ধূসরের ইশারা করা প্লেট দেখে বিভ্রান্ত হলো। ভাইয়াতো এত ঝাল খাননা। নিশ্চিত হতে বলল ‘ এটা? ‘

‘ হু।’

‘ এটাত অনেক ঝাল ভাইয়া!’

‘ তোকে দিতে বলেছি।’

কণ্ঠে কী যেন ছিল! পুষ্প দ্রুত এগিয়ে দেয়। কিন্তু চিন্তা হতে শুরু করে। ইকবাল, পিউ সবাই চোখ বড় করে চেয়ে থাকে। ধূসর যে এত ঝাল খায়না,সেটা ওদের সবার জানা।

ইফতি অতশত ভাবলো না।

শোনো পিউ,বলে আবার কথা শুরু করল সে। ধূসর কাটাচামচ টা শক্ত করে চে*পে ধরল মাংসের গায়ে। যেন ইফতির গলায় ধরেছে ওটা। তারপর একসাথে দুটো পিস তুলে মুখে ভরল। চোখ কপালে তুলল পিউ। পাশে বসা, বকবক করতে থাকা ছেলেটাকে ফেলে তার শ*ঙ্কিত দৃষ্টি পরে রইল সামনের উদ্ভ্রান্তের মত খেতে থাকা মানুষ টার ওপর।

ধূসর একটা বার আশেপাশে তাকালো না। একটুখানি সামনে রাখা পানির বোতলের দিকেও দেখল না। সকলের বিস্মিত দৃষ্টিতেও তোয়াক্কা হলো না কোনো। ইফতির কথা থেমে গেছে। সে নিজেও হা করে দেখছে ধূসরের খাওয়া।

ধূসর সবটা শেষ করে থামল। কোটর ঝালের প্রকোপে টলটল করছে।

স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল সবাই। সে উঠে দাঁড়াতেই ইকবাল কিছু বলতে যায়,ধূসর শুনলো না।

ওয়াশরুমের দিক হাঁটা ধরল চুপচাপ। তার টলমলে কদম পিউকে যা বোঝার বুঝিয়ে দেয়। হুলস্থূল পায়ে ধূসরের পেছনে ছুটল সে। ইকবাল যেতে নিয়েও থেমে গেল,ওকে যেতে দেখে। জায়গায় বসে পরল আবার।

ওয়াশরুম তখন ফাঁকা। দু একজন হাত ধুঁয়ে চলে গেছে কেবল। ধূসর অন্ধকার দেখছে। দৃষ্টি ঝাপ্সা। চোখ বেয়ে উষ্ণ জল গড়ায়। অক্ষিপট টকটকে লাল। ঠোঁট ভিজে গেছে লালায়। দিশেহারা অবস্থাপ্রায়। ধোঁয়া বের হচ্ছে কান দিয়ে। মাথার রগ দপদপ করে লাফাচ্ছে। সে বেসিনে ঝুঁকে পরল একপ্রকার। মুখে পানি নিয়ে কয়েকবার কুলি করে ফেলল। মাথায় পানি দিলো। কাশি উঠে গেছে। পিউ দৌড়ে আসে। ধূসরের অবস্থা দেখে বুকটা ছি*ড়ে গেল ক*ষ্টে। হুটোপুটি করে কাছে এসে দাঁড়াল। পিঠে হাত রেখে উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,

‘ আপনি ঠিক আছেন ধূসর ভাই?’

ধূসর সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পিঠ থেকে পিউয়ের হাতখানা ছিটকে সরায়। ফিরে তাকাতেই পিউ আঁ*তকে উঠল তার চেহারা দেখে। আর্তনা*দ করে বলল,

” আল্লাহ,কী অবস্থা হয়েছে আপনার? ‘

ধূসর চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। পিউ দুঃশ্চিন্তায় সেই রু*ষ্ট চাউনীর তল পেতে অক্ষম।

‘ ইফতি এখানে কেন এসেছে? তুই ডেকেছিস?’

পিউ থমকে তাকাল।

‘ আমি কেন ডাকব?’

‘ তাহলে এলো কী করে?’

‘ বলল তো বন্ধুদের সাথে,আর

আমি কীভাবে ডাকব? আমার কাছে কি ওনার ফোন নম্বর আছে?’

‘ থাকলে ডাকতিস?’

‘ আল্লাহ, না, তা কখন বলেছি?’

‘ তা হলে ও আসবে কেন? আর বসবে কেন তোর পাশে? ‘

বলতে বলতে পিউয়ের মাথার পাশের দেয়ালে ঘু*ষি বসাল ধূসর। পিউ ভয়ে থরথর করে ওঠে। শরীরের কম্পন তীব্র হয়। প্রতিরোধ ভে*ঙে যায়। আচমকা দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল সে।

ধূসরের লালিত চোখমুখ থেকে আড়াল করতে চাইল নিজেকে।

ধূসর হতবুদ্ধি হয়ে গেল এবার। এক মুহুর্তে হুশে এলো যেন। রা*গের মাথায় বলা উল্টোপাল্টা কথায় নিজেই নিজেকে মনে মনে ক*ষে চ*ড় মা*রল । পিউ যে কস্মিনকালেও এরকম করবেনা,তার থেকে ভালো কে জানে! কী বলতে, কী বলে দিলো। ইশ! কীভাবে কাঁদছে! ধূসর করুন চোখে চাইল। হ*তাশ হলো নিজের ওপর। এই মেয়েটাকে ধম*ক,আর রা*গ দেখানো ছাড়া কি আর কিছুই সে পারেনা? কেন সে এমন ?

ধূসর ফোস করে শ্বাস ফেলল। আলতো করে ধরল পিউয়ের হাত দুটো। পাছে ব্য*থা লাগে! মুখ থেকে সরাল আলগোছে। ভেজা স্নিগ্ধ চোখমুখ উন্মুক্ত হলো। এই মুখস্রী দেখে বনবাসে এক যুগ কেন? একশ যুগ কাটানোও সহজ৷ ধূসর হাসল। নমনীয়,দুষ্প্রাপ্য হাসি। চোখের কার্নিশ, দু আঙুলে মুছিয়ে স্বীকারোক্তি দিলো,

‘ মাথা ঠিক ছিল না, সরি!’

পিউ চমকে চেয়ে রইল। ধূসর ভাইয়ের মুখে সরি? চেহারায় অনুতাপ? তার হা হওয়া মুখটা পেছনে ফেলে ধূসর আরেকবার বেসিনের দিক তাকায়। চোখে- মুখে পানি ছেটায়। ঘুরে তাকিয়ে মুছে নেয় পিউয়ের ওড়নায়। তুলতুলে হাত মুঠোতে নিয়ে বলে,

‘ আয়। ‘

পিউ বিহ্বল,বিমূর্ত। ধূসরদের আসতে দেখে তিন জোড়া চোখ তটস্থ ভঙিতে চেয়ে থাকে। পুষ্প যেতে চেয়েছিল,ইকবাল মানা করেছে। ইফতির সামনে না বললেও, পুষ্প বুঝেছে কারণটা। পিউ-ধূসরের একা সময় কা*টাতে দেয়াই আসল উদ্দেশ্য !

ধূসর কী ভেবে থামল। আচমকা তার হাতখানা উঠে, পেঁচিয়ে ধরল পিউয়ের কাঁধ। রীতিমতো ওকে আকড়ে নিলো নিজের সাথে। পিউ আশ্চর্য বনে একবার হাত দ্যাখে,একবার ধূসরকে। দুই ঠোঁট ফাঁকা করে চেয়ে রয়। ওকে অমন সাথে পেচিয়েই হেঁটে আসে বাকীদের কাছে। একবার আড়চোখে তাকায় ইফতির দিকে। যার জন্য এত আয়োজন,সেই ছেলেটাই ভাবলেশহীন বসে। তার দৃষ্টিভঙিতে ওরা তো ভাই-বোন! ভাই বোনকে ধরতেই পারে।

ইকবাল শুধাল ” ঠিক আছিস?”

‘হু। তোরা আয়,আমরা নীচে যাচ্ছি। ‘

‘ খাবিনা? ‘

‘ ইচ্ছে নেই।’

পিউকে নিজের সাথে ধরে রেখেই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গেল ধূসর। এক মুহুর্তের জন্য হাতটা হটালো অবধি না। ইফতি মন খা*রাপ করে সেই প্রস্থান দেখে গেল।

পিউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবার হাসল। ফেলে আসা আস্ত পিৎজ্জাটার জন্য মন কেমন করলেও এই যে ধূসরের সঙ্গে এভাবে মিশে আছে, এই যে কাঁধে রাখা নিরেট হাতটা,এইসবের কাছে যেখানে পৃথিবী তুচ্ছ,সেখানে পিৎজ্জা আর এমন কী!

তারপর চোরা চোখে একবার চেয়ে দেখল একটা শ্যামবর্ণ, মজবুত চো*য়াল। গা থেকে ছুটে আসা চিরচেনা সুবাসে মুঁদে,চোখে বুজে আসতে চায়। উফ! এই রাস্তার মধ্যেই যদি হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরা যেত!

‘ঝাল কমেছে ধূসর ভাই?’

‘ হু।’

‘ একটা আইসক্রিম খাবেন?’

‘ লাগবে না।’

‘ মিষ্টি?’

‘ না।’

‘ ডেইরিমিল্ক?’

ধূসর শান্ত চোখে তাকাল এবার। নিরুত্তাপ, বরফ -শীতল সেই চাউনী। যেন এই মানুষটা রা*গ কী জানেইনা। এক ফাঁকে তার চক্ষুদ্বয় ঘুরে এলো পিউয়ের লিপস্টিক পরা ঠোঁট জোড়া থেকে। তারপর আবার চাইল ঠিক চোখ বরাবর। কেমন অদ্ভূত গলায় বলল,

‘ যেই ডেইরিমিল্ক খেতে চাইছি,সেটা দোকানে পাওয়া যায়না।’

পিউ বুঝতে না পেরে বলল ‘ অনলাইনে যায়?’

ধূসর হেসে ফেলল। একদিকে সরে গেল ঠোঁট। বলল,

‘ তুই বুঝবি না।’

ততক্ষণে ইকবালরা নেমে আসে। ধূসররা নেই,তারা থেকে কী করবে? পুষ্পর হাতে তিনটে প্যাকেট দেখে পিউয়ের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। ধূসর তাকে ছেড়ে দিতেই, সে ওমনি তার কাছে গিয়ে বলল,

‘ পিৎজ্জাটা এনেছিস?’

‘ হ্যাঁ। বাড়ি গিয়ে খাস।’

‘ না গাড়িতে খাব। ‘

‘ আচ্ছা। ‘

ইফতিকে সাথে দেখে ধূসরের মেজাজ আবার চটে যায়৷ রা*গ হলেই সরু নাক ফেঁপে ওঠে। ইকবালকে বলল,

‘ রওনা দেব। ‘

‘ আচ্ছা।’

পিউকে বলল, ‘ সামনে বোস।’

মেয়েটা মাথা ঝাঁকায়। বাধ্যের মত উঠে বসে। ইকবাল,ইফতিকে বলল,

‘ যা তাহলে। ‘

‘ তোমরা এখন কোথায় যাবে?’

‘ এই আশেপাশে ঘুরে,ওদের বাসায় নামিয়ে,ফিরে যাব।

‘ চাইলে কিন্তু আমিও…’

ধূসর ওমনি কথা কেড়ে নিলো। শান্ত অথচ কড়া কণ্ঠে বলল,

‘ ,তুমি না তোমার ফ্রেন্ডদের সাথে এসেছো? ভাইকে পেয়ে,বন্ধুদের ফেলে এলে তাদের খা*রাপ লাগবেনা? মুখে হয়ত বলবে না,কিন্তু এটা এক ধরনের অসামাজিকতা। ভাই -ভাবিকে পরেও পাবে,বাট ফ্রেন্ডস সামটাইমস নট ফর এভার। দিস ইজ টোটালি ব্যাড ম্যানার্স ইফ্তি।

ইকবাল অসহায় ভাবে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইফতির মুখ শুকিয়ে গেছে৷ বলার মতো কিছু রইলই না। জোরপূর্বক হেসে বলল,

‘ তাও ঠিক। আচ্ছা আরেকদিন। আসি তাহলে ভাইয়া।’

ইকবাল মাথা নাড়ে, ‘ যা।’

পুষ্প বলল, ‘ ভালো থেকো ভাইয়া।’

ইফতি হাসল। পিউকে হাত নেড়ে বলল, ‘ বাই পিউ।’

পিউ ঢোক গিলল। হুম*ড়ি খেয়ে পড়ে গেল দোটানায়। সেকি হাত নেড়ে বাই বলবে? না, না, দরকার নেই এত সৌজন্যতার। ধূসর ভাই ইফতিকে যে সহ্য করতে পারছেন না,সে নিয়ে সন্দেহ নেই। তার ও আগ বাড়িয়ে এত খাতিরের কী দরকার!

ছোট করে বলল,

‘ বাই।’

ইফতি উঠে গেল সিড়ি বেয়ে। ধূসর রেগে*মেগে ইকবালের দিক ফেরে। সে ভীত কণ্ঠে বলল,

‘ আমি কী করলাম?’

ধূসর দাঁত চিবিয়ে বলল, ‘ তোর ভাই পিউকে লাইন মার*ছে।’

ইকবাল সহায়হীন ভঙিতে তাকায়। এই কাহিনী বুঝতে বাকী নেই ওর। ধূসরকে ঠান্ডা করতে বলল,

‘ ছোট মানুষ তো,বোঝেনি। বাড়ি গিয়ে মানা করে দেব ভাই। ‘

ধূসর হ্যাঁ- না কিছু বলল না। ঘুরে এসে ড্রাইভিং এ বসল।

ইকবাল দুপাশে মাথা নেড়ে নিজেও উঠল গাড়িতে। ইফতির জন্য বন্ধুত্বে বিন্দুমাত্র চি*ড় ধরানো যাবে না। ছেলেটার সাহস কী! এক দিনেই লাইন মা*রে মেয়েদের! সিটে বসেই বিড়বিড় করে গা*লি দিলো , ‘হতচ্ছাড়া একটা। পড়াশোনার নাম নেই, প্রেম ছোটাচ্ছি দাঁড়া।

পিউ কোলে রাখা হাত থেকে চোখ তুলে ধূসরের দিক তাকাল। সে গাড়ি স্টার্ট দেয়। পিউ মিনমিন করে বলল,

‘ আমি কিন্তু শুধু বাই বলেছি। ‘

ধূসর তাকালো না। হুইল ঘুরিয়ে, একদম ঠান্ডা গলায় বলল,

‘ মে*রে ফেলব তোকে।’

পিউ মনে মনে হাসল। সেই হাসির অল্প ছটা ভেসে উঠল ঠোঁটেও। সিটের সাথে মাথা এলিয়ে ভাবল,

‘ মা*রুন না। আপনার হাতে ম*রেও সুখ।’

***

ইফতি ওইমুহুর্তের জন্য থামলেও ক্ষান্ত হলোনা। পরেরদিন সোজা পৌঁছে গেল পিউয়ের কলেজের সামনে। পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে, ওকে দেখেই চমকে উঠল মেয়েটা। ছুটে কলেজের ভেতর যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ইফতি ডেকে উঠল,’ এই পিউ।’

পিউ জ্বিভ কা-টল বিরক্ত ভঙিতে৷ ছেলেটার দেখে ফেলতে হলো? অথচ ঘুরে তাকাল হাসি হাসি মুখে। একদম আকাশ থেকে পরার নাটক করে বলল,

‘ আরে আপনি? ‘

ইফতি তার সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে এগিয়ে আসে।

‘ দেখেও চলে যাচ্ছিলে কেন?’

পিউ সুবোধ বালিকার ন্যায় বলল,

‘ কই, আমিত দেখিনি।’

‘ আসলেই দেখোনি?’

‘ না।’

‘ আমি ভাবলাম দেখেছো। পরীক্ষা কেমন দিলে?’

‘ ভালো। আপনি এখানে হঠাৎ? ‘

‘ উফ পিউ,আপনি আজ্ঞে কোরোনা। উই আর সেম ব্যাচ।’

‘ তাহলে তুই করেই বলব?’

‘ কেন? মাঝে কিছু নেই?’

পিউ মুখের ওপর বলল,

‘ ওটা বেমানান।’

‘ কেন?’

সে কাঁধ উঁচায়,

‘ এমনি।’

ইফতি কণ্ঠ নামিয়ে শুধাল,

‘ আমাকে দেখে খুশি হওনি?”

‘ হব না কেন?’

‘ মুখ দেখেতো মনে হচ্ছেনা।’

পিউ লম্বা হেসে বলল, ‘ আমার মুখটাই এরকম।’

‘ তাই?’

‘ জি। বললেন না তো,এখানে কেন?’

‘ এমনিই,ভাবলাম শেষ পরীক্ষা, এসে দেখা করি।’

‘ও।’

‘ কফি খাবে?’

পিউ মিথ্যে বলল,

‘ কফি খাইনা আমি।’

‘ কাল যে খেলে!’

‘ ওটাত কোল্ড কফি। ‘

‘ তাহলে আজকেও কোল্ড খাও।’

‘ পরপর খেলে ঠান্ডা লাগবে আমার।’

‘ তাহলে আইসক্রিম?’

‘ একই কথা। ‘

‘ তাহলে কী খাবে?’

‘ কিছু না।’

‘ কেন?’

‘ বাড়ি যাব। পরশু অনুষ্ঠান না? আম্মু তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে।’

ইফতি আহ*ত কণ্ঠে বলল,

‘ প্রথম বার তোমার কলেজের সামনে এলাম, সময় দেবেনা আমায়?’

‘ আপনি জানিয়ে এলে দিতে পার‍তাম। আজতো কিছু করার নেই। অন্য আরেক দিন।’

আমি এখন যাই?

‘ যাবে?’

‘ জি।’

‘ চলো পৌঁছে দিই। সাইকেলে করে গিয়েছো কখনও? ভালো লাগবে। ‘

পিউ ত্রস্ত মাথা নেড়ে বলল,

‘ না না,আমার গাড়ি আসবে। গাড়ি ফাঁকা গেলে আব্বু ব*কবে। আমি যাই।’

পিউ ভদ্রতার ধার-ধারল না আজ। সোজা নাক বরাবর, ছটফটে পায়ে হাঁটা ধরল। ইফতি অবাক হলো ওর আচরণ দেখে। পরমুহূর্তে, ভাবল লজ্জা পাচ্ছে হয়ত। মেয়েটা এমনিই একটু ক্লাসিক। কাঁধ উচিয়ে সে উড়িয়ে দিলো ভাবনা। সাইকেলে চে*পে রওনা হলো বাড়িতে। এদিকে পিউ হাঁটতে হাঁটতে গালা*গালি দিয়ে তার জ্ঞাতিগুষ্টি উদ্ধার করছে। কী এক ঝামেলা এসে কাঁধে পরল! ইয়া আল্লাহ! সে কি এতটাই সুন্দর? যে ইফতি এক দেখায় এভাবে পিছনে লেগেছে! সুন্দর হলে ধূসর ভাই ভালো করে তাকান না কেন? ওনার চোখে কি কিছু পড়েনা? শুধু মনে মনে ভালোবাসলে,আর হিং*সেতে জ্বলেপু*ড়ে ঝাল খেলে হবে? একটু ক্যাবলা বনে তাকিয়ে থাকতে পারেনা? যেমন করে শাহরুখ খান, মাধুরি দিক্সিতের দিক চেয়ে থাকে। সালমান চেয়ে থাকে ঐশ্বরিয়ার দিকে। ইশ! ধূসর ভাইয়া কেন এত নিরামিষ?

আচমকা ভূতের মত হাজির হলো মৃনাল।

আগের মতোই দীর্ঘ হেসে ডাকল,’ ভাবি।’

পিউ চকিতে তাকায়। ছেলেটাকে দেখেই ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। পা থামলো না তার। মৃনাল পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

‘ ভাবির কি মেজাজ খা*রাপ? ‘

‘ হ্যাঁ। ‘

‘ ভাবি কি রে*গে আছেন?’

‘ জি।’

‘ আমি কি বির*ক্ত করলাম?’

‘ জি।’

মৃনাল থতমত খেয়ে বলল,

‘ হেঁটে যাচ্ছেন কেন ভাবি? গাড়ি আসেনি?’

পিউ দাঁড়িয়ে গেল এবার। নাক ফুলিয়ে বলল,

‘ আচ্ছা আপনার কি আর কাজ নেই? সারাদিন কি আমার কলেজের সামনে থাকেন?’

‘ সারাদিন না,আপনার পরীক্ষার তিন ঘন্টা থাকি।’

পিউ তাজ্জব হয়ে বলল,

‘ কেন? ও, আপনার ভাই বুঝি পাহাড়া দিতে বলেছেন আমায়?’

ছেলেটার সহজ স্বীকারোক্তি,

‘ জি।’

পিউ চেঁতে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর শান্ত গলায়, গুছিয়ে বলল,

‘ যেদিন আপনার ভাইকে সামনে পাব না? কেরোসিন ছাড়াই জ্বা*লিয়ে দেব।’

মৃনাল মাথা কাত করে বলল, ‘ আচ্ছা।’

পিউ বিরক্ত হয়ে দাঁত খটমট করে এগিয়ে যায়। পেছন থেকে মৃনাল চেঁচিয়ে বলে,

‘ ভাবি রিক্সা ডেকে দেব?’

পিউও পালটা চেঁচাল,

‘ পুলিশ ডেকে দিন,আপনার ভাই সহ আপনাকে জেলে ভরে দিই।’

মৃনালের ওপর বিশেষ প্রভাব পরল না এর। দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁত বার করে হাসল সে।

****

সোমবার ঠিক বিকেল পাঁচটায় একটা ছোটখাটো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইকবাল -পুষ্পর আংটিবদল শেষ হলো। মুমতাহিনার আগেভাগে দিয়ে যাওয়া স্বর্নের আংটিটার পাশাপাশি একটা হীরের সাদা আংটিও জায়গা পেলো তার অনামিকায়। ইকবালকেও হীরের আংটি দিলেন আমজাদ। বেশ বড় সড় চোখ ধাঁধানো পাথরের আংটিটা নিজে পছন্দ করে কিনেছেন আজমল। বরের সব কেনা-কা*টা তার ওপর। বাকী ভাইদের ফুরসত কই?

আংটি বদলে তেমন কেউ আসেনি। ইকবাল দের চাচা-চাচী এলেও সিকদার পরিবারই শুধু। বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদ,শুক্রবার বিয়ে বলে মেহমানরা আসা শুরু করেননি এখনও।

পুষ্পকে আংটি পরাতে পেরে আনন্দ ধরছেনা ইকবালের। তার খুব ইচ্ছে করছে পুষ্পর চিকন চিকন আঙুল গুলো জড়ো করে টসটসে একটা চুমু খেয়ে ফেলতে। চারপাশের এত এত মুরুব্বিদের ভীড়ে অত নির্লজ্জ হওয়া হলোনা ।

পিউয়ের হাতে ট্রে ধরিয়ে দিয়েছেন মিনা বেগম। বলেছেন ‘অতিথিদের সবাইকে দিয়ে আসতে।

সে ভীষণ সাবধানে,সতর্ক হয়ে পা ফেলে এলো। কখন না পাপোসে উলটে পরে! আছা*ড় খাওয়ার তো কম অভ্যাস নেই।

তারপর ইকবাল,ইকবালের চাচা-চাচী,ওর বাবা-মা নূড়ি সবাইকে একে একে গ্লাস দিতে দিতে ইফতির কাছে গেল। ছেলেটা বসেছিল দূরে। ড্রয়িং রুম থেকে বাড়তি জিনিস পত্র সরিয়ে সমস্তটা সোফা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে আজ। যাতে সবাই বসতে পারেন। পিউ,ইফতির দিকে ট্রে বাড়িয়ে বলল,

‘ নিন।’

ইফতি আগেই চেয়ে ছিল। পিউ খুব কাছে আসায় তার নজর গাঢ় হয়। বিমুগ্ধ হয়ে পরে। এই অল্প একটুখানি সাজসজ্জা তার তনুমন প্রকান্ড নাড়িয়ে দেয়। ওমন আফিমের ন্যায় চেয়ে চেয়েই হাতে গ্লাস তোলে । পিউ অপ্রতিভ হলো। অস্বস্তিতে চটপট সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, ব্যস্ত পায়ে চলে গেল। ধূসর খা*মচে ধরল কুশান। এক খাম*চিতেই কভার ছি*ড়ে তুলো চলে এলো হাতে।

পাশে বসা ইকবালের দিকে মুখ এগোলো সে। শুধাল,

‘ তোর ভাইকে বলেছিলি?’

ইকবাল মেরুদণ্ড সোজা করে ফেলল। হাসিটা মুছে গেল ওমনি। দুদিন ধরে বিয়ের শপিং, পার্টি অফিস, পুষ্পকে নিয়ে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে নাক ডেকে ঘুমিয়েছে। ইফতির সাথে দেখাই তো হয়নি। ইয়া মা’বূদ! কপালে দুঃ*খ আছে এবার।

সে ভ*য়ে ভ*য়ে পাশ ফেরে। মুখভঙ্গি দেখেই ধূসর যা বোঝার বুঝে গেল। মন চাইছিল ইকবাল কে কাঁধে তুলে আ*ছাড় মারতে। রা*গটুকু অতি ক*ষ্টে গি*লে বসে থাকল।

ইফতি ঢকঢক করে শরবত খেয়ে গ্লাস খালি করল। পিউ রান্নাঘরে ঢোকার আগেই গ্লাস ওর হাতে দেয়ার ছুঁতোয়,কথা বলবে আরেকবার। সে উঠে দাঁড়ায়। ছুটে যাওয়ার মত এগিয়ে যায়। ধূসর সবটা দেখল। উঠে দাঁড়াল নিজেও। ইফতি পেছন থেকে ডাকে,

‘ পিউ।’

পিহ চ সূচক শব্দ করে দাঁড়ায়। ভেতরে ভেতরে ক্রো-ধে ফেঁটে পরে। এই ছেলে কি পিছু ছাড়বেনা? ধূসর ভাই দেখলে তো ওকেই বকবেন। ঘুরে বলল,

‘ জ্বি।’

‘ গ্লাসটা।’

: শেষ? ‘

‘ হ্যাঁ। ‘

‘ টেবিলের ওপর রাখলেই পারতেন।’

‘ ভাবলাম,তোমাকেই দিই।’

পিউ গ্লাস ধরতে গেলে ইফতির আঙুল তার আঙুল ছুঁয়ে দেয়। পিউ কটমট করে ওঠে রাঁগে। বলতে পারেনা কিছু। ট্রেতে গ্লাস রেখে হাঁটা ধরতেই সে আবার ডাকল,

‘ পিউ, আজ অনেক ব্যস্ত তুমি। তাইনা?’

পিউ এবার ঘুরলোনা। বলল,

‘ জি একটু।’

‘ ফ্রি হলে বোলো,তোমাদের ছাদ টা দেখব।’

‘ আপনি চাইলে আপুকে নিয়ে যেতে পারেন। আমার থেকে ওর বর্ননা বেশি সুন্দর।’

বলে দিয়ে ঢুকে গেল রান্নাঘরে। ইফতি মুচকি হাসল। বিড়বিড় করে বলল,

‘ ভাবির দেখানো,আর তোমার দেখানো এক না কি?’

ঠিক তখনি কাঁধের ওপর একটা ভারি হাত পরল। ছেলেটা চমকে তাকায়। ধূসর ভ্রু উচিয়ে বলল,

‘ ছাদ দেখবে?’

ইফতি ঘা*বড়ে গেলো। ধূসরের কণ্ঠ শীতল হলেও চোখে কী যেন মিশে! তার একটু আগের কথাগুলো কি উনি শুনে ফেলেছেন?

ধূসর তার কাঁধ পেচিয়ে বলল, ,

‘ চলো আমি দেখাচ্ছি।’

ইফতি আমতা-আমতা করে বলল,

‘ না মানে আমি আসলে…

ধূসর হাঁটতে থাকে। ইফতি অনিচ্ছায় পা মেলায়। হঠাৎ সিড়িঘরে এসে থামল সে। কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে দাঁড়াল। ভনিতা ছাড়াই প্রশ্ন করল,

‘ পিউকে ভালো লেগেছে তোমার?’

ভ্যাবাচেকা খেল ইফতি। ধরে পরে গিয়েছে তার মানে! ধূসর ভাই কে সে জানে। সাংঘাতিক লোক! ওনার বোনকেই লাইন মা*রা? তুঁতলে বলতে গেল,

‘ না না, আমি, আমিত এম এমনি আমি….’

ধূসর চমৎকার হেসে বলল,

‘ চ্যিল! এটাইত বয়স। এই সময়ে একটা মেয়ে দেখবে,তাকে ভালো লাগবে,কদিন পেছনে ঘুরবে, রাজি হলে প্রেম করবে, এমনইত হওয়া চাই।’

ইফতি বিভ্রমে ভুগছে৷ আবহাওয়া কেমন বোঝা দুঃসা*ধ্য।

ধূসরের হাসিটা যেমন হঠাৎ করে এসেছে, তেমন হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল। দৃশ্যমান হলো কপালের দুপাশের নীলাভ শিরাগুচ্ছ।

লহু কণ্ঠে বলল,

‘তবে ছোট ভাই, প্রেম করা খা*রাপ নয়, কিন্তু বড় ভাইদের জিনিসের দিকে চোখ দেয়া খা*রাপ।’

ইফতি বুঝলোনা। দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছুটছে। কপালে ঘাম। ধূসর আবার তার কাঁধে হাত রাখে। তারপর পিউয়ের যাওয়ার দিক একটা আঙুল তাক করল,তারপর ঘুরিয়ে দেখাল নিজেকে। নীরবে বোঝাল,

‘ ওটা আমার।’

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!