নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ মার্চ ২০২৫

এক সমুদ্র প্রেম | প্রেমের উত্তাপ, হৃদয়ের শিহরণ

সমাপ্ত

এক সমুদ্র প্রেম | সিজন ১ | পর্ব - ৫৭

৩০০ ভিউ
০ মন্তব্য
১ মিনিট

পিউ ছুটে এসে লুটিয়ে পরল বিছানায়৷ চিরাচরিত সেই সিনেমায় হিরোয়িনদের মত ঝাঁপ দিলো এক প্রকার। বালিশটা বুকে চেপে হাঁস-ফাঁস করে উঠল। ধূসর ভাই ওর ঠোঁটে চুমু খেয়েছেন? এখনও স্তম্ভিত ফিরছেনা ওর। একটু আগের সবকিছু সত্যিই ঘটেছে? উনি নিজে থেকে কাছে এসেছিলেন? পিউয়ের মাথা চক্কর কাটছে বিশ্বাস- অবিশ্বাসের মাঝখানে ঝুলে। সে উঠে বসল। কী থেকে কী হয়েছে সব কিছু মনে করতেই দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল লজ্জায়। এখন ওই মানুষটার সামনে কী করে যাবে ও? কী করে মেলাবে চোখ? ইয়া আল্লাহ! পৃথিবীতে এত লজ্জা ওকেই কেন দিলে?

সত্যিই পিউ দুটোদিন ধূসরের সামনে পড়ল না। যতটা পারল লুকিয়ে রাখল নিজেকে। না সকালে সামনে যায়,না রাতে। বুদ্ধিমান ধূসরের বুঝতে বাকী রইল না। সে অতিষ্ঠ হলো দ্বিতীয়বার। একটা চুমুর ভারে যদি সামনে আসাই বন্ধ হয়,বিয়ের রাতে এই পুচকে মেয়ে কী করবে?

______

সেদিন শুক্রবার। পুরাতন বলখেলার মাঠে জন-সাধারণের উপচে পরা ভিড়। একটা বিশাল তাবু টাঙানো হয়েছে মাথার ওপর। সাড়ি সাড়ি করে প্লাস্টিকের লাল-নীল চেয়ার পেতে রাখা। চেয়ারের মুখোমুখি বানানো একটা মাঝারি আকারের স্টেজ। একটা লম্বা টেবিল,পেছনে কয়েকটি ফোমের চেয়ার। আর পাশেই মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়ার জায়গা। এই মুহুর্তে যেখানে ভাষণ দিচ্ছেন খলিল। জনগণের প্রতি তার সকল কর্তব্যের কথা নিপুণ ভঙিমায় পালনের ওয়াদা করছেন। লোকজনের ওসবে মন নেই। না আছে কান। এই চকচকে রোদের মধ্যেও তারা বিশেষ মুহুর্তের অপেক্ষায়। ইকবাল গিয়ে ধূসরের পাশের চেয়ারে বসল। জিগেস করল,

‘ কী রে ব্যাটা,ভাষণ দিবিনা?’

‘ না।’

‘কেন? এই তুই না সভাপতি? ‘

‘ তো? একবার সবার চেহারা দ্যাখ,কী বিরক্ত এরা! পারলে খলিল ভাইকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলত। যেখানে এসেছে জামাকাপড় আর খাবার নিতে,এসব অহেতুক বকবক শুনবেই বা কেন? ‘

ইকবাল মাথা ঝাঁকাল, ‘ তাও ঠিক।’

ওদের কথার মধ্যেই একটা রিক্সা এসে ভীড়ল। ভাড়া চুকিয়ে নামল মারিয়া। মাকে সাবধানে ধরে নামাল। ওদের দেখেই ইকবাল বলল,

‘ মারিয়া না?’

ধূসর উঠে বলল, ‘ আয়।’

পেছনে চলল ইকবাল। রোজিনাকে দেখেই দুজন সালাম দিলো। তিনি শুভ্র হাসলেন। শুধালেন,

‘ ভালো আছো তোমরা?’

‘ জি আন্টি। আসতে অসুবিধে হয়নি তো?’

‘ না না।’

ইকবাল রাস্তা দেখাল,’ আসুন।’

মারিয়া আর রোজিনা থমকাল যখন স্টেজের টেবিলের ওপর রওনাকের ফ্রেমবন্দী ছবিটা দেখতে পায়। মেয়েটা বিস্ময়ে হা করে চাইল ওদের দিক। ধুসর বলল,

‘ রওনাক আমাদের বন্ধু ছিল। একটা ভালো কাজে ওকে না রাখলে চলে? ‘

মারিয়ার চোখ টলটলে হলো নিমিষে। সে নিজেকে সামলালেও, রোজিনা কেঁ*দে ফেললেন।

ইকবাল এসে আকড়ে ধরল ওনাকে। সান্ত্বনা দিলো,

‘ আন্টি প্লিজ কাঁদবেন না। আপনার এক ছেলে নেইতো কী? আমরা আছিনা?’

সেই সময় সিকদার বাড়ির পরিচিত গাড়িগুলো দেখা যায়। একে একে তিনটে গাড়ি এসে থামল গেটে। ততক্ষনে খলিল বক্তব্য শেষ করেছেন। একটা লম্বা বিশাল বক্তৃতার ইতি টেনেছেন সংক্ষিপ্ত ভূষণের মাধ্যমে। সোহাল মাইক্রোফোনের সামনে আসে। বিক্ষিপ্ত,এলোমেলো হয়ে দাঁড়ানো,হৈচৈ বাধানো লোকদের শান্ত হতে বলে।

আমজাদ নেমে এলেন। পুরো পরিবার নামল তার। ধূসরের হাসি বিস্তৃত হলো৷ আজ তিন বছরে প্রথম বার নিজের কাজে,পরিবার,পরিজনদের দেখে বুক জুড়াচ্ছে তার। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ হলো।

খলিল নিজে এগিয়ে এলেন ওদের সাদরে নিয়ে যেতে। যেঁচে এসে হাত মেলালেন আমজাদ,আফতাব আনিসের সঙ্গে। সাদিফ চশমা ঠিকঠাক করে আশেপাশে চাইতেই মারিয়ার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। মেয়েটা ওর দিকে মুগ্ধ বনে চেয়েছিল। হঠাৎ সাদিফ তাকাবে বোঝেনি। লজ্জা আর থতমত খেয়ে তৎপর দৃষ্টি সরাল সে। সাদিফ এসব বুঝল কী না কে জানে! সে ওকে দেখে অবাক হয়েছে। চোখে- মুখে বিস্ময়ের রেশ। তারপর ঝকঝকে হেসে এগিয়ে এলো কাছে।

মারিয়া ভাবল ওর সাথে কথা বলবে, হাই -হ্যালো কিছু একটা। কিন্তু সাদিফ ওরই পাশে দাঁড়িয়ে, ওকে সম্পূর্ন অবজ্ঞা করে, রোজিনা কে বলল,

‘আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন? আপনি এখানে আসবেন, আমি কিন্তু একদমই জানতাম না।’

মারিয়া মুখ টা বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষনাৎ। মনে মনে নারাজ হলো। এমন ভাব করল যেন ওকে দ্যাখেওনি।

‘ অলাইকুম সালাম বাবা! ধূসর ওরা খবর পাঠাল কাল। তোমরা আসবে আমিও জানতাম না। ‘

‘ ভালোই হলো,দেখা হয়ে গেল এই সুযোগে।’

এর মধ্যে সোহেল এসে বলল,

‘ আন্টি আপনি আমার সাথে আসুন।’

‘ কোথায় বাবা?

‘ ভেতরে সবার বসার ব্যবস্থা করেছি,আসুন। ‘

রোজিনা মাথা দোলালেন৷ হাঁটাও ধরলেন সোহেলের পেছনে। মারিয়া দ্বিধাদ্বন্দে ভুগল। সাদিফ তো কথা বলছেনা। সে কী দাঁড়িয়ে থাকবে? যেই মাকে অনুসরন করতে গেল সাদিফ ওমনি একলাফে পথরোধ করে দাঁড়াল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

‘ আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

‘ মা…’

‘ মা কী? ‘

‘ একা তো।’

‘ তাতে কী? আপনার মায়ের সাথে আমার মায়েদের আলাপ হলে দেখবেন আপনাকে আর চিনবেইনা। আমার চার মা এমন জাদু জানেনা! হা হা। ‘

সাদিফ হাসল। গর্বের হাসি। মারিয়া চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ গলায় উদ্বেগ ঢেলে বলল সাদিফ,

‘ এই আপনি জানেন,আমি মামা হচ্ছি।’

বলার সময় ওর সাদাটে চেহারা আরেকটু ঝলকাতে দেখা যায়। মারিয়া আন্দাজ করে বলল,

‘ কে? পুষ্প…!’

‘ ইয়াপ।’

মারিয়া উচ্ছ্বল কণ্ঠে বলল, ‘ সত্যি?’

সেইসাথে চোখে চোখে পুষ্প আর ইকবালকে খুঁজল সে। একটা শুভকামনা তো জানাতে হবে।

সাদিফ নেত্রযূগল নাঁচাতে নাঁচাতে বলল,

‘ ইকবাল ভাই কী ফাস্ট দেখেছেন? বউ বাপের বাড়ি না রাখার কী অনবদ্য ফন্দি! এমন মানুষের জন্যেই রাজনীতি পার্ফেক্ট। ‘

মারিয়া অপ্রতিভ ভঙিতে মাথা দোলাল। সহমত পোষণ করলেও, কোথাও গিয়ে লজ্জা লাগছে ওর।

সাদিফ ফের বলল,

‘ ইকবাল ভাইতো পারলে এখনই পুষ্পটাকে মাথায় তুলে রাখে। সিড়ি দিয়ে ওঠাচ্ছে ধরে, নামাচ্ছেও ধরে। নীচে নামতেই দিচ্ছেনা বেশি। খাবার খেতে গেলে মরিচটাও বেছে দিচ্ছে। আমার বোন কিন্তু দারুণ লাকি ম্যালেরিয়া! হা হা হা। ‘

সাদিফ আবার হাসল। ফুলের মত পবিত্র দেখাল তার মুখবিবর। যেন জটিলতা,কুটিলতা জানেইনা। মারিয়া বিমুগ্ধ নেত্রে অনিমেষ চেয়ে রইল ওর দিকে। সাদিফ আচমকা হাসি কমিয়ে, শান্ত স্বরে বলল,

‘ অবাক লাগছে তাইনা? সদ্য ছ্যাকা খাওয়া ছেলের মুখে এত হাসি দেখে?’

মারিয়ার মুখভঙ্গি বদলে গেল। ত্রস্ত বলতে নিলো,

‘ না না, আমি তো…’

সাদিফ মধ্যখানে কথা কেড়ে নেয়। ভেজা স্বরে বলে ,

‘ আসলে আমি ভালো থাকতে চাইছি ম্যালেরিয়া। হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে চাইছি পিউকে। ও ধূসর ভাইয়ের বউ হবে,ওকে নিয়ে আদৌ কিছু ভাবলেও আমার অস্বস্তি হচ্ছে। তাই হেসে হেসে নিজের অভিপ্রায় লুকিয়ে চেষ্টা করছি আনন্দে থাকার। কী, পারব না?’

মারিয়া বলল, ‘ কেন পারবেন না? ভালো মানুষ রা খারাপ থাকতেই পারেনা।’

‘ আমি ভালো? ‘

‘ অবশ্যই। ‘

সাদিফ সন্দিহান কণ্ঠে বলল,

‘ কিন্তু কে যেন একদিন বলেছিল আমার মত অস*ভ্য,খারাপ ছেলে দুটো দেখেনি?’

মারিয়া নাক ফোলাল,

‘ আপনি এখনও পুরোনো কথা নিয়ে পড়ে আছেন?’

সাদিফ হেসে উঠল। প্রস্তাব রাখল,

‘ চলুন চা খেয়ে আসি।’

‘ এখন?’

‘ আরে আসুন তো।’

নিজেই হাত ধরে টেনে চলল সাদিফ। মারিয়া পা মেলাতে মেলাতে মৃদূ হাসল। ওর মুঠোয় থাকা স্বীয় হাতের দিক চেয়ে ভাবল’ যদি এইভাবে আমাকে সাথে নিয়ে চলার পথটা দীর্ঘ করতেন,খুব কী মন্দ হয় সাদিফ?

*******

পিউ মহা মুসিবতে পড়েছে। এখানকার একেকটা দামড়া দামড়া ছেলে তাকে ভাবি বলে ডাকছে। যাকে বলে ডেকে মুখে ফ্যানা তুলে ফ্যালা। আপনি -আজ্ঞে করছে। দিচ্ছে প্রচুর প্রচুর সম্মান। এই যে সে ভেতরে মা চাচীদের মধ্যে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিল,কোত্থেকে এক ছেলে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে ছুটে এসেছে। ধড়ফড়িয়ে বলছে,

‘ ভাবি আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এই নিন বসুন।’

পিউ অত্যাশ্চর্য হয়ে চেয়েছিল। ছেলেটা নিঃসন্দেহে ওকে তুলে দশ-বিশটা আছা*ড় মা*রতে পারবে। এমন হাট্টাগাট্টা ছেলে আপনি করে বলছে,এত ইজ্জত দেয়ায় ছোট্ট মেয়েটা অস্বস্তিতে গাঁট।

‘ কী হলো ভাবি, বসুন।’

পিউ দোনামনা করে চেয়ারে বসল।

আফতাব, আনিস পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেটি আবার বলল,

‘ ভাবি কিছু লাগবে? কোক,বা ঠান্ডা পানি?’

পিউ বলার আগেই আফতাব ধমকে বললেন,

‘ এই ছেলে,তুমি ওকে ভাবি ডাকছো কেন? আমাদের মেয়ের ত বিয়েই হয়নি।’

পিউ ভ*য়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল আবার। আফতাব যে ধূসরের বাবা ছেলেটা জানে। একটুও না ঘাবড়ে,পিউয়ের দিক চেয়ে অবাক হয়ে বলল,

‘ এ বাবা! আপু আপনার বিয়ে হয়নি?’

পিউ দুপাশে মাথা নাড়ল। ছেলেটা জ্বিভ কে*টে বলল,

‘ সরি আপু,আমি ভেবেছিলাম আপনি ইকবাল ভাইয়ের বউ। সত্যিই সরি! সরি আঙ্কেল!’

আফতাব ভ্রু কুঁচকে রইলেন। ছেলেটা জোর করে হেসে চলে গেল। এপাশে এসে মুখ ফুলিয়ে শ্বাস নিলো। একটুর জন্য বেচে গিয়েছে।

ওর যাওয়ার দিক চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল পিউ। কী সুন্দর এরা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে! তাকে যে কার জন্য ভাবি ডাকা হচ্ছে সে কী আর জানেনা?

‘ পিউ মা,তুমি এই গরমের মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে তোমার মায়েদের সাথে গিয়ে বোসো। ‘

পিউ মিনমিন করে বলল,

‘ এখানে ভালো লাগছে চাচ্চু। একটু থেকেই চলে যাব।’

‘ আচ্ছা,চলো আনিস।’

ওনারা চলে গেলেন। পিউ ওড়না আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে চারপাশে তাকাল। অত মানুষের ভিড়ে ধূসর ভাইকে খুঁজে পেল না। এখানে আসা থেকে মানুষটা একবারও ওর দিকে তাকায়নি। কথা বলা তো দূর। যেন চেনেইনা ও কে! উনি কি খুব রে*গে আছেন? সে এই দুদিন সামনে যায়নি বলে অভিমান করেছেন?

কথা বন্ধ করে দেবেন না তো আবার?

পিউ শঙ্কিত হলো। ব্যকুল চোখ তখনও ধূসরের খোঁজে। অথচ সে মানুষটা সদ্য এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। পিউ খেয়াল করেনি। গলা উঁচিয়ে উঁচিয়ে ভিড় দেখছে সে। যদি ওনাকে দেখা যায়! শেষে ক্লান্ত হয়ে ঠিকঠাক হলো। বিড়বিড় করে বলল,

‘ রাগ করেছেন ধূসর ভাই? নিজেই চুমু খেয়ে লজ্জায় ফেলে নিজেই রাগ করছেন? ঠিক আছে করুন। আমারও রা*গ আছে। সাইজে ছোট হলে কী হবে? আমার রা*গ আপনার থেকেও বড়।’

তারপর মুখ বেকিয়ে ঘুরতেই মুখোমুখি হলো ধূসরের। হকচকিয়ে পিছিয়ে গেল পিউ। সংঘ*র্ষ

হতে হতেও হলো না।

ধূসর চোখ সরু করল। কপালের মাঝে প্রগাঢ় ভাঁজ। পিউ ভাবল কিছু বলবে। এই যে সে এতক্ষন বিড়বিড় করেছে,শুনতে পেয়েছে নির্ঘাত। এ নিয়ে হলেও একটা ধমক তো প্রাপ্য। ধূসর এক পা এগোতেই পিউয়ের বুক ধুকপুক করে ওঠে। ভীত লোঁচনে চারদিকে তাকায়। বাবা,চাচ্চুরা কেউ দেখে ফেললে!

ধূসর একটু এগিয়ে থামল। চোখ দুটো তখনও সরু। আচমকা মুখ ঘুরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ঘটনাক্রমে পিউ ভ্যাবাচেকা খায়,হতভম্ব হয়। হা করে চেয়ে থেকে চোখ পিটপিট করল। এটা কী হলো? কোন ধরনের ইগনোর এটা?

****

সাদিফের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। রোজিনা, জবা বেগমদের পেয়ে দুনিয়া ভুলে গিয়েছেন। আমুদে গল্পে মজেছেন সকলে।

পুষ্প সেখানে একা একা বসে। গুরুজন দের আলাপে সে মজা পাচ্ছেনা। বিরক্ত ও লাগছে এমন বসে থেকে। পিউটা যে কোথায়?

এর মধ্যে ইকবাল ঢুকল সেখানে। সোজা ওর কাছে এসে বলল,

‘ মাই লাভ, জুস খাবে? বেশি করে আইস দিয়ে নিয়ে আসব?’

পুষ্প মাথা নাড়ল। ইকবাল বলল, ‘ তাহলে কোক?’

‘ উহু?’

‘ তাহলে কী খাবে?’

‘ কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছেনা ইকবাল।’

ইকবাল চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

‘ কেন মাই লাভ! শরীর খা*রাপ করছে? মাথা ঘুরছে আবার? বমি পাচ্ছেনা তো!’

ওর উদ্বীগ্নতা দেখে হেসে ফেলল পুষ্প। হাতটা মুঠোত ধরে বলল,’ আমি একদম ঠিক আছি। তুমি আমার পাশে থাকো, তাহলে দেখবে সম্পূর্নটাই ঠিক থাকব।’

ইকবাল আ*হত স্বরে বলল, ‘ এটাই তো এখন পারছিনা মাই লাভ। আরেকটু পরেই জামাকাপড় বিতরণ শুরু হবে। আমাকে যে থাকতে হবে সেখানে।’

‘ তাহলে এখন একটু কাছে থাকো আমার।’

পিউ ধপ করে পুষ্পর পাশের চেয়ারে বসে পড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ বাবাহ! কত প্রেম এদের! দেখতে দেখতে অন্ধ না হয়ে যাই।’

পুষ্প মাথায় একটা চাঁটি বসাল ওমনি। ইকবাল টেনে টেনে বলল,

‘ আমরাও তো কত লোকের কত কি দেখছি আজকাল। কই,আমরা তো অন্ধ হয়ে যাইনি পিউপিউ! দিব্যি সুস্থ, দ্যাখো।’

পিউ ঘাবড়ে গেল। ইকবাল ভাই কী দেখার কথা বললেন? ওইদিন ধূসর ভাই যে ওকে চুমু খেয়েছেন, সেটা দেখে নেয়নি তো আবার? সে তুঁতলে শুধাল,

‘ ককী ককী দেখেছেন আপনি? ‘

‘ দেখেছি তো অনেক কিছু। ওসব হলো গোপন কথা। ওসব কী আর বলা যায়?’

এক ছেলে এলো তখন,জানাল, ‘ ধূসর ভাই ডাকছেন।’

ইকবাল হাসতে হাসতে হেলেদুলে চলে গেল। কিন্তু পিউ পড়ল মহা দুশ্চিন্তায়। সত্যিই যদি ওই সময় ইকবাল ভাই কিছু দেখে নেয়? ইশ,কী লজ্জার ব্যাপার-স্যাপার।

পিউ, পুষ্পর দিক একটু এগিয়ে বসে বলল,

‘ এই আপু,ভাইয়া কীসের কথা বলেছেন?’

পুষ্প জানে, ইকবাল পিউয়ের জন্মদিনের কথা বলেছে। সেই ধূসরের সঙ্গে তার মাখোমাখো প্রেম চিত্রের ইঙ্গিত। অথচ না জানার ভাণ করে বলল,

‘ আমি কীভাবে জানব? ওই জানে ও কি বলেছে!’

পরপর বলল,

‘ তুই ওর কথা ধরছিস কেন বলতো,জানিসই তো ও কেমন। দশটার মধ্যে নয়টা কথাই ফাজলামো করে। ‘

পিউ মাথা ঝাঁকাল। কথা সত্যি। কিন্তু তাও খচখচানিটা দূর হলো না।

****

দুটো ধোঁয়া ছোটা গরম গরম চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে এলো সাদিফ। মারিয়া দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের এপাশে। সে এসে একটা ওকে দিলো। মারিয়া সহাস্যে কাপ নেয়। সাদিফের সাথে চা খাওয়ার এই মুহুর্তটা সবথেকে রঙীন লাগে ওর৷ ভীষণ চায়,সময়টা আস্তে কাটুক। কাপের চা দেরীতে ফুরাক। আরেকটু পাশাপাশি থাকুক সাদিফ। মারিয়া চোখ আগলে দেখুক ওর সৌম্যদর্শিত মুখশ্রী।

মাইক্রোফোনে ইকবালের আওয়াজ ভেসে আসছে। সবাইকে লাইনে দাঁড়াতে বলছে ও। এক্ষুনি কাপড় বিতরণের আশ্বাস দিচ্ছে শুনে সাদিফ ব্যস্ত গলায় বলল,

‘ প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছে বোধ হয়। তাড়াতাড়ি খান।’

মারিয়া ঠোঁট উলটে চুপ করে থাকল। সে যে ইচ্ছে করে দেরী করতে চেয়েছিল তা আর হচ্ছেনা।

সাদিফ ব্যস্ত ভাবে কাপে চুমুক বসাতেই উষ্ণতায় জ্বিভ পু*ড়ে গেল।

‘ ওহো’ বলে কাপ সরিয়ে নিলো সে৷ এইটুকুতেই যেন আঘাত পেলো মারিয়া। শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এলো সে। উদগ্রীব হয়ে বলল,

‘ কী হয়েছে? দেখি,জ্বিভ পু*ড়েছে? সাবধানে খাবেন তো।’

সাদিফ শীতল চোখে চাইল। মারিয়ার চেহারায় অনুচিন্তনের গাঢ় চিহ্ন। সে আস্তে করে বলল,

‘ আ’ম অলরাইট।’

সম্বিৎ ফিরল মারিয়ার। উত্তেজনায় ও যে সাদিফের অনেকটা কাছে চলে গিয়েছে খেয়াল হলো এখন। তক্ষুনি সরে এলো । তাকাতেই পারল না লজ্জায়। আরেকদিক মুখ ফিরিয়ে চায়ে মনোযোগ দেওয়ার ভাণ করল। সাদিফ প্রসঙ্গ তুলল না। চুপচাপ কাপের কোনায় চুমুক বসাল সে। অথচ ঠোঁটে রইল মিটিমিটি হাসি।

********

বিশাল বিশাল লাইন বেধেছে। এই এলাকায় যে এত দুঃস্থ মানুষ থাকে এখানে না এলে জানতোই না পিউ।

এদিকে কতগুলো ছোট ছোট টেবিল বসানো হয়েছে লাইনের এপাশে। তার ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাপড়। লুঙ্গি,সুতির শাড়ি আর পাঞ্জাবি। এত মানুষের মধ্যে একজন দুজনের বিলানো তো সম্ভব নয়। সময় সাপেক্ষ বেশ। তাই ভাগ ভাগ করে প্রত্যেকটি টেবিলে জামাকাপড় রাখা হলো। প্রতি টেবিলের কাপড় বন্টনের দায়িত্বে থাকবে একজন করে । মোট চারটে সাড়ি বানানো হয়েছে তাই। ধূসর,ইকবাল,খলিল আর সোহেল বিলাবে। সোহেল যুগ্ম আহ্বায়ক কী না!

লাইন থেকে একেকজন আসবে আর ওরা সহাস্যে তুলে দেবে এসব। সেই লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে আবার অনেকে। মৃনাল ও আছে। পিউকে যে চেয়ার দিয়ে গেল,সেও আছে। কোনও রকম কোনও বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবেইনা আজ।

খলিল এসে দাঁড়ালেন। তার পাশে একজন সহযোগী আছে,যিনি সব হাতের কাছে এগিয়ে দেবেন,আর তিনি তুলে দেবেন মানুষের হাতে৷ এরপর ইকবাল দাঁড়াবে, তারপর সোহেল। এরপরের সাড়িতে ধূসর দাঁড়াবে। খলিলের ওপাশটায় দুজন দাঁড়াবে তেহারির প্যাকেট বিলাতে।

বাড়ির রমনীরাও বেরিয়ে এলেন । ভালো জিনিস দেখতেও ভালো লাগে।

আমজাদ সিকদার পেছনে দুহাত বেধে কেবল এসে দাঁড়িয়েছেন। এত এত মানুষকে সাহায্য করার বিষয়টা বেশ লাগছে ওনার। হঠাৎই ধূসর কাছে এসে বলল,

‘ আসুন বড় আব্বু।’

উনি বুঝতে না পেরে বললেন ‘ কোথায়?’

‘ আসুন,বলছি।’

ধূসর অপেক্ষায় রইল না। নিজেই পরিবারের মধ্য থেকে আমজাদকে টেনে নিয়ে গেল। বাকীরা তাকিয়ে রইল কৌতুহল নিয়ে।

ধূসর এসেই তার সাড়িতে আমজাদ কে দাঁড় করাল। বলল,’ আপনি দিন।’

আমজাদ আশ্চর্য বনে বললেন, ‘ আমি?’

‘ হ্যাঁ। আপনি। ‘

আফতাব হাসলেন। আমজাদ তখনও স্তব্ধ হয়ে চেয়ে। ধূসর তাগাদা দিল,

‘ সবাই অপেক্ষা করছে বড় আব্বু, দিন! ‘

আমজাদ আপ্লুত নজর ফিরিয়ে এনে সামনে চাইলেন। অসহায় এক মানুষের দুহাতের আজোলে তুলে দিলেন পোশাকটি। তিনি পুলকিত হাসলেন,চলে গেলেন। এমন করে একেকজন এলো।

ইকবাল রোজিনাকে আগেই তার জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনিও একইরকম বিস্মিত। এটা অবশ্য ওদের পূর্ব পরিকল্পিতই। কিন্তু ধূসর যে এইভাবে মাঝখানে হিটলার শ্বশুর কে আনবে এটা ত জানা ছিল না।

পরিবারের সবাই চেহারা ঝলমলে । ধূসর তুলে দিচ্ছে আমজাদের হাতে,আমজাদ দিচ্ছেন লাইনে থাকা মানুষদের। দৃশ্যটি এত চমৎকার যে,আনিস ফোন বের করে অসংখ্য ছবি তুলে ফেলেছেন। আমজাদের ঠোঁটে হাসি। এই যে একেকজন কাপড় পেয়ে আনন্দিত হচ্ছে,এই চিত্র দেখেও চোখ জুড়ায়। এক সময় এক বৃদ্ধা নারী অগ্রসর হলেন। হাতে লাঠি ওনার। কুঁজো হয়ে ভর দিয়েছেন তাতে। ধূসর ওনাকে দেখেই বেছে বেছে একটা ভালো কাপড় আমজাদের দিক এগিয়ে দিলো। আমজাদ পৌঢ়ার হাতে দিলেন হেসে। নারীটি বুকের সাথে চেপে ধরলেন কাপড়টা। সাথে, এক ধাপ এগিয়ে আমজাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে দোয়া করলেন। খানিকক্ষনের জন্য থমকে রইলেন আমজাদ। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলেন ওনার প্রস্থান পথে। সিকদার বাড়ির কর্ণধার তিনি। উনিই সবার বড়। এক কথায় সবার ছায়া। অথচ ওনার ছায়া কেউ নেই। কতদিন পর কেউ একজন মাথায় হাত রাখল কে জানে! মা এখন বেচে থাকলে এরকম বয়সী হতোনা?

আমজাদের নেত্রযূগল আজকেও ছলছলে হলো। তবে সামনে অপেক্ষমান লোকটিকে দেখে তৎপর ধাতস্থ হলেন। ওষ্ঠপুটে ফের হাসি এনে লেগে পড়লেন কাজে।

মারিয়া ঠোঁট চেপে কা*ন্না আটকাচ্ছে। রোজিনা সবাইকে কাপড় দিচ্ছেন, পাশেই তার মৃত ভাইয়ের ছবি। সে অপলক চেয়ে দেখছে সেই দৃশ্য। তখন মুখের সামনে ধবধবে রুমাল এগিয়ে ধরলো সাদিফ। মারিয়া ভেজা চোখে চাইলে বলল,

‘ আপনার চোখে জল বেমানান লাগছে ম্যালেরিয়া! প্লিজ…..!’

মারিয়া ওর দিক চেয়ে থেকে রুমাল নেয়। চোখ মোছে আলগোছে। সাদিফ বলল,

‘ আপনি ইদানীং ছিঁচকাঁদুনে হয়ে যাচ্ছেন। ‘

‘ ছিঁচকাঁদুনে!’

‘ হ্যাঁ,কথায় কথায় কাঁদলে এটাইত বলে।’

মারিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

‘ আমার জায়গায় থাকলে বুঝতেন। আপনি আরো কাঁদতেন তখন।’

সাদিফের কণ্ঠস্বর পালটে এলো হঠাৎ। শুধাল,

‘ আর আমার জায়গায় থাকলে? আপনি কী করতেন ম্যালেরিয়া?’

মারিয়া মুখ কালো করে ফেলল। পরপর নীচের দিক চেয়ে এক পেশে হাসল। ভাবল,

‘ আমিত অনেক আগেই আপনার জায়গায় আছি সাদিফ। দুজনেই স্বীয় স্থানে ভালোবেসে ব্যর্থ। আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনা বলেই যে,এমন নীরব ভালোবেসে নিজের হৃদয়কে আঘাত করছি। ‘

পিউ খুব মনোযোগ দিয়ে খলিলকে দেখছে। সে বড় গভীর প্রণিধান! মাঝেমধ্যে পল্লব ঝাপ্টাচ্ছে। ইকবাল বিষয়টা খেয়াল করল অনেকক্ষন। কাজ শেষে এসে পাশে দাঁড়িয়ে শুধাল,

‘ এভাবে কী দেখছো পিউপিউ? ‘

মেয়েটা খানিক নড়ে ওঠে। ধ্যানে ভাঁটা পরেছে। তারপর দুনিয়ার সব চিন্তা কণ্ঠে ঢেলে বলল,

‘ এই রোদের মধ্যে আপনাদের টাকলা মেয়র টাকে কেন বের করেছেন ভাইয়া? ওনার টাক-টা যদি ফেটে যায়,তখন?’

ইকবাল জ্বিভ কে*টে বলল, ‘ আরে আস্তে, শুনতে পাবে।’

পিউ ফিসফিস করে বলল, ‘ সরি সরি! ‘

কিন্তু কথাটা ততক্ষনে খলিলের কানে পৌঁছে গিয়েছে। কে বলেছে শোনার জন্য পেছনে আর তাকালেন না। মান ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে না? কিন্তু নিরস মুখে, হাতটা একবার টাকে বোলালেন। বয়স খুব বেশি নয়,কিন্তু এই চুল অকালে পড়ার চিন্তায় সে নিজেও কাহিল। তাই বলে এই মেয়ে টাকলা মেয়ের নাম দিলো? এই নাম এখন বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে গেলে কী হবে? পুরো জেলা তাকে টাকলা মেয়র ডাকবে? খলিল তাড়াহুড়ো করে এক ছেলেকে ডাকলেন। বললেন,

‘ আমাকে একটা টুপি বা ক্যাপ জোগাড় করে দাওত।’

_____

ভরা, লোক পরিপূর্ণ মাঠ এখন শূন্য। চেয়ার -টেবিল গোছানো হচ্ছে।

ধূসরদের পরিবারের জন্য খাওয়া দাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। খলিল ও আছেন সেখানে।

ধূসর খাওয়া শেষ করে বাইরে এলো। হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা এখানেই। ইকবাল ঢুকছিল। ওকে দেখে দাঁড়িয়ে, দাঁত মেলে হেহে করে হাসল সে। ধূসর কপাল কুঁচকে বলল,

‘ আবার কী হয়েছে?’

ইকবাল একবার সতর্ক ভাবে ভেতরের দিকটা দেখে নেয়। না,কেউ আসছে না। তারপর বাহবা দিয়ে বলে,

‘ ভাই কী বুদ্ধি রে তোর! এখন থেকেই শ্বশুর কে পটানোর সমস্ত বন্দোবস্ত করে ফেলছিস? আর যেই রকেটের গতিতে এগোচ্ছিস, হিটলার শ্বশুর এইবার তোকে মেয়ে দেবে কনফার্ম। ‘

ধূসর চোখ ছোট করে বলল,

‘ তোকে কে বলল আমি ওনাকে পটানোর জন্যে এসব করছি? আমি যা করেছি মন থেকে।’

ইকবাল মানল না,

‘ এহ,বললেই হলো। মন থেকে করলে আঙ্কেলকে দাঁড় করালি না কেন? ওনাকেই কেন করালি?’

‘ কারণ,বাবার জন্য বড় আব্বু আছে। ওনার জন্য কেউ নেই। সারাজীবন সবার অভিবাবক হতে গিয়ে উনিতো কিছু পাননি। তাই…’

ইকবাল কথা টেনে নিয়ে বলল,

‘ তাই তুমি চেষ্টা করছো ওনার অভিবাবক হতে? শোন ধূসর,এসব না অন্য কাউকে বলিস। আমি অন্তত শুনছিনা। তুই যে পিউকে পাওয়ার জন্য এসব করছিস আমি জানি।’

‘ পিউকে পাওয়ার জন্য আমার কারো মন জেতার দরকার নেই। আমার জিনিস আমি জোর করে হলেও,নিজের কাছে রেখে দিতে জানি।’

সুদৃঢ় কন্ঠ ধূসরের। ইকবাল তাও মাথা দুপাশে ঝাঁকিয়ে বলল,

‘ না না, বললেই হলো? আমি যা বোঝার বুঝে গেছি।’

ধূসর অতিষ্ঠ ভঙিতে মাথা নাড়ল। বুঝল এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে এসে ট্যাপ ছাড়ল। ইকবাল থেমে থাকল না৷ কাছে এসে কণ্ঠ শৃঙ্গে তুলে বলল,

‘ আমি ভাবতেও পারছিনা,একটা মানুষের মাথায় এত ঘিলু কোথায় থাকে? আমাকেও একটু ধার দিতি ধূসর। পুষ্পটাকে বিয়ে করার আগে এপ্লাই করতে পারতাম। ‘

ধূসর বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ তুই থামবি ইকবাল?

‘ না।’

‘ কত টাকা নিবি থামতে?’

ইকবাল এমন ভাবে তাকাল যেন ভীষণ অপমানিত হয়েছে । টেনে টেনে বলল,

‘ টাকা দিয়ে আমার কথা কেনার চেষ্টা করবেন না সিকদার সাহেব। আমি গরিব হতে পারি,কিন্তু ছোটলোক নই।’

ধূসর চোখ-মুখ কোঁচকাল।

‘ ছ্যাবলানোর একটা সীমা থাকে। পুষ্পটা যে কী দেখে তোর প্রেমে পড়েছিল হু নোস।’

ইকবাল দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

‘ নিজের থেকে সিনিয়র একজন কে এত বড় অপমান? ‘

‘ সিনিয়র! ‘

‘ তাহলে? তুই এখনও অবিবাহিত। আর আমি? আমি এক বাচ্চার বাপ হচ্ছি। পজিশনে কে এগিয়ে?’

ধূসর মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরল। ওর সাথে থাকলে তার পাগল হতে দেরী নেই।

ইকবাল গম্ভীর চোখে ধূসরের যাওয়া দেখে ফিরতেই পিউ সামনে পড়ল। প্লেটের খাবার এক প্রকার যুদ্ধ করে শেষ করলো মেয়েটা। অথচ যার জন্য এত তাড়াহুড়ো করে এসছে,সে কোথায়?

পিউ ব্যগ্র লোঁচনে এদিক -ওদিক চাইল। ইকবালের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে তাকাল। বলল,

‘ কী হয়েছে?’

‘ ভাবছি।’

‘ কী ভাবছেন ? ‘

‘ হু? না মানে ধূসর একটা কথা বলে গেল তো, সেটাই ভাবছি।’

পিউ আগ্রহভরে চায়,’ কী কথা ভাইয়া? ‘

ইকবাল মস্তক দুলিয়ে দুলিয়ে বলল,

‘ ওই,বলছিল যে,তোমাকে আজ এত্ত সুন্দর লাগছে! ওর ইচ্ছে করছে এখান থেকেই সোজা কাজী অফিসে চলে যেতে। ‘

পিউ প্রথমে ভ্রু গোটাল। তারপর ভেঙচি কে*টে বলল

‘ মিথ্যুক।’

সেও চলে গেল।

ইকবাল ঠোঁট উল্টে বলল,

‘ যা বাবা! মিয়া-বিবি কেউই বিশ্বাস করেনা আমায়। সত্যি! জগতে ভালো মানুষের কোনও দামই নেই।’

পিউ ভেজা হাত ওড়নায় মুছল। ধূসরকে তখনও পেলো না। ফিরে আসতে নিয়ে হঠাৎ থামল,ঘুরে চাইল। ওইত সে। কথা বলছেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। চওড়া পিঠ এদিকে ফিরে৷ পিউ ছুটে যায়। ওকে আসতে দেখে সামনের ছেলেটি ধূসরকে ইশারা করে দেখাল। ঘুরে চাইল সে। ছেলেটি চলে গেছে। পিউ এসে সামনে দাঁড়িয়ে, বলল,

‘ আপনাকেই খুঁজছিলাম।’

ধূসর বক্ষপটে হাত বেধে দাঁড়াল। কথা বলল না,কারণ ও জিজ্ঞেস করল না দেখে পিউ মুখ ছোট করে বলল,

‘ আপনি কি আমার ওপর সত্যিই রেগে আছেন ধূসর ভাই?’

ধূসর উত্তর দিলো না। পাশ কাটাতে গেলেই পিউ হাত টেনে ধরল ত্রস্ত। ধূসর ঠোঁট কাম*ড়ে শব্দহীন হাসে। অথচ ফিরে চায়,ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখে। পিউ কাঁদো-কাঁদো কণ্ঠে বলল,

‘ সরি!’

ধূসর নিরুত্তর। পাত্তাই দিলো না এমন ভঙিতে আরেকদিক তাকাতেই পিউ হাতটা ঝাঁকিয়ে বলল,

‘ সরি বললাম তো। আর রেগে থাকবেন না প্লিজ!’

ধূসর তাকাল। চোখমুখ পাথরের ন্যায় রেখেই বলল,

‘ তো কী করব? কিছু বলতে গেলে কাঁপা-কাঁপি করিস। কিছু করতে এলে ছুটে পালিয়ে যাস। সামনেই আসিস না। এর থেকে চুপ থাকা ভালো না?’

পিউ সংকীর্ণ করল আঁদল। মাথা নামিয়ে বলল,

‘ আমি কি ইচ্ছে করে এমন করি? আগে কি কখনও প্রেম করেছি? অভ্যেস নেই বলেইত এমন হয়। ছোট মানুষ, একটুত ভুল হবেই। আপনি বুঝি তা শুধরে না দিয়ে, আরেকদিক মুখ ফিরিয়ে থাকবেন?’

ধূসর অবাক হওয়ার ভাণ করে বলল,

‘ ছোট মানুষ? কথা শুনে তো মনে হলোনা তুই ছোট।’

পিউ অসহায় মুখ করে, চুপ থাকল। ধূসর নিজেই বলল,

‘ তুই বলতে চাইছিস ,আমি তোর সাথে প্রেম করছি?’

পিউ তাকাতেই সে ভ্রু নাঁচাল। মেয়েটা বোকা কণ্ঠে শুধাল,

‘ করছেন না?’

ধূসর এগিয়ে আসে আবার। দুরুত্ব ঘোচায়। পিউ স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা চালাল। ধূসরের লম্বা দেহটা নেমে আসে ওর চেহারার ওপর। কণ্ঠ খাদে এনে বলল,

‘ আমিতো তোকে প্রেমিকা বানাতে চাইনা পিউ। ডিরেক্ট আমার বউ বানাতে চাই। ‘

পিউয়ের বুক ধ্বক করে উঠল। লজ্জায় অস্থির ভঙিতে খাম*চে ধরল দুপাশের কামিচ। ধূসর গাঢ় চাউনী বোলাল ওর মুখশ্রীতে। এই কুণ্ঠায় আই-ঢাই করে ওঠা,আর ফুলতে থাকা দুটো র*ক্তাভ গাল, ওর কাছে সবথেকে ললিত মনে হয়। মনে হয় সর্বাধিক উপভোগ্য।

ধূসর গলার স্বর আরো নামিয়ে বলল,

‘ কিন্তু তুই এত নাছোড়বান্দা, এমন এমন কাজ করিস, যে আমি মাঝেমধ্যে নিয়ন্ত্রনে থাকতে পারিনা। এর প্রমাণ তো সেদিন দিলাম,আরো চাই?’

পিউ ঢোক গিলল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার । হীরকচূর্ণের ন্যায় ফোটা ফোটা ঘাম জমছে নাকে।

ভোরের প্রথম দীপ্তি যেমন স্নিগ্ধ, নির্মল, এক চমৎকার আদুরে কিরণে ঝলমলায়,ধূসরের কাছে ওকে ঠিক তেমন লাগছে এখন। ওর অবস্থা দেখে হেসে ফেলল সে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধ পেঁচিয়ে বলল

‘ চল।’

পিউয়ের কথা জড়িয়ে এলো,

‘ কককোথায়?

‘ যা ঘামছিস, আইসক্রিম কিনে দেই ।’

আফতাব স্তম্ভিত নেত্রে চেয়ে রইলেন ওদের যাওয়ার দিকে। কথাবার্তা কানে না গেলেও,এই চিত্রপটে ওনার বুঝতে বাকী নেই কিছু। ধূসর আর পিউয়ের মধ্যে কী চলছে ভাবতেই মস্তিষ্ক রুদ্ধ হয়ে এল। হাত পা বিবশ লাগছে আত*ঙ্কে। এর মানে ওইদিন ঠিক সন্দেহ করেছিলেন? কিন্তু, ধূসরের মত একটা বুদ্ধিমান ছেলে, এত বড় ভুল কীভাবে করল? ভালোবাসার জন্য কি পিউ ছাড়া কেউ ছিল না? এই কথা ভাইজান জানলে যে সর্ব*নাশ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে ওদের এতদিনের পরিবারটা।

আপনার মতামত শেয়ার করুন!

গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার চিন্তা, অনুভূতি বা প্রশ্ন নিচে জানান। লেখক আপনার মতামতের অপেক্ষায় আছেন!