সিজন 1 অধ্যায় 32 ট্র্যাজেডি মনস্তাত্ত্বিক #আত্মহত্যার চেষ্টা #জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ রিয়ানা রহমানআরিয়ানসাদাত খান রিয়ানআরিশা

মরিয়া সিদ্ধান্তের চরম পরিণতি

•18 মিনিট পড়া•2,786 শব্দ
মরিয়া সিদ্ধান্তের চরম পরিণতি

একটা অতি পুরানো গোডাউনের সামনে দাড়িয়ে আছি। চারদিকটা পুরো নিস্তব্ধ। দূর দুরান্ত পর্যন্ত কোন গাড়ি নেই। একদম মানব শূন্য।

প্রথমত এমন এক জায়গায় দেখে কিছুটা অবাক হই। কিন্তু তখন আমার মস্তিষ্ক বার বার এইটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে ” আমার রিয়ানে এক্সিডেন্ট হয়েছে। তাকে যে করেই হোক রিয়ানের কাছে যেতে হবে। ”

আমি সেই নাম্বারে আবার ফোন করি। ফোনটি ৩-৪ বার রিং হতেই ফোন রিসিভ করে। তারপর আমি বিচিলিত কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করি “রিয়ান কোথায়?” সে প্রতিউত্তরে বলে,

“গোডাউনের ভিতরে।” আর সাথে সাথে ফোনটি কেটে দেয়।

তখন আমার মাথায় শুধু রিয়ানই ঘুরছিল যার ফলস্বরূপ আমার মনে একবারের জন্যেও এই কথাটি মস্তিষ্কের তীর সীমানায় আসে নি যে, “রিয়ান এইখানে কি করতে এসেছিল? বা কেন এসেছিল?”

আমি ধীর পায়ে ভিতরের দিকে অগ্রসর হই। ভিতরটা আবছা অন্ধকারে ঘেরা। তার উপর নাকে বার বার কেমন এক উটকো গন্ধ এসে বারি খাচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছিল যে এই গোডাউনটি হয়তো বা অনেক দিন ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আমি এইসব তোক্কোয়া না করে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে ” রিয়ান, রিয়ান” বলে ডাকতে থাকি। কিন্তু প্রতিউত্তরে কোন সারাশব্দ পাই না। আমার এইবার ভয় করতে শুরু করে। তাও সাহস জুগিয়ে রিয়ানের নাম অনাবরত নিতে থাকি। তখনই চারদিকে লাইট জ্বলে উঠে। আমি এইবার আলো রশ্মি প্রতিফলিতর ফলে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলি। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুলতে শুরু করি। চোখ খুলে সামনে আরিয়ানকে দেখে চমকে যাই। আরিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বিশ্রী হাসি দিচ্ছে। যা আমার শরীরে কাটার মত বিদছে। কিন্তু তখনও আমার মাথায় শুধু রিয়ানই ঘুরছিল তাই আমি আরিয়ানের মুখভঙ্গি এড়িয়ে তার উপর প্রশ্ন ছুঁড়ে মারি,

.

— রিয়ান কোথায়? রিয়ানের সাথে কি করেছো তুমি??

.

— উফফ হো সুইটহার্ট!! ইউ আর সো ডাম! কেউ তোমায় ফোন করে বললো রিয়ান ব্রো এর এক্সিডেন্ট হয়েছে আর তুমি তা বিশ্বাস করেও ফেললে?? কোন যাচাই-বাছাই না করেই? আর এইখান পর্যন্ত এসে পড়লে! হাইরে ভালবাসা! মানুষ ঠিকই বলে ভালবাসা অন্ধ হয়। আজকে দেখেও নিলাম। মুখ বেকিয়ে।

.

— কি বুঝাতে চাচ্ছো তুমি??

.

— উফফ ডামবো! ফোর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন রিয়ান ব্রো একদম ঠিক আছে। তার কোন এক্সিডেন্ট হয় নি। তোমাকে এইখানে আনার জন্য এইসব কারসাজি করা।

.

— ইউউউ বাস্টার্ড!! (সরি ফোর দ্যা গালি)

.

— এতটুকুতেই হাইপার হয়ে যাচ্ছো সুইটহার্ট? তাহলে পরবর্তীতে যা হতে চলেছে তা কিভাবে সইবে তুমি?

.

আমি নিজের রাগ কোন মতে সংযত রেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করি। তারপর কিছু সাহস জুগিয়ে বলি।

— এর আগের বার তো কিছু করতে পারি নি কিন্তু এইবার তোমার এমন অবস্থা করবো যে পানিও নসীব হবে না তোমার। সবাই জানবে এই ভালো মানুষ রুপে নরপশুকে।

.

— হাহ!! নাইচ জোক! তুমি না আমার আগে কিছু করতে পেরেছ না এখন কিছু পারবে। কিন্তু আমি তোমার সব কিছুই করতে পারবো। রাস্তার মেয়ের চেয়েও বাজে অবস্থা হবে তোমার। দেখবে কিভাবে? ওয়েট আ ফিউ সেকেন্ড!

.

এই বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কি যেন বের করতে থাকে। তারপর তা আমার সামনে ধরে। তারপর আমি যা দেখি তাতে আমার মাথার উপর আসমান ভেঙ্গে পড়ে।

মোবাইল স্ক্রিনে আমার আর আরিয়ানের ছবি। ছবি গুলোতে বুঝা যাচ্ছে যে আমরা অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে আছি। আরিয়ান একের পর এক ছবি দেখিয়ে চলেছে। সব গুলোতে আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে আছি। এইসব ছবি যে কেউ দেখলে চোখ বন্ধ করে বলে দিবে যে আরিয়ানের সাথে আমার কোন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি এইসব দেখে বলি।

.

— মিথ্যে! সব মিথ্যে! এই ছবিগুলোতে থাকা মেয়ে আমি না। কান্না করতে করতে।

.

— হ্যাঁ জানি এই ছবিতে থাকা মেয়ে তুমি না। অন্য কেউ। তার জায়গায় শুধু তোমার চেহারাটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাট কথা হলো এইটা শুধু আমি আর তুমিই জানি এইটা তুমি না। বাকিরা তো আর জানে না। আর তারা জানবেও না।

যখন সকলের সামনে আমি এইসব ছবিগুলো ভাইরাল করবো তখন তোমার ইমেজটা গিয়ে কোথায় দাড়াবে ভেবেছ? রিয়ান ব্রো এই তোমার বেপারে কি ভাববে?

যে তার হবু বউ আগেই তার ফুপাতো ভাইয়ের সাথে…

.

— চুপ একদম চুপ। আর একটাও বাজে কথা বলবে না! কেন করছো এইসব? কি চাই তোমার? কান্না করতে করতে।

.

— এইতো মূল কথায় এসেছ! সো দ্যা ফ্যাক্ট ইজ আই ওয়ান্ট ইউ। যে কাজ ৬ বছর আগে পূরণ হয় নি তা এখন পূরণ করতে চাই। আই সোয়ের এই ছবি গুলোর কথা কেউ জানবে না।

.

— এইটা কোন দিনও সম্ভব না। আমি পারবো না।

.

— আমার কথা যদি না মানো তাহলে একবার ভেবে দেখ কি হবে? যখন এই ছবি গুলো রিয়ান ভাই দেখবে তখন কি হবে! তোমাকে নষ্টা বলে দূরে সরিয়ে দিবে। তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিবে। তোমার গলায় চরিত্রহীনা ট্যাগটা লেগে যাবে। কোথাও মুখও দেখাতে পারবে না। ঘৃণা করবে তোমায় শুধু ঘৃণা।

তখন তোমাকে আমি এমনেও মিসইউস করতে পারবো। আমার কাছে তো তোমাকে ধরা দিতেই হবে। ইউ হ্যাভ নো আদার চয়েস।

.

আমি কিছু না বলে মূর্তির ন্যায় চুপচাপ বসে থাকি। নিতে পারছিলাম না এইসব কিছু। অবশ্য আমার জায়গায় অন্য যেকোনো মেয়ে থাকলেও হয়তো সহ্য করতে পারতো না।

একটা মেয়ের যখন আপত্তিকর ছবি বের হয় তখন তাকে যে কি পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তা শুধু একটা মেয়েই বুঝতে পারবে। চারদিকের মানুষ আর সমাজ একজোট হয়ে মেয়েটির উপর এক গাধা অপবাদ আর অপমান ছুঁড়ে মারতে পারে। কেউ জানতে চায় না সেটা মিথ্যা কি না। চারদিকে তাকে নিয়ে খালি হাসি তামাশাই করতে থাকতে। অথচ তারা সেই ছেলেটির দিকে আঙুল তুলেও কথা বলবে না। সে আগের ন্যায় খোলামেলা ভাবেই চলাফেরা করতে পারবে। আসলে আমাদের সমাজই এমন। যত যাই হোক দোষ মেয়েরই হবে।

আমার চোখ দিয়ে অনাবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কেন না আমি যে এই সমাজের এই রুপ থেকে বেশ পরিচিত। ৬ বছর আগে যে আমি এই সমাজ নামক জাতির অপমান আর অপবাদের স্বীকার হয়েছি।

আমাকে কিছু বলতে না দেখে আরিয়ান বলে উঠে ।

.

— উফফ দিস মেলোড্রামা। আচ্ছা যাও ২ দিনের টাইম দিলাম। এই ২ দিনের মধ্যে যদি তুমি তোমার সম্মতি আমাকে না জানাও তাহলে এই ছবিগুলো সকলের কাছে পৌঁছাবে। আর সবার আগে রিয়ান ব্রো এর কাছে যাবে৷ এখন তুমি যেতে পারো। আমার এখন আরও কাজ আছে।

.

.

আমি একবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি। সে তৃপ্তির হাসি হাসছে। আমার এখন নিজের প্রতি নিজের এই ঘৃণা লাগছিল। আমি কিছু না বলে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে আসি।

আমার এইবার নিজের প্রতি রাগ হতে লাগলো। ভীষণ রাগ! নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। এই আরিয়ান নামক কালো ছায়া আমার জীবন একদম অভিশাপ স্বরুপ। যে প্রত্যেক বার আমায় ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে যায়।

.

.

??

.

বাসায় আসতেই রিংকি আর আরশি এক গাদা প্রশ্ন আমার দিকে ছুঁড়ে মারে। তখন আমি রিয়ানের এক্সিডেন্টের কথা শুনে এতটাই বিচলিত ছিলাম যে ওদেরকে কিছু না বলেই দৌড়ে বেরিয়ে যাই।

তারা এড্রেস না জানায় আমার পিছু পিছু আসতে পারে নি। আর না পেরেছিল কাউরো সাথে যোগাযোগ করতে।

.

— বল ড. রিয়ান কেমন আছে? (আরিশা)

.

— তিনি ঠিক আছে। আর তার কিছু হয় নি। কেউ মজা করেছিল।

.

— হোয়াট দ্যা হেল! এইসবের মানে কি? কে করেছিল এইসব জানিস? (রিংকি)

.

— না জানি না।

.

— তোকে এমন লাগছে কেন? সব ঠিক আছে তো? (আরিশা)

.

— জানি না।

.

বলেই রুমে চলে যাই আর ওদের মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দেই। রিংকি আর আরিশা দুইজন দুইজনের মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে থাকে।

.

.

রাত ১০ টা বাজে,

রিংকি আর আরিশা অনাবরত দরজা ধাক্কিয়ে চলেছে। আজ সারাদিন আমি রুম থেকে বের হয় নি। যার জন্য তারা এখন না পেরে আমাকে রুম থেকে বের করার জন্য উঠে পরে লেগেছে। আমি এইবার না পেরে দরজা খুলে দেই।

দুইজন রুমে এসে আমায় দেখে অবাক হয়ে যায়। আমার চোখ দুটো লাল হয়ে একদম ফুলে আছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। মুখটা ফুলা। রিয়ানা কেমন করে যেন ঢুলছে।

.

— তুই তোর এই কি হাল করেছিস? কি হয়েছে রিয়ানু বল? (আরিশা)

.

— কিছু না। তোরা শুধু আমায় একা থাকতে দে প্লিজ।

.

এই বলে আবার দরজা বন্ধ করে দেই। ওরা এইবার না পেরে এইবার রিয়ানকে ফোন দেয়।

.

.

??

.

সারাদিন দৌড়াদৌড়ির মাঝে আজ রিয়ান একবারও রিয়ানা খোঁজ নিতে পারে নি। সামনে হলুদ। রিয়ান দুইপক্ষের দিকটা একসাথেই সামলাচ্ছে। যার জন্য কাজ দ্বিগুন। যেহেতু রিয়ান একা হাতে সব সামলাচ্ছে সেহেতু তার উপর কাজের চাপ একটু বেশি। স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ারও সময় নেই।

রিয়ান ব্যাস দিন ভর ক্লান্তি নিয়ে একটু শুয়েছিল ঠিক তখনই রিয়ানের মোবাইলটা বেজে উঠে। রিয়ান বেশ বিরক্তিকর একটা ভাব নিয়ে মোবাইলটা হাতে নেয়। তারপর আরিশার নাম্বার দেখে তার ভ্রুটা কুচকে আসে।

রিয়ান ফোন ধরতেই আরিশা বলে উঠে।

.

— ড. রিয়ান আপনি প্লিজ একটু তারাতারি আসেন। রিয়ানা সেই দুপুরে বাসায় এসে নিজেকে ঘর বন্দি করে ফেলেছে। কিছুতেই দরজা খুলছে না। আপনি প্লিজ একটু জলদি আসেন।

.

রিয়ান কিছু বুঝতে না পেরে ফোন রেখে সিসিটিভি অন করে৷ রিয়ান দেখতে পায় রিয়ানা এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে। রুমে হাল একদম নাজেহাল। রিয়ানাকে দেখতে কেমন যেন অসাভাবিক লাগছে। রিয়ান আর দেরি না করে তারাতারি গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

.

.

??

.

রিয়ান এসে অনাবরত দরজা ধাক্কিয়ে চলেছে। কিন্তু রিয়ানা কোন রেসপন্স করছে না। তাই রিয়ান বাধ্য হয়ে দরজাটা ভাঙ্গে। গিয়ে দেখে রিয়ানা সেই এলোমেলো হয়েই শুয়ে আছে। রিয়ান তার কাছে দিয়ে অনাবরত রিয়ানাকে ডেকে চলেছে। আরিশা আর রিংকিও সমান তালে ডেকে চলেছে। কিন্তু রিয়ানার কোন হেল-দুল নেই। এইবার রিয়ানের চোখ যায় পাশে পড়ে থাকা একটা ঔষধের পাতার দিকে। রিয়ান সেটা হাতে নিতেই বুঝে যায় যে সেটা কি!

রিয়ান আর দেরি না করে রিয়ানাকে পাজাকোল করে নিয়ে বেরিয়ে যায়। আরিশা বের হলে নিলে তার নজর যায় সাইডের টেবিলে পড়ে থাকা একটা সাদা কাগজের দিকে। সে সেটা হাতে নিয়ে দেখে এইটা রিয়ানার চিঠি। আরিশা সেটা নিয়ে রিংকির সাথে বেরিয়ে পড়ে।

রিয়ানার মুখের পাশ দিয়ে একবার সাদা ফেনার মত বের হতে শুরু করেছে। যা দেখে রিয়ান আরও দ্রুত ভাবে গাড়ি চালানো শুরু করে।

.

.

??

.

হসপিটালের করিডোরের একটা চেয়ারে রিয়ান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো তার এক রক্তিম লাল হয়ে আছে। সাথে এক রাশ ভয়ও ফুটে উঠেছে তার চোখে। রিয়ানাকে হারানো ভয়!

রিয়ানা এখন ভিতরে অপারেশন থিয়েটারে। ওর অপারেশন হচ্ছে। যেহেতু রিয়ান একজন অনেক বড় আর নাম করা ডাক্তার তাই তার কথাতে কেউ পুলিশকে কল করে নি। রিয়ান বিষয়টাকে ধামাচাপা রাখারই চেষ্টা করেছে।

.

.

?

.

কিছুক্ষণ আগেই ডাক্তার এসে বলে গিয়েছে যে রিয়ানা এখন বিপদমুক্ত। তার পেট ওয়াস করে সকল স্লিপিং পিলস বের করা হয়েছে।

কিন্তু তাও রিয়ানের মনের মধ্যে রিয়ানাকে হারানোর ভয় যেন একদম গেধে গিয়েছে।

কিন্তু এখন রিয়ানের মনের মধ্যে বার বার একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, “রিয়ানা কেন সুসাইড এটেম্পট করলো।”

তখনই আরিশা এসে রিয়ানের পাশে বসে। তারপর বলে।

.

— এইটাই তো ভাবছেন যে রিয়ানা কেন এমন করলো তাই তো?

.

রিয়ান এইবার মাথা তুলে তাকায়। তারপর কৌতুহলি চোখে আরিশা দিকে তাকায়। আরিশা এইবার বলা শুরু করে।

.

.

.

— এই ঘটনার মূল হচ্ছে আরিয়ান। হ্যাঁ ঠিক শুনেছেন আরিয়ান। যে আপনার ফুপাতো ভাই। এখন আরিয়ানের সাথে আমাদের কিভাবে পরিচয় কি তাই তো ভাবছেন? তাহলে শুনুন,

এই কাহিনি এখনকার না। আরও ৭-৬ বছর পুরানো। যখন আমরা সবে মাত্র এইচএসসি পাশ করে মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার জন্য কোচিং এ ভর্তি হই।

রিয়ানা, আমি আর রিংকি সেই কলেজ কালিন থেকে বন্ধু। সেই থেকে সব কিছুতেই আমরা একসাথে ছিলাম।

আমরা যখন মেডিক্যালে পরিক্ষা দেওয়া শেষ করে একটু রিলেক্স হই। সকলের এক্সামই ভালো হয়েছিল। এতদিন পড়াচাপে একদম আধপাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমরা ঠিক করলাম কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাক। যেই কথা সেই কাজ। সেই সপ্তাহেই আমরা বেরিয়ে পড়ি সিলেটের উদ্দেশ্যে।

সিলেটে আমরা গিয়ে রিংকির এক আত্মীয় এর বাসায় উঠি। তারপর শুরু হয় আমাদের ঘুরাঘুরি। সেখানেই দেখা হয় আরিয়ানের সাথে। সে নাকি লন্ডন থেকে এইখানে ঘুরতে এসেছিল। প্রথম দেখাতেই আরিয়ানকে আমাদের তেমন সুবিধার মনে হয় নি। কেমন গা লাগা টাইপ ছিল। তাই দূরে দূরেই থাকলাম আমরা। কিন্তু সে আমাদের পিছু ছাড়ে নি। সে নাকি শুধু আমাদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চায়৷ আমরাও পরে কিছু একটা ভেবে তার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে নেই। যা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।

আরিয়ান শুরু থেকেই রিয়ানার সাথে ফ্লার্ট করার চান্স খুঁজতো। তাকে ইম্প্রেস করার ট্রাই করতো। কিন্তু রিয়ানা পাত্তা দিত না। তার এইসবের প্রতি কোন ইন্টেরেস্ট ছিল না বলে। কিন্তু আরিয়ান হার মানে নি।

সে আমাদের পিছু নিতে নিতে ঢাকায় চলে আসে। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকদিন পার হয়ে যায়। আরিয়ান কিছুতেই রিয়ানার পিছু ছাড়ছিল না। রিয়ানা অনেকবার তাকে না করে কিন্তু সে শুনে না। একদিন সে সকলের সামনে রিয়ানাকে প্রপোস করে৷ আর রিয়ানা রেগে গিয়ে ওকে থাপ্পড় মেরে দেয়। যার জন্য আরিয়ানের মনে রিয়ানার জন্য রাগ আর ক্রোধ সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে প্রতিশোধের আগুন ধাও ধাও করে জ্বলছিল। কিন্তু সে তা আমাদের বুঝতে দেয় নি।

সে রিয়ানা থেকে সরি বলে আবার ফ্রেন্ডশিপ ঠিক করার কথা বলে আর অনেক রিকুয়েষ্ট করে। যার জন্য রিয়ানাও রাজি হয়ে যায়।

অতঃপর আরিয়ান আমাদের একদিন এক পার্টিতে ইনভাইট করে। আরিয়ান জানতো যে সে যদি রিয়ানাকে একা দাওয়াত দেয় সে আসবে না। তাই সে আমাদের সবাইকে দাওয়াত দেয়। আমরাও খুশি মনে যাই।

.

এই বলে আরিশা একটু থামে। তারপর বলা শুরু করে।

.

.

.

— পার্টিটা বিকেল বেলা ছিল। আমরা সেখানে গিয়ে সকলেই ইনজয় করতে থাকি। আমি আর রিংকি একটু অন্য দিকে গিয়েছে তখন রিয়ানা একা হয়ে যায়। সেই সময় আরিয়ান এসে রিয়ানা সাথে কথা বলতে শুরু করে আর কথায় কথায় ওর জামাতে সোফট ড্রিংকস ঢেলে দেয়। তার সে সরি সরি বলে তাকে উপরের দিকে রুমে যেতে বলে। পার্টিটা একটা বাসা বাড়ির মধ্যেই ছিল। তাই রিয়ানা কিছু না বলে সেইদিকে চলে যায়। রিয়ানা যখন তার জামা পরিষ্কার করছিল তখন আরিয়ান সেই রুমে আসে। তারপর..

.

.

— তারপর কি আরিশা?? স্পিক আপ!!

.

.

আরিশা এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করে।

.

.

— তারপর সে রিয়ানার সাথে জোবরদোস্তি করা শুরু করে। হি ওয়াস ট্রাইয়িং টু মলেস্ট হার। রিয়ানা এইবার চেঁচামেচি শুরু করে কিন্তু বাইরে গানের আওয়াজে পারে না। রিয়ানা যখন জানতে চায় সে এমন কেন করছেন তখন সে জানায় যে সে রিয়ানা থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমন করছে। সে যে তাকে সকলের সামনে থাপ্পড় মেরিছিল তার প্রতিশোধ। আর এমনেও তার নাকি আগে থেকেই রিয়ানার উপর নজর ছিল।

আরিয়ান যখন রিয়ানার সাথে অসভ্যতামি করার চেষ্টা করছিল তখন রিয়ানা নিজেকে বাঁচানোর জন্য ওকে আঘাত করে। আরিয়ান তখন ওকে ছেড়ে দেয়। রিয়ানা কোন মতে বাইরে চলে আসে।

সকলেই তখন ওকে দেখে শোকড। ওর জামার হাতা খানিকটা ছিড়া। চুল এলোমেলো। সে পাগলে মত কান্না করছিল। আমি আর রিংকি দ্রুত ওকে কাভার আপ করি। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করি কি হয়েছে। সে কিছু বলতে পারছিল না ভয় আর কান্নার ফলে। অনাবরত কেঁপে চলেছিল সে।

তাই আমরা তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু তাও সে কিছু বলতে পারে নি। সেইদিন রাতে ওর প্রায় ১০৪° জ্বর এসেছিল। সে জ্বরের ঘরে বার বার চিৎকার করছিল আর বলছিল যে, ” কাছে আসবে না, আমার কাছে আসবে না।”

তখনই আমরা বুঝে যাই কি হয়েছে। ৫ পর রিয়ানের জ্বর ঠিক হয় তখন সে আমাদের সিব বলে। আমার আর রিংকির বাবা মা দ্রুত একশন নেয়। পুলিশে রিপোর্ট করে। পুলিশ গিয়ে আরিয়ানকে ধরেও। কিন্তু ৩ দিন বাদেই তার মা এসে আরিয়ানকে ছাড়িয়ে দেশের বাইরে চলে যায়।

রিয়ানা এর মধ্যে একদম চুপচাপ হয়ে যায়। কথা বলাই যেন ভুলে যায়। সারাদিন নিজেকে রুমে বন্দি হয়ে থাকতো সে। মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠতো তো কখনো কখনো ভয়ে চিৎকার করে উঠতো। ট্রোমায় চলে যাচ্ছিল ও।

আমরা ওর সাথে কথা বলার অনেক চেষ্টা করতাম কিন্তু সে বলতো না। একদিন আমরা জোর করে ওকে বাইরে নিয়ে যাই।

বাইরে গিয়ে ও একটু ভালো হচ্ছিলও কিন্তু তখনই পাশের কিছু আন্টিরা কানা ঘুষা শুরু করে যে রিয়ানা নাকি বাজে মেয়ে। সে নাকি নষ্টা। ছেলেদের সাথে ঢলাঢলি করে। আরও কত কি! কটু কথার যেন বন্যা বয়ে যায়। অথচ এইখানে রিয়ানা কোন দোষই ছিল না।

রিয়ানা এইসব শুনে তখন আরও ভেঙে পড়ে। আবার নিজেকে রুমে বন্দি করে ফেলে৷ দিন দিন ডিপ্রেশন চলে যাচ্ছিল ও। তারপর আমরা ওকে সাইকেটট্রিসের কাছে নিয়ে যাই। আর ওর চিকিৎসা করাই। এরই মধ্যে জানতে পারি আমাদের একই মেডিক্যালে চান্স হয়ে যায়। কিন্তু রিয়ানা তখনোও স্টেবেল ছিল না যে মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারবে।

তাই আমার আর রিংকির বাবা মা মিলে রিয়ানার সব ভর্তির ফি আর বাদ বাকি ফরমালিটিস পূরণ করে। আমরা এইদিকে রিয়ানাকে আগের লাইফে ফিরে আসতে হেল্প করতে থাকি। অবশেষে অনেক কষ্টে ওকে আবার সাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনি। ওকে আরও স্ট্রোং করি। কিন্তু ওর মনে তখন ভালবাসার প্রতি অনিহা জমে যায়। এক প্রকার ঘৃনা যাকে বলে। যা আমরা চেয়েও বের করতে পারি নি।

এইভাবে চলতে থাকে। এরপর ও আপনাকে পায়। আর ভালবাসতে শুরু করে। কিন্তু আবার আরিয়ান ফিরে এসে ওকে ভয় দেখানো শুরু করে। আর আজ ও যা করেছে তার ফলে রিয়ানা এইবার পুরো ভেঙে গিয়েছিল। যার জন্য ও এমন একটা স্টেপ নেয়।

.

.

— মানে? কি হয়েছিল আজ?

.

.

আরিশা একটা কাগজ রিয়ানের দিকে এগিয়ে দেয় তারপর তাকে পড়তে বলে। রিয়ান এইবার কাগজটি খুলে দেখে তা রিয়ানার চিঠি। রিয়ান এইবার তা পড়তে শুরু করে।

.

.

[ চিঠির শুরু দিকে আজকের পুরো ঘটনাটা লিখা। তারপর তার নিচে লিখা। তারপর তার কষ্ট আর ডিপ্রেশনের কথা লিখা। সে কেন এই পথ বেছে নিয়েছে তার কারণও বলা আছে। সে পারবে রিয়ানের ঘৃণার সহ্য করতে পারবে না। পারবে তার জন্য রিয়ানের উপর কেউ আঙ্গুল তুলুক।

শেষ সে রিয়ানের প্রতি তার ভালবাসার কথা বলেছে। আর বিদাই নিয়েছে।]

.

.

রিয়ানের চোয়াল একদম শক্ত যায়। চোখ দিয়ে এখন আগুন বর্ষিত হতে থাকে। পায়ের রক্ত মাথায় উঠে আগুন হয়ে আছে। সে যেন এখনই আরিয়ানকে খুন করে ফেলবে। কি যে করবে সে নিজেও জানে না।

তখনই একজন নার্স এসে জানায় যে রিয়ানার সেন্স এসেছে।

রিয়ান এইবার সেই দিকে যায়। দিয়ে দেখে একজন নার্স রিয়ানাকে উঠে বসাতে সাহায্য করছে। রিয়ান এইবার ধীর পায়ে রিয়ানার সামনে গিয়ে দাড়ায়। নার্স রিয়ানাকে বসিয়ে চলে যায়। রিয়ানা এইবার চোখ তুলে রিয়ানের দিকে তাকায়। তারপর অস্পষ্ট সুরে বলতে শুরু করে।

.

— রিয়ান আ…

.

আর কিছু বলতে পারলো না সে। তার আগেই রিয়ান রিয়ানার গালে স্বজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।

অধ্যায় 32 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

মরিয়া সিদ্ধান্তের চরম পরিণতি

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন