সিজন 1 অধ্যায় 16 পারিবারিক রোমান্টিক #অভিমান #গোপন যত্ন #অপেক্ষা দুআ জেনি আহেলি বেগম রিজোয়ান ইয়াদ ডালিয়া জিয়া

কলঙ্কহীন চাঁদের সুপ্ত প্রতীক্ষা

7 মিনিট পড়া 1,092 শব্দ
কলঙ্কহীন চাঁদের সুপ্ত প্রতীক্ষা

–“ইয়াদ কি সত্যি আমাকে ভুলে গেলো?”

কল্পনাতীত মনে মুঠোতে নিবদ্ধ মোবাইলে দুআর স্থির দৃষ্টি।কাঙ্খিত মানুষটার ফোনের অপেক্ষা করছিল সে ইয়াদ গ্রাম ত্যাগ করার দিন থেকেই।কিন্তু আফসোস,

কাঙ্খিত সেই মানুষ থেকে ফোন আসেনি একটিবার।সারাটাদিন কলেজ আর ভাইয়ের বিয়ের টুকটাক প্রস্তুতিতে সে ব্যাপারটা ভুলে থাকলেও রাতের বেলায় ইয়াদের স্মৃতি দুআর পিছু ছাড়ে না।লোকটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দুআ হৃদমাঝার থেকে মুছতে অক্ষম।অথচ মানবটা যখন গ্রামে ছিলো,তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতো, ঘোর দৃষ্টিতে দুআর পানে চেয়ে থাকতো,তখন দুআ লজ্জায় কুঁকড়ে উঠেছিল মাত্রই;কোনো ধরনের কথার উৎপত্তি হতে দিলো না সে।বর্তমানে সেই মানবের একটা ফোনের আশায় দুআ অস্থির।লোকটা গ্রামে অবস্থাকালীন তার কথাবার্তা আর বাচনভঙ্গির সাহায্যে দুআকে অস্থির করে তুলতো,তার অন্তরে অন্য অনুভূতির জানান দিতো।আর এখন সেই একই লোকটাই দুআর মনকে তারই জন্যে ভাবনার জগৎ সৃষ্টি করতে বাধ্য করলো।দুআ চিন্তিত, কিঞ্চিৎ আশাহীন।তার মন এই মুহূর্তে প্রশ্ন করছে দুটো।এক:দুআকে বলা ইয়াদের শেষ কথা কি শুধুই দুআর প্রতি ইয়াদের মোহ ছিলো?দুই:ইয়াদের কি কোনো বিপদ হয়েছে?যার কারণে সে দুআকে ফোন করছে না!

দুআ মত্ত গভীর ভাবনায়।ভেতরকার এক সত্তা বলছে,দুআর প্রতি ইয়াদের ভাবনার বহিঃপ্রকাশ একেবারে পবিত্র। এতে কোনো খাদ নেই।

হৃদয়ে চলাকালীন ঝড়ে দুআ নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।মস্তিষ্ক থেকে সব ভাবনা দূর করে সে মোবাইল বিছানায় ছুড়লো।ওড়না গলায় উপর সমানভাবে ছড়িয়ে দিয়ে রুম ত্যাগ করলো সে।ইয়াদের ব্যাপারটা আর ভাবতে চাইছে না আপাতত।লোকটাকে আদৌ বিশ্বাস করা ঠিক হবে কিনা,দুআ বুঝতে পারছে না।শহুরে মানুষ,তার উপর বড় মাপের খেলোয়াড়;আর এই মানুষটা নাকি দুআকে ফোন করবে!অসম্ভব।দুআর সব আশা নিরাশায় পরিণত হলো।বুকের মাঝে চিনচিন ব্যাথা অনুভব করছে সে।লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো,সেই খেলোয়াড়ের ব্যাপারে কিছু ভাববে না।যদিও রামিসাকে জিজ্ঞাসা করলেই তার খবর পাওয়া যেতো,তবে দুআ নিজেকে বেড়াজালে রাখতেই পছন্দ করে। তাই সকল প্রশ্নে মনের মাঝে গুঁজে রেখে সেই প্রশ্নের দহনের উত্তাপ সহ্য করছে মেয়েটা।

বসার ঘরে উপস্থিত সকলে আলোচনায় মগ্ন।দুআর বাবা মাঝের বড় আকারের সোফায় পা তুলে রাজকীয় ভাব নিয়ে বসে আছে।তার মায়ের কোলে বিদ্যমান পানের কৌটা থেকে পান সাজাচ্ছে জেনি।রিজোয়ান এবং তার মা বেশ মনোযোগ দিয়ে ইদ্রিস জমিদারের কথায় মশগুল।দুআ ধীর গতিতে বসলো মায়ের পাশে।কথার আন্দাজে বুঝতে পারলো,আগামীকাল তারা মাইশাদের বাসায় যাবে বিয়ের তারিখ নির্ধারণের জন্যে।প্রধান আলোচনা শেষ হতেই দুআর দিকে দৃষ্টি জ্ঞাপন করলো ইদ্রিস।আলতো হেসে মেয়েকে তিনি বলে উঠলেন,

–“আম্মা,ভাইয়ার বিয়ার খবরে খুশি তো?”

দুআ মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো,

–“জ্বী,আব্বা।আমি কালকেও যাবো সেই বাড়িতে।”

–“আলবৎ যাবি।আমার একমাত্র বোন তুই।”

রিজোয়ান স্ফীত কণ্ঠে বললো।

–“ছোট মালকিনের বিয়াতে এই ঘর আরো বেশি মুখরিত হইবে।তখন আত্মীয় যে বাড়বো!”

জেনির কথায় মুখ কুঁচকে ফেললো ইদ্রিস,

–“আমার মাইয়্যার বিয়া এহন না। ঢের দেরী আছে।আমার মাইয়্যা আগে পইড়বো।”

ইদ্রিসের কথায় সম্মতি জানালো সকলেই।এতে দুআর মনটা স্বস্তিতে ভরে গেলো।এতো ভালো পরিবার কয়জনের ভাগ্যে জুটে!

আগামীকাল সেই বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মা, কাকীর সাথে মিলে ডালা সাজিয়ে নিচ্ছে দুআ।রঙিন ফিতা,রঙিন পেপার সবটা দিয়ে সুন্দর করে ডালা সাজিয়ে ফেলছে মেয়েটা।আর অতীব দামী জিনিসপত্র সব সেখানেই সন্তপর্নে রাখছে আহেলী।দুআর কাকী বসে বসে নির্দেশনা দিচ্ছে মাত্রই।

দুআ কাজ করার সময় কামিজের লম্বা হাতাটা তাকে বড্ড জ্বালাতন করছে। অতঃপর নির্দ্বিধায় সে হাতের কাপড় উঠিয়ে কনুই পর্যন্ত তুললো। শুভ্র হাতখানায় ছোপ ছোপ ডোরাকাটা দাগ।দুআ যতটা এইসব দাগকে কলঙ্ক ভাবে,বাস্তবে তা একেবারে অসত্য।দুআর সম্পূর্ণ ধ্যান ডালা সাজানোতে

–“দুআ মালকিন,আপনার হাত খানা কি সুন্দর লাইগতাছে!”

দুআ হাসলো জেনির কথায়।

–“তাই?কই আমি তো সুন্দরের কিছু দেখছি না!”

দুআর ধারে নিজের অবস্থান ঠিক করলো জেনি,

–“আপনি হাত ঢাইকা রাখেন কেন?আমার এই হাত দেহেন আর আপনার হাত দেহেন।আমার হাতে কেমন লোম, গা’র রং পরিষ্কার হইলেও আপনার হাতের পাশে আমার হাতটা কেমন দেহাচ্ছে!আপনি হুদাই গরম আবহাওয়া থাকলেও এইসব পড়েন।”

–“ধুর,কি যে বলো।আমার লম্বা হাতা ভালো লাগে।ধরণীতে কেউ তোমার মতো সহজ সরল ভাবে না।”

দুআর দীর্ঘশ্বাস।

–“আপনি ডাক্তার দেহান না কেন?এতো যদি আপনার আফসোস থাহে?”

–“এই মাইয়্যা,বেশি কথা বলছিস।আমার মেয়েকে আমরা কম ডাক্তার দেখায়নি,বুঝেছিস!এটা যাবে না দুআর শরীর থেকে।”

কাকীর কথায় জেনি চুপ মেরে গেলো।সে তো এমনিতেই ভাবছিলো দুআর কথা।

কাকীমা কাজে ব্যস্ত হতেই জেনি পুনরায় দুআর কানে ফিসফিস করে বলতে আরম্ভ করলো,

–“মালকিন,আপনি সত্যিই অপরূপা।আপনার এইসব দাগ দেইখাও আমার আপনাকে সবচেয়ে বেশি অপরূপ মনে হইতাছে।আল্লাহ্ যেনো এক শিল্প দিয়া বানাইছে আপনারে।আপনার শুয়ামি বেশ ভাইগ্যবান হইবো।আপনার মতো চন্দ্রাবতীরে যে পাইবো।চাঁদের গায়ে যেমন দাগ,তাও সে সুন্দর।তেমনি আপনিও একই।এক্কেরে চাঁদের লাহান।”

দুআ স্থব্ধ।এক পর্যায়ে হুঁ হুঁ করে হেসে উঠলো সে ।তার রূপের এমন বর্ণনা আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি।দুআ মুখে হাত চাপলো,

–“তুমি ভারী মজার।আমার জীবনে কোনো পুরুষ আসবে না।কারণ কি জানো?এইযে তারা আমার সুন্দর মুখ দেখেই পটে যাবে,কিন্তু গায়ের দাগ দেখে পালাবে।তাই আমার এইসবে কোনো চাহিদা নেই।”

জেনি দুআর ফিসফিস কথায় কানে আঙ্গুল দিয়ে অল্প চুলকিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,

–“হায়রে,মালকিন বলে কি?আসল ভালোবাসা আইসবো আপনার জীবনে।এই গরীব মাইয়্যা দোয়া করলো আপনার জন্যে। দেইখবেন,সে আপনাকে খুদ নিজের থাইকাই বেশি ভালোবাসবো। আমীন!”

জেনির হুংকারে তিনজনই তাকালো তার পানে।দুআ হেসে কুটিকুটি আর বাকি দুই মহিলা আচ্ছামত বকছে জেনিকে।জেনির মুখে যেনো আজ খই ফুটেছে।তবে বিধাতা যেনো জেনির এই কথা সাদরে গ্রহণ করে, এমনটাই প্রত্যাশা করলো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রিজোয়ান।বোনের জীবনে যেনো চিরসুখ চারিদিক থেকে মুড়িয়ে আসে,রিজোয়ানের প্রার্থনারত মনের আকুতি।

____________________

ঢাকায় ফিরে ইয়াদ কয়েকদিন ধরেই ইয়াসিরকে সামলিয়েছে।ছেলেটার বাবা মারা যাওয়ার পর একেবারে রূপ বদলিয়ে ফেললো যেনো।খাওয়া নেই, নাওয়া নেই,”বাবা বাবা” বলে অদ্ভুত সব কথাবার্তা বলে।বন্ধুর করুণ দিনে ইয়াদ পারেনি তার সাথ ছাড়তে।বরং বাকি দুই বন্ধুও বেশ খেয়াল রাখার চেষ্টা করছে ছেলেটার।তার বাবা মারা যাওয়ার দিন তিনেক তো ইয়াসিরকে সমলানোটাই যেনো দায় হয়ে যেত তাদের।তবে এখন ছেলেটা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে অনেকটা।ইয়াসিরের অবস্থার উন্নতি দেখে ইয়াদ এবং বাকি সবাই তার সাথে দেখা করে ইয়াসিরের ঘর ত্যাগ করলো।বাকি দুইজন চলে গেলে ইয়াদ চড়ে বসলো নিজের গাড়িতে।উদ্দেশ্য মিরপুর স্টেডিয়াম।দুইমাস পর থেকে পুনরায় শুরু হবে সিরিজ।ইয়াসিরের সাথে সময় কাটিয়ে তবেই সে মাঠে ফিরে। যতোই যা করুক সে, তার মনের গহীনে দুআর প্রতিচ্ছবি হাতছানি দেয় ক্ষণে ক্ষণে।ইয়াদের মন খারাপ হলো।মেয়েটাকে ফোন দিবে বলে আশা দেখিয়ে আশা ভাঙলো সে। এতোই ব্যস্ত সময় পার করেছে সে এই কয়দিন,দম ফেলার সময়টুকু যেনো তার জন্যে ছিলো নিষিদ্ধ।অথচ সেদিন ফেরার পথে গাড়িতে অবস্থানকালীন মেয়েটার ফোন নাম্বার নিয়েছিল সে রামিসা থেকে।হৃদয়ে চাপা আর্তনাদ অনুভব করলো ইয়াদ।সরাসরি দেখা বা কথা বলা না হলেও,তার চন্দ্রাবতীর ছবি দর্শন করতে ভুলেনি সে কোনোদিন।এই কাজ যেনো ইয়াদের চরম আসক্তিতে রূপান্তরিত হলো।দুআর কথা স্মরণে এলে সবকিছুই তার আবছা মনে হয়।এইযে এখনো,দুআর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার মুঠোফোনের রিং পড়ার শব্দটা তার কর্ণপাত হচ্ছে না।কয়েকবার পুনরায় রিং বাজতেই হুঁশ এলো তার।মায়ের নাম্বার দৃশ্যমান।

–“আম্মি?”

–“জিয়া আমাকে শেষ করে দিলো,আব্বা।”

ডালিয়ার কান্নারত কণ্ঠ।

–“কেনো?কি হয়েছে আবার?”

ইয়াদের কণ্ঠে রাগের তেজ।

–“জামালের সাথে নাকি সে বিয়ে করে ফেলবে।এতদিন জ্বর থাকায় এই পাগলামি কমেছিল তার।এখন আবারও সেই একই কথা।এইসব আর ভালো লাগছে না,রোজ রোজ।”

–“রুমে তালা মারো আপুর। টাইমলি খাবার দিবে শুধু।আপুর মতো দূর্বল মানুষ নিজের ক্ষতি করবে না।এই যা কান্নাকাটি করবে বা খাবার খাবে না এতটুকুই।কিন্তু, রুমের বাহিরে এলে চলে যাওয়ার বিপদ আছে।”

ইয়াদ স্টিয়ারিং ঘুরানো অবস্থায় জবাব দিলো।

–“ঠিক আছে,তাই করছি।”

ডালিয়ার কথায় ইয়াদ ফোন রাখলো।এই জামাল আর জিয়ার কাহিনীর ইতি কবে ঘটবে এই নিয়ে আবারও চিন্তায় মগ্ন হলো সে।তার একটাই আফসোস,তার বোন যার জন্যে এত অতিষ্ট হচ্ছে সে তাকে নাম মাত্রই ভালোবাসে।তবে,নিজের বোনকে এমন কুলাঙ্গার থেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ইয়াদ।একদিন ঠিকই সে মুক্তি করবে তার বোনকে এই নরপিশাচের চুঙ্গুল থেকে।

অধ্যায় 16 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

কলঙ্কহীন চাঁদের সুপ্ত প্রতীক্ষা

অনুচ্ছেদ 1 / 1 চলছে