> **বিকল্প ফরম্যাটসমূহ:** [এইচটিএমএল](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep2) | [জেসন](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep2?format=json) | [আরএসএস ফিড](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep2?format=rss) | [অ্যাটম ফিড](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep2?format=atom)

# আলোর ঝলক ও অজানা আকর্ষণ

![আলোর ঝলক ও অজানা আকর্ষণ](https://cdn.golpohub.com/covers/episodes/chapter-chapter-2914-fb83ef.webp)

---
*[সালসাবিল সারা](https://golpohub.com/authors/salsabil-sara)-এর [আমার চন্দ্রাবতী](https://golpohub.com/series/amar-chondraboti) সিরিজ থেকে*\n*আনুমানিক পড়ার সময়: 16 মিনিট*
- **মোট শব্দ:** 2,551
- **প্রকাশিত:** Sep 19, 2026
---

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দেশ বিদেশের নানান ক্রিকেটারদের মিলন মেলা বসেছে। “বিপিএল” এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপলক্ষ্যে এই আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।চারদিকে আলোর তীব্র ঝলকানিতে এই ভরা সন্ধ্যাকে আলোর ফোয়ারা বলে মনে হচ্ছে।গোল গোল টেবিলের সামনে বসে আছে বিপিএল এর একেকটা দলের খেলোয়াড় এবং তাদের প্রতিনিধি,কোচ।নিজের সহকর্মীদের সাথে টুকটাক আলাপ করছে,ইয়াদ।সম্পূর্ণরূপে অনুষ্ঠান উপভোগ করলেও,কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার পাশের টেবিলে বসা জামালের দিকে।ইয়াদের সাথে জামালের চোখাচোখি হতেই জামাল নিজের দৃষ্টি নিচু করে নিলো।পরক্ষণে ইয়াদ বুঝলো জামাল তার দলের প্রতিনিধির কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে।ইয়াদের অধরে বাঁকা হাসি,ইয়াদের যেনো জামালের বলা প্রত্যেকটা কথা মনে মনে জানান হচ্ছে।নিজের খরশান গালে হাতের তালু ঘষে সামনের দিকে দৃষ্টি জ্ঞাপন করলো সে।ইয়াদের মোবাইল বেজে উঠতেই ইয়াদ মোবাইল হাতে নিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লো।স্পিকারের তীব্র শব্দে এই জায়গায় বসে মোবাইলে কথা বলা একেবারে অসম্ভব।ফোন রিসিভ করতেই ইয়াদের মা,ডালিয়ার অভিযোগ প্রবেশ করলো ইয়াদের কর্ণগহ্বরে, –“আব্বা,অনুষ্ঠানের পর বাসায় এসে যাবে।থাইল্যান্ড থেকে এসেছো তিনদিন হলো,এখনো বাড়ি পর্যন্ত আসলে না।” –“বিপিএল এর কাজে ব্যস্ত ছিলাম,আম্মি। কাল রাতে ফিরবো।” –“আজ রাতেই আসবে,যতো রাত হউক।তিনদিন পর থেকে খেলা এই বিপিএল শুরু হবে,এরপর তোমার দেখা পাওয়া আমার জন্য দুষ্কর হয়ে যাবে।ইয়াদু,যেটা বলেছি সেটাই করবে।তোমার বাবা কিন্তু রেগে আছে।” ডালিয়ার কথায় শান্ত হলো ইয়াদ।সে স্বাভাবিক কণ্ঠে আওড়ালো, –“দেরী হবে।তবে,আজই আসবো বাসায়।অনুষ্ঠানে আছি,আম্মি।রাখছি।” –“আমি অপেক্ষা করবো।আসবে কিন্তু।” ইয়াদ ফোন রাখলো।ফোনের স্ক্রিনে নিজের বাবা মায়ের সাথে তার হাস্যোজ্বল ছবি দৃশ্যমান। গত ঈদে মা বাবার সাথে তার এই মুহূর্তটা ক্যামেরাবন্দী করেছিলো তার ছোটবোন মারিয়া।কাকতালীয়ভাবে ইয়াদের এই ছবিতে তিনজনকেই অমায়িক লাগছে।ক্রিকেটের কারণে ব্যক্তিগত অনেক মুহূর্ত উপভোগ করতে পারেনি সে পরিবারের সাথে।তাই,নিজের মনে ওয়াদা করলো ইয়াদ; সামনে যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে সে নির্দ্বিধায় অংশগ্রহণ করবে। দরকার পড়লে তার ক্রিকেটের জন্য অনুষ্ঠানের সময়কে পরিবর্তন করা হবে। সামনে থাকা বিরাট রঙ্গিন আয়নাতে তাকিয়ে ইয়াদ নিজের পরিহিত গাঢ় নীল রঙের কোটের বোতাম আটকে নিলো। আয়নাতে নিজের পাশাপাশি অপর মানুষের অবয়ব থেকে ইয়াদ পেছনে বাঁক ফিরলো, –“মিস্টার সিনহা! অনুষ্ঠান ছেড়ে এইখানে? নতুন শিকারের তালাশ করছেন বুঝি? –“আহ ইয়াদ, তুমি কি আমাকে সারাজীবন সন্দেহ করেই যাবে?” –“আলবৎ করে যাবো। যেখানে আপনি নিজেই খেলায় ফিক্সিংয়ের জন্যে আমাকে চারবার কুপ্রস্তাব দিয়েছেন।সেখানে আপনাকে সন্দেহ না করার মত কিছুই আমি দেখছি না।” ইয়াদ নিজের হাত ঘড়ি ঠিক করে জবাব দিলো। –“তোমার কাছে কি টাকার কোনো মূল্য নেই?তিন ম্যাচের সমতুল্য টাকা দিতে চেয়েছি তোমাকে,কিন্তু তুমিই নিলে না।”ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস” কি তোমার অতিপ্রিয়?” –“সেটা আমার ব্যাপার।তো,জামাল যেহুতু আপনার কানে এইসব বাতিয়ে দিয়েছে আগে,তাকেই পরবর্তীতে আমার সাথে কথা বলতে বলবেন।তার না বলা কথা আপনার মুখ দিয়ে বের হয়,বিষয়টা আমার প্রচুর বিরক্ত লাগে।খেলা ফিক্সিং এর যে অপরাধ আপনি আর জামাল মিলে করছেন,এর খোলাসা হলে আপনাদের মেরুদন্ড ভেঙে যাবে।এরপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।” ইয়াদের কড়া কণ্ঠ। জনাব সিনহা হেসে উঠলো, –“ক্রিকেট জগতে আমার বিনাশ এতো সহজ না।তুমিই একমাত্র,যে আমার সাথে জোর খাটিয়ে তর্ক করো।দেখা যাক,মেরুদন্ড কার ভাঙে!সাবধানে থেকো ইয়াংম্যান।” কথাটা বলে সিনহা হাত উঁচিয়ে ইয়াদের কাঁধ চাপড়ে দেওয়ার আগে ইয়াদ তার বুকসমান সিনহার কাঁধ চেপে ধরলো, –“ইয়াদ কাউকে ভয় করে না,তাই ইয়াদের সাথে কারো তুলনা করা একেবারে বেমানান।চোরের দশদিন, মালিকের একদিন।সাবধানে থাকবেন স্বয়ং আপনি।” ইয়াদ নিজের কথা ব্যক্ত করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দ্রুত পায়ে অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।এইদিকে ইয়াদের হুমকি এবং অপমানে সিনহা টিস্যুর সমেত নিজের ঘর্মাক্ত মুখমন্ডল মুছে নিলো। অনুষ্ঠানে গিয়ে ইয়াদ বাকিদের সাথে আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়লো।একে একে বিপিএলে অংশগ্রহণ করা সকল দলকে সংবর্ধনা জানানো হলো। ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস এর অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয় ইয়াদ।খাওয়ার পর্ব শেষে ইয়াদ নিজের কিছু লোকের সাথে দেখা করে বেরিয়ে পড়লো নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে।ঘরের রাস্তার কাছাকাছি বাঁক ফেরানোর পূর্বেই রাস্তার মোড়ে সে ফারসিভ,ইয়াসির এবং স্পন্দনকে দেখতে পেলো।ইয়াদের গাড়ি তাদের দৃষ্টিতে এলে হাত নাড়িয়ে দিলো স্পন্দন,যার অর্থ তারা গাড়ি থামাতে বললো।ইয়াদের প্রাইভেট কার থামলো।গাড়ি থেকে বের হতেই একে একে স্পন্দন,ইয়াসির এবং ফারসিভ আলিঙ্গন করলো তাকে।ইয়াদ বিস্ময়ের সুরে তাদের প্রশ্ন করলো, –“তোরা?এইখানে কি করছিস?” –“তোরই অপেক্ষায় ছিলাম।জানি তোর মেজাজ খারাপ।রশিদের সাথে কথা হলো ফেসবুকে কিছুক্ষণ পূর্বে।সে জানালো তোর সাথে কার যেনো কথা কাটাকাটি হলো।তাই ভাবলাম,তোর সাথে দেখা করে একটু চমকে দিই তোকে।” ইয়াসির হেসে জবাব দিলো। –“তা বুঝলাম। আমাকে ফোন করলেই তোদের হতো।কিন্তু, আমি বাড়িতে আসবো এই খবর কে দিলো?” ইয়াদ পুনরায় প্রশ্ন করলো। –“রশিদই বলেছে ইয়াসিরকে।বুঝিস ই তো,তোর পেয়ারা ভলেন্টিয়ার সে।তোর সব কাজে কঠোর নজর রাখা তার প্যাশনের মধ্যে পড়ে।যায় বলিস ছেলেটা ভালো। ফোন করার চেয়ে সারপ্রাইজ দেওয়া উত্তম!” ফারসিভ বলে উঠলো। –“ছেলেটা ভালো?অন্যের কথা কান পেতে শোনা কি ভালো কাজ?” ইয়াদের কণ্ঠস্বর কড়া হলো। –“আরে আরে,থাম।তুই এমন হুটহাট বদলে যাস কিভাবে?চল ঘুরে আসা যাক।” ইয়াসির অনুরোধ করলো। ইয়াদ ইয়াসিরের পেছনে এক নজর তাকিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো, –“বাইক এনেছিস?” –“হ্যাঁ।” ইয়াসির ঘাড় নাড়িয়ে জবাব দিলো। –“আমি চালাবো বাইক।ইয়াসির আমার গাড়িতে উঠে পড়।” হাসিমুখে কথাটা বলে ইয়াদ নিজের নীল রঙা কোট খুলে নিলো।ভেতরে পরিহিত সাদা রঙের শার্টের ইন ভেঙে প্যান্টের উপর টান দিয়ে মসৃণভাবে শার্টকে ঠিক করলো ইয়াদ। এরপর হাতের কোট ইয়াসিরকে ধরিয়ে তার কাছ থেকে হেলমেট নিয়ে বাইকে বসে পড়লো সে। ইয়াসির চলে গেলো গাড়িতে।গাড়ি টান দিতেই ইয়াদ নিজের মাথায় হেলমেট পড়ে ছুটলো গাড়ির পেছন পেছন।তীব্র গতিতে বাইক ছুটছে যার কারণে ইয়াদের কলার অবাধ্য হয়ে বাতাসে উড়ছে। গভীর রাতে,ঢাকা শহর নিস্তব্দ।রাস্তাটাও কেমন ফাঁকা।তাই ইয়াদ তার পুরো দমে ছুটছে। ব্রীজের নিচে সুন্দর এক জায়গায় থামলো তারা।মধ্যরাতের ঝিরিঝিরি বাতাস বিদ্যমান চারিদিকে।এইখানে উপস্থিত কয়েকজন সবাই আড্ডায় মত্ত। আশে পাশে পুলিশ টহল দেয়,তাই এই জায়গা গভীর রাতেও নিরাপদ।তিন চারটা ভালো মানের টং সিস্টেম দোকান আছে এই জায়গায়।উপস্থিত ছেলে-মেয়ে সেখানেই ভিড় করছে বেশি।ইয়াদ এখনো মাথা থেকে হেলমেট খুলেনি।মানুষজন দেখে একটু ভাবনায় পড়লো সে। –“আমার কাছে মাস্ক নেই। গাড়িও এনেছি আজ অন্যটা।এইসব পোকা আমাকে দেখলেই চলে আসবে বিরক্ত করতে।ঐদিকে চল।” একটু দূরে ল্যাম্পপোস্টের স্ট্যান্ডের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বললো ইয়াদ। –“শালা,বিখ্যাত মানুষের বন্ধু হয়ে মহা জ্বালায় পড়লাম। কোথায় ভাবলাম এইখানে মেয়ে আছে,মেয়ে দেখে ভাবসাব করবো।তোর জন্যে আমার এইসব স্বপ্নই থেকে গেলো।” হেলমেটের বিদ্যমান কালো রঙের গ্লাস উঠিয়ে স্পন্দনের কথায় ইয়াদ জবাব দিলো, –“চা নিয়ে আয়।মেয়ে মানুষ খুবই ঝামেলার। মোহ কেটে গেলে দেখবি,কই তোর মেয়ে আর কই তোর ভাব।” কথাটা শুনে কিটকিট করে হাসলো বাকি দুইজন।স্পন্দন মুখ বেজার করে চললো দোকানের দিকে।উল্টোদিকে পিঠ দিয়ে ল্যাম্পপোস্টের নিচে থাকা বেঞ্চে বসলো তারা।স্পন্দন চা আনলে সকলে মিলে জমজমাট এক আড্ডায় মত্ত হলো। খনিক্ষণ বাদে ইয়াদের মোবাইল বেজে উঠলে হাতে থাকা মোবাইলে সে দেখলো তার বোন মারিয়া তাকে ফোন দিয়েছে, –“ভাইয়া, মা জিজ্ঞেস করলো কবে ফিরবে?” –“আধা ঘন্টা সময় লাগবে।আসছি বল।” ইয়াদের থমথমে উত্তর। ব্যস কথা শেষ তাদের।ইয়াদ আবারও আড্ডায় মন দিলো।মিনিট তিনেক পরে দেখলো তার মোবাইলে বার্তা পাঠিয়েছে মারিয়া। জরূরী কিছু ভেবে মেসেজ দেখলো সে সাথে সাথে।একখানা ছবি পাঠিয়েছে মারিয়া,তার উপর লেখা আছে;’ মাইশা আপুর হবু শশুরবাড়ির লোকজন।’ ইয়াদ ছবিতে চোখ ঘুরিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে, ছবির মাঝামাঝি অবস্থানরত হাস্যোজ্বল পবিত্র চেহারার একজনের দিকে তার দৃষ্টি থমকে যায়।ইয়াদ কিছু ভাবার পূর্বে ছবিটা চলে গেলো।ইংরেজিতে গোটা অক্ষরে লিখা উঠলো, –“মারু আন্সেন্ট আ মেসেজ।” যায় অর্থ, মারিয়া মেসেজটা মুছে দিলো। ইয়াদের ভ্রু কুঁচকে এলো।ব্যাপারটা তার মাথায় প্রবেশ করলো না।পরক্ষণে মারিয়া আবারও মেসেজ দিলো, –“সরি ভাই।ফ্যামিলির সবাইকে এই মেসেজ ফরোয়ার্ড করতে গিয়ে তোমাকেও পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।” মেসেজ পড়ে মোবাইল আবারও নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো সে।যেনো তার কিছুই যায় আসে না, মারিয়ার পূর্ববর্তী মেসেজে। বিশাল সময়ের আড্ডা দেওয়া শেষ।বাড়ি ফেরার পালা এইবার।ইয়াদ এখন নিজের প্রাইভেটকার করেই রওনা দিলো।বাকিরা নিজেদের সুবিধামতো তাদের গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দুইবার তীব্র হর্ণ দিতেই বিশাল আকারের ফটক খুলে দিলো দারোয়ান।ঘুম ঘুম নয়নে হাত তুলে সালাম দিতেও ভুললেন না উনি। ইয়াদ গাড়ি পার্ক করে বৃহৎ আয়তনের উঠোন ক্রস করে প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়ালো।বেল দেওয়ার পূর্বেই দরজা খুলে দিলো তার মা।ছেলেকে দেখে আবেগপ্লুত হয়ে নিজের বাহুডোরে নিলো ডালিয়া, –“আমার আব্বা।কতদিন পর দেখলাম!” ইয়াদ মায়ের পিঠে হাত রাখলো। –“না ঘুমিয়ে কি করছো?” –“তোমায় দেখা ছাড়া কিভাবে ঘুমায়,আব্বা!গাড়ির শব্দ শুনেই দৌড়ে এসেছি আমি দরজা খুলতে।আসো।” ইয়াদকে নিজের বাহুডোর থেকে মুক্ত করে জবাব দিলো তার মা।মুচকি হেসে ইয়াদ ঘরের ভেতরে আসলো।অনেকদিন পরে এসেছে তার নিজের ঘরে। বসার ঘরে তার দুই বোন জিয়া এবং মারিয়াকে দেখে প্রশ্ন করলো সে, –“কি ব্যাপার,এতো রাতে জেগে কেনো?” –“ভাইয়া!” –“ইয়াদু!” চিল্লিয়ে উঠলো দুইবোন।ছোট বোন মারিয়ার সবচেয়ে ভালো আর সেরা ভাই এবং বড় বোন জিয়ার আদুরে ভাই হলো ইয়াদ।দুইজনকেই হাসিমুখে আলিঙ্গন করলো সে। –“আরে,ফুপু ফোন করেছিল। মাইশার বিয়ের কথা আগানোর কথা ভাবছে।তাই দেরী হলো।” জিয়া হেসে জবাব দিলো। –“ওহ!” –“আব্বা,খেয়ে এসেছিস?কিছু খাবি?” –“নাহ, আম্মি।খাবো না।রুমে যাচ্ছি,টায়ার্ড প্রচুর।” ইয়াদ রুমে যাওয়ার পূর্বে জিয়ার হাতে থাকা ফোনে ইনকামিং কলে দেখলো জামালের নাম্বার।জিয়া লুকোনোর আগেই ইয়াদ হুমকিস্বরূপ জিয়াকে বলে উঠলো, –“জামাল ভালো ছেলে না। পরে পস্তানোর আগে তামাশা বন্ধ করো।আমি বেঁচে থাকতে তাকে মেনে নিবো না।” ইয়াদের কর্কশ স্বর। –“ইয়াদু!তাকে আমি ভালো..” জিয়া কিছু বলতে নিলে তাকে থামিয়ে দেয় ইয়াদ, –“আম্মি,আমি কিছু করে বসলে যেনো আমাকে কেউ দোষ না দেয়।” ইয়াদের হাঁটার গতি দ্রুত।জিয়ার ক্যাচ ক্যাচ তার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে যেনো।ফ্রেশ হয়ে ট্রাউজার পড়নে উদোম শরীরে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ইয়াদ।গায়ের উপর পাতলা কম্বল টেনে অক্ষিজোড়ার উপর হাত রাখলো সে। হঠাৎই ইয়াদের স্মৃতিতে মারিয়ার পাঠানো আজকের ছবিটা দুই তিনবার ভেসে উঠলো।কিন্তু,সেই শুভ্র চেহারার মেয়েটার মুখ স্পষ্ট মনে আসছে না তার। ইয়াদও আর মাথা ঘামালো না সেদিকে।তন্দ্রায় অক্ষিজোড়া বুঁজে এলো ইয়াদের। ————————— অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুআ সবার মাঝে বসে আছে। রামিসার বাসায় আজ সবাই মিলে খেলা দেখতে বসেছে।বিপিএল এর প্রথম ম্যাচ শুরু হয়েছে আজ। রামিসার দাওয়াতে তাই সঞ্জয়,মাহি এসেছে তাদের বাসায়।যার কারণে দুআর খেলা দেখার চরম অনিচ্ছা থাকা সত্বেও তাকে এইখানে আসতে হলো। রামিসা সদা এমনই করে।বাংলাদেশের খেলা বা বিপিএল এ ইয়াদের খেলা থাকলে,সে সবাইকে এক জোট করে খেলা দেখতে বসে।খেলা চলাকালীন পুরোটা সময় তাদের মধ্যে একটা টানটান উত্তেজনা থাকে,যেটা দেখতে দুআর বেশ লাগে।দুআ তাদের সাথে এই মাস্তিময় সময় নষ্ট করতে চাই না।যার কারণে মুখ বুঁজে সে তাদের সাথে যোগ হলো।এইযে এখনো খেলা শুরু হয়নি।কিন্তু সঞ্জয়,মাহি, রামিসার ভেতরে টান টান উত্তেজনা ভর করছে।দুআর বাসায় তার মা এবং চাচী দেখে মাঝে মাঝে খেলা।তবে, তাদের সাথে মুহূর্তটা এতো জমজমাট হয় না।রিজোয়ান এবং তার আব্বা তো এইসব খেলা দেখার মাঝে একেবারেই নেই।অগত্য দুআ রামিসার কথামতো দাওয়াত এবং তাদের নাট্যমি দুটোই উপভোগ করার চেষ্টা করছে। রামিসার রুমের খাটে মাহি,দুআ এবং রামিসা বসলো আর সঞ্জয় সিঙ্গেল একখান চেয়ারে নিজের জায়গা করে নিলো।ইয়াদ এবং টিমের বাকি সবাই মাঠে নামতেই মাহি চিল্লিয়ে উঠলো, –“এইতো এইতো আমার ইয়াদু।আজব,ছেলেটা এতো সুন্দর কেনো?” –“দেখতে হবে না, কার ভাই?” রামিসা নিজের কাঁধ চাপড়ে বললো। –“দেখিস আজকে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসই জিতবে।ইয়াদ যে আছে!” সঞ্জয় হেসে বলে উঠলো। –“কেমন তোরা!চট্টগ্রামের মানুষ হয়ে ঢাকাকে সাপোর্ট করছিস।দেশের বিরুদ্ধে হলে হয় দেশদ্রোহী,আর যেহুতু তোরা জেলার বিপক্ষে, তাই তোরা জেলাদ্রোহী।” দুআ মুখ কুঁচকে জবাব দিলো। –“চুপ থাক,আজব।আমার ইয়াদু যেখানে আমরা আছি সেখানে।” –“হ্যাঁ,ইয়াদ ভাই যেখানে আমরা আছি সেখানে।” রামিসাও তাল মেলালো মাহির সাথে। –“উফফ,চুপ।দেখ তোরা তোদের ইয়াদকে।আমি কিছু বললাম না আর।তাও এইভাবে স্লোগান দিস না।বেশি বিরক্তিকর।” দুআর বিরক্তি দেখে মাহি, রামিসা হেসে উঠলো। –“শুনেছি,কোনো জিনিস কেউ অপছন্দ করলে তার কাছে সেটাই ধরা দেয়।কেনো যেনো তোর ভবিষ্যতের উলোট পালোট এক ঝড়ের গন্ধ পাচ্ছি আমি।চাঁদ রাণী,ইয়াদ ভাইয়ের প্রতি তোমার এই নাক কুঁচকানো দেখবে তোমার কাল হবে।” রামিসা হো হো করে হেসে বললো। –“জীবনেও না।ভাই, দয়া করে এইসব ভয় আমাকে লাগাবি না।” দুআ চোখ বকা করলো। –“আজব, রামিসা হুদাই ভয় দেখাচ্ছিস কেনো?খেলায় ফোকাস কর।এই দেখ আমার ইয়াদু ফিল্ডিং দিচ্ছে।কি সুন্দর গায়ের গঠন ছেলেটার!” দুআ এবং বাকি সবাই তাকালো টিভির পর্দায়।ইয়াদের এক ঝলক দুআর চোখে পড়লো,কিন্তু ইয়াদের সেই ঝলক দুই সেকেন্ডের বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না। খেলা মুটামুটি চাপে আছে।ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস বেশ ভালোই ফিল্ডিং দিয়েছে পুরো ম্যাচ জুড়ে।দুআ খেলা উপভোগ না করলেও একটু পর পর হেসে কুটি কুটি হয়েছে রামিসা,মাহি এবং সঞ্জয়ের নানান কীর্তিতে।একেকটা উইকেটে মাহির নাচ ছিলো দেখার মতো।শেষ বলে যেই সিক্স হচ্ছিলো অমনি মাহি “না” বলে জোরে চিল্লিয়ে উঠলো।দুআ মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে টিভির পর্দায় দৃষ্টি দিতেই দেখলো ইয়াদ নামের ছেলেটা হাওয়ায় ভেসে লাফিয়ে ক্যাচ ধরে ফেললো।এই ক্যাচ মধ্যম হাইটের যে কারো জন্যে একেবারে অনিশ্চিত ছিলো।কিন্তু, উচ্চতায় বেশ লম্বা হওয়ায় ইয়াদ খুব সহজে বল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। হাওয়ায় ভেসে থাকার কারণে ইয়াদের জার্সি উল্টিয়ে তার শুভ্র উদর নজরে এলো দুআর।মুহূর্তেই দুআর বেশ ঝটকা অনুভব হলো শরীরে।এইদিকে সবাই ইয়াদের ক্যাচ ধরার খুশিতে আত্মহারা হয়ে আছে,আর অন্যদিকে দুআ ইয়াদের শুভ্র উদরে দৃষ্টি জ্ঞাপন করে শরীরে অজানা অনুভূতি অনুভব করলো।কিছু সময় দৃষ্টি নিচু রেখে দুআ আবারও সেদিকে তাকালে দেখলো,ইয়াদ সবার সাথে বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে দুই হাত মিলিয়ে যাচ্ছে।ইয়াদের মুখের অমায়িক হাসি সত্যিই যেনো দুআর নজরে আটকে পড়লো।পরক্ষণে দুআ চোখ ঘুরিয়ে নিজেকে সামলে নিলো।আর মনে মনে ভাবলো, –“এইসব খেলোয়াড়ের দিকে নজর দেওয়া পাপ।আমার জীবনে আমি একাই খুশি।এইসব খেলোয়াড়ের জন্যে নিজের মনকে নত হতে দেওয়া বারণ।কারণ, এদের হাজারো চাহিতা আছে। কচুর খেলোয়াড়।” নিচের ঠোঁটে দাট কামড়ে দুআ সব মনের ভাবনা নিমিষেই দূর করে দিলো।খানিকক্ষণ পূর্বের কাহিনী যেনো দুআ একেবারেই স্মৃতি থেকে মুছে নিয়েছে। খেলায় বিরতি চলছে।এই সুযোগে সবাই খেতে বসলো।ঘড়িতে চারটা বাজে।খেলা প্রেমীদের মাঝে বসে দুআর আজ দুপুরের খাবার খেতে বেশ দেরী হয়ে গেলো।এইদিকে মাহির মন খারাপ।সে তার প্রিয় মোরগ পোলাও পেয়েও মুখ বেজার করে রেখেছে।দুআ সেদিকে লক্ষ্য করে মাহিকে জিজ্ঞেস করলো, –“কি সমস্যা তোর?কিছুক্ষণ পরে আবারও খেলা শুরু হবে।তোর ইয়াদকে দেখার ইচ্ছা মরে গেলো বুঝি?খাচ্ছিস না কেনো?মোরগ পোলাও দেখলে তুই মানুষই চিনিস না।আজ কি হলো?” –“আমার না ইয়াদের সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করছে।” মাহির নিভু কণ্ঠের জবাব। –“খুবই বাজে ইচ্ছা।” দুআ বললো। –“সিরিয়াসলি বলছি।আমার একবার ইয়াদের সাথে হাত মেলাতে ইচ্ছা করছে।আজব,এই রামিসা তোর কাজিন আবার কবে আসবে তোদের বাড়িতে?” –“আমি কিভাবে বলবো?ভাইয়া নিজের বাসায়ও থাকে অনেক কম সময়ের জন্যে।গত বছর তো ভাইয়া এসেছিল আমাদের বাসায়।গ্রামের সবাই এসেছে কমবেশি তার সাথে দেখা করতে।তখন এতো জোর করেও তোদের আনতে পারলাম না আমি।এখন এই অভিযোগ কেনো?” –“সেটাই।আসিসনি কেনো?সেবার তো খুব লজ্জায় মরেছিলি।” সঞ্জয় ভাত মুখে দিয়ে প্রশ্ন করলো। –“আমি কি করবো?সেইবার দুআ আসেনি। আমিও লজ্জার কারণে আর যায়নি,আজব।” মাহি মন খারাপ করে বললো। –“দুআ তো এমনিও আসতো না ইয়াদের চৌদ্দ গুষ্টি আসলেও।তাই পরেরবার ইয়াদ ভাই এলে নিজের দায়িত্বে চলে আসিস।দেখা করে যাবি।” রামিসার কথায় ইতি ঘটলো মাহির দুঃখী চেহারার। –“শান্তি?এখন ভাত গিল।এমন যাদু করেছে এই ইয়াদ নামের ছেলেটা তোদের! বাপরে বাপ।কি আছে এই ছেলের মাঝে আল্লাহ্ মালুম।” দুআ ভ্রু নাচিয়ে বললো। –“একবার তার মোহে পড়বে তো চন্দ্রাবতী,তোমার জীবনটাও এমন এলোমেলো হয়ে যাবে,আজব।” –“দরকার নেই। খাল কেটে কুমির আনা,দুআর কাজ না।তোরাই ভালোবাস সেই ইয়াদ বিন তেহরান উরফে সাদা ভূতকে!” দুআ কথাটা বলে নিজের খাবারে মন দিলো।বাদ বাকি মাহি এখনো প্যান প্যান করছে দুআর সাথে।দুআর সেইদিকে মন নেই।তার মন আপাতত খাবারের দিকে। সম্পূর্ণ খেলা উপভোগ করা হলো না দুআর।মাহি, রামিসা এবং সঞ্জয়ের চিল্লাফাল্লা আর আবেগী ভাব বেশ লাগছিল তার।কিন্তু,এর মাঝে মাইশা এসে দুআকে বলে উঠলো, –“দুআ,রিজোয়ান এসেছে নিচে।ডাকছে।” –“কেনো আপু?ভাইয়া এই সময়?” –“নিতে এসেছে বললো তোমাকে।” মাইশা দুআর প্রশ্নে জবাব দিলো। –“ওহহ।” দুআ ছোট্ট করে বললো। –“আরেকটু থাক না,চাঁদ!” রামিসা অনুরোধ করলো। –“আম্মাকে তো বলেছিলাম সন্ধ্যার দিকে গাড়ি বা মজিদ কাকাকে পাঠাতে।কিন্তু ভাই কেনো এলো জানিনা।এসেছে যখন যেতেই হবে।নাহলে রিজোয়ান ভাই চটে গেলে আমার সব সুযোগ সুবিধা চান্দে যাবে।আসি।” দুআ উঠে পড়লো।সবার থেকে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো সে মাইশা সমেত।রিজোয়ানের কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত টুকটাক কথা বললো সে মাইশার সাথে।রিজোয়ান দুআর হাত ধরলো।ইশারায় মাইশাকে বিদায় জানিয়ে দুআ সমেত বাইরে চলে গেলো রিজোয়ান।দুআ ক্ষীণ কণ্ঠে রিজোয়ানকে প্রশ্ন করলো, –“তুমি নিতে এলে যে?” –“দুপুরে চাচী বললো তুই এই বাড়িতে।আমি এইদিকে কাজে এসেছিলাম তাই ভাবলাম তোকে নিয়ে যায়।” রিজোয়ানের সোজা উত্তর। –“ওহ।আরেকটু থাকতে পারলে ভালো হতো।খেলা দেখতে মজা লাগছিল অনেক।” দুআ গাড়িতে উঠে বসলো। –“কার খেলা?বাংলাদেশের?এই খেলা শুরু হলো আবার কবে?” –“নাহ,বিপিএল।তুমি খেলা দেখো না কেনো?বাংলাদেশের প্রায় সবারই ক্রিকেট প্রিয়।আর মেয়েরা খেলা না দেখলেও ইয়াদ নামের ক্রিকেটার এর জন্যে সবাই দেখে ক্রিকেট।” দুআ নির্দ্বিধায় বললো।এই প্রশ্ন যেনো তার ঠোঁটের কিনারায় প্রস্তুত ছিলো। –“সময়ই পায় না।কিভাবে দেখবো?তাছাড়া আগে যা একটু দেখতাম,এখন ভালো লাগে না দেখতে।বিশেষ করে ইয়াদ ছেলেটাকে।” বিরক্ত নিয়ে বললো রিজোয়ান। –“কেনো?ইয়াদ তো সবার পছন্দের।” দুআ পুনরায় প্রশ্ন করলো। –“ছেলেটা ভার্সিটিতে পড়াকালীন চিনতাম।উগ্র একটা ছেলে ছিলো জুনিয়র ব্যাচের।হঠাৎ দেখি দেশের সেরা খেলোয়াড় এখন সে।তার চলাফেলা,কাজকর্ম সবই আমার অপছন্দ ছিলো।তবে ছেলেটা এখন কেমন জানিনা।ব্যক্তিগত ভাবে আমার ভালো লাগে না তাকে। তুই এত প্রশ্ন করছিস কেনো?” দুআ ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠলো। আমতা আমতা করে বলল, –“এমনিই।” –“ওহ!এইসব ক্রিকেটার নিয়ে কথা বলার কিছু নেই।” রিজোয়ান আবারও বিরক্তি দেখালো। –“উনি তো মাইশা আপুর কাজিন হয়। এতোই অপছন্দ তোমার তাকে, দেখা সাক্ষাৎ কিভাবে করবে?” দুআর মুখে যেনো আজ প্রশ্নের ফোয়ারার সৃষ্টি হলো। –“ভেবে দেখিনি। যা হবে দেখা যাবে। ফর্মালিটির খাতিরে কথা বলবো যদি জরুরি হয়।” –“হুম,বুঝেছি।” দুআ চুপ করে গেলো।রিজোয়ান ইয়াদকে কেনো ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করে,এটা জানতে তার আগ্রহী মন পুনরায় প্রশ্ন করতে চাইলো রিজোয়ানকে।কিন্তু,রিজোয়ানের গম্ভীর চেহারা দুআর বিবেকের কাছে তার প্রশ্নকে হার মানালো।দুআ মনে মনে ভাবছে, –“সবার প্রিয় ইয়াদকে,ভাইয়ার অপছন্দের কি আছে?ইয়াদ ছেলেটা আসলে কেমন?” দুআর মনে আজ শুধু অজানা প্রশ্নের উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।

---

[<< পূর্ববর্তী অধ্যায়](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep1) | [সিরিজ সূচি](https://golpohub.com/series/amar-chondraboti) | [পরবর্তী অধ্যায় >>](https://golpohub.com/episodes/amar-chondraboti-s1-ep3)