মধ্যরাতের অচেনা সংকেত

•6 মিনিট পড়া•934 শব্দ
মধ্যরাতের অচেনা সংকেত

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি নীরব হয় না।

দূরে কোনো গাড়ির শব্দ, কোথাও কুকুরের ডাক, ছাদের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ—সব মিলিয়ে শহরটা যেন ঘুমিয়েও জেগে থাকে।

সেদিন রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল।

জানালার কাঁচ বেয়ে পানির ফোঁটাগুলো নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছিল। ঘরের আলো বন্ধ। শুধু বিছানার পাশের ছোট্ট ল্যাম্পটা জ্বলছিল।

মাইশা বিছানায় শুয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রল করছিল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সে।

রাত ২টা ১৭ মিনিট।

— এত রাত হয়ে গেল!

মাইশা ফোনটা পাশে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই—

ট্রিং... ট্রিং...

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।

মাইশা চমকে উঠে বসল।

এই রাতে কে ফোন করছে?

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

Unknown Number.

কোনো নাম নেই।

মাইশা কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর কলটা কেটে যাবে ভেবে অপেক্ষা করল।

কিন্তু ফোনটা থামল না।

রিং... রিং... রিং...

অবশেষে একটু দ্বিধা নিয়ে কলটা রিসিভ করল।

— হ্যালো?

ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এল না।

শুধু হালকা বাতাসের মতো একটা শব্দ।

মাইশা আবার বলল—

— হ্যালো? কে বলছেন?

এবার একটা ছেলের কণ্ঠ ভেসে এল।

শান্ত।

কিছুটা নিচু।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে স্থির।

— মেহেজাবিন ইসলাম মাইশা?

মাইশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

— জ্বী... আপনি কে?

ওপাশের কণ্ঠটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল—

— আমাকে তুমি চেনো না। কিন্তু তোমার মা আমাকে চিনতেন।

মাইশা বিছানায় সোজা হয়ে বসল।

মায়ের কথা শুনতেই তার ঘুম পুরোপুরি উধাও হয়ে গেল।

— আমার মা?

— হ্যাঁ।

— আপনি আমার মাকে কীভাবে চিনতেন?

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

— সেটা এখন বলা যাবে না।

মাইশার কণ্ঠে বিরক্তি চলে এল।

— তাহলে এত রাতে ফোন করে মায়ের কথা বলছেন কেন?

ছেলেটা এবার ধীরে বলল—

— কারণ সময় হয়ে গেছে।

— কিসের সময়?

— সত্যিটা জানার সময়।

মাইশা কিছু বলতে যাচ্ছিল।

কিন্তু ছেলেটা তার আগেই বলল—

— তুমি তোমার মাকে নিয়ে যা জানো, তার সবটা সত্যি নয়।

মাইশা স্তব্ধ হয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।

তারপর খুব ধীরে বলল—

— আপনি কী বলতে চাইছেন?

— তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে...

— কী?

— বারো বছর আগে যে মেয়েটা সবার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল, তার সঙ্গে আসলে কী হয়েছিল।

মাইশার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেল ফোনের ওপর।

— আমার মা তো... মারা যাননি।

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর এল না।

এই নীরবতাটাই যেন মাইশার ভয় আরও বাড়িয়ে দিল।

— আপনি কে?

এবার ছেলেটা বলল—

— আমার নাম রায়হান ব্যাপারী।

মাইশা নামটা মনে করার চেষ্টা করল।

কোথাও শুনেছে?

না।

কিন্তু লোকটার কণ্ঠে এমন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে জানে মাইশার জীবনের এমন কিছু, যা মাইশা নিজেও জানে না।

মাইশা আবার প্রশ্ন করল—

— আপনি আমার মাকে কীভাবে চিনতেন?

রায়হান এবার বলল—

— তোমার মা শুধু আমার পরিবারকে চিনতেন না। আমাদের পরিবারের সঙ্গে তোমাদের পরিবারের একটা পুরোনো সম্পর্ক ছিল।

— কেমন সম্পর্ক?

— সেটা তোমার বাবা জানেন।

— তাহলে আপনি আমাকে ফোন করছেন কেন?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে রায়হান বলল—

— কারণ তোমার বাবা তোমাকে সবটা বলবেন না।

মাইশার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হলো।

— আপনি কি আমার বাবাকে চেনেন?

— হ্যাঁ।

— তাহলে উনাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারতেন।

— কিছু প্রশ্ন সরাসরি করা যায় না, মাইশা।

মাইশা চুপ করে গেল।

তারপর রায়হান বলল—

— কাল বিকেলে পুরোনো নদীর ঘাটে এসো।

মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল—

— কেন?

— তোমার মায়ের ব্যাপারে কিছু দেখানোর আছে।

— কী?

— সেটা সামনে এলে বুঝবে।

মাইশা একটু ভেবে বলল—

— আমি একা যাব না।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর রায়হান শান্ত গলায় বলল—

— একা আসার দরকার নেই। যাকে বিশ্বাস করো, তাকে সঙ্গে নিয়ে এসো।

মাইশা অবাক হলো।

ছেলেটা যেন তার বয়সের কথাটাও বুঝতে পারছে।

রায়হান আবার বলল—

— আর একটা কথা।

— কী?

— তোমার বাবাকে আজ রাতে কিছু বলো না।

— কেন?

— কারণ আমি নিশ্চিত নই, তোমার বাবা এখনো জানেন কি না যে পুরোনো গল্পটা আবার শুরু হয়েছে।

মাইশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

— কোন গল্প?

কিন্তু এবার ওপাশে শুধু নীরবতা।

— হ্যালো?

কোনো উত্তর নেই।

— হ্যালো? রায়হান ভাইয়া ?

কল কেটে গেছে।

মাইশা কিছুক্ষণ ফোনটা কানে ধরে বসে রইল।

তারপর স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

2:17 AM

সময়টা যেন হঠাৎ তার চোখে অস্বাভাবিক লাগতে শুরু করল।

সে কল হিস্ট্রি খুলল।

অচেনা নম্বরটা সেখানে আছে।

২ মিনিট ১৭ সেকেন্ড।

মাইশা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

মায়ের কথা তার মাথায় ঘুরছে।

“তোমার মা আমাকে চিনতেন।”

“তুমি তোমার মাকে নিয়ে যা জানো, তার সবটা সত্যি নয়।”

“বারো বছর আগে যে মেয়েটা সবার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল...”

মাইশা জানত, তার মা সম্পর্কে পরিবারে খুব বেশি কথা বলা হয় না।

ছোটবেলা থেকেই যখনই মায়ের প্রসঙ্গ উঠেছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আজ প্রথমবার কেউ এসে তাকে বলল—

তার জানা গল্পের বাইরেও আরেকটা গল্প আছে।

মাইশা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গেল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।

সে কাঁচে হাত রাখল।

মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

“আমার মা আসলে কী লুকিয়েছিলেন?”

ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরোনো ছবির দিকে।

ছবিটা তার মায়ের।

ছবিতে মা হাসছেন।

মাইশা ছবিটা হাতে তুলে নিল।

এতদিন এই মুখটাকে সে শুধু নিজের মা হিসেবেই চিনেছে।

আজ প্রথমবার মনে হলো—

এই হাসির আড়ালেও হয়তো কোনো গল্প ছিল।

কোনো ভয়।

কোনো গোপন কথা।

হয়তো এমন কিছু, যার জন্য একজন মানুষকে বারো বছর সবার চোখের আড়ালে থাকতে হয়েছিল।

মাইশা ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

তারপর খুব আস্তে বলল—

— মা... তুমি আসলে আমার কাছ থেকে কী লুকিয়েছিলে?

বাইরে হঠাৎ একটা বজ্রপাত হলো।

মাইশা চমকে জানালার দিকে তাকাল।

তার ফোনের স্ক্রিন আবার জ্বলে উঠল।

কোনো নতুন কল নয়।

শুধু কয়েক সেকেন্ড আগে পাওয়া অচেনা নম্বরটা এখনও স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে।

মাইশা নম্বরটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বরটা Save করতে গেল।

নাম লিখল—

রায়হান ব্যাপারী।

এক মুহূর্ত থেমে নামটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

তারপর ফোনটা রেখে দিল।

সে তখনও জানত না—

এই একটা ফোনকলই তার জীবনের সবচেয়ে পুরোনো কিছু দরজা খুলে দেবে।

আর সেই দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে এমন এক সত্যি—

যার শুরু মাইশার জন্মেরও আগে।

অধ্যায় 1 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

মধ্যরাতের অচেনা সংকেত

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন