ফেস্ট শেষ হওয়ার পর রাতটা বেশ শান্ত ছিল।
সারাদিনের ভিড়, হৈচৈ, গান আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর মাইশা অবশেষে বাসায় ফিরে নিজের ঘরে এসে বসেছিল।
শাড়িটা খুলে আরামদায়ক পোশাক পরে সে বিছানায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল।
ফেস্টে তোলা ছবিগুলো একে একে গ্যালারিতে আসছিল।
মোমোর তোলা ছবি।
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি।
মঞ্চের সামনে তোলা কয়েকটা ছবি।
আর নীল শাড়ি পরা কয়েকটা ছবি।
মাইশা একটা ছবি দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
“মন্দ হয় নাই।”
তারপর ছবিটা মোমোকে পাঠিয়ে দিল।
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই—
মোমো:
“এই ছবিটা আমি পোস্ট করব।”
মাইশা লিখল,
“করিস না ”
মোমো:
“কেন?”
মাইশা:
“এমনি।”
মোমো:
“তুইও রায়হানের মতো ‘এমনি’ বলা শুরু করছিস!”
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
“এই মেয়েটা সব বুঝে ফেলে কেন!”
অন্যদিকে রায়হান তখন নিজের ঘরে বসে ছিল।
ঘরের আলোটা খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। বিছানার পাশে ফোনটা রাখা।
সে Instagram খুলল।
কিছুক্ষণ স্ক্রল করার পর থেমে গেল।
তার গ্যালারিতে আজকের একটা ছবি।
মাইশা।
নীল শাড়িতে।
রায়হান ছবিটা আবার খুলল।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসল।
তারপর Instagram Story-তে ছবিটা দিল।
গান হিসেবে বেছে নিল—
“I Wanna Be Yours” — Arctic Monkeys.
Story-টা সে Close Friends-এ দিল।
সবার জন্য নয়।
শুধু তার কাছের কয়েকজন বন্ধু দেখতে পারবে।
Story পোস্ট করার পর রায়হান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
দুই সেকেন্ড পর আবার তুলে দেখল।
কেউ দেখেছে কি না।
নিজেই হেসে ফেলল।
“আমি আবার কী করতেছি!”
ঠিক তখনই তার Close Friends-এর একজন, আয়ান, Story দেখে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ দিল।
আয়ান:
“মামা ”
রায়হান রিপ্লাই দিল,
“কী?”
আয়ান লিখল,
“এই মাইয়া দা কে রে? MASHAALLAH, অনেক সুন্দর! ”
রায়হান কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
“নজর দিস না।”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে—
“কেন? ”
রায়হান এবার লিখল,
“ও আমার অক্সিজেন।”
মেসেজটা পাঠানোর পর নিজেই কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।
তারপর ফোনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
“আমি এসব কী বলতেছি!”
আয়ান তখন একের পর এক হাসির ইমোজি পাঠাচ্ছে।
আয়ান:
“ওহহহহ মামা! ”
আয়ান:
“কাহিনি অনেক দূর গড়াইছে দেখি!”
আরেক বন্ধু মেসেজে ঢুকে বলল,
“চালায় যা বন্ধু, আমরা কিছু দেখি নাই।”
রায়হান বিরক্ত হয়ে লিখল,
“তোরা চুপ কর।”
আয়ান আবার লিখল,
“মামা, বিয়ের দাওয়াত কিন্তু চাই।”
রায়হান ফোনটা বিছানায় ছুড়ে রেখে বলল,
“পাগল সব!”
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোনটা হাতে নিল।
Story-টা এখনও আছে।
নীল শাড়িতে মাইশা।
পেছনে বাজছে সেই গান।
রায়হানের ঠোঁটের কোণে আবার একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
পরদিন সকাল।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে সকাল থেকেই ভিড়।
কেউ ক্লাসে ঢুকছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
স্কুলের গেটের একটু দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।
গাড়ির পাশে রায়হান।
সে আসলে কোনো বিশেষ কাজে আসেনি।
নিজেকেই বলেছিল,
“এমনিই আসছি।”
কিন্তু নিজের মনকে সে যতই বোঝাক, সে জানত—
সে কার জন্য অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর ছাত্রছাত্রীরা বের হতে শুরু করল।
রায়হান দূর থেকে গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তাকে দেখা গেল।
মাইশা।
কিন্তু আজকের মাইশা গতকালের মতো শান্ত নয়।
মুখটা গম্ভীর।
হাঁটার গতি দ্রুত।
হাতে ব্যাগ শক্ত করে ধরা।
দেখে মনে হচ্ছে সে ভেতর থেকে রাগে ফুঁসছে।
রায়হান একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল।
মাইশা গেট দিয়ে বেরিয়ে এল।
রায়হান তাকে দেখেও এমন ভান করল যেন কিছুই দেখেনি।
মাইশা তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রায়হান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
“এই মাইশা…”
মাইশা থামল না।
রায়হান আবার বলল,
“শুনো না।”
মাইশা এবারও হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“Shut up. Bye.”
রায়হান কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আচ্ছা?”
মাইশা পেছনে তাকালও না।
রায়হান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“সকাল সকাল আবার কার ওপর রাগ?”
ঠিক তখনই মোমো গেট দিয়ে বের হলো।
রায়হান তাকে থামাল।
“মোমো।”
মোমো তাকিয়ে বলল,
“জি?”
“মাইশার কী হয়েছে?”
মোমো প্রথমে মাইশার চলে যাওয়ার দিকে তাকাল।
তারপর রায়হানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি জানেন না?”
“না।”
মোমো একটু হেসে বলল,
“আজকে তো ও পুরো স্কুলের সঙ্গে যুদ্ধ করে বের হইছে।”
রায়হান ভ্রু কুঁচকাল।
“কী হয়েছে?”
“একটা মেয়ের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে।”
“কার সঙ্গে?”
“আনিকা।”
“কী নিয়ে?”
মোমো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আনিকা মাইশাকে নিয়ে খুব বাজে কথা বলছিল।”
রায়হানের মুখের হাসি একটু কমে গেল।
“তারপর?”
“মাইশা প্রথমে কিছু বলে নাই। পরে মেয়েটা আবার সামনে এসে কথা বলায়…”
মোমো একটু থেমে বলল,
“মাইশা রেগে গিয়ে ওকে একটা থাপ্পড় দিয়ে বসছে।”
রায়হান অবাক হয়ে বলল,
“কি?”
“হুম।”
“মাইশা?”
“হ্যাঁ।”
মোমো মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আর রাগের মাথায় বলছে—‘এই ইঁদুরের মতো চেহারা নিয়ে আমার সামনে আর আসবি না।’”
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই মুখের কোণে একটা হাসি চলে এল।
মোমো বলল,
“আপনি হাসতেছেন কেন?”
রায়হান দ্রুত মুখটা স্বাভাবিক করে বলল,
“না… কিছু না।”
মোমো চোখ ছোট করে তাকাল।
“আপনারও ওই ‘কিছু না’ রোগ আছে দেখি।”
রায়হান হেসে বলল,
“ওর সঙ্গে কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল সেটা জানো?”
“ঠিকঠাক জানি না। তবে আনিকা নাকি মাইশার কিছু ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলছিল।”
রায়হান এবার গম্ভীর হলো।
“মাইশা ঠিক কাজ করেনি।”
মোমো মাথা নাড়ল।
“জানি। আমিও ওকে বলছি। কিন্তু আপনি তো জানেন, রাগ উঠলে ওর মাথায় কিছু থাকে না।”
রায়হান মাইশার চলে যাওয়ার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটাকে সে নীল শাড়িতে দেখে মনে মনে বলেছিল “আল্লাহ, এমন কেন!”, সেই মেয়েটাই এখন কারও সঙ্গে ঝামেলা করে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেছে।
রায়হান আস্তে করে বলল,
“এই মাইয়া তো দেখি শাড়ির চেয়েও বেশি ডেঞ্জারাস।”
মোমো হেসে ফেলল।
“আপনি এখনও বুঝেন নাই?”
“কী?”
“মাইশুকে সামলানো সহজ না।”
রায়হান মুচকি হেসে বলল,
“সেটা তো অনেক আগেই বুঝছি।”
মোমো চলে গেল।
রায়হান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ফোন বের করল।
Instagram খুলল।
গত রাতের Story এখনও দেখা যাচ্ছে।
নীল শাড়ির ছবি।
সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
তারপর গ্যালারি খুলল।
আরেকটা ছবি।
ফেস্টের সময় লুকিয়ে তোলা।
মাইশা হাসছে।
রায়হান ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“একদিকে এই মেয়েটা এমন সুন্দর করে হাসে… আর অন্যদিকে রাগলে মানুষকে থাপ্পড় মারে।”
সে মাথা নাড়িয়ে হেসে ফেলল।
“সত্যিই ডেঞ্জারাস।”
কিন্তু তার হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
ফোনে আবার একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
“মাইশার সঙ্গে যতটা কাছে যাচ্ছ, ততটাই সাবধানে থেকো।”
রায়হানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
আরেকটা মেসেজ এল—
“কারণ ২০১৪-এর সত্যিটা শুধু ওর পরিবারের জন্য বিপজ্জনক নয়।”
রায়হান ধীরে ধীরে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করল।
তার চোখ এবার আর হাসছিল না।
মাইশার দিকে তাকানোর মানুষটা হয়তো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।
কারণ সে বুঝতে শুরু করেছে—
মাইশাকে নিয়ে তার মনে যতই অন্যরকম কিছু তৈরি হোক, তাদের চারপাশের রহস্যটা এখনও শেষ হয়নি।
বরং—
এটা আরও গভীর হচ্ছে।
