সিজন 1 অধ্যায় 12 রোমান্টিক ভ্রমণ #ঈর্ষা #গাড়ি ভ্রমণ #ঘুম মাইশারায়হান ব্যাপারীমোমোলামিয়া

শীতের সকালে অজানা যাত্রা

•8 মিনিট পড়া•1,174 শব্দ
শীতের সকালে অজানা যাত্রা

ডিসেম্বরের ছুটিতে কয়েকদিন বাসায় বসে থাকতে থাকতে মাইশার জীবনটা একেবারে পানসে হয়ে গিয়েছিল।

সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা, কিছুক্ষণ ফোন দেখা, একটু ঘোরাঘুরি, আবার বিছানায় শুয়ে থাকা—এই একই রুটিন।

একদিন দুপুরে লামিয়া এসে বলল,

"মাইশু, নোয়াখালী যাবি?"

মাইশা বিছানা থেকে উঠে বসল।

"কবে?"

"কাল ভোরে।"

"আমি যাব।"

লামিয়া হেসে বলল,

"এত তাড়াতাড়ি রাজি?"

"বাসায় বসে থেকে কী করব?"

মোমোকেও খবর দেওয়া হলো। মোমো শুনেই রাজি।

ওদের পরিকল্পনা হলো—ভোরে বের হবে। নোয়াখালীতে গিয়ে প্রথমে নতুন বাড়িতে থাকবে। দুই দিন পর নানুর বাড়িতে যাবে।

মাইশার বাবা কাজের কারণে চট্টগ্রাম যাবে বলে মেয়েকে লামিয়ার সঙ্গে যেতে অনুমতি দিলেন।

সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল।

শুধু একটা ব্যাপার ইচ্ছে করেই কাউকে বলা হলো না।

রায়হানকে।

মাইশা নিজেই বলেছিল,

"ওনাকে কিছু বলবি না।"

মোমো হেসে বলেছিল,

"কেন?"

"সারপ্রাইজ দেব।"

ভোর

ভোরের ঠান্ডা বাতাসে চারপাশ তখনও ঘুমিয়ে।

গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

লামিয়া আগে থেকেই তৈরি।

মোমোও এসে গেছে।

মাইশা তখনও পুরোপুরি ঘুমের মধ্যে।

কালো একটা হুডি পরে, মাথার হুডটা অর্ধেক মাথায় তুলে, চোখেমুখে ঘুমের ছাপ নিয়ে সে গাড়ির পেছনের সিটে বসে পড়ল।

মোমো তাকে দেখে হেসে বলল,

"তুই কি মানুষ, নাকি ঘুমন্ত ভূত?"

মাইশা চোখ না খুলেই বলল,

"চুপ কর।"

তারপর আবার মাথা সিটে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

লামিয়া সামনে বসে ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলছিল।

মোমো পেছনের সিটের বাম পাশে বসেছিল।

মাইশা তখন মাঝখানে।

গাড়ির অন্য পাশটা খালি।

ঠিক তখনই বাইরে আরেকটা গাড়ির শব্দ হলো।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে রায়হান এসে দাঁড়াল।

সে জানতই না মাইশা নোয়াখালী যাচ্ছে।

মোমো তাকে দেখে মুখ চেপে হাসল।

রায়হান গাড়ির কাছে এসে বলল,

"কোথায় যাচ্ছিস তোরা?"

মোমো হেসে বলল,

"নোয়াখালী।"

রায়হান অবাক।

"নোয়াখালী?"

"হ্যাঁ।"

রায়হান ভ্রু কুঁচকে বলল,

"আমারে না বলে বেরিয়ে নোয়াখালী যাবি?"

তারপর হঠাৎ পেছনের সিটের দিকে তাকাল।

কালো হুডি পরা একটা মেয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর চিনতে পারল।

মাইশা।

ঘুমন্ত অবস্থায়ও মেয়েটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।

চোখ বন্ধ, চুলগুলো এলোমেলো, কালো হুডির ভেতর মুখটা আরও শান্ত লাগছে।

রায়হানের মুখে অজান্তেই একটা হাসি চলে এল।

মনে হলো—

এই মেয়েটার প্রেমে সে হয়তো অনেক আগেই পড়ে গেছে। শুধু মাইশাই সেটা জানে না।

রায়হান নিচু গলায় বলল,

"তুই তো আমাকে পুরো সারপ্রাইজ দিয়ে দিলি।"

মাইশা অবশ্য কিছুই শুনল না।

সে তখনও ঘুমাচ্ছে।

লামিয়া পেছন ফিরে বলল,

"সামনে আসো।"

রায়হান সামনে বসতে যাচ্ছিল।

কিন্তু লামিয়া হঠাৎ বলল,

"না না, সামনে আমি বসব। তুমি পেছনে যাও।"

রায়হান হেসে বলল,

"আচ্ছা।"

লামিয়া সামনের সিটে বসে পড়ল।

রায়হান পেছনের দরজা খুলে উঠতেই মাইশা একটু নড়ল।

কিন্তু ঘুম ভাঙল না।

রায়হান পেছনের ডান পাশে বসে পড়ল।

এখন পেছনের সিটে—

মোমো — মাইশা — রায়হান।

মোমো বাম পাশে।

মাইশা মাঝখানে।

রায়হান ডান পাশে।

মোমো চারদিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

"লামিয়া, আল্লাহ তোর বিচার করবে!"

লামিয়া সামনে থেকে বলল,

"কেন?"

"এই দুইজনের মাঝখানে আমাকে বসাইছিস কেন?"

রায়হান হেসে ফেলল।

মোমোও হাসতে হাসতে বলল,

"আমি তো কিছুই করিনি!"

লামিয়া বলল,

"তুই মাঝখানেই থাক।"

মোমো মাথা নেড়ে বলল,

"আচ্ছা, ঠিক আছে।"

গাড়ি চলতে শুরু করল।

ভোরের রাস্তা তখনও বেশ ফাঁকা।

মাইশা ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠছিল।

কিছুক্ষণ পর সে চোখ মেলে সামনে তাকাল।

তারপর ডান দিকে তাকাতেই—

রায়হান।

মাইশা পুরো জমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড সে শুধু তাকিয়ে রইল।

"আপনি এখানে?!"

রায়হান হেসে বলল,

"হ্যাঁ।"

"আপনি এখানে কী করেন?"

"নোয়াখালী যাচ্ছি।"

"কিন্তু..."

মাইশা লামিয়ার দিকে তাকাল।

"তুমি ওনাকে বলছ?"

লামিয়া হেসে বলল,

"আমি না।"

মোমো বলল,

"সারপ্রাইজ!"

মাইশা আবার রায়হানের দিকে তাকাল।

রায়হান মুচকি হেসে বলল,

"আমারে না বলে নোয়াখালী চলে যাচ্ছিলে?"

মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

"আপনাকে বলতেই হবে নাকি?"

"না। তবে বললে ভালো লাগত।"

"সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।"

রায়হানের মুখের হাসিটা আরও গভীর হলো।

"সারপ্রাইজটা খারাপ হয়নি।"

মাইশা চোখ ঘুরিয়ে সামনে তাকাল।

"বেশি খুশি হওয়ার কিছু নাই।"

"আমি তো খুশি।"

"কেন?"

রায়হান শান্তভাবে বলল,

"কারণ তুমি এখানে।"

মাইশা আর কিছু বলল না।

মোমো চুপচাপ দুজনের কথা শুনে হাসছিল।

কিছুক্ষণ পর গাড়ির ভেতর নরম সুরে “I Was Never There” বাজতে শুরু করল।

মাইশা গানটা মন দিয়ে শুনতে লাগল।

তার চোখে তখনও একটু ঘুম।

গাড়ির দুলুনি, শীতের সকাল আর গানের ধীর সুর—সব মিলিয়ে আবার তার চোখ ভারী হয়ে এল।

রায়হান পাশে বসে চুপচাপ ছিল।

কিছুক্ষণ পর মোমোও ঘুমিয়ে পড়ল।

লামিয়া সামনে।

ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে।

আর পেছনে ধীরে ধীরে আবার নীরবতা নেমে এল।

মাইশার মাথা একবার সামনে ঝুঁকল।

আবার সোজা হলো।

তারপর ধীরে ধীরে ডান দিকে হেলে গেল।

রায়হান বুঝতে পারছিল কী হতে যাচ্ছে।

কিন্তু সে নড়ল না।

একসময় মাইশার মাথা এসে থামল—

রায়হানের কাঁধে।

রায়হান কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

তার প্রিয় মানুষটা আজ তার পাশেই।

তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।

সে মনে মনে বলল,

"আজকে তোকে একটুও বিরক্ত করব না। ঘুমা।"

রায়হান নিজের অবস্থানও বদলাল না।

যাতে মাইশার ঘুম না ভাঙে।

গাড়ির ভেতর সবাই চুপ।

শুধু গানটা আস্তে বাজছে।

কিছুক্ষণ পর মাইশার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।

ঘুমের মধ্যেই সে একটু নড়ল।

রায়হান তার ফোনের দিকে তাকাল না।

মাইশা ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।

স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই তার চোখে পড়ল—

আলভি।

তার বেস্ট ফ্রেন্ড।

আর তার সঙ্গে একটা ছোট্ট মেয়ের ছবি।

আলভির ছোট বোন।

মাইশা মেসেজ খুলল।

আলভি লিখেছে,

"কোথায় আছিস?"

মাইশা উত্তর দিল।

কথা শুরু হলো।

একটু পর ভিডিও কলও এল।

মাইশা খুব আস্তে কথা বলছিল, যাতে বাকিদের ঘুম না ভাঙে।

আলভির ছোট বোন ভিডিও কলে চিৎকার করে বলছিল,

"মাইশা আপু!"

মাইশা হেসে ফেলল।

"আরে আস্তে!"

মেয়েটা আবার চিৎকার করে বলল,

"আপু!"

মাইশা ওর সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

রায়হান কিছু বলল না।

কিন্তু তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

সে চুপচাপ সামনে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর মাইশা ফোন রেখে দেখল রায়হান অস্বাভাবিকভাবে চুপ।

সে আস্তে বলল,

"আপনার কী হয়েছে?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"কিছু না।"

"না, কিছু একটা হয়েছে।"

"বললাম তো কিছু না।"

মাইশা একটু তাকিয়ে থেকে বলল,

"আপনি মন খারাপ করেছেন?"

রায়হান হেসে বলল,

"না।"

মাইশা বুঝতে পারছিল না।

তারপর রায়হান হঠাৎ বলল,

"আলভিও কি চট্টগ্রামে থাকে?"

মাইশা একটু অবাক হয়ে তাকাল।

"হ্যাঁ।"

"ওহ।"

আর কিছু বলল না রায়হান।

মাইশা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—

কিছু একটা হয়েছে।

কিন্তু রায়হান সেটা বলছে না।

সে আর জোর করল না।

শুধু আবার মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে বসে রইল।

রায়হানও জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি।

সে জানে, মাইশার জীবনে তার জায়গাটা এখনও স্পষ্ট নয়।

কিন্তু আজ অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য—

মাইশা তার পাশে।

এটুকুই যেন তার কাছে যথেষ্ট।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পেরিয়ে অবশেষে নোয়াখালীর পরিচিত রাস্তা চোখে পড়ল।

মাইশার ঘুম তখন পুরোপুরি কেটে গেছে।

গাড়ি যখন তাদের নতুন বাড়ির সামনে এসে থামল, মাইশা জানালার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।

"এসে গেছি!"

লামিয়াও নেমে পড়ল।

মোমো ব্যাগ হাতে নামল।

মাইশা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশের দিকে তাকাল।

পরিচিত বাড়ি।

পরিচিত উঠান।

পরিচিত মানুষগুলোর কণ্ঠ।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাড়ির সবাই তাদের ঘিরে ফেলল।

কে এসেছে, কেমন আছে, ঢাকা থেকে কবে বেরিয়েছে—সব নিয়ে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।

মাইশা একে একে সবার সঙ্গে দেখা করল।

দুই দিন তারা এখানেই থাকবে।

তারপর যাবে নানুর বাড়িতে।

রায়হানও তাদের নামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

"তোমরা ঠিকমতো থেকো।"

মাইশা বলল,

"আপনি?"

"আমি আমাদের বাসায় যাচ্ছি।"

মাইশা মাথা নাড়ল।

"আচ্ছা।"

রায়হান গাড়িতে উঠতে উঠতে একবার পেছনে তাকাল।

মাইশা তখন বাড়ির সবার মাঝে দাঁড়িয়ে।

চোখে সেই পরিচিত উজ্জ্বলতা।

রায়হান মৃদু হেসে গাড়িতে উঠে গেল।

কিন্তু গাড়ি চলে যাওয়ার পরও তার মাথায় একটা দৃশ্যই ঘুরছিল—

কালো হুডি পরা ঘুমন্ত মাইশা, যে তাকে না জানিয়েই নোয়াখালী এসে তাকে সারপ্রাইজ দিয়েছিল।

আর মাইশা?

সে তখনও জানত না—

এই নোয়াখালী সফরটা শুধু কয়েক দিনের বেড়ানো হয়ে থাকবে না।

কারণ এই বাড়ির দেয়ালের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু গল্প,

যেগুলো একদিন তার নিজের জীবনকে বদলে দেবে।

অধ্যায় 12 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

শীতের সকালে অজানা যাত্রা

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন