বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল।
নোয়াখালীর বাড়ির বিশাল উঠানটায় সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। কেউ গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার ছোটদের নিয়ে হাসাহাসি করছে।
মাইশু তখন বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়িটা ঠিক করছিল।
মোমো ফোন হাতে নিয়ে একের পর এক ছবি তুলছে।
"এইদিকে তাকাস!"
"দাঁড়া, চুলটা ঠিক করি।"
"মাইশা, একটু হাস!"
মাইশু বিরক্ত হয়ে বলল,
"আর কত ছবি তুলবি?"
মোমো বলল,
"যতক্ষণ না একটা perfect ছবি পাই।"
লামিয়া পাশ থেকে বলল,
"তুই এমন ভাব করছিস যেন ছবি তুললে তোর জরিমানা দিতে হবে।"
মাইশু হেসে ফেলল।
"তোরা দুইজন পাগল।"
ঠিক তখনই পেছন থেকে রায়হানের গলা এল—
"একটা ছবি আমিও তুলতে পারি?"
মাইশু ঘুরে তাকাল।
রায়হান দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো।
মাইশু একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
"আপনি?"
রায়হান হালকা হেসে বলল,
"হ্যাঁ, আমি।"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে লামিয়ার দিকে তাকাল।
লামিয়া ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
রায়হান মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমার সাথে একটা ছবি তুলবে?"
মাইশু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর একটু নিচু গলায় বলল,
"আচ্ছা..."
মোমো আর লামিয়া দুজনেই—
"ওওওওওওওওও! "
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করে ইশারা করল—
চুপ।
দুজনেই মুখ চেপে হাসতে লাগল।
মাইশুর গাল হালকা লাল হয়ে গেছে।
সে আস্তে করে বলল,
"তোরা চুপ করবি?"
মোমো বলল,
"আমরা তো কিছুই বলিনি!"
"এই 'ওওওও' কে বলল?"
"আমরা না।"
লামিয়া বলল,
"হয়তো বাতাস বলেছে।"
মাইশু মাথায় হাত দিল।
"আল্লাহ!"
রায়হান হেসে ফেলল।
তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কাজিনকে বলল,
"ভাই, একটা ছবি তুলে দেবেন?"
সে ফোনটা হাতে নিল।
রায়হান মাইশার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
মাইশু একটু দূরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল।
রায়হান আস্তে বলল,
"এত দূরে দাঁড়াচ্ছ কেন?"
"এমনিই।"
"ছবিতে দুজনকেই দেখা যাবে তো?"
মাইশু হালকা হেসে তার পাশে দাঁড়াল।
ক্যামেরার দিকে তাকানোর সময় মাইশু একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
রায়হান সেটা দেখে মুচকি হাসল।
Click.
প্রথম ছবি।
"আরেকটা," রায়হান বলল।
Click.
দ্বিতীয় ছবি।
তৃতীয়বার মাইশু একটু স্বাভাবিক হয়ে হাসল।
Click.
তৃতীয় ছবিটা দেখে রায়হান বলল,
"এইটা ভালো হয়েছে।"
মাইশু বলল,
"দেখি।"
রায়হান ফোনটা দেখাল।
ছবিটায় দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
মাইশুর মুখে নরম হাসি।
রায়হানের চোখে সেই চেনা শান্ত expression।
মাইশু ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"হুম... ভালোই।"
মোমো পেছন থেকে বলল,
"শুধু ভালো?"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে মোমোর দিকে তাকাল।
মোমো আবার মুখ চেপে হাসল।
কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে ছবি তোলার সিদ্ধান্ত হলো।
মোমো, লামিয়া, মাইশু আর রায়হান—চারজন একসঙ্গে দাঁড়াল।
প্রথম ছবিতে মোমো অদ্ভুত একটা face দিল।
দ্বিতীয় ছবিতে লামিয়া মাইশুর কাঁধে মাথা রাখল।
তৃতীয় ছবিতে মাইশু হেসে ফেলল কারণ রায়হান ঠিক তখনই বলেছিল,
"মাইশা, serious হও।"
মাইশু বলেছিল,
"আপনি আগে serious হন।"
আর সেই মুহূর্তটাই ক্যামেরায় ধরা পড়ে গেল।
রায়হান ছবিগুলো পরে নিজের ফোনে নিল।
মোমো বলল,
"রায়হান ভাই, story দিবেন?"
রায়হান বলল,
"দেখি।"
মোমো চোখ টিপে বলল,
"দিবেনই।"
রায়হান কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে Instagram খুলল।
প্রথম story-তে চারজনের একটা ছবি দিল।
কোনো caption না।
শুধু একটা ছোট্ট white heart.
দ্বিতীয় story-তে মাইশার সঙ্গে তোলা ছবিটা।
তার ওপর খুব ছোট করে লিখল—
"A good day."
তৃতীয় story-তে সবাই হাসছে এমন একটা candid ছবি।
সঙ্গে একটা soft music।
মাইশু তখনও জানত না, রায়হানের story-তে তার ছবি উঠে গেছে।
কিছুক্ষণ পর
মাইশু নিজের ফোন হাতে নিয়ে বসেছিল।
হঠাৎ মোমো দৌড়ে এসে বলল,
"মাইশা!"
"কী?"
"তুই রায়হানের story দেখেছিস?"
মাইশু ভুরু কুঁচকে বলল,
"না। কেন?"
মোমো ফোনটা সামনে ধরল।
মাইশু স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
তার নিজের ছবি।
রায়হানের সঙ্গে।
মাইশু কয়েক সেকেন্ড চুপ।
তারপর বলল,
"এইটা story-তে দিল কেন?"
মোমো মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"কেন? ছবি তো সুন্দর।"
লামিয়া পাশে এসে বলল,
"হ্যাঁ, অনেক সুন্দর।"
মাইশু একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
"তোরা আবার শুরু করিস না।"
মোমো হেসে বলল,
"আমরা কিছু বলছি না।"
রাতের দিকে বাড়ির সবাই যখন ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে ফিরছিল, মাইশু বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল।
রায়হানও কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল।
মাইশু হঠাৎ বলল,
"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
রায়হান ফোন থেকে চোখ তুলল।
"হুম?"
"আপনার পুরো নাম কী?"
রায়হান একটু অবাক হলো।
"হঠাৎ?"
"এমনিই।"
রায়হান মুচকি হেসে বলল,
"আমির ইসলাম রায়হান।"
মাইশু কয়েক সেকেন্ড নামটা মনে মনে বলল।
"আমির ইসলাম রায়হান..."
রায়হান বলল,
"কেন?"
মাইশু মাথা নাড়ল।
"কিছু না।"
"এতদিন পর পুরো নাম জানলে?"
"হ্যাঁ।"
রায়হান হেসে বলল,
"তাহলে এখন থেকে কী বলে ডাকবে?"
মাইশু একটু ভেবে বলল,
"রায়হানই ভালো।"
রায়হান বলল,
"ঠিক আছে।"
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
দূরে রাতের বাতাসে নারকেল পাতার শব্দ হচ্ছিল।
মাইশু জানত না—
এই মানুষটার পুরো নাম আজ প্রথম জানলেও,
তার জীবনে এই নামটা আরও অনেক বছর ধরে থেকে যাবে।
আর রায়হান?
সে জানত না, আজ যে মেয়েটার সঙ্গে তোলা একটা সাধারণ ছবি সে story-তে দিয়েছে,
একদিন সেই ছবিটাই হয়তো তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
