নোয়াখালীর সেই বিকেলটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল।
নতুন বাড়ির চারপাশে তখন এক ধরনের শান্ত পরিবেশ। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে, উঠানের এক পাশে কয়েকজন বড়রা বসে গল্প করছেন। মোমো আর লামিয়া তখনও মাইশাকে নিয়ে ব্যস্ত।
মাইশা বারান্দার এক কোণে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের ছবি দেখছিল।
কিছুক্ষণ আগেই রায়হান তার সঙ্গে তোলা ছবিগুলো স্টোরিতে দিয়েছে।
প্রথমে গ্রুপ ছবি।
তারপর তাদের দুজনের ছবি।
তারপর আরেকটা candid ছবি।
মাইশা ছবিগুলো দেখছিল আর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসছিল।
হঠাৎ মোমো পাশ থেকে উঁকি দিয়ে বলল,
"কী দেখছিস?"
মাইশা তাড়াতাড়ি ফোনটা নামিয়ে ফেলল।
"কিছু না।"
লামিয়া সঙ্গে সঙ্গে পাশে এসে বসে বলল,
"কিছু না মানে?"
"কিছু না মানে কিছু না!"
মোমো চোখ ছোট করে তাকাল।
"রায়হানের স্টোরি দেখছিস, তাই না?"
মাইশা একটু থেমে গেল।
"তাতে কী হয়েছে?"
লামিয়া হেসে বলল,
"কিছু হয় নাই। কিন্তু একটা কথা বলি?"
"বল।"
"তোর মুখটা লাল হয়ে গেছে।"
"চুপ কর!"
মোমো হেসে উঠল।
"ওই যে! ধরা খাইছিস!"
মাইশা বিরক্ত হয়ে ফোনটা উল্টো করে রেখে দিল।
"তোরা দুইজন না, একদম অসহ্য।"
লামিয়া বলল,
"আমরা অসহ্য না। আমরা সত্যিটা দেখতে পাচ্ছি।"
মাইশা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
"কী সত্যি?"
মোমো আর লামিয়া একসঙ্গে বলে উঠল,
"কিছুই না! "
মাইশা বুঝল, এদের সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই।
সে উঠে ভেতরে চলে গেল।
কিন্তু তার যাওয়ার পরও মোমো আর লামিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।
অন্যদিকে—রায়হান
রায়হান তখন নিজের ঘরে।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন স্ক্রল করছিল।
তার স্টোরির ভিউ বাড়ছে।
একশো।
দুইশো।
তারপর একের পর এক রিপ্লাই।
প্রথমে সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু হঠাৎ একটা মেসেজ দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
Ayan:
"মামা "
রায়হান রিপ্লাই দিল,
"কী?"
দুই সেকেন্ড পর আবার মেসেজ।
"ভাবি তো শেইইইই! "
রায়হান কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
"ভাবি?"
তারপর আবার মেসেজ।
"ভাই সত্যি বল, এতদিন লুকাইছিলি কেন?"
রায়হান দ্রুত টাইপ করল,
"কী লুকাইছি?"
Ayan সঙ্গে সঙ্গে তিনটা laughing emoji পাঠাল।
"আমারে বোকা বানাস না।"
"স্টোরি দেখছি।"
"একটা না, তিনটা।"
"তাও আবার একজন মেয়ে।"
"তারপর 'A good day.' "
রায়হান কপালে হাত রাখল।
"আল্লাহ..."
সে লিখল,
"ও শুধু বন্ধু।"
মেসেজ দেখা হলো।
কিন্তু উত্তর এলো না।
বরং কয়েক সেকেন্ড পর Ayan একটা screenshot পাঠাল।
সেটা ছিল রায়হানের নিজের স্টোরি।
মাইশার সঙ্গে তার ছবির ওপর Ayan বড় করে লিখেছে—
“আমাদের নতুন ভাবি? ”
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
Ayan কল ধরেই হেসে বলল,
"কী রে, জামাই?"
"তুই স্টোরি ডিলিট কর।"
"কেন?"
"ডিলিট কর।"
"কিন্তু সত্যি তো সুন্দর হইছে!"
"আয়ান!"
"আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করিস না।"
"তুই এসব শুরু করিস না।"
Ayan এবার একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বলল,
"ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা বল।"
"কী?"
"তুই মেয়েটারে পছন্দ করিস?"
রায়হান চুপ।
Ayan বলল,
"চুপ কেন?"
"তুই এসব বুঝবি না।"
"মানে পছন্দ করিস।"
"আমি কিছু বলি নাই।"
"চুপ থাকা মানেই হ্যাঁ।"
রায়হান হালকা হেসে ফেলল।
"তুই বেশি কথা বলিস।"
"আর তুই কম বলিস। তাই তোকে দিয়ে সত্যি বের করা কঠিন।"
"এখন রাখ।"
"ঠিক আছে জামাই ভাই।"
কল কেটে গেল।
রায়হান ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিল।
তারপর আবার তুলে নিল।
স্টোরি খুলল।
মাইশার ছবিটা আবার দেখল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল।
"ভাবি নাকি..."
সে মাথা নাড়ল।
"পাগলগুলা।"
কিন্তু তার মুখের হাসিটা আর গেল না।
এক ঘণ্টা পর
রায়হানের বন্ধুদের একটা গ্রুপ ছিল।
নাম—
“ভাইদের আড্ডা 2.0”
গ্রুপে সাধারণত পড়াশোনা, ক্রিকেট, মজা—সবকিছু নিয়েই কথা হতো।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় গ্রুপের আলোচনার বিষয় একটাই।
মাইশা।
Ayan প্রথমে রায়হানের স্টোরির screenshot পাঠাল।
তারপর লিখল,
"ভাইয়েরা, পরিচিত হও। আমাদের ভাবি।"
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
"ওহহহহ! রায়হান finally! "
আরেকজন—
"মামা এতদিন single সাজছিলি?"
আরেকজন—
"মেয়েটা সুন্দর তো! "
Ayan লিখল,
"সুন্দর না? সুন্দর বললে কম বলা হয়।"
রায়হান গ্রুপ খুলে সব পড়ছিল।
তারপর লিখল,
"তোরা থামবি?"
সঙ্গে সঙ্গে reply—
"না।"
তারপর আরেকজন—
"ভাবি কবে থেকে?"
রায়হান লিখল,
"ভাবি না।"
Ayan:
"তাহলে?"
রায়হান:
"বন্ধু।"
Ayan:
"বন্ধুদের সঙ্গে তিনটা ছবি একদিনে?"
রায়হান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কী উত্তর দেবে সে নিজেও বুঝতে পারল না।
শেষে শুধু লিখল—
"তোদের কাজ নাই?"
Ayan:
"আছে। তোকে জ্বালানো।"
রায়হান মাথা নাড়ল।
"শেষ..."
কিন্তু তখনই আরেকজন একটা নতুন স্টোরি দিল।
স্টোরিতে রায়হানের সেই ছবিটা।
আর mention—
@Rayhan
তার নিচে লেখা—
“ভাইয়ের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন। ভাবি তো শেইইই! ”
রায়হান সেটা দেখেই উঠে বসে গেল।
"এইটা আবার কে দিল!"
সে সঙ্গে সঙ্গে screenshot নিয়ে বন্ধুকে পাঠাল।
"ডিলিট কর।"
ওপাশ থেকে উত্তর—
"কেন? সত্যি তো সুন্দর লাগছে।"
"ডিলিট কর বলছি।"
"না।"
"আয়ান!"
"হুম জামাই ভাই?"
"তোকে..."
রায়হান বাকিটা আর লিখল না।
কারণ তার নিজেরই হাসি পাচ্ছিল।
এরপর শুরু হলো আসল কাণ্ড।
একজন একটা story দিল—
“রায়হান ভাইয়ের জীবনে বসন্ত এসেছে ”
Mention:
@Rayhan
তারপর আরেকজন—
“Finally our bro is not single ”
Mention:
@Rayhan
তারপর আরেকজন—
“ভাবি welcome to the group ”
আবার mention।
রায়হানের ফোনে একটার পর একটা notification আসতে লাগল।
Mentioned you in their story.
Mentioned you in their story.
Mentioned you in their story.
রায়হান বিরক্ত হয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিল।
কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার খুলল।
সবগুলো story দেখল।
তারপর একটা জায়গায় এসে থেমে গেল।
কেউ মাইশার ছবিটা নিয়ে লিখেছে—
“ভাই, taste আছে তোমার! ”
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"আছে তো..."
কথাটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার পর নিজেই থেমে গেল।
"আমি কী বললাম!"
সে হেসে মাথা নিচু করল।
মাইশার ফোনেও notification
এদিকে মাইশা তখন ঘরের ভেতরে বসে ছিল।
ফোন হাতে নিতেই একের পর এক notification।
সে অবাক।
"এত mention কেন?"
প্রথম story খুলল।
তারপর দ্বিতীয়টা।
তারপর তৃতীয়টা।
প্রতিটাতেই—
Rayhan
আর তার সঙ্গে মাইশার ছবি।
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর চোখ বড় করে বলল,
"এরা আমাকে কী ভাবছে!"
মোমো পাশে এসে ফোনটা কেড়ে নিল।
"দেখি!"
মোমো story দেখে এক সেকেন্ড চুপ।
তারপর—
"ওওওওওওও!"
মাইশা তাড়াতাড়ি বলল,
"চুপ!"
লামিয়া দৌড়ে এসে বলল,
"কী হইছে?"
মোমো ফোনটা দেখিয়ে বলল,
"রায়হানের বন্ধুরা মাইশাকে ভাবি বানাইয়া ফেলছে!"
লামিয়া ফোন নিয়ে দেখল।
তারপর হেসে কুটিকুটি।
"ওরে বাবা!"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"এটা funny কীসের?"
মোমো বলল,
"তুই জানিস না, ওরা রায়হানকে কত জ্বালাবে?"
মাইশা বলল,
"আমাকে কেন mention দিচ্ছে না?"
মোমো চোখ টিপে বলল,
"ভয় পায়।"
"কিসের ভয়?"
"তুই যদি সত্যি সত্যি ওদের ভাবি হয়ে যাস!"
"মোমো!"
সবাই হেসে উঠল।
মাইশা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
"তোরা না..."
রায়হানের আরেক বিপদ
রায়হান তখনও বন্ধুদের story দেখে যাচ্ছে।
হঠাৎ Ayan আবার একটা story দিল।
এবার story-তে শুধু রায়হানের ছবি।
তার নিচে লেখা—
“Single ছিল। এখন story-তে তিনটা ছবি দিয়ে প্রমাণ করছে single না। ”
Mention:
@Rayhan
রায়হান এবার সত্যিই reply দিল—
"তুই মর।"
Ayan সঙ্গে সঙ্গে reply—
"ভাবির কাছে নালিশ করব।"
রায়হান লিখল,
"ওকে এসব বলবি না।"
Ayan:
"কেন?"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—
"লজ্জা পাবে।"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো reply নেই।
তারপর—
"ওহহহহহহহহহ!"
তারপর একসঙ্গে ২০টা laughing emoji।
রায়হান বুঝল—সে ভুল করেছে।
খুব বড় ভুল।
সে গ্রুপ mute করে দিল।
রাত
রাতের খাবারের পর রায়হান একা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
চারপাশে অন্ধকার।
দূরে বাড়ির আলো।
হালকা বাতাস।
তার ফোনে আবার notification এলো।
সে ভাবল, আবার হয়তো কোনো বন্ধু।
কিন্তু এবার মাইশার message।
মাইশা:
"আপনার বন্ধুরা কি সবসময় এমন?"
রায়হান হেসে ফেলল।
রায়হান:
"আজকে একটু বেশি হয়ে গেছে।"
কিছুক্ষণ পর মাইশা লিখল,
"আমাকে তো ভাবি বানিয়ে ফেলছে সবাই।"
রায়হান অনেকক্ষণ screen-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
"ওদের কথা সিরিয়াসলি নিও না।"
মাইশা:
"আমি নিচ্ছি না। কিন্তু আপনার বন্ধুরা অনেক পাগল।"
রায়হান:
"হ্যাঁ।"
তারপর একটু ভেবে লিখল—
"তবে একটা কথা..."
মাইশা:
"কী?"
রায়হান লিখল—
"ওরা যা ভাবছে, সেটা পুরোপুরি ভুলও না।"
মেসেজটা পাঠিয়ে রায়হান নিজেই থমকে গেল।
"আমি এটা কেন লিখলাম!"
সে দ্রুত message unsend করতে গেল।
কিন্তু ততক্ষণে—
Seen.
রায়হানের বুক ধক করে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড।
কোনো reply নেই।
এক মিনিট।
দুই মিনিট।
তারপর মাইশার reply এলো—
"মানে?"
রায়হান screen-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার আঙুল keyboard-এর ওপর থেমে আছে।
সে লিখল—
"মানে... বন্ধুত্বের কথা বলছি।"
তারপর আরেকটা message—
"বেশি কিছু ভাবো না।"
ওপাশ থেকে শুধু—
"আচ্ছা।"
রায়হান ফোনটা নামিয়ে ফেলল।
কিন্তু মুখের হাসিটা লুকাতে পারল না।
কারণ সে জানত—
“বন্ধুত্ব” শব্দটার আড়ালে সে নিজেই কতটা কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
সেই রাতেই Ayan আবার story দিল।
কালো background।
তার ওপর সাদা অক্ষরে—
“কিছু মানুষ relationship status hide করে, কিন্তু story সব বলে দেয়। ”
নিচে—
@Rayhan
রায়হান story দেখে মাথায় হাত দিল।
"এই ছেলেটাকে আমি একদিন সত্যিই মেরে ফেলব।"
তারপরও story-টা দেখে আবার হেসে ফেলল।
কারণ যতই সবাই মজা করুক—
মাইশার সঙ্গে তোলা ছবিগুলো সে delete করেনি।
বরং gallery খুলে ছবিগুলো আবার দেখল।
একটা ছবিতে মাইশা হেসে তাকিয়ে আছে।
রায়হান কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে বলল—
"তুই জানিস না, মাইশা..."
"তোদের সবার মজা হয়তো একদিন সত্যি হয়ে যাবে।"
তারপর ফোনটা বুকের কাছে রেখে সে আকাশের দিকে তাকাল।
আর ঠিক তখনই—
তার ফোনে একটা unknown number থেকে message এলো।
“যাকে সবাই তোমার ‘বৌ ’ ভাবছে, তাকে নিয়ে এত নিশ্চিন্ত হয়ো না, রায়হান।”
রায়হানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে message-টার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
আর কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা message এলো—
“কারণ মাইশার গল্পে তুমি যতটা ভাবছ, তার চেয়েও বেশি কিছু লুকানো আছে।”
রায়হান এবার আর কিছু বলল না।
শুধু ফোনটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
হাসি-ঠাট্টার আড়ালে আবারও রহস্যের দরজা খুলে গেল।
