রাতটা আর আগের মতো ছিল না।
কয়েক মিনিট আগেও রায়হান বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাইশার সঙ্গে নিজের ছবি নিয়ে বন্ধুদের পাগলামি দেখে হাসছিল। একের পর এক স্টোরি, “ভাবি তো শেইই!”, “Finally our bro is not single”—এসব দেখে বিরক্ত হওয়ার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল।
কিন্তু অচেনা নম্বরের শেষ দুটো মেসেজ তার মাথার ভেতরের সব হাসি এক মুহূর্তে থামিয়ে দিল।
“যাকে সবাই তোমার ‘বৌ ’ ভাবছে, তাকে নিয়ে এত নিশ্চিন্ত হয়ো না, রায়হান।”
তারপর—
“কারণ মাইশার গল্পে তুমি যতটা ভাবছ, তার চেয়েও বেশি কিছু লুকানো আছে।”
রায়হান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার আঙুল থেমে আছে।
মেসেজ দুটো বারবার পড়েও কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছিল না।
এই মানুষটা মাইশাকে চেনে।
শুধু চেনে না—
রায়হানকে তার নাম ধরে সতর্ক করছে।
কিন্তু কেন?
রায়হান ধীরে ধীরে টাইপ করল,
"তুমি কে?"
কয়েক সেকেন্ড পর দেখা গেল—
Seen.
কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
রায়হান আবার লিখল,
"মাইশার ব্যাপারে তুমি কী জানো?"
আবারও—
Seen.
তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
রায়হান ফোনটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
"কে তুমি?"
এবারও কোনো উত্তর এলো না।
পরদিন সকাল
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
বাড়ির ভেতরে সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। রান্নাঘর থেকে নাশতার গন্ধ আসছে। বাইরে উঠানে ছোটরা খেলছে।
মাইশা ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিতেই প্রথমে মোমোর মেসেজ।
"ঘুম থেকে উঠছিস?"
মাইশা লিখল,
"হুম।"
তারপর মোমো আবার—
"গতকালের story দেখেছিস?"
মাইশা বিরক্ত হয়ে লিখল,
"দেখছি। আর আমাকে এসব নিয়ে আর জ্বালাবি না।"
মোমো:
"আমি তো কিছু করি নাই। রায়হানের বন্ধুরা করছে। "
মাইশা ফোনটা রেখে দিল।
তারপর আবার তুলে নিল।
কেন জানি না, সে রায়হানের profile খুলে ফেলল।
গতকালের story আর নেই।
কিন্তু highlights-এ কয়েকটা নতুন ছবি।
মাইশা একটু থেমে গেল।
তারপর নিজের সঙ্গে নিজেই বলল,
"এই ছেলে আবার আমার ছবি রাখছে নাকি?"
সে আরও একটু দেখল।
তারপর দ্রুত বের হয়ে এলো।
"আমি এসব কেন দেখছি!"
অন্যদিকে রায়হান
রায়হান সারারাত ভালোভাবে ঘুমাতে পারেনি।
অচেনা নম্বরের কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল।
সে জানত, মাইশার জীবনে এমন কিছু আছে যার পুরোটা সে নিজেও জানে না।
তার বাবার পুরোনো কাগজপত্র।
২০১৪ সালের ঘটনা।
মাইশার মায়ের নাম।
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি।
আর এখন—
একজন অচেনা মানুষ তাকে সরাসরি সতর্ক করছে।
রায়হান বিছানা থেকে উঠে টেবিলের কাছে গেল।
তার ড্রয়ার খুলল।
ভেতরে কয়েকটা পুরোনো কাগজ, একটা ছোট নোটবুক আর কিছু ছবি রাখা।
সে একটা ছবি বের করল।
ছবিটা অনেক পুরোনো।
ছবির পেছনে একটা তারিখ লেখা—
২০১৪
রায়হান ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"তুমি আসলে কে?"
তারপর তার চোখ আটকে গেল ছবির এক কোণে।
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু হাতে একটা ঘড়ি।
রায়হান ছবিটা আরও কাছে নিয়ে এল।
"এই ঘড়িটা..."
হঠাৎ তার মনে হলো—
এটা সে আগে কোথাও দেখেছে।
দুপুর
মাইশা বারান্দায় বসে ছিল।
মোমো পাশে।
লামিয়া সামনে।
তিনজন গল্প করছিল।
হঠাৎ মোমো বলল,
"মাইশা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
"কর।"
"রায়হানকে তুই কবে থেকে চিনিস?"
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কেন?"
"এমনিই।"
"এমনিই আবার কী?"
লামিয়া হেসে বলল,
"ওর বন্ধুরা তোকে ভাবি বানিয়ে ফেলেছে। এখন আমরাও জানতে চাই, ব্যাপারটা আসলে কী।"
মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"কিছুই না।"
মোমো বলল,
"একদম?"
"একদম।"
"তুই ওকে পছন্দ করিস না?"
মাইশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"পছন্দ-টছন্দ জানি না। মানুষটা একটু ভালো।"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে লামিয়ার দিকে তাকাল।
লামিয়াও তাকাল মোমোর দিকে।
দুজনের চোখে একই হাসি।
মাইশা সেটা দেখে বলল,
"কী?"
মোমো বলল,
"কিছু না।"
"তোদের এই ‘কিছু না’টাই সবচেয়ে সন্দেহজনক।"
লামিয়া হাসতে হাসতে বলল,
"ঠিক আছে, আমরা চুপ।"
ঠিক তখনই—
মাইশার ফোন বেজে উঠল।
রায়হান কলিং...
মাইশা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
মোমো ফিসফিস করে বলল,
"ওওওওও!"
"চুপ!"
মাইশা কলটা ধরল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে রায়হানের কণ্ঠ।
"কী করছ?"
"কিছু না।"
"ব্যস্ত?"
"না।"
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"গতকালের ব্যাপারে..."
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আপনার বন্ধুদের কথা বলবেন না।"
রায়হান হেসে ফেলল।
"না। অন্য কথা।"
"কী?"
"তোমাকে একটা প্রশ্ন করব?"
"করেন।"
"তোমার মায়ের পুরোনো কোনো জিনিস কি তোমার কাছে আছে?"
মাইশার হাসি থেমে গেল।
মোমো আর লামিয়াও তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করল।
"হঠাৎ?"
"এমনিই জানতে চাইলাম।"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"কিছু পুরোনো জিনিস আছে। কেন?"
রায়হান বলল,
"তুমি কি কখনো সেগুলো ভালো করে দেখেছ?"
"হ্যাঁ।"
"সব?"
"হুম।"
রায়হান আবার চুপ।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
"মাইশা, তোমার কাছে যদি কোনো পুরোনো ছবি থাকে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের, সেটা আমাকে দেখাবে?"
মাইশা এবার অবাক হলো।
"২০১৪?"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"কিছু একটা মিলাতে চাই।"
"কী মিলাতে?"
রায়হান উত্তর দিল না।
মাইশা বলল,
"আপনি আবার রহস্য করছেন।"
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
"তুমি তো রহস্য পছন্দ করো।"
"না, আমি উত্তর পছন্দ করি।"
"উত্তর পাবে।"
"কবে?"
"সময় হলে।"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"আপনি না একদম..."
রায়হান হেসে বলল,
"জানি।"
তারপর কল কেটে গেল।
সন্ধ্যা
রায়হান আবার সেই পুরোনো ছবিটা বের করল।
ছবির মানুষটার হাতে ঘড়ি।
সে নিজের ফোনে ছবিটা zoom করল।
ঘড়ির ডায়ালের পাশে খুব ছোট করে একটা অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
R.B.
রায়হানের বুকটা ধক করে উঠল।
R.B.
সে ফিসফিস করে বলল,
"রাশেদ ব্যাপারী?"
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"অসম্ভব।"
রাশেদ ব্যাপারী সম্পর্কে সে যতটুকু জানে, তার গল্পের শেষটা অন্যরকম।
কিন্তু তাহলে—
এই ছবির মানুষটা কে?
ঠিক তখন তার ফোনে আবার notification এলো।
অচেনা নম্বর।
রায়হান দ্রুত message খুলল।
এবার মাত্র একটা লাইন—
“ঘড়িটা দেখেছ?”
রায়হানের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
"তুমি আমার ছবি দেখছ?"
কোনো উত্তর নেই।
আবার লিখল,
"তুমি কি আমার বাবাকে চেনো?"
কয়েক সেকেন্ড পর reply এলো।
“তোমার বাবা আমাকে চিনতেন।”
রায়হানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে আবার লিখল,
"মাইশার মায়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?"
এইবার উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
তারপর—
“আমি তার গল্পের শেষ মানুষ ছিলাম না।”
রায়হান স্থির হয়ে গেল।
আরেকটা message এলো।
“কিন্তু আমি জানি, সে কেন হারিয়ে গিয়েছিল।”
রায়হান এবার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
"সে কি সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিল?"
Seen.
কোনো উত্তর নেই।
তারপর—
ফোনের screen-এ নতুন একটা ছবি এসে হাজির হলো।
একটা পুরোনো বাড়ি।
অন্ধকার।
সামনে একটা দরজা।
আর দরজার ওপরে ছোট করে লেখা—
G.B.B — 2014
রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।
এটা সেই বাড়ি।
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি।
তারপর ছবির নিচে একটা লাইন—
“তুমি যদি সত্যিই মাইশাকে ভালোবাসো, তাহলে তাকে সত্যিটা জানতে দাও।”
রায়হান অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর খুব ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
প্রথমবার—
তার নিজের অনুভূতিটাকে সে আর “পছন্দ” বলে এড়িয়ে যেতে পারল না।
কারণ অচেনা মানুষটাও সেটা বুঝে গেছে।
রায়হান সত্যিই মাইশাকে ভালোবাসে।
কিন্তু এখন প্রশ্ন একটাই—
মাইশাকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কি মাইশার অতীতের সত্যিটাও বলতে হবে?
আর যদি সেই সত্যিটা মাইশার জীবনটাই বদলে দেয়?
রায়হান জানত না।
শুধু জানত—
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ির দরজাটা আবার খুলতে চলেছে।
আর এবার—
তার সঙ্গে মাইশাও থাকবে।
