৯ ডিসেম্বর
নোয়াখালীর বিকেলটা সেদিন অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
শীতের হালকা আমেজ, চারপাশে নরম রোদ আর বাড়ির উঠানে ছড়িয়ে থাকা হাসি-আড্ডা। মাইশা বারান্দায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল। হঠাৎ একটা নতুন মেসেজের নোটিফিকেশন আসতেই সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
অপরিচিত একটা আইডি।
মেসেজটা খুলতেই লেখা—
"হাই। আমি আয়ান। রায়হানের বন্ধু।"
মাইশা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর রিপ্লাই দিল,
"জি? "
কয়েক সেকেন্ড পর আবার মেসেজ এলো।
"আগামীকাল ১০ ডিসেম্বর রায়হানের birthday।"
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"কীইই? "
আয়ান লিখল,
"হ্যাঁ। আর আমরা কয়েকজন কাল নোয়াখালী আসতেছি।"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই মুখে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
"আচ্ছা... তাহলে কালকে একটা কাজ করা যায়।"
আয়ান জিজ্ঞেস করল,
"কী কাজ?"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
"সেটা কালকে বুঝবেন। "
আয়ান আর কিছু বুঝতে না পেরে শুধু লিখল,
"ভয় লাগতেছে আপনার কথা শুনে। "
মাইশা ফোনটা পাশে রেখে হেসে ফেলল।
তার মাথায় তখন একটা মাত্র চিন্তা—
রায়হানকে এমন একটা জন্মদিন দিতে হবে, যেটা সে কোনোদিন ভুলবে না।
১০ ডিসেম্বর
সকাল থেকেই রায়হানের মনটা অদ্ভুত খারাপ।
ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়েই সে অপেক্ষা করেছিল—
হয়তো কেউ একটা মেসেজ দেবে।
"Happy Birthday."
কিন্তু...
কিছুই নেই।
একটা মেসেজও না।
রায়হান ভ্রু কুঁচকে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
কিছুক্ষণ পর আবার হাতে নিল।
নোটিফিকেশন নেই।
সে নিজের মনেই বলল,
"বাহ! বন্ধুরা মনে হয় আমার জন্মদিনটাও ভুলে গেছে।"
আসলে কেউ ভুলেনি।
আয়ান, সিফাত, আরও কয়েকজন বন্ধু—সবাই ইচ্ছা করেই চুপ করে আছে।
কারণ তারা সবাই মিলে একটা surprise plan করছে।
কিন্তু রায়হান সেটা জানে না।
দুপুরের দিকে আয়ান তাকে ফোন করল।
"ভাই, আজকে কোথায় খাওয়া যায় বলেন তো?"
রায়হান বিরক্ত গলায় বলল,
"আমার জন্মদিন আর তুই আমাকে জিজ্ঞেস করতেছিস কোথায় খাবি?"
আয়ান হাসি চেপে বলল,
"আরে ভাই, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।"
"যা খুশি খা।"
"ঠিক আছে ভাই।"
কল কেটে আয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাইশাকে মেসেজ করল।
"আপা, কোন restaurant ভালো?"
মাইশা এক মুহূর্তও দেরি না করে লিখল—
"এগুলা নিয়ে আপনি চিন্তা কইরেন না, আমি ওর birthday program Food Forest-এ করব।"
আয়ান অবাক হয়ে লিখল,
"কিন্তু ওকে আনবেন কীভাবে?"
মাইশার মুখে আবার সেই দুষ্টু হাসি।
"ওটা আমার দায়িত্ব।"
"কীভাবে?"
"আমি বলব, একটা ছেলে আমাকে disturb করতেছে।"
আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে লিখল,
"আপা, আপনি ভয়ংকর। "
মাইশা রিপ্লাই দিল,
"জানি। "
বিকেলের দিকে মাইশা ছুটে গেল মোমো আর লামিয়ার কাছে।
"শোন, কালকে না—মানে আজকেই—রায়হানের birthday!"
মোমো চোখ বড় করে বলল,
"কীইই? আজকে?"
"হ্যাঁ!"
লামিয়া বলল,
"তাহলে surprise হবে!"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ। কিন্তু এমন surprise, ও জীবনে ভুলবে না।"
মোমো হেসে বলল,
"আমি কিন্তু আয়াতকেও আনব।"
"আয়াত আসতেছে?"
"হ্যাঁ। আজকে নোয়াখালী আসতেছে।"
লামিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"তাহলে আমিও সাজব!"
মাইশা হেসে ফেলল।
"সবাই সাজবি। কিন্তু একটা কথা—আমার surprise যেন নষ্ট না হয়।"
মোমো বলল,
"চিন্তা করিস না।"
তারপর তিনজন একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।
পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেল।
সন্ধ্যার আগে মাইশা নিজের ঘরে ঢুকে আলমারি খুলল।
একটার পর একটা পোশাক সরাতে সরাতে শেষ পর্যন্ত তার হাত থেমে গেল একটা শাড়ির ওপর।
সাদা, মুক্তোর মতো নরম একটা শাড়ি।
শাড়িটার রঙ একেবারে ঝকঝকে সাদা নয়—বরং হালকা pearl-white। আলো পড়লে খুব সূক্ষ্ম একটা ঝিলিক দেখা যায়।
মাইশা শাড়িটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
"এটাই পরব।"
লামিয়া দরজা থেকে তাকিয়ে বলল,
"এইটা?"
"হ্যাঁ।"
মোমো পেছন থেকে এসে বলল,
"রায়হান তো শেষ।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
"চুপ!"
মোমো হাসতে হাসতে বলল,
"আরে আমি কী বললাম?"
"বেশি কথা বললে তোকে বাদ দিয়ে দিব।"
"আচ্ছা আচ্ছা। "
অন্যদিকে রায়হানের দিনটা আরও খারাপ হতে লাগল।
সকাল থেকে কেউ তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা দেয়নি।
দুপুরে আয়ান ফোন করেও এমনভাবে কথা বলেছে যেন আজ আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ একটা দিন।
সিফাতও শুধু বলেছে,
"কী খবর?"
রায়হান মনে মনে বলল,
"সবাই বদলে গেছে।"
সন্ধ্যার দিকে সে চুপচাপ বসে ছিল।
ফোনের স্ক্রিনে নিজের জন্মতারিখ দেখে আবার ফোনটা বন্ধ করে দিল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
"একজনও মনে রাখল না..."
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম—
মাইশা।
রায়হানের মনটা এক মুহূর্তে একটু ভালো হয়ে গেল।
সে কল ধরল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে মাইশার কাঁপা কাঁপা গলা।
"রায়হান..."
রায়হানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
"কী হয়েছে?"
মাইশা যেন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"একটা ছেলে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে disturb করতেছে..."
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
"কোথায় তুমি?"
"আমি... Food Forest-এ।"
"কার সঙ্গে আছো?"
মাইশা একটু থেমে বলল,
"তুমি আগে এখানে আসো।"
রায়হানের গলায় এবার একদম চিন্তার সুর।
"ঠিক আছে। আমি আসতেছি। তুমি কোথাও যেও না।"
কল কেটে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—
মাইশার কিছু যেন না হয়।
Food Forest-এর ভেতরে তখন অন্যরকম আয়োজন।
টেবিল সাজানো।
সাদা-রুপালি decoration।
মাঝখানে সুন্দর একটা সাদা কেক।
আর চারপাশে মোমো, লামিয়া, আয়াত, সিফাত, আয়ানসহ সবাই লুকিয়ে আছে।
মাইশা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ।
মাইশার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
"ও এসেছে।"
সবাই দ্রুত নিজেদের জায়গায় চলে গেল।
দরজা খুলে রায়হান ঢুকল।
তার চোখে তখনও দুশ্চিন্তা।
"মাইশা কোথায়?"
হঠাৎ—
সব আলো জ্বলে উঠল।
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
"SURPRISEEEE!"
রায়হান থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বুঝতে পারল না।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাইশার দিকে।
সাদা মুক্তোর মতো শাড়ি।
খোলা চুল, সুন্দরভাবে সাজানো মুখ, চোখে হালকা কাজল।
রায়হান শুধু তাকিয়েই রইল।
মাইশা হেসে বলল,
"Happy Birthday, রায়হান।"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"তুমি..."
মাইশা ভ্রু তুলল।
"আমি কী?"
রায়হান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
"কিছু না।"
আয়ান পেছন থেকে বলল,
"ভাই, আজকে কিন্তু মুখটা বন্ধ রাখবেন না।"
সিফাত হেসে বলল,
"এতক্ষণ যে মানুষটা ভাবতেছিল কেউ ওরে মনে রাখে নাই, এখন দেখেন অবস্থা।"
রায়হান হাসতে হাসতে বলল,
"তোরা সবাই মিলে আমাকে বোকা বানাইছিস?"
মোমো বলল,
"হ্যাঁ।"
"আর মাইশা?"
মাইশা গর্ব করে বলল,
"আমি তো কিছুই করি নাই।"
রায়হান তাকিয়ে বলল,
"তুমি আমাকে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে বললে একটা ছেলে তোমাকে disturb করছে!"
মাইশা হেসে ফেলল।
"ওটা surprise-এর অংশ ছিল।"
রায়হান মাথায় হাত দিয়ে বলল,
"আল্লাহ! এই মেয়েটা আমাকে একদিন হার্ট অ্যাটাক করাইয়া ছাড়বে।"
সবাই হেসে উঠল।
এরপর মোমো সামনে এসে একটা বড় সাদা কেক বের করল।
কেকের ওপর লেখা—
Happy Birthday, Rayhan
রায়হান কেকটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
"এটা কে করেছে?"
মোমো বলল,
"আমি।"
"ভালো হইছে।"
মাইশা বলল,
"এখন candle blow করেন।"
রায়হান মোমবাতির সামনে দাঁড়াল।
সবাই একসঙ্গে জন্মদিনের গান গাইতে শুরু করল।
মোমবাতি নিভে গেল।
রায়হান চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ wish করল।
তারপর চোখ খুলতেই প্রথম যে মানুষটার দিকে তাকাল—
সে ছিল মাইশা।
মাইশা সেটা খেয়াল করলেও কিছু বলল না।
শুধু হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর আয়াত এসে মোমোর পাশে দাঁড়াল।
মোমো বলল,
"এতক্ষণ কোথায় ছিলে?"
আয়াত হেসে বলল,
"তোমার জন্যই তো এত দূর আসছি।"
মোমো লজ্জা পেয়ে বলল,
"চুপ!"
অন্যদিকে লামিয়া আর সিফাত একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।
আয়ান নিজের এক single friend-কে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ মিউজিক শুরু হলো।
"Disco Deewane"
মোমো হাততালি দিয়ে বলল,
"চলো! Dance!"
সবাই একে একে উঠল।
মোমো হাত ধরে আয়াতকে টেনে নিল।
মোমো আর আয়াত একসঙ্গে নাচতে শুরু করল।
লামিয়া একটু ইতস্তত করছিল।
সিফাত হাত বাড়িয়ে বলল,
"চলেন?"
লামিয়া হেসে হাত বাড়িয়ে দিল।
লামিয়া আর সিফাত নাচতে শুরু করল।
আয়ান তার সেই single বন্ধুকে নিয়ে নাচতে লাগল।
আর কিছুক্ষণ পর মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।
"আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
রায়হান বলল,
"আমি নাচি না।"
মাইশা চোখ ছোট করে বলল,
"আজকে birthday। আজকে নাচতেই হবে।"
"না।"
"হ্যাঁ।"
"মাইশা—"
"চলুন।"
মাইশা তার হাত ধরে টেনে নিল।
রায়হান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
তারপর হেসে ফেলল।
মাইশা আর রায়হান একসঙ্গে নাচতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে একটা group dance শুরু করল।
হাসি, চিৎকার, হাততালি—পুরো জায়গাটা যেন মুহূর্তের জন্য অন্যরকম হয়ে উঠল।
রায়হান মাঝে মাঝে মাইশার দিকে তাকাচ্ছিল।
মাইশা সেটা বুঝতে পারলেও না বোঝার ভান করছিল।
একসময় তাদের চোখাচোখি হলো।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ড যেন আশেপাশের সব শব্দকে একটু থামিয়ে দিল।
তারপর মাইশা হেসে অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল।
রায়হানও মুচকি হাসল।
নাচ শেষ হওয়ার পর রায়হানের বন্ধুরা একটা ব্যাগ নিয়ে এল।
আয়ান বলল,
"ভাই, আপনার জন্য gift."
রায়হান ব্যাগ খুলে দেখল—
সাদা শার্ট, সঙ্গে সাদা coat আর pant।
রায়হান অবাক হয়ে বলল,
"সাদা?"
আয়ান বলল,
"আজকে পুরো white look হবে।"
মাইশা হেসে বলল,
"পরবেন কিন্তু।"
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আপনার পছন্দ?"
মাইশা একটু থেমে বলল,
"হুম... ভালো লাগবে।"
রায়হানের মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
"তাহলে পরব।"
মোমো দূর থেকে লামিয়াকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল।
লামিয়া ফিসফিস করে বলল,
"দেখছিস?"
মোমো হাসি চেপে বলল,
"সব দেখতেছি।"
রাত একটু গভীর হলে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করছিল।
রায়হান তখন নতুন সাদা শার্ট আর coat-pant পরে ফিরে এসেছে।
মাইশা তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"ভালো লাগতেছে।"
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
"আপনারও।"
মাইশা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
"আমি তো জানিই।"
রায়হান হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা notification এলো।
একটা অপরিচিত নম্বর।
রায়হান মেসেজটা খুলল।
মাত্র এক লাইন—
"জন্মদিনের আনন্দ শেষ হওয়ার আগে একটা কথা মনে রাখুন, রায়হান—মাইশার জীবনে আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়েও বেশি কিছু লুকিয়ে আছে।"
রায়হানের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অজান্তেই চোখ চলে গেল মাইশার দিকে।
মাইশা তখন মোমোর সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলছে।
রায়হান ফোনটা শক্ত করে ধরে রাখল।
তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—
মাইশার জীবনে আসলে কী লুকিয়ে আছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
এই মানুষটা বারবার তাদের দুজনকে অনুসরণ করছে কেন?
