সিজন 1 অধ্যায় 18 রোমান্টিক আবেগঘন মুহূর্ত #গোপন যত্ন #কান্না মাইশারায়হান ব্যাপারী

ভেজা চোখে নীরব হাহাকার

•8 মিনিট পড়া•1,124 শব্দ
ভেজা চোখে নীরব হাহাকার

১১ ডিসেম্বর

নোয়াখালীর সকালটা ছিল একেবারে অন্যরকম।

শীতের হালকা কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। নতুন বাড়ির সামনে বিশাল মাঠটায় রোদ এসে পড়েছে। দূরে কয়েকটা গাছের পাতায় শিশিরের পানি ঝুলছে। বাড়ির ভেতর থেকে রান্নার গন্ধ আসছে, উঠানে কয়েকজন গল্প করছে।

গত রাতের জন্মদিনের আয়োজনের রেশ যেন এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

মাইশা ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।

মাঠের দিকে কয়েকজন ছেলেকে দেখা যাচ্ছে।

মাইশা চোখ কুঁচকে একটু ভালো করে তাকাল।

তারপরই মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।

রায়হান।

সাদা টি-শার্ট পরে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে।

মাইশা কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওদের দেখল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

"কালকে তো অনেক বড় বড় কথা বলছিল। আজকে আবার কী করছে দেখি!"

সে চুপচাপ ওড়নাটা ঠিক করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।

মাঠের মাঝখানে তখন বেশ জমজমাট অবস্থা।

রায়হান, আয়ান, সিফাত আর আরও কয়েকজন বন্ধু মিলে ফুটবল খেলছিল।

আয়ান বল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করল,

"রায়হান! এদিকে!"

রায়হান বলটা পাস করে দিল।

সিফাত বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,

"দেখি আজকে কে জিতিস!"

রায়হান হেসে বলল,

"আজকে তোদের কাউকেই ছাড়ব না।"

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"কালকে birthday boy ছিলি বলে অনেক সম্মান দিছি। আজকে কিন্তু কোনো ছাড় নাই!"

রায়হান হাসল।

"আয়ান, বেশি কথা বলিস না।"

"কেন?"

"বল দিয়ে উত্তর দিব।"

আয়ান হেসে পালিয়ে গেল।

মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাইশা দূর থেকে সব দেখছিল।

সে ভাবছিল, রায়হানকে একটু ভয় দেখাবে।

গতকাল birthday-তে তাকে কতবার বোকা বানিয়েছে—আজ একটু সুযোগ পেলে সে-ও মজা করবে।

মাইশা আস্তে আস্তে মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেল।

তারপর একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রায়হানকে দেখতে লাগল।

রায়হান তখন খেলায় এতটাই ব্যস্ত যে আশেপাশে কে আছে, কিছুই খেয়াল করছে না।

মাইশা মনে মনে বলল,

"দেখি, সাহেব আজকে কত বড় খেলোয়াড় হইছে!"

খেলা আরও জমে উঠল।

সিফাত বলটা রায়হানের দিকে বাড়িয়ে দিল।

রায়হান দৌড়ে গিয়ে বলটা নিয়েই সামনে এগোল।

আয়ান চিৎকার করে বলল,

"শট নে!"

রায়হান একটু দূরে গিয়ে বলটাকে জোরে কিক করল।

কিন্তু...

ঠিক সেই মুহূর্তে মাইশা গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটছিল।

সে বুঝতেই পারেনি বলটা তার দিকেই আসছে।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর—

ধপ্!

বলটা সোজা গিয়ে মাইশার নাকে লাগল।

মাইশা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

তারপর দুই হাত দিয়ে নাক চেপে ধরল।

"আহ্!"

মাঠের সবাই থেমে গেল।

রায়হানের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও।

সে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

"মাইশা?!"

মাইশা কোনো উত্তর দিল না।

তার হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাল রক্ত বের হতে শুরু করেছে।

রায়হান যেন পাথর হয়ে গেল।

তারপর হঠাৎ পুরো দৌড়ে মাইশার কাছে ছুটে গেল।

"মাইশা!"

মাইশা নাক চেপে ধরে বলল,

"আহ্... ব্যথা করছে..."

এই একটা কথা শুনেই রায়হানের মুখটা কেমন বদলে গেল।

সে মাইশার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,

"রক্ত... রক্ত বের হচ্ছে!"

মাইশা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

"দেখতেছি তো!"

রায়হান কী করবে বুঝতে পারছিল না।

সে একবার মাইশার নাকের দিকে তাকাচ্ছে, একবার চারপাশের দিকে তাকাচ্ছে।

তারপর আয়ানকে চিৎকার করে বলল,

"পানি আন!"

আয়ান দৌড়ে গেল।

সিফাতও ছুটে এলো।

"মাইশা, মাথা একটু সোজা রাখো।"

কিন্তু রায়হান যেন কারও কথা শুনছেই না।

তার চোখ তখন শুধু মাইশার মুখে।

আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার চোখে পানি চলে এলো।

মাইশা অবাক হয়ে তাকাল।

"রায়হান?"

রায়হান কিছু বলল না।

চোখের পানি মুছতে গিয়ে আরও বেশি কাঁদতে শুরু করল।

মাইশা অবাক হয়ে বলল,

"আরে! তুমি কান্না করতেছ?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"আমি... আমি তো চাই নাই..."

তার গলা কেঁপে গেল।

"আমি জানতাম না তুমি সামনে আসছো..."

মাইশা এবার একটু থেমে গেল।

সে বুঝতে পারল, রায়হান সত্যিই ভয় পেয়ে গেছে।

"আরে, আমি ঠিক আছি।"

রায়হান কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

"তুমি ঠিক আছো কই?"

মাইশা হালকা হেসে বলল,

"এই তো... নাকে একটু লাগছে।"

"একটু?!"

রায়হানের গলা আরও কেঁপে উঠল।

"রক্ত বের হচ্ছে!"

মাইশা এবার একটু হাসতে চাইল।

"রায়হান, তুমি তো এমন করতেছ যেন আমার নাকটাই ভেঙে গেছে!"

রায়হান চোখ মুছতে মুছতে বলল,

"আমি বুঝতে পারি নাই..."

তারপর খুব আস্তে বলল,

"তোমার ব্যথা লাগছে... এটা আমি সহ্য করতে পারতেছি না।"

মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নাকের ওপর হাত রেখেই বলল,

"তুমি কাঁদতেছ কেন?"

রায়হান চোখ তুলে তাকাল।

"কারণ তুমি ব্যথা পাইছো।"

মাইশা মজা করে বলল,

"তাহলে তুমি বুঝবা না?"

রায়হান ভ্রু কুঁচকে বলল,

"কী বুঝব?"

মাইশা একটু হাসল।

"তুমি যে আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করো!"

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ।

তারপর খুব আস্তে বলল,

"হ্যাঁ। করি।"

মাইশা এবার আর কিছু বলতে পারল না।

আয়ান তখন পানি আর টিস্যু নিয়ে ফিরে এল।

"এই নেন!"

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে টিস্যুটা নিয়ে মাইশার হাতে দিল।

"নাকটা চেপে ধরো।"

মাইশা বলল,

"আমি পারতেছি।"

রায়হান বলল,

"তবুও আমি থাকতেছি।"

আয়ান আর সিফাত একে অপরের দিকে তাকাল।

আয়ান নিচু গলায় বলল,

"ভাই তো পুরো শেষ।"

সিফাত ফিসফিস করে বলল,

"চুপ কর। এখন বললে তোকে মেরে ফেলবে।"

রায়হান শুনে ফেলল।

"আয়ান!"

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করল।

"জি ভাই। "

মাইশা হেসে ফেলল।

হাসতেই আবার নাকে ব্যথা লাগল।

"আহ্!"

রায়হান আবার ভয় পেয়ে গেল।

"ব্যথা করছে?"

"হুম।"

"চলো, ভেতরে যাই।"

"আমি হাঁটতে পারব।"

"আমি বলছি চলো।"

মাইশা একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

রায়হানের চোখ তখনও ভেজা।

সে খুব আস্তে বলল,

"প্লিজ।"

মাইশা আর কিছু বলল না।

চুপচাপ রায়হানের সঙ্গে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

বাড়ির বারান্দায় এসে মাইশা একটা চেয়ারে বসল।

রায়হান সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার চোখের পানি এখনও পুরো শুকায়নি।

মাইশা তাকিয়ে বলল,

"তুমি এখনও কাঁদতেছ?"

রায়হান মুখ ঘুরিয়ে বলল,

"না।"

"মিথ্যা।"

"চুপ।"

"রায়হান..."

"হুম?"

মাইশা একটু মিষ্টি করে বলল,

"তুমি সত্যিই ভয় পাইছিলা?"

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মাথা নাড়ল।

"হ্যাঁ।"

"এতটা?"

"তুমি যখন রক্তে হাত ভিজাইলা..."

সে থেমে গেল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

"মনে হইছিল... যদি তোমার কিছু হয়ে যায়?"

মাইশার চোখের দুষ্টু ভাবটা একটু নরম হয়ে গেল।

সে আস্তে বলল,

"আমার কিছু হয়নি।"

রায়হান তাকিয়ে রইল।

মাইশা হেসে বলল,

"আর একটা কথা।"

"কী?"

"তুমি কাঁদলে তোমাকে একদম বাচ্চা লাগে।"

রায়হান বিরক্ত হয়ে বলল,

"তোমার জন্য কাঁদছি, আর তুমি আমারে বাচ্চা বলতেছ?"

মাইশা হেসে ফেলল।

"হ্যাঁ।"

রায়হানও শেষ পর্যন্ত হেসে ফেলল।

কিন্তু তার চোখের দুশ্চিন্তা তখনও পুরোপুরি কাটেনি।

কিছুক্ষণ পর মাইশা উঠে দাঁড়াল।

"আমি ঘরে যাচ্ছি।"

রায়হান বলল,

"আমি আসি?"

মাইশা অবাক হয়ে তাকাল।

"কেন?"

"তুমি পড়ে গেলে?"

মাইশা চোখ বড় করে বলল,

"নাকে বল লাগছে, পায়ে না।"

আয়ান দূর থেকে হেসে ফেলল।

রায়হান তাকিয়ে বলল,

"তুই হাসিস না!"

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মাইশা হাসতে হাসতে ঘরের দিকে চলে গেল।

দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল।

রায়হান তখনও দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

মাইশা আস্তে করে বলল,

"রায়হান?"

"হুম?"

"আর কাঁদবা না।"

রায়হান হালকা হেসে বলল,

"তুমি আর বলের সামনে হুট করে আসবা না।"

মাইশা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,

"আগে বলটা ঠিকমতো মারতে শিখেন।"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"ঠিক আছে। কিন্তু আজকের পর থেকে তোমার সামনে শট মারা বন্ধ।"

মাইশা হেসে ঘরে ঢুকে গেল।

রায়হান কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে নিজের মনেই বলল—

"তোমার একটু ব্যথাও যদি আমার এতটা কষ্ট দেয়... তাহলে তুমি আমার কাছে আসলে কতটা?"

কিন্তু উত্তরটা সে নিজেও জানত না।

আর ঠিক তখনই—

রায়হানের ফোনে আবার সেই অপরিচিত নম্বর থেকে একটি মেসেজ এলো।

"তাকে যতটা ভালোবাসছেন, তার চেয়েও সাবধানে থাকুন। কারণ মাইশাকে ঘিরে খেলা এখনো শুরুই হয়নি।"

রায়হানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

তারপর চোখ তুলে তাকাল মাইশার বন্ধ দরজার দিকে।

গত রাতের জন্মদিন, আজকের দুর্ঘটনা—সবকিছু কি সত্যিই কেবল কাকতালীয়?

অধ্যায় 18 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

ভেজা চোখে নীরব হাহাকার

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন