১১ ডিসেম্বর, বিকেল
মাইশার নাকে বল লাগার ঘটনাটা ঘটার পর থেকে রায়হান যেন পুরোপুরি বদলে গেছে।
সকাল থেকে অন্তত দশবার জিজ্ঞেস করেছে—
"এখন ব্যথা করছে?"
মাইশা প্রতিবার একই উত্তর দিয়েছে,
"না।"
কিছুক্ষণ পর আবার—
"রক্ত বের হচ্ছে?"
"না।"
আর একটু পর—
"মাথা ঘুরতেছে না তো?"
মাইশা বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলেছে,
"রায়হান, আমি ঠিক আছি!"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলেছে,
"নিশ্চিত?"
মাইশা এবার হেসে ফেলেছে।
"হ্যাঁ, নিশ্চিত।"
"ঠিক আছে।"
কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার—
"মাইশা..."
"আবার কী?"
"ব্যথা করলে আমাকে বলবা।"
মাইশা মাথা নাড়িয়ে বলেছিল,
"আচ্ছা, বলব।"
রায়হান তখনই শান্ত হয়েছিল।
অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য।
দুপুরের পর বাড়িটা একটু শান্ত হয়ে গেল।
বাড়ির বড়রা কেউ ভেতরে গল্প করছে, কেউ দুপুরের খাবারের পর বিশ্রাম নিচ্ছে। মাঠের দিকেও আগের মতো ভিড় নেই।
মাইশা বারান্দায় বসে একটা বই খুলে রেখেছিল।
কিন্তু পড়ছিল না।
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল বাড়ির একেবারে পেছনের দিকে।
পুরোনো বাড়িটার দিকে।
নোয়াখালীর এই বাড়ির নতুন অংশটা যতটা গোছানো আর ব্যস্ত, পুরোনো বাড়িটা ততটাই নীরব।
অনেকদিন ধরে সেখানে কেউ নিয়মিত থাকে না।
পুরোনো কাঠের দরজা।
দেয়ালের কিছু অংশে শ্যাওলা।
জানালাগুলো প্রায় সবসময় বন্ধ।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—
বাড়ির সবাই পুরোনো বাড়িটার কথা উঠলেই কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়।
মাইশা বইটা বন্ধ করল।
নিজের মনেই বলল,
"ওই বাড়িটায় আসলে কী আছে?"
ঠিক তখনই পেছন থেকে মোমোর গলা—
"কী দেখছিস?"
মাইশা চমকে ফিরে তাকাল।
"কিছু না।"
মোমো এসে তার পাশে বসল।
"তুই যখন 'কিছু না' বলিস, তখনই বুঝি কিছু একটা আছে।"
মাইশা হেসে বলল,
"ওই পুরোনো বাড়িটা দেখছিলাম।"
মোমোর মুখের হাসি একটু কমে গেল।
"ওই বাড়ি?"
"হুম।"
"কেন?"
"জানি না।"
মাইশা একটু নিচু গলায় বলল,
"তোর কি কখনো মনে হয় না, এই বাড়ির কিছু ব্যাপার সবাই আমার কাছ থেকে লুকায়?"
মোমো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"তোর মায়ের ব্যাপারটার পর থেকে তোর সন্দেহ আরও বেড়েছে।"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু একা একা কোথাও যাস না।"
মাইশা হেসে বলল,
"আমি কি এতটা বোকা?"
মোমো তাকিয়ে বলল,
"হ্যাঁ।"
"এই!"
দুজনেই হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই রায়হান দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে এলো।
মাইশাকে দেখেই প্রথম প্রশ্ন—
"নাক কেমন?"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে মুখ চেপে হাসল।
মাইশা চোখ ঘুরিয়ে বলল,
"আবার শুরু!"
রায়হান বসতে বসতে বলল,
"জিজ্ঞেস করলাম।"
"ভালো।"
"ব্যথা?"
"না।"
"রক্ত?"
"না।"
"মাথা—"
মাইশা হাত তুলে থামিয়ে দিল।
"আর একটা প্রশ্ন করলে কিন্তু সত্যি তোমাকে মেরে ফেলব।"
রায়হান মুচকি হেসে বলল,
"ঠিক আছে।"
মোমো ফিসফিস করে বলল,
"ওর তো এখন ডাক্তার হওয়ার শখ হইছে।"
রায়হান তাকিয়ে বলল,
"তুই চুপ কর।"
মাইশা হাসতে হাসতে বলল,
"আচ্ছা, রায়হান—তুমি এত ভয় পেয়েছিলে কেন?"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলল,
"কারণ..."
সে থেমে গেল।
"তোমার নাক থেকে রক্ত দেখার পর মাথা কাজ করছিল না।"
মাইশা এবার আর মজা করল না।
রায়হান খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"তুমি কাঁদলে আমি বুঝতে পারি না কী করব।"
মাইশা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু তার ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।
বিকেলের দিকে সবাই মিলে বাড়ির উঠানে বসেছিল।
আয়ান, সিফাত আর আরও কয়েকজন গল্প করছিল।
মাইশা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরোনো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ রায়হান তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"কী দেখছ?"
মাইশা আস্তে বলল,
"ওই বাড়িটা।"
রায়হান তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
"ওখানে যেও না।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
"কেন?"
রায়হান উত্তর দিল না।
"রায়হান?"
"কিছু না।"
"কিছু না হলে যেতে মানা করছ কেন?"
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"কারণ জায়গাটা অনেক পুরোনো। অনেক কিছু আছে যেগুলো আমরা নিজেরাও জানি না।"
মাইশা একটু কাছে এসে বলল,
"তুমি জানো?"
রায়হান তার দিকে তাকাল।
"সব না।"
"কিছু জানো?"
রায়হান এবারও চুপ।
মাইশার চোখ সরু হয়ে গেল।
"তুমি কিছু লুকাচ্ছ।"
"না।"
"হ্যাঁ।"
"মাইশা..."
"তুমি যদি কিছু জানো, আমাকে বলবে।"
রায়হান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
"যদি জানি, বলব।"
মাইশা বলল,
"প্রমিস?"
রায়হান মাথা নাড়ল।
"প্রমিস।"
সন্ধ্যার একটু আগে মাইশা নিজের ঘরে ফিরে গেল।
আলমারি থেকে কিছু কাপড় বের করতে গিয়ে হঠাৎ একটা পুরোনো বাক্স চোখে পড়ল।
সে বাক্সটা টেনে বের করল।
ঢাকনা খুলতেই পুরোনো কাগজের গন্ধ।
কিছু পুরোনো ছবি।
কয়েকটা চিঠি।
আর নিচে একটা ছোট্ট কালো খাম।
মাইশার বুক ধক করে উঠল।
কালো খামটা সে আগে দেখেছে।
সেই একই ধরনের খাম।
যেটা তার মায়ের পুরোনো জিনিসের মধ্যে পেয়েছিল।
মাইশা ধীরে ধীরে খামটা হাতে নিল।
ভেতর থেকে একটা ছোট কাগজ বের হলো।
মাত্র কয়েকটা শব্দ।
"পুরোনো বাড়ির পশ্চিম ঘর।
দরজাটা কখনো খোলা হয়নি।
চাবি যার কাছে, সে-ই জানে কেন।"
মাইশার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে আবার কাগজটা পড়ল।
পশ্চিম ঘর।
তার মনে পড়ল—
পুরোনো বাড়ির পশ্চিম দিকটা সবসময় বন্ধ থাকে।
কেউ সেখানে যায় না।
মাইশা দ্রুত ফোনটা হাতে নিল।
প্রথমে কারও কথা মনে হলো না।
তারপর সে রায়হানের নামের ওপর চাপ দিল।
কল গেল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
রায়হান ধরল না।
মাইশা বিরক্ত হয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই একটা মেসেজ এলো।
রায়হান।
"কী হয়েছে?"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
"তুমি কোথায়?"
"বাইরে। কেন?"
"আমার তোমার সাথে কথা আছে।"
কিছুক্ষণ পর—
"এখন আসব?"
মাইশা লিখল,
"হ্যাঁ।"
প্রায় দশ মিনিট পর রায়হান দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
"কী হয়েছে?"
মাইশা কোনো কথা না বলে কালো খামটা তার হাতে দিল।
রায়হান খামটা দেখে থমকে গেল।
তার মুখের রং বদলে গেল।
"এটা কোথায় পেলে?"
মাইশা বলল,
"আমার পুরোনো বাক্সে।"
রায়হান কাগজটা খুলে পড়ল।
তারপর ধীরে ধীরে মাইশার দিকে তাকাল।
"তুমি এটা কাউকে দেখিয়েছ?"
"না। শুধু তোমাকে।"
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলল,
"মাইশা, তুমি কি জানো এই পশ্চিম ঘরটা কোথায়?"
"হ্যাঁ।"
"কেউ তোমাকে ওখানে যেতে বলেছে?"
"না।"
"তাহলে যাবে না।"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"আবার একই কথা!"
রায়হান গম্ভীর হয়ে বলল,
"কারণ আমি এবার মজা করছি না।"
মাইশা চুপ হয়ে গেল।
রায়হান আবার কাগজটার দিকে তাকাল।
"এই লেখাটা..."
"কী?"
"আমি আগে দেখেছি।"
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"কোথায়?"
রায়হান উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একটা শব্দ হলো।
খট্।
দুজনেই থেমে গেল।
আবার—
খট্...
মনে হলো পুরোনো বাড়ির দিক থেকে কাঠের কোনো দরজা নড়ল।
মাইশা ফিসফিস করে বলল,
"ওইটা কী?"
রায়হান জানালার দিকে এগিয়ে গেল।
দূরে পুরোনো বাড়িটার পশ্চিম পাশ দেখা যাচ্ছে।
অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে।
কিন্তু—
একটা জানালায় খুব ক্ষীণ আলো।
রায়হান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
মাইশা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"ওখানে আলো জ্বলছে?"
রায়হান কোনো উত্তর দিল না।
তারপর হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
Unknown Number.
রায়হান কলটা ধরল না।
কিছুক্ষণ পর একটা মেসেজ এলো।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
মাত্র একটা লাইন—
"পশ্চিম ঘরের দরজা খুললে, ২০১৪ আবার ফিরে আসবে।"
রায়হানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
মাইশা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—
এবার ব্যাপারটা সত্যিই গুরুতর।
সে ধীরে ধীরে বলল,
"রায়হান... ২০১৪ সালে ওই ঘরে কী হয়েছিল?"
রায়হান এবার তার দিকে তাকাল।
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল—
"আমি জানি না, মাইশা।"
একটু থেমে সে যোগ করল,
"কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে... তোমার মা জানতেন।”
