সিজন 1 অধ্যায় 2 ড্রামা রহস্য #অতীতের প্রশ্ন #প্রথম সাক্ষাৎ #চিঠি মাইশারফিকুল ইসলাম মিলনরায়হান ব্যাপারী

নদীর ঘাটে পুরোনো খাম

•8 মিনিট পড়া•1,242 শব্দ
নদীর ঘাটে পুরোনো খাম

সকালের আলোটা জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে।

রাতের বৃষ্টির পর ঢাকার আকাশটা আজ অদ্ভুত পরিষ্কার। রাস্তায় এখনো জায়গায় জায়গায় জমে থাকা পানিতে গাড়ির চাকা ছিটকে যাচ্ছে। দূর থেকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হওয়া ছেলেমেয়েদের কণ্ঠ, রিকশার ঘণ্টা আর গাড়ির হর্ন—সব মিলিয়ে শহরটা আবার নিজের চেনা ব্যস্ততায় ফিরে গেছে।

কিন্তু মাইশার মাথার ভেতর?

সেখানে এখনো রাত ২টা ১৭ মিনিট।

বিছানায় বসে সে অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।

স্ক্রিনে একটা নাম।

রায়হান ব্যাপারী।

নামটা সে নিজেই সেভ করেছে।

কেন করেছে, সেটা সে নিজেও জানে না।

হয়তো নামটা বারবার চোখে পড়ুক বলেই।

হয়তো নিজেকে বোঝাতে যে গত রাতের ফোনটা স্বপ্ন ছিল না।

মাইশা ধীরে ধীরে ফোনটা পাশে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়াল।

চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি।

চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে। সে হাত দিয়ে চুল সরিয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাল।

গতকাল পর্যন্ত তার জীবনটা খুব সাধারণ ছিল।

স্কুল, পড়াশোনা, পরিবার, বন্ধু, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—

আর আজ সকালে উঠে মনে হচ্ছে, তার নিজের মায়ের জীবন নিয়েই সে কিছু জানে না।

মাইশা নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,

"মা... তোমার কী এমন গল্প ছিল, যেটা আমাকে কখনো বলোনি?"

কোনো উত্তর এল না।

শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ।

টিক।

টিক।

টিক।

"মাইশু! নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!"

বাইর থেকে বাবার কণ্ঠ ভেসে এল।

মাইশা দ্রুত ফোনটা হাতে নিল।

রায়হানের নম্বরটা আরেকবার দেখল।

তারপর স্ক্রিন বন্ধ করে নিচে চলে গেল।

ডাইনিং টেবিলে বাবা বসে ছিলেন। পাশে সকালের নাশতা সাজানো।

রফিকুল ইসলাম মিলন সাধারণত সকালবেলা বেশ শান্ত থাকেন। কিন্তু আজ তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর।

মাইশু চেয়ার টেনে বসতেই বাবা বললেন,

"এত দেরি হলো কেন?"

"ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে।"

"রাত জেগেছিলি?"

মাইশা এক মুহূর্ত থেমে গেল।

"হুম... একটু।"

বাবা আর কিছু বললেন না।

মাইশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল,

"আব্বু?"

"হুম?"

"রায়হান ব্যাপারী কে?"

চামচটা বাবার হাতে থেমে গেল।

খুব সামান্য সময়ের জন্য।

কিন্তু মাইশার চোখ সেটা এড়িয়ে গেল না।

বাবা ধীরে ধীরে চামচটা নামিয়ে রাখলেন।

"এই নামটা কোথায় শুনলি?"

মাইশা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

"কাল রাতে একজন আমাকে ফোন করেছিল।"

বাবার মুখের রঙ বদলে গেল।

"কে?"

"রায়হান ব্যাপারী।"

কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না।

মাইশা এবার একটু ঝুঁকে এল।

"তুমি তাকে চেনো?"

বাবা চোখ সরিয়ে নিলেন।

"চিনি।"

একটা শব্দ।

শুধু একটা শব্দ।

কিন্তু সেই একটা শব্দই মাইশার ভেতরের প্রশ্নগুলো আরও বাড়িয়ে দিল।

"কীভাবে চেনো?"

"অনেক পুরোনো পরিচয়।"

"আমার মায়ের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল?"

বাবা এবার সরাসরি মেয়ের দিকে তাকালেন।

"মাইশু, এসব নিয়ে প্রশ্ন করিস না।"

"কেন?"

"কারণ তোর জানার দরকার নেই।"

মাইশার ভ্রু কুঁচকে গেল।

"আমার মাকে নিয়ে আমার জানার দরকার নেই?"

বাবা কিছু বললেন না।

মাইশার কণ্ঠ একটু শক্ত হয়ে গেল।

"কাল রাতে সে আমাকে ফোন করে বলেছে, মায়ের ব্যাপারে আমি নাকি সবটা জানি না।"

বাবা এবার যেন হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলেন।

"সে কী বলেছে?"

"বলেছে, বারো বছর আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা তুমি আমাকে কখনো বলোনি।"

"আর কিছু?"

মাইশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"বলেছে, আমাকে তোমাকে জিজ্ঞেস করতে—বারো বছর আগে সেই মেয়েটার কী হয়েছিল, যে সবার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল।"

বাবার চোখে এবার এমন একটা ভয় দেখা গেল, যা মাইশা আগে কখনো দেখেনি।

কয়েক সেকেন্ড পর বাবা খুব ধীরে বললেন,

"রায়হান তোকে আর ফোন করলে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলবি।"

"কেন?"

"কারণ তুই এখনো অনেক কিছু বুঝিস না।"

"তাহলে তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলো।"

"সময় হলে বলব।"

"কখন সেই সময় হবে?"

বাবা এবার কোনো উত্তর দিলেন না।

মাইশা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়াল।

চেয়ারটা সরানোর শব্দে ঘরের নীরবতা ভেঙে গেল।

যাওয়ার আগে সে থেমে বলল,

"আব্বু, একটা কথা।"

বাবা তাকালেন।

"তুমি যদি কিছু লুকিয়ে থাকো, আমি একদিন না একদিন সেটা খুঁজে বের করব।"

বাবার চোখে অদ্ভুত একটা কষ্ট ফুটে উঠল।

কিন্তু তিনি শুধু বললেন,

"সব সত্যি খুঁজে বের করা সবসময় ভালো হয় না, মাইশু।"

মাইশু চলে গেল।

কিন্তু কথাটা তার মাথায় আটকে রইল।

সব সত্যি খুঁজে বের করা সবসময় ভালো হয় না।

কেন?

দুপুরের দিকে মাইশার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অপরিচিত নম্বর।

সে স্ক্রিনে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

রায়হান ব্যাপারী।

মেসেজ মাত্র দুই লাইন।

"তোমার বাবা সবটা জানেন না।

আর যা জানেন, তার সবটা তোমাকে বলবেন না।"

মাইশা কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল,

"তাহলে তুমি কী জানো?"

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর—

"তোমার মায়ের রেখে যাওয়া একটা জিনিস আমার কাছে আছে।"

মাইশার আঙুল থেমে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে লিখল,

"কী জিনিস?"

উত্তর এল কয়েক সেকেন্ড পর।

"সেটা সামনে থেকে বলাই ভালো।"

তারপর আরেকটা মেসেজ।

"আজ বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে পুরোনো নদীর ঘাটে আসতে পারবে?"

মাইশা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

গত রাতেও একই জায়গার কথা বলেছিল রায়হান।

কিন্তু এবার সে ভয় পেল না।

বরং তার ভেতরের কৌতূহলটা ভয়কে ছাড়িয়ে গেল।

সে লিখল,

"আমি একা যাব না।"

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

"সেটাই চাই। যাকে তুমি বিশ্বাস করো, তাকে সঙ্গে নিয়ে এসো।"

মাইশা একটু অবাক হলো।

সে ভেবেছিল রায়হান হয়তো একা আসতে বলবে।

কিন্তু লোকটা বরং নিজেই বলছে কাউকে সঙ্গে আনতে।

আবার একটা মেসেজ এল।

"আর একটা কথা—আজ রাতে তোমার বাবাকে কিছু বলো না।"

মাইশা সঙ্গে সঙ্গে লিখল,

"কেন?"

উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।

তারপর—

"কারণ আমি নিশ্চিত নই, তোমার বাবা জানেন কি না যে পুরোনো গল্পটা আবার শুরু হয়েছে।"

মাইশার বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।

আবার শুরু হয়েছে?

কোন গল্প?

বিকেল ৪টা ২০।

পুরোনো নদীর ঘাটের আশেপাশে মানুষজন খুব বেশি নেই।

বৃষ্টির পর নদীর পানি একটু ফুলে উঠেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।

মাইশা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পুরোনো গাছের নিচে এসে দাঁড়াল।

তার সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত বড় মানুষও আছে—তাই অন্তত একা আসার ভয়টা নেই।

সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।

৪টা ২৫।

৪টা ২৮।

৪টা ৩০।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—

"তুমি সময়ের আগে চলে এসেছ।"

মাইশা ঘুরে দাঁড়াল।

ছেলেটাকে দিনের আলোয় প্রথমবার ভালো করে দেখল।

রায়হান ব্যাপারী।

কাল রাতের কণ্ঠটা যতটা রহস্যময় ছিল, মানুষটাকে তার চেয়েও বেশি শান্ত মনে হলো।

সাদামাটা পোশাক।

চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।

মাইশা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

"তুমি রায়হান ব্যাপারী?"

রায়হান হালকা হাসল।

"হুম।"

"তুমি আমার মাকে চিনতে?"

রায়হানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

"চিনতাম—এই কথাটা খুব সহজ।"

"তাহলে কঠিন কথাটা বলো।"

রায়হান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

"তোমার মা আমার পরিবারের পরিচিত ছিলেন।"

"কতটা পরিচিত?"

"তোমার জন্মের আগের সময় থেকে।"

মাইশা চুপ।

রায়হান পকেট থেকে একটা পুরোনো খাম বের করল।

খামটা বেশ পুরোনো। কাগজের রঙ হলদেটে হয়ে গেছে।

তার ওপর হাতে লেখা কয়েকটা শব্দ।

মাইশার চোখ আটকে গেল।

"আমার মেয়ের জন্য।"

মাইশা ধীরে ধীরে বলল,

"এটা কার লেখা?"

রায়হান খামটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

"আমার বাবার।"

মাইশার হাত কেঁপে উঠল।

"আমার জন্য?"

"সম্ভবত।"

"সম্ভবত মানে?"

"আমি নিশ্চিত নই, এই চিঠিটা শেষ পর্যন্ত তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না। কিন্তু আমার বাবা এটা রেখে গিয়েছিলেন।"

মাইশা খামটা হাতে নিল।

ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।

কাগজের ওপর কয়েক লাইন লেখা।

সে পড়তে শুরু করল।

প্রথম কয়েক লাইন স্বাভাবিক।

তারপর—

তার চোখ আটকে গেল একটা নামের ওপর।

রাশেদ।

মাইশার ভ্রু কুঁচকে গেল।

"রাশেদ কে?"

রায়হান এবার নদীর দিকে তাকাল।

তারপর খুব ধীরে বলল,

"এই নামটাই হয়তো তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারে।"

মাইশা চমকে তাকাল।

"মানে?"

রায়হান কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

"আজ এতটুকুই।"

"না।"

মাইশার কণ্ঠ এবার দৃঢ়।

"তুমি আমাকে এখানে ডেকেছ। আমার মায়ের একটা চিঠি দিয়েছ। তারপর বলছ এতটুকুই?"

রায়হান তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর বলল,

"সব উত্তর একসঙ্গে পেলে রহস্য থাকে না, মাইশু।"

মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,

"আমাকে মাইশু বলে ডাকছ কেন?"

রায়হানের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল।

"তোমার মা ডাকতেন।"

মাইশার মুখের expression মুহূর্তেই বদলে গেল।

"আমার মা?"

রায়হান আর হাসল না।

শুধু বলল,

"হ্যাঁ।"

তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে যোগ করল—

"আর তোমার মায়ের গল্পটা তুমি যতটা ভাবছ, তার চেয়েও অনেক পুরোনো।"

মাইশা খামটা শক্ত করে ধরে রাখল।

তার মাথায় তখন শুধু একটা নাম ঘুরছে—

রাশেদ।

আর একটা প্রশ্ন—

তার মা আসলে কী লুকিয়ে গিয়েছিলেন?

দূরে নদীর পানিতে একটা নৌকা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আর মাইশা তখনও জানত না—

এই পুরোনো খামের ভেতরের কয়েকটা শব্দই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দরজাটা খুলে দিতে চলেছে।

অধ্যায় 2 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

নদীর ঘাটে পুরোনো খাম

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন