সিজন 1 অধ্যায় 20 ড্রামা রহস্য #পারিবারিক রহস্য #সাসপেন্স মাইশারায়হান ব্যাপারী

বারো বছরের রুদ্ধদ্বার রহস্য

•9 মিনিট পড়া•1,347 শব্দ
বারো বছরের রুদ্ধদ্বার রহস্য

রায়হানের শেষ কথাটা শুনে মাইশা কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না।

"কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে... তোমার মা জানতেন।"

ঘরের ভেতর তখন অদ্ভুত নীরবতা।

জানালার বাইরে সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এসেছে। দূরের গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো বাড়িটার পশ্চিম পাশের সেই জানালায় এখনও ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।

মাইশা ধীরে ধীরে বলল,

"তুমি কীভাবে জানলে আমার মা ওই ঘরের কথা জানতেন?"

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

সে কালো খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।

"আমি নিশ্চিত না।"

"কিন্তু তুমি এমনভাবে বললে যেন তুমি কিছু জানো।"

"আমি কিছু জিনিস জানি। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগাতে পারিনি।"

মাইশা এবার একটু এগিয়ে এল।

"তাহলে আজকে জোড়া লাগাও।"

রায়হান তার দিকে তাকাল।

"এখন?"

"হ্যাঁ।"

"রাত হয়ে যাচ্ছে।"

"তাতে কী?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"এই জন্যই তোমাকে নিয়ে সমস্যা।"

মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,

"কী সমস্যা?"

"তুমি ভয় পাও না।"

"আমি ভয় পাই।"

"তাহলে?"

"কিন্তু ভয় পেলেই তো সবকিছু থেকে পালিয়ে থাকতে পারি না।"

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"ঠিক আছে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"

"কী?"

"তুমি একা কোথাও যাবে না।"

মাইশা বলল,

"তুমি থাকলে?"

রায়হান একটু থেমে বলল,

"আমি থাকব।"

দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

পুরোনো বাড়িটার দিকে যাওয়ার পথটা নতুন বাড়ির পেছন দিয়ে গেছে। দিনের বেলায় জায়গাটা সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর পরিবেশটা একেবারে বদলে যায়।

মাইশা ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

রায়হান তার একটু সামনে।

হঠাৎ মাইশা বলল,

"রায়হান।"

"হুম?"

"একটা কথা বলি?"

"বলো।"

"তুমি কি ভয় পাচ্ছ?"

রায়হান হাঁটতে হাঁটতেই বলল,

"হ্যাঁ।"

মাইশা অবাক হলো।

"তুমি স্বীকার করছ?"

"ভয় পাওয়া আর ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়া এক জিনিস না।"

মাইশা মৃদু হাসল।

"দার্শনিক হয়ে গেছ।"

"তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে।"

"আমি কী করেছি?"

রায়হান এবার ঘুরে তাকাল।

"তুমি আমাকে শান্তিতে থাকতে দাওনি।"

মাইশা হেসে ফেলল।

"আমি তো কিছুই করি না।"

"সেটাই সমস্যা।"

পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দুজনেই থেমে গেল।

বাড়িটা দিনের তুলনায় এখন অনেক বেশি রহস্যময় লাগছে।

পুরোনো দেয়ালের রং উঠে গেছে। জানালার কাঠ কালচে হয়ে আছে। বারান্দার এক কোণে শুকনো পাতার স্তূপ।

রায়হান পকেট থেকে ফোনের টর্চ জ্বালাল।

মাইশা নিচু গলায় বলল,

"পশ্চিম ঘর কোনটা?"

রায়হান হাত তুলে বাড়ির ডান পাশ দেখাল।

"ওই শেষের ঘরটা।"

মাইশা তাকিয়ে দেখল।

দরজাটা সত্যিই বন্ধ।

পুরোনো কাঠের দরজায় একটা মরিচা ধরা তালা ঝুলছে।

মাইশা কাছে গিয়ে তালাটার দিকে তাকাল।

"এটা তো অনেক পুরোনো।"

রায়হান বলল,

"হুম।"

"কেউ ব্যবহার করে না?"

"আমার জানামতে না।"

মাইশা দরজার ওপর হাত রাখল।

ঠিক তখনই—

ঠক।

ভেতর থেকে যেন কিছু একটা শব্দ হলো।

মাইশা সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল।

"শুনলে?"

রায়হানও স্থির হয়ে গেল।

"হ্যাঁ।"

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ।

আবার—

ঠক... ঠক...

মাইশা ফিসফিস করে বলল,

"ভেতরে কেউ আছে?"

রায়হান এবার দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।

কোনো কথা নেই।

শুধু বাতাসের শব্দ।

সে বলল,

"মনে হয় পুরোনো কাঠ নড়ছে।"

মাইশা বলল,

"কাঠ এভাবে তিনবার নড়ে?"

রায়হান কোনো উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই মাইশার চোখ পড়ল দরজার পাশের দেয়ালে।

সেখানে খুব পুরোনো একটা কাঠের ফলক লাগানো।

ধুলোয় প্রায় ঢাকা।

সে হাত দিয়ে ধুলো সরাল।

কয়েকটা অক্ষর দেখা গেল।

G.B.B.

মাইশার বুক ধক করে উঠল।

"রায়হান..."

রায়হান কাছে এল।

"কী?"

"এটা দেখো।"

রায়হান ফলকটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

"এটাই সেই initials..."

মাইশা বলল,

"Gunhaji Bepari Bari?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"হ্যাঁ।"

মাইশা এবার আরও ভালো করে দেখল।

ফলকের নিচে একটা বছর খোদাই করা।

2014

দুজনের চোখাচোখি হলো।

মাইশা ধীরে বলল,

"সবকিছু আবার ওই বছরেই গিয়ে থামছে।"

রায়হান এবার খুব নিচু গলায় বলল,

"আর এটাই আমাকে ভয় দেখাচ্ছে।"

মাইশা কালো খামটা বের করল।

"এখানে লেখা ছিল পশ্চিম ঘরের কথা।"

রায়হান বলল,

"দেখাও।"

মাইশা কাগজটা এগিয়ে দিল।

রায়হান আবার পড়ল।

"পুরোনো বাড়ির পশ্চিম ঘর।

দরজাটা কখনো খোলা হয়নি।

চাবি যার কাছে, সে-ই জানে কেন।"

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

"চাবি।"

"কী?"

"এখানে চাবির কথা বলা হয়েছে।"

মাইশা বলল,

"কিন্তু চাবি কোথায়?"

রায়হান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

"তোমার কাছে থাকা G.B.B. চাবিটা মনে আছে?"

মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।

সেই চাবি।

যেটা সে তার মায়ের পুরোনো জিনিসের মধ্যে পেয়েছিল।

যার গায়ে ছোট করে লেখা ছিল—

G.B.B. — 2014

মাইশা ফিসফিস করে বলল,

"তুমি মনে করছ ওই চাবিটা..."

"হয়তো এই দরজার।"

মাইশা ব্যাগ থেকে ছোট কাপড়ের প্যাকেটটা বের করল।

ভেতরে সেই চাবি।

রায়হান চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

"তুমি এটা সঙ্গে করে এনেছ?"

"হ্যাঁ।"

"সবসময়?"

"হুম।"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"তুমি সত্যিই পাগল।"

মাইশা বলল,

"এখন এসব বাদ দাও।"

সে চাবিটা তালার কাছে ধরল।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থামিয়ে দিল।

"এক মিনিট।"

"কী?"

"আমরা জানি না দরজার ওপাশে কী আছে।"

মাইশা বলল,

"তাই বলে সারাজীবন বন্ধ রাখব?"

রায়হান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

শেষ পর্যন্ত বলল,

"ঠিক আছে। কিন্তু আমি আগে চেষ্টা করব।"

মাইশা চাবিটা তার হাতে দিল।

রায়হান ধীরে ধীরে চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাল।

ক্লিক।

দুজনেই স্থির।

তালা নড়েছে।

রায়হান আবার ঘুরাল।

ক্লিক।

তালা খুলে গেল।

মাইশার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

রায়হান দরজার হাতল ধরল।

কিন্তু দরজা খোলার আগেই—

পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।

"কে ওখানে?"

দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল।

অন্ধকার বারান্দার একদম শেষ প্রান্তে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে।

মাইশা তাকে চিনতে পারল না।

রায়হানের মুখের ভাব বদলে গেল।

"চাচা?"

লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

তার চোখ সরাসরি রায়হানের হাতে থাকা চাবির দিকে।

তারপর মাইশার দিকে।

কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে লোকটা বলল,

"এই চাবি তোমার কাছে এলো কীভাবে?"

মাইশা উত্তর দেওয়ার আগেই রায়হান সামনে এসে দাঁড়াল।

"আপনি এই চাবিটা চেনেন?"

লোকটা কিছু বলল না।

শুধু দরজার দিকে তাকাল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

"ওই দরজা খুলো না।"

মাইশা বলল,

"কেন?"

লোকটা এবার তার দিকে তাকাল।

তার চোখে ভয়।

"কারণ ওই ঘরের ভেতরে যা আছে, সেটা বাইরে আসার পর আর কোনো কিছু আগের মতো থাকবে না।"

মাইশার গলা শুকিয়ে গেল।

"আমার মায়ের সঙ্গে ওই ঘরের কী সম্পর্ক?"

লোকটা যেন হঠাৎ পাথর হয়ে গেল।

রায়হানও তাকিয়ে রইল।

লোকটা কিছুক্ষণ পর বলল,

"তুমি তানিয়ার মেয়ে?"

মাইশা ধীরে মাথা নাড়ল।

লোকটা চোখ নামিয়ে ফেলল।

"তাহলে... এত বছর পর সত্যিই সে ফিরে এসেছে।"

মাইশা অবাক হয়ে বলল,

"কে?"

লোকটা আর কোনো উত্তর দিল না।

সে দ্রুত ঘুরে চলে গেল।

মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।

"রায়হান..."

"হুম?"

"সে 'সে ফিরে এসেছে' বলতে কাকে বলল?"

রায়হান কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখ তখনও লোকটার চলে যাওয়ার দিকে।

কিছুক্ষণ পর তারা নতুন বাড়িতে ফিরে এল।

মাইশার মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন।

ঘরে ঢুকেই সে রায়হানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

"তুমি ওই লোকটাকে চিনতে?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"পুরোপুরি না।"

"কিন্তু তুমি তাকে চাচা বলে ডাকলে।"

"বাবার বাড়ির পরিচিত মানুষ। ছোটবেলায় দেখেছি।"

"তার নাম?"

রায়হান একটু ভেবে বলল,

"হাশেম চাচা।"

মাইশা ধীরে বলল,

"হাশেম চাচা জানেন আমার মায়ের ব্যাপারে।"

"হয়তো।"

"শুধু হয়তো?"

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"মাইশা, একটা কথা বলি?"

"বলো।"

"আমরা যেটার পেছনে ছুটছি, সেটা শুধু তোমার মায়ের একটা পুরোনো গল্প না।"

মাইশা চুপ।

"এটার সঙ্গে তোমার বাবাও জড়িত। আমার বাবাও জড়িত। আর সম্ভবত আরও কয়েকজন।"

মাইশা ধীরে বলল,

"তাহলে এতদিন সবাই চুপ ছিল কেন?"

রায়হান উত্তর দিল,

"কারণ কেউ একজন চেয়েছে আমরা যেন কখনো জানতে না পারি।"

রাত প্রায় দশটা।

মাইশা নিজের ঘরে বসে ছিল।

টেবিলের ওপর রাখা কালো খাম, চাবি আর পুরোনো কাগজ।

সে একটা একটা করে সবকিছু দেখছিল।

হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কালো খামের ভেতরের কাগজের একদম নিচে।

আগে খেয়াল করেনি।

খুব ছোট করে লেখা আরও একটা লাইন।

সে ফোনের আলো বাড়িয়ে পড়ল।

"যদি মাইশা কখনো জানতে পারে, তাকে রায়হানের কাছ থেকে দূরে রেখো।"

মাইশার বুক কেঁপে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ উঠল ফোনের স্ক্রিনে।

রায়হানের সঙ্গে তার শেষ কথোপকথনটা তখনও খোলা।

সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর একটা প্রশ্ন তার মাথায় এল—

কেন?

কেন তাকে রায়হানের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে?

রায়হান কি সত্যিই শুধু একজন সাহায্যকারী?

নাকি তার পরিবারের সঙ্গে এই রহস্যের সম্পর্ক আরও গভীর?

মাইশা ঠিক তখনই রায়হানকে একটা মেসেজ লিখল—

"তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।"

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—

"বলো।"

মাইশা লিখল—

"আমাকে যদি কখনো তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়... তুমি কি আমাকে সত্যিটা বলবে?"

অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

"তোমাকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিতে পারবে না। কিন্তু সত্যিটা জানার পর তুমি নিজেই হয়তো আমার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে চাইবে।"

মাইশার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

সে শুধু লিখল—

"কেন?"

রায়হানের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।

তারপর—

"কারণ আমার পরিবার সম্পর্কে এমন কিছু আছে, যেটা তোমার মা মৃত্যুর আগে লুকিয়ে গিয়েছিলেন।"

মাইশা স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর আরও একটা মেসেজ এল—

"আর আমি ভয় পাচ্ছি, সেই সত্যিটা তোমাকে আমার কাছ থেকে নয়—আমার বিরুদ্ধেই দাঁড় করাবে।"

মাইশা ফোনটা শক্ত করে ধরে রাখল।

বাইরে তখন গভীর রাত।

পুরোনো বাড়িটার পশ্চিম ঘরটা আবার অন্ধকার।

কিন্তু তার ভেতরে—

কী আছে?

একটা পুরোনো চিঠি?

কোনো ছবি?

কোনো প্রমাণ?

নাকি এমন কোনো সত্যি—

যেটা জানার পর মাইশা আর রায়হানের সম্পর্কটাই বদলে যাবে?

অধ্যায় 20 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

বারো বছরের রুদ্ধদ্বার রহস্য

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন