ড্রিম হলিডে পার্কে ঢোকার পর থেকেই সবার মধ্যে যেন আলাদা একটা উচ্ছ্বাস কাজ করছিল। চারপাশে মানুষের ভিড়, রাইডের শব্দ, দূর থেকে ভেসে আসা গান আর মাঝে মাঝে বন্ধুদের হাসির শব্দ—সব মিলিয়ে পরিবেশটা একেবারে জমে উঠেছিল।
মাইশার বাবাএর বন্ধু মুন্নার ড্রিম হলিডে পার্কে আসার পর থেকেই মোমো আর আয়াত একদিকে, সিফাত আর লামিয়া অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু সেদিনের সবচেয়ে বড় ঘটনা তখনো বাকি।
সবাই যখন পার্কের একটু নিরিবিলি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল, সিফাত হঠাৎ লামিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
লামিয়া অবাক হয়ে বলল,
"কী হয়েছে?"
সিফাত কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মৃদু হেসে বলল,
"একটা কথা বলব?"
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
"বলো।"
সিফাত এবার একটু নার্ভাস হয়ে গেল।
"তোমাকে প্রথম থেকেই আমার অন্যরকম লাগে। কিন্তু এতদিন ঠিক করে বলতে পারিনি।"
লামিয়া চুপ।
সিফাত ধীরে বলল,
"তুমি কি... আমার সঙ্গে থাকতে চাও?"
লামিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
"মানে?"
সিফাত হেসে বলল,
"মানে, তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে?"
লামিয়া কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নিচু করে ফেলল।
"হুম।"
"সত্যি?"
"হুম।"
সিফাতের মুখের হাসিটা আরও বড় হয়ে গেল।
দূর থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখে মোমো প্রায় চিৎকার করে উঠল,
"ইয়েসসস! অবশেষে!"
মাইশাও হেসে ফেলল।
"শেষ পর্যন্ত লামিয়াও মিংগেল হয়ে গেল!"
মোমো নিজের বুকে হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
"আমার সঙ্গে সঙ্গে আরেকজনও মিংগেল! আজকে আমার জীবনের সেরা দিন!"
আয়াত হেসে বলল,
"তুমি এত খুশি কেন?"
মোমো বলল,
"কারণ এতদিন আমি একা মিংগেল ছিলাম। এখন লামিয়াও আছে।"
আয়াত মাথা নাড়িয়ে বলল,
"তোমাদের মেয়েদের যুক্তি আমি কোনোদিন বুঝব না।"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে আয়াতের হাত ধরে বলল,
"চলো, তোমাকে নিয়ে ওইদিকে যাই।"
আয়াত অবাক,
"কোথায়?"
"নতুন কাপলকে একটু প্রাইভেসি দিতে হবে।"
মোমো আয়াতকে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
লামিয়া আর সিফাতও নিজেদের মতো হাঁটতে শুরু করল।
সবাই যেন ইচ্ছে করেই ওদের একটু আলাদা সময় দিচ্ছিল।
আর সেই সুযোগে মাইশা আর রায়হানও ধীরে ধীরে বাকিদের থেকে কিছুটা দূরে চলে গেল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
রায়হানের দুই হাত পকেটে।
মাইশা মাঝে মাঝে চারপাশে তাকাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর হঠাৎ মাইশা বলল,
"রায়হান।"
"হুম?"
"তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে?"
রায়হান একবার মাইশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
"হুম।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।
"কয়টা?"
রায়হান একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
"চারটা।"
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"চারটা?!"
রায়হান মাথা নেড়ে বলল,
"হুম।"
মাইশা এবার সত্যিই সিরিয়াস হয়ে গেল।
"নাম কী ওদের?"
রায়হান ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে বলল,
"সাদিয়া, নাদিয়া, দালিয়া আর মালিহা।"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীর গলায় বলল,
"ওহ।"
রায়হান বুঝতে পারল না মাইশা যে কথাটা একেবারে সত্যি ধরে নিয়েছে।
সে আবার মজা করে বলল,
"কী হলো?"
মাইশা কোনো উত্তর দিল না।
তার মুখটা হঠাৎ একটু ফ্যাকাশে লাগতে শুরু করল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চারপাশটা যেন তার কাছে একটু ঝাপসা হয়ে গেল।
মাইশা ধীরে বলল,
"রায়হান..."
"হুম?"
"আমার একটু..."
কথাটা শেষ করার আগেই মাইশার মাথাটা ঘুরে উঠল।
সে এক পা পিছিয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সামনে পড়ে যেতে নিলে রায়হান দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলল।
"মাইশা!"
রায়হানের গলার স্বর মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে মাইশাকে শক্ত করে ধরে বলল,
"মাইশা, তুমি ঠিক আছো?"
মাইশা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করল।
"মাথা... অনেক ব্যথা করতেছে।"
রায়হান উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
"কখন থেকে?"
"জানি না।"
"শরীর খারাপ লাগছে?"
মাইশা খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
"হুম... শরীরটা অনেক খারাপ লাগতেছে।"
রায়হানের মুখের হাসি এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।
সে মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?"
মাইশা দুর্বল গলায় বলল,
"ভাবছিলাম ঠিক হয়ে যাবে।"
রায়হান আর কোনো কথা না বলে মাইশার কপালে হাত রাখল।
এক মুহূর্তেই তার চোখ বদলে গেল।
"মাইশা..."
"হুম?"
"তোমার অনেক জ্বর।"
মাইশা চোখ মেলে তাকাল।
"সত্যি?"
রায়হান এবার আর একটুও মজা করল না।
"হুম। অনেক জ্বর।"
সে চারপাশে তাকাল।
মোমো আর আয়াত বেশ দূরে চলে গেছে। লামিয়া আর সিফাতও নিজেদের মতো কথা বলছে।
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করল।
"মোমোকে কল দিচ্ছি।"
মাইশা দুর্বলভাবে বলল,
"না... ওদের ডাকো না। সবাই তো ব্যস্ত।"
রায়হান বিরক্ত হয়ে বলল,
"এখন কার কী ব্যস্ততা আছে সেটা আমার দেখার বিষয় না। তুমি অসুস্থ।"
মাইশা চুপ করে গেল।
রায়হান আবার তার কপালে হাত রাখল।
"মাইশা, দাঁড়াতে পারবে?"
মাইশা চেষ্টা করে বলল,
"পারব।"
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার শরীরটা আবার দুলে উঠল।
রায়হান দ্রুত তাকে ধরে ফেলল।
"না। তুমি একদম ঠিক নেই।"
তার গলায় এবার ভয় স্পষ্ট।
"চলো, আগে বসাই তোমাকে। তারপর সবাইকে জানাচ্ছি।"
মাইশা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মাথাটা আবার ভারী হয়ে আসছিল।
আর রায়হানের মাথায় তখন শুধু একটাই কথা ঘুরছিল—
মাইশার এত জ্বর হলো কখন?
কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন ছিল—
এই জ্বরের সঙ্গে কি শুধু শরীর খারাপের সম্পর্ক, নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে?
