ড্রিম হলিডে পার্কের বিকেলটা হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ আগেও সবাই হাসি-ঠাট্টা করছিল, কেউ রাইড নিয়ে ব্যস্ত, কেউ ছবি তুলছিল। আর এখন সবার মুখেই চিন্তার ছাপ।
রায়হান এক হাত দিয়ে মাইশাকে ধরে রেখেছে। মাইশার শরীরটা তখনও বেশ দুর্বল। চোখ দুটো ভারী হয়ে এসেছে, মাথাটা যেন ঘুরছে।
রায়হান আবার তার কপালে হাত রাখল।
"মাইশু, এখন কেমন লাগছে?"
মাইশা আস্তে বলল,
"একটু ভালো।"
"একটু ভালো মানে?"
"আগের মতো মাথা ঘুরতেছে না।"
রায়হান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও চিন্তা পুরোপুরি কাটল না।
সে দূরে থাকা মোমো, আয়াত, লামিয়া, সিফাত আর আয়ানকে ডাকল।
"এই, সবাই এদিকে আসো!"
সবাই প্রায় দৌড়ে চলে এল।
মোমো মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কী হইছে ওর?"
রায়হান বলল,
"মাইশার অনেক জ্বর। মাথাও ঘুরছিল। একটু আগে পড়ে যাচ্ছিল।"
লামিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাইশার হাত ধরল।
"মাইশু, তুই ঠিক আছিস?"
মাইশা দুর্বলভাবে হাসল।
"হুম। এখন একটু ভালো লাগতেছে।"
সিফাতও চিন্তিত হয়ে বলল,
"তাহলে আর এখানে থাকা ঠিক হবে না।"
আয়াত মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ, আগে বাসায় নিয়ে যাই।"
আয়ান বলল,
"সবাই থাকলে মজা করার চেয়ে আগে মাইশাকে ঠিক করা দরকার।"
রায়হানও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বলল,
"চলো।"
মাইশা অবশ্য তখনও একটু জেদ করে বলল,
"আমি ঠিক আছি। এত চিন্তা করার কিছু নাই।"
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"তুমি চুপ করবে?"
মাইশা অবাক হয়ে তাকাল।
"কী?"
"এখন তোমার কোনো কথা শুনব না। বাসায় যাবে।"
মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"আচ্ছা।"
মোমো পাশ থেকে হেসে বলল,
"ওহ! মাইশু আজকে দেখি কেউ একজনের কথা খুব সুন্দর করে শুনতেছে।"
মাইশা চোখ রাঙিয়ে বলল,
"মোমো, চুপ কর।"
"আচ্ছা বাবা!"
সবাই হেসে ফেলল।
বাড়ি ফেরার পথে
পার্ক থেকে বের হওয়ার পর সবাই নিজেদের মতো গাড়িতে উঠে পড়ল।
মাইশা গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
রায়হান বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"এত তাকাচ্ছ কেন?"
"দেখছি।"
"কী দেখছ?"
"তুমি ঠিক আছ কি না।"
মাইশা একটু চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে বলল,
"আমি ঠিক আছি।"
রায়হান বলল,
"তোমার শরীরের অবস্থা দেখে 'ঠিক আছি' কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না।"
মাইশা এবার একটু হেসে বলল,
"তুমি এত চিন্তা করো কেন?"
রায়হান জানালার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"কারণ তুমি অসুস্থ হলে সবাইকে বিরক্ত করো।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আমি আবার কী বিরক্ত করি?"
"এই যে এখনো কথা বলতেছ।"
"বেডা!"
রায়হান হেসে ফেলল।
মাইশাও হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ আগের ভয়টা যেন একটু কমে গেল।
বাসায় ফিরে
বাড়িতে পৌঁছানোর পর সবাই মাইশাকে আগে ঘরে নিয়ে গেল।
মাইশা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল।
জ্বরটা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। মাথার ব্যথাটাও আগের তুলনায় কিছুটা কম লাগছিল।
সন্ধ্যার দিকে মাইশা উঠে বসতেই মোমো এসে বলল,
"এই, কেমন লাগছে?"
মাইশা বলল,
"ভালো।"
লামিয়া এসে কপালে হাত দিয়ে দেখল।
"জ্বর কমছে মনে হচ্ছে।"
মাইশা হাসল।
"বলছিলাম না, ঠিক হয়ে যাব।"
রায়হান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে বলল,
"এখন কেমন আছ?"
মাইশা তাকিয়ে বলল,
"এখন ভালো লাগতেছে।"
রায়হান এবার একটু স্বস্তির হাসি দিল।
"ভালো।"
মাইশা বলল,
"কিন্তু..."
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।
"কিন্তু কী?"
মাইশা কিছু না বলে মুচকি হাসল।
তারপর বলল,
"রাতে কী করবা সবাই?"
আয়ান পাশ থেকে বলল,
"কী আর করব? বসে বসে চোর পাহারা দেব।"
মোমো বলল,
"আজকে রাতে BBQ পার্টি করলে কেমন হয়?"
সবার চোখ একসঙ্গে চকচক করে উঠল।
আয়াত বলল,
"আইডিয়াটা খারাপ না।"
সিফাত বলল,
"আমি রাজি।"
লামিয়া বলল,
"আমিও।"
আয়ান বলল,
"আমিও রাজি।"
সবশেষে রায়হান মাইশার দিকে তাকাল।
"তুমি?"
মাইশা একটু ভেবে বলল,
"আমি রাজি।"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"তোমার শরীর খারাপ। বেশি রাত জাগা যাবে না।"
মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"আচ্ছা বাবা!"
সবাই হেসে উঠল।
রাতের BBQ
রাত নামতেই বাড়ির উঠানটা যেন ছোট্ট একটা পার্টি স্পটে পরিণত হলো।
এক পাশে BBQ-এর আয়োজন।
কেউ মাংস মেরিনেট করছে, কেউ কাঠকয়লা ঠিক করছে, কেউ গান চালিয়েছে।
আয়ান তো শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত।
"এই সিফাত, ওইটা ধর!"
সিফাত বলল,
"আমি কি তোর চাকর?"
আয়ান হেসে বলল,
"আজকে সবাই সবার চাকর।"
মোমো আর আয়াত এক পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।
লামিয়া আর সিফাতও মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
সবাই মজা করছিল।
কিছুক্ষণ পর মাইশাও ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে এল।
তাকে দেখেই রায়হান উঠে দাঁড়াল।
"এই মাইশা।"
মাইশা তাকাল।
"হুম?"
"এখন কেমন আছ?"
মাইশা হেসে বলল,
"ভালো লাগতেছে তো।"
রায়হান একটু কাছে এসে বলল,
"সত্যি?"
"হুম।"
"মাথা?"
"একটু ব্যথা আছে।"
"জ্বর?"
"মনে হয় কমে গেছে।"
রায়হান আবার কপালের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল।
"ঠিক আছে। বেশি দৌড়াদৌড়ি করবে না।"
মাইশা বলল,
"আমি কি ছোট বাচ্চা?"
রায়হান হেসে বলল,
"তোমাকে দেখলে মাঝে মাঝে তাই মনে হয়।"
"বেডা!"
মাইশা হঠাৎ নিজের হাতের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
"আমার না অনেক মেহেদি লাগাতে ইচ্ছা করতেছে।"
মোমো দূর থেকে শুনে বলল,
"আমি পারি না!"
লামিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আমিও না!"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"এই দুই বলদ মেহেদি দিতেই পারে না।"
মোমো বলল,
"তুই নিজেই দে।"
মাইশা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
"নিজে দিতে পারি। কিন্তু এখন নিজের হাতে দিতে ইচ্ছা করতেছে না।"
রায়হান এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল।
হঠাৎ বলল,
"আমি দিয়ে দিই।"
চারপাশে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এল।
মাইশা চোখ বড় করে তাকাল।
"তুমি?"
"হুম।"
"তুমি মেহেদি দিতে পারো?"
রায়হান একটু আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
"না।"
মাইশা অবাক।
"তাহলে?"
রায়হান মুচকি হেসে বলল,
"ট্রাই করে দেখি।"
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
"ওইইই! আজকে ইতিহাস হবে!"
মোমো বলল,
"রায়হান মেহেদি দিবে? আমি এই দৃশ্য মিস করব না!"
লামিয়া হেসে বলল,
"দাও দাও। দেখি কী হয়!"
মাইশা নিজের হাত বাড়িয়ে দিল।
"আচ্ছা। দেখি কতটুকু পারো।"
রায়হান মেহেদির কোনটা হাতে নিয়ে বসে পড়ল।
চারপাশে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
আয়ান তো ফোন বের করেই ফেলেছে।
"এইটা রেকর্ড হবে।"
রায়হান বলল,
"তুই ফোন নামা।"
আয়ান বলল,
"না ভাই। এটা ইতিহাস।"
মাইশা হাসতে হাসতে বলল,
"দাও না, তুলুক।"
রায়হান এবার মাইশার হাত নিজের হাতে নিল।
তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে মেহেদি দিতে শুরু করল।
প্রথমে একটা ছোট ফুল।
তারপর তার চারপাশে পাতার মতো ডিজাইন।
এরপর কয়েকটা বাঁকানো লাইন।
রায়হান এতটাই মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল যে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
মোমো ধীরে ধীরে লামিয়ার কানে বলল,
"বেডা তো সিরিয়াসলি পারতেছে!"
লামিয়া হেসে বলল,
"আমিও ভাবিনি।"
আয়ান ইতিমধ্যে স্টোরি বানিয়ে ফেলেছে।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে রায়হান খুব মন দিয়ে মাইশার হাতে মেহেদি আঁকছে।
সে স্টোরিতে লিখল—
"ভাই আমার প্রেমে হাবু-ডুবু খাইতেছে! "
সঙ্গে কয়েকটা হাসির ইমোজি।
প্রায় কিছুক্ষণ পর রায়হান মাইশার হাতটা একটু দূরে সরিয়ে দেখল।
"হয়ে গেছে।"
মাইশা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর চোখ বড় করে বলল,
"মাশাআল্লাহ!"
রায়হান একটু হেসে বলল,
"সুন্দর হইছে?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"অনেক সুন্দর হইছে তো!"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"সত্যি! আমি ভাবছিলাম ডিজাইন শেষ হওয়ার পর আমরা সবাই হাসপাতালে যাব।"
লামিয়া বলল,
"কিন্তু ভাই সত্যিই সুন্দর দিছে।"
আয়ান বলল,
"রায়হান, তুই এতদিন এই প্রতিভা লুকায়া রাখছিলি কেন?"
রায়হান বলল,
"নিজেও জানতাম না যে পারি।"
সবাই হেসে উঠল।
হঠাৎ লামিয়া বলল,
"মাইশু, তুই ওর হাতে কিছু এঁকে দে।"
মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।
"কী আঁকব?"
লামিয়া মুচকি হেসে বলল,
"তোর নাম লিখে দে।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কেন? ওনার তো চারটা গার্লফ্রেন্ড আছে!"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে জোরে হেসে উঠল।
"আবার শুরু করছ?"
মাইশা সিরিয়াস মুখে বলল,
"সাদিয়া, নাদিয়া, দালিয়া আর মালিহা—সবাই তো আছে।"
রায়হান মাথা নাড়িয়ে বলল,
"বোকা মেয়ে। আমি তোমার সাথে মজা করছিলাম।"
মাইশা চোখ সরু করে তাকাল।
"সত্যি?"
"হুম।"
"মিথ্যা বললে কিন্তু—"
"মাইশা।"
"হুম?"
রায়হান হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"তুমি চাইলে আমার হাতে যা খুশি আঁকতে পারো।"
মাইশা কিছুক্ষণ তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেহেদি হাতে নিল।
"ঠিক আছে।"
সে রায়হানের হাতের ওপর প্রথমে একটা ছোট্ট স্পাইডার আঁকতে শুরু করল।
রায়হান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
"স্পাইডার?"
মাইশা বলল,
"হুম।"
"কেন?"
মাইশা কিছু না বলে নিচে ছোট করে লিখল—
My Spider Boy
রায়হান লেখাটা দেখে একদম চুপ হয়ে গেল।
তার মুখে এমন একটা হাসি ফুটল, যেটা লুকানোর কোনো উপায়ই ছিল না।
আয়ান দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
"ভাইইইই! শেষ! তোর তো আজকে আর কোনো কথা নাই!"
মোমো বলল,
"ওই মুখটা দেখ! এই মানুষটা মনে হয় এখন মাটিতে পা রাখবে না।"
লামিয়া হেসে বলল,
"রায়হান ভাই, এত খুশি কেন?"
রায়হান হাতের মেহেদির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
"জানি না।"
মাইশা বলল,
"জানো না মানে?"
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কিছু জিনিসের কারণ বলতে হয় না।"
মাইশা কিছু বুঝল না।
শুধু নিজের আঁকা স্পাইডারটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
আর রায়হান?
সে বারবার নিজের হাতের দিকে তাকাচ্ছিল।
My Spider Boy.
দুটো ছোট্ট শব্দ।
কিন্তু তার কাছে সেদিন রাতে ওই শব্দ দুটোই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপহার হয়ে গেল।
চারপাশে সবাই হাসছে, BBQ-এর গন্ধে পুরো উঠান ভরে গেছে, মেহেদির গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।
সবকিছু যেন একেবারে স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও—
মাইশার ফোনটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
একটা অচেনা নম্বর থেকে মাত্র একটি মেসেজ।
"যে মানুষটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি হাসায়, তার কাছেই হয়তো তোমার সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকানো আছে।"
মাইশা কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে রায়হানের দিকে তাকাল।
রায়হান তখনও নিজের হাতে আঁকা My Spider Boy দেখে হাসছে।
মাইশার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল।
কারণ সে বুঝতে পারছিল—এই গল্পে ভালোবাসা যতটা সত্যি, রহস্যটাও ততটাই কাছাকাছি।
