রাতটা আর আগের মতো স্বাভাবিক থাকল না।
উঠানে সবাই তখনও হাসি-ঠাট্টা করছে। BBQ-এর আগুন ধীরে ধীরে কমে এসেছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে, কেউ আবার মাইশার হাতে আঁকা মেহেদি আর রায়হানের হাতে আঁকা স্পাইডার নিয়ে মজা করছে।
কিন্তু মাইশার মাথায় ঘুরছিল শুধু সেই মেসেজটা।
"যে মানুষটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি হাসায়, তার কাছেই হয়তো তোমার সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকানো আছে।"
সে বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল।
রায়হান সেটা খেয়াল করল।
"কী হয়েছে?"
মাইশা তাড়াতাড়ি ফোনটা উল্টে রাখল।
"কিছু না।"
রায়হান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"মাইশা, তোমার 'কিছু না' শুনলেই আমার মনে হয় কিছু একটা হয়েছে।"
মাইশা একটু চুপ করে বলল,
"অচেনা নম্বর।"
রায়হানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
"আবার?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"হুম।"
"কী বলেছে?"
মাইশা ফোনটা এগিয়ে দিল।
রায়হান মেসেজটা পড়ল।
তার চোখ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনে স্থির হয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"তুমি এখনই রিপ্লাই দেবে না।"
"কেন?"
"কারণ ওরা চায় তুমি ভয় পাও।"
মাইশা নিচু গলায় বলল,
"কিন্তু যদি সত্যিই তোমার সঙ্গে কিছু সম্পর্ক থাকে?"
রায়হান তার দিকে তাকাল।
"আমার সঙ্গে অনেক কিছু সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তোমাকে একা কিছু বের করতে হবে না।"
মাইশা কিছু বলল না।
রায়হান আবার বলল,
"আর একটা কথা।"
"কী?"
"আজকের পর থেকে কোনো অচেনা নম্বরের সঙ্গে একা কথা বলবে না। আমাকে দেখাবে।"
মাইশা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
"তুমি সবসময় এত অর্ডার দাও কেন?"
রায়হান হেসে ফেলল।
"কারণ তুমি কোনো কথা শোনো না।"
"আমি শুনি।"
"হুম। খুব শুনো।"
"বেডা।"
রায়হান হাসল।
কিন্তু তার চোখে হাসি ছিল না।
কারণ মেসেজটার শেষ লাইনটা তার মাথায় আটকে গিয়েছিল।
সবচেয়ে বড় সত্যি...
সত্যিটা কী?
আর কেন বারবার মাইশার মায়ের নাম, ২০১৪, গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি আর তার নিজের পরিবারকে একই সুতোয় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে?
পরদিন সকাল
সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাইশার প্রথম কাজ ছিল ফোন দেখা।
কোনো নতুন মেসেজ নেই।
গত রাতের নম্বরটাও আর কোনো কথা বলেনি।
মাইশা কিছুটা স্বস্তি পেল।
কিন্তু স্বস্তিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ঘরের টেবিলের ওপর গতকালকার কিছু জিনিস রাখা ছিল।
মেহেদির কোন।
তার পাশে কয়েকটা কাগজ।
আর একটা পুরোনো কালো খাম।
মাইশা খামটার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।
এটা সে আগেও দেখেছে।
তার মায়ের জিনিসপত্রের মধ্যে পাওয়া সেই কালো খাম।
যেটার ভেতর থেকে আগেই বের হয়েছিল সেই ছোট্ট কাগজ—
"পুরোনো বাড়ির পশ্চিম ঘর।"
মাইশা ধীরে ধীরে খামটা হাতে নিল।
তারপর খামটা উল্টে দেখল।
পেছনে খুব ছোট করে একটা লেখা।
আগে খেয়ালই করেনি।
R.B. — 2014
মাইশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
"R.B..."
সে ফিসফিস করে বলল,
"রাশেদ ব্যাপারী?"
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
মোমো ঢুকতে ঢুকতে বলল,
"এই মাইশু, কী করছিস?"
মাইশা তাড়াতাড়ি খামটা লুকিয়ে ফেলল।
"কিছু না।"
মোমো সন্দেহের চোখে তাকাল।
"আবার কিছু না?"
"হুম।"
"দেখা।"
"কী?"
"যেটা লুকাইলি।"
মাইশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে খামটা বের করল।
মোমো লেখা দেখে চুপ হয়ে গেল।
"R.B.?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"হুম।"
"রাশেদ?"
"সম্ভবত।"
মোমো ধীরে বলল,
"তোর মায়ের গল্পে এই রাশেদ কে?"
মাইশা উত্তর দিতে পারল না।
কারণ সত্যিটা সে নিজেও জানত না।
দুপুরে
রায়হানকে সব দেখানো হলো।
সে খামটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"এটা কোথায় পেয়েছ?"
"পুরোনো জিনিসের মধ্যে।"
"কোন জিনিস?"
"মায়ের।"
রায়হান খামটা আবার দেখল।
তার চোখ এবার আরও গম্ভীর।
"R.B."
মাইশা বলল,
"তুমি কি রাশেদ ব্যাপারীকে চেনো?"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর বলল,
"নামটা শুনেছি।"
"কোথায়?"
"বাবার কিছু পুরোনো কাগজে।"
মাইশা একদম সামনে এসে দাঁড়াল।
"তাহলে আমাকে বলো।"
রায়হান মাথা তুলল।
"কী বলব?"
"রাশেদ কে?"
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমি যতটুকু জানি, ততটুকুই বলব।"
"ঠিক আছে।"
"রাশেদ ব্যাপারী আমাদের পরিবারের পরিচিত ছিলেন।"
মাইশার চোখ সরু হয়ে গেল।
"ছিলেন?"
"হুম।"
"এখন নেই?"
রায়হান একটু থেমে বলল,
"এই জায়গাটাই সমস্যা।"
"মানে?"
"আমি নিশ্চিত না তিনি কোথায়।"
মাইশা চুপ।
রায়হান বলল,
"২০১৪ সালের কিছু কাগজে তার নাম বারবার এসেছে। কিন্তু কোথাও পুরো ঘটনা লেখা নেই। শুধু নাম, কিছু তারিখ আর কিছু জায়গার উল্লেখ আছে।"
"গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি?"
রায়হান তাকাল।
"হ্যাঁ।"
মাইশার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল।
"তাহলে রাশেদ ২০১৪ সালে আমাদের বাড়িতে ছিল?"
রায়হান বলল,
"সম্ভবত।"
"সম্ভবত কেন?"
"কারণ আমি তখন খুব ছোট ছিলাম, মাইশা।"
সে একটু থামল।
"আমি যা জানি, সব পরে পাওয়া কাগজ থেকে।"
মাইশা নিচু গলায় বলল,
"তাহলে তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না?"
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি যদি সব জানতাম, তোমাকে এতদিন ধরে প্রশ্নের মধ্যে রাখতাম না।"
মাইশা চুপ করে গেল।
পুরোনো বাক্স
রায়হান হঠাৎ বলল,
"একটা কাজ করা যায়।"
"কী?"
"আমার কাছে বাবার কিছু পুরোনো কাগজ আছে।"
"কোথায়?"
"ঢাকায়।"
"সেখানে R.B.-এর কিছু আছে?"
"জানি না।"
"তাহলে?"
রায়হান মুচকি হাসল।
"দেখে বের করব।"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আমিও যাব।"
"না।"
"কেন?"
"কারণ তুমি আজও পুরোপুরি সুস্থ না।"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"আমার জ্বর তো কমে গেছে।"
"তার মানে এই না যে তুমি সব জায়গায় দৌড়াবে।"
"আমি দৌড়াব না।"
"তোমাকে চিনি।"
মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"তুমি আমাকে কতদিন ধরে চেনো যে এত বড় বড় কথা বলো?"
রায়হান হেসে বলল,
"যতদিন ধরে চিনি, ততদিনেই বুঝেছি তুমি বিপজ্জনক।"
"তাহলে আমাকে নিয়ে ঘোরো কেন?"
রায়হান এক মুহূর্ত থেমে গেল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"কারণ তোমাকে একা রাখলে আরও বেশি বিপদ হবে।"
মাইশা কিছু বলল না।
সেদিন বিকেলে রায়হান তার বাড়ি থেকে একটা পুরোনো বাক্স নিয়ে এল।
বাক্সটা খুব সাধারণ।
কালচে বাদামি রঙের।
উপরের অংশে ধুলো জমে ছিল।
রায়হান বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখল।
মাইশা, মোমো, লামিয়া, সিফাত আর আয়ান সবাই আশপাশে দাঁড়িয়ে গেল।
আয়ান বলল,
"এইটা খুললে যদি ভূত বের হয়, কিন্তু আমি দায়ী না।"
মোমো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"তুই চুপ কর।"
রায়হান তালাটা খুলল।
ভেতরে পুরোনো কিছু কাগজ।
কয়েকটা ছবি।
একটা পুরোনো ডায়েরি।
আর একটা ছোট কাপড়ের প্যাকেট।
রায়হান প্রথমে কাগজগুলো দেখতে শুরু করল।
একটা।
দুটো।
তিনটা।
তারপর হঠাৎ একটা কাগজে চোখ আটকে গেল।
"এক মিনিট।"
সবাই চুপ।
রায়হান কাগজটা হাতে নিল।
উপরে লেখা—
2014
তার নিচে তিনটা নাম।
তানিয়া
রাশেদ
রায়হানের বাবা
মাইশার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
"আমার মায়ের নাম!"
রায়হান ধীরে মাথা নাড়ল।
"হুম।"
মাইশা কাগজটা নিতে চাইলে রায়হান তাকে দিল।
কাগজে পুরো ঘটনা লেখা নেই।
শুধু কয়েকটা লাইন।
"যদি তানিয়া চলে যায়, তাকে খুঁজতে যেও না।
কারণ সে নিজে থেকে যায়নি।
যে মানুষটাকে সবাই দোষ দেবে, সে আসল মানুষ নয়।
আর রাশেদকে বিশ্বাস করো না।"
মাইশার হাত কাঁপতে শুরু করল।
"এটা কে লিখেছে?"
রায়হান কাগজটা উল্টে দেখল।
কোনো নাম নেই।
শুধু নিচে একটা অদ্ভুত চিহ্ন।
R
মোমো ধীরে বলল,
"রাশেদ?"
সিফাত বলল,
"হতে পারে।"
রায়হান মাথা নাড়ল।
"না।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
"কীভাবে বুঝলে?"
রায়হান বলল,
"রাশেদ হলে নিজের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে সাইন করার দরকার ছিল না।"
মাইশা বলল,
"তাহলে কে?"
রায়হান কোনো উত্তর দিল না।
তারপর বাক্সের ভেতর থেকে কাপড়ের প্যাকেটটা তুলে নিল।
খুলতেই বেরিয়ে এল—
একটা পুরোনো হাতঘড়ি।
ঘড়িটা দেখতে পুরোনো।
চামড়ার স্ট্র্যাপ শুকিয়ে গেছে।
কিন্তু ডায়ালের নিচে ছোট করে খোদাই করা—
R.B.
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"এই ঘড়ি!"
রায়হান তাকাল।
"তুমি আগে দেখেছ?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"ওই পুরোনো ছবিতে।"
সবাই চুপ হয়ে গেল।
রায়হান ঘড়িটা হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল।
তারপর বলল,
"এটাই সেই ঘড়ি।"
মাইশা ধীরে বলল,
"তাহলে ছবির মানুষটা রাশেদ?"
রায়হান বলল,
"সম্ভবত।"
"আর সে আমার মায়ের সঙ্গে ছিল?"
"হ্যাঁ।"
মাইশার চোখে এবার ভয় স্পষ্ট।
"তাহলে আমার মা ২০১৪ সালে আসলে কীসের মধ্যে জড়িয়ে গিয়েছিল?"
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ—
রায়হানের ফোন বেজে উঠল।
সবাই চমকে তাকাল।
অচেনা নম্বর।
রায়হান ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল।
তারপর রিসিভ করল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে কোনো কথা নেই।
শুধু কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাসের শব্দ।
রায়হান বলল,
"কে?"
নীরবতা।
তারপর খুব নিচু একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল—
"ঘড়িটা পেয়েছ?"
রায়হানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
"আপনি কে?"
ওপাশের মানুষটা বলল,
"যার কারণে ২০১৪ সালের গল্পটা আজও শেষ হয়নি।"
মাইশা রায়হানের দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়হান গলা শক্ত করে বলল,
"আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন কেন?"
লোকটা হেসে বলল,
"কারণ তুমি ভুল জায়গায় খুঁজছ।"
"মানে?"
"রাশেদকে খুঁজে লাভ নেই।"
রায়হান চুপ।
লোকটা আবার বলল,
"যাকে খুঁজছ, সে তোমাদের খুব কাছেই ছিল।"
রায়হানের চোখ ধীরে ধীরে মাইশার দিকে গেল।
লোকটা শেষবার বলল,
"আর মাইশার মা যে রাতে হারিয়ে গিয়েছিল... সেই রাতে তোমার বাবাও সেখানে ছিলেন।"
কল কেটে গেল।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
কেউ কথা বলছে না।
মাইশার মুখ সাদা হয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে রায়হানের দিকে তাকাল।
"রায়হান..."
রায়হান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার মুখেও এবার কোনো উত্তর নেই।
মাইশা কাঁপা গলায় বলল,
"আমার বাবা না... তোমার বাবা?"
রায়হান ধীরে বলল,
"আমার বাবা।"
মাইশার চোখে পানি চলে এল।
"তাহলে এতদিন ধরে তোমার পরিবারও জানত?"
রায়হান কিছু বলল না।
মাইশা এবার এক পা পিছিয়ে গেল।
তার মাথায় আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটা ফিরে এল—
যাকে সে বিশ্বাস করছে, তার পরিবারই যদি তার মায়ের হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকে?
রায়হান মাইশার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
"মাইশা, আমার কথা শোনো।"
মাইশা থেমে গেল।
রায়হান খুব শান্ত গলায় বলল,
"আমি তখন শিশু ছিলাম। আমি কিছু করিনি।"
মাইশার চোখ দিয়ে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
"আমি জানি।"
সে একটু থেমে বলল,
"কিন্তু আমি এটাও জানতে চাই... তোমার বাবা সেদিন সেখানে কী করছিলেন?"
রায়হান উত্তর দিতে পারল না।
কারণ সেই মুহূর্তে তার নিজের কাছেও প্রথমবারের মতো একটা ভয়ংকর সত্যি পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল—
মাইশার মায়ের হারিয়ে যাওয়ার রাতের সঙ্গে তার নিজের পরিবারের সম্পর্ক শুধু পরিচয়ের ছিল না।
আর সেই পুরোনো ঘড়ি?
সেটা হয়তো শুধু রাশেদের পরিচয় নয়।
২০১৪ সালের সেই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
