রাতটা আর স্বাভাবিকভাবে কাটল না।
রায়হানের ফোনে আসা সেই অচেনা নম্বরের কথাগুলো যেন সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।
"মাইশার মা যে রাতে হারিয়ে গিয়েছিল... সেই রাতে তোমার বাবাও সেখানে ছিলেন।"
কথাটা বারবার মাইশার মাথায় ঘুরছিল।
সে জানত না কী বিশ্বাস করবে।
তার নিজের বাবা?
রায়হানের বাবা?
রাশেদ?
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ির পুরোনো পশ্চিম ঘর?
২০১৪ সালের সেই ঘড়ি?
সবকিছু যেন একটা সুতোয় বাঁধা, অথচ সুতোটা কোথা থেকে শুরু হয়েছে—কেউ জানে না।
রায়হান তখনও চুপ করে বসে ছিল।
তার হাতে সেই পুরোনো ঘড়ি।
R.B.
সে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
"আমার বাবার ব্যাপারে আমাকে সত্যিটা জানতে হবে।"
মাইশা নিচু গলায় বলল,
"আর আমার মায়ের ব্যাপারেও।"
রায়হান মাথা তুলল।
"হুম।"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"কিন্তু একটা কথা..."
"কী?"
"তুমি যদি কিছু জানতে পারো, আমাকে লুকাবে না তো?"
রায়হান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"না।"
"মানে?"
"তোমার কাছ থেকে আর কিছু লুকাব না।"
মাইশার চোখে অদ্ভুত একটা শান্তি এল।
"প্রমিস?"
রায়হান হাতটা এগিয়ে দিল।
"প্রমিস।"
মাইশা তার হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে নিজের আঙুল দিয়ে হালকা ছুঁয়ে দিল।
কিন্তু তাদের সেই ছোট্ট মুহূর্তটাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
হঠাৎ মাইশার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে সে থেমে গেল।
নানি।
কামরুল নাহার।
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল।
"হ্যালো, নানি?"
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো কথা এল না।
তারপর খুব ধীর গলায় নানি বললেন,
"মাইশু?"
"হুম, নানি।"
"তুই এখন কোথায়?"
"বাসায়।"
"রায়হান কি তোর সঙ্গে আছে?"
মাইশা অবাক হয়ে রায়হানের দিকে তাকাল।
"হুম।"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নানি বললেন,
"ওকে ফোনটা দে।"
মাইশা ফোনটা রায়হানের হাতে দিল।
রায়হান বলল,
"আসসালামু আলাইকুম, নানি।"
কামরুল নাহারের গলা এবার একটু কাঁপছিল।
"ওয়ালাইকুম সালাম।"
"কী হয়েছে?"
"তুই কি জানিস... ২০১৪ সালের ব্যাপারে আবার কথা উঠেছে?"
রায়হান চুপ হয়ে গেল।
"আপনি কীভাবে জানলেন?"
"সব খবর আমার কাছে আসে না, রায়হান। কিন্তু কিছু খবর... নিজের থেকেই এসে দরজায় দাঁড়ায়।"
রায়হান এবার সোজা হয়ে বসল।
"আপনি কী জানেন?"
নানি বললেন,
"অনেক বছর আগে তোর বাবা একবার আমার কাছে এসেছিল।"
রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।
"আমার বাবা?"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"তানিয়ার ব্যাপারে।"
রায়হান মাইশার দিকে তাকাল।
মাইশা নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
নানি আবার বললেন,
"তোর বাবা সেদিন একটা জিনিস আমার কাছে রেখে গিয়েছিল।"
রায়হান বলল,
"কী জিনিস?"
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
"একটা ফোন।"
মাইশা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
"ফোন?"
রায়হান হাত দিয়ে ইশারা করে তাকে শান্ত করল।
নানি বললেন,
"হ্যাঁ। পুরোনো একটা ফোন।"
রায়হানের গলা শুকিয়ে গেল।
"ওই ফোনে কী ছিল?"
নানি ধীরে বললেন,
"আমি পুরোটা দেখিনি।"
"কেন?"
"কারণ তোর বাবা আমাকে বলেছিল—যদি কোনোদিন তানিয়ার মেয়ে নিজের মায়ের ব্যাপারে জানতে চায়, তখনই ফোনটা তাকে দিতে।"
মাইশার চোখে পানি এসে গেল।
রায়হান বলল,
"নানি, ফোনটা এখন কোথায়?"
"আমার কাছে নেই।"
"মানে?"
"আমি যেটা বলতে চাইছিলাম, সেটা হলো... ফোনটা আমি তোর মায়ের জিনিসের সঙ্গে রেখেছিলাম।"
মাইশা কাঁপা গলায় বলল,
"তাহলে সেটা কোথায়?"
নানি বললেন,
"তোর পুরোনো বাড়ির পশ্চিম ঘরে।"
ঘরটা যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রায়হান ধীরে বলল,
"পশ্চিম ঘরে?"
"হ্যাঁ।"
মাইশা ফিসফিস করে বলল,
"তাহলে এতদিন..."
নানি বললেন,
"কেউ যেন সেটা খুঁজে না পায়, তাই ওটা এমন জায়গায় রাখা হয়েছিল যেখানে কেউ সহজে হাত দেবে না।"
রায়হান জিজ্ঞেস করল,
"আপনি কি জানেন ফোনটার মধ্যে কী আছে?"
নানি এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"একটা ভয়েস রেকর্ডিং আছে।"
মাইশার বুক ধক করে উঠল।
"কার?"
নানি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
"তোর মায়ের।"
মাইশার চোখ দিয়ে এবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
রায়হানও কিছু বলতে পারল না।
কামরুল নাহার ধীরে বললেন,
"আর একটা কথা মনে রাখিস।"
"কী?"
"ফোনটা পাওয়ার পর একা শুনবি না।"
রায়হান বলল,
"কেন?"
নানির গলা এবার খুব নিচু হয়ে গেল।
"কারণ ওই রেকর্ডিংয়ে এমন একটা নাম আছে... যেটা শুনলে তোরা দুজনেই বুঝবি, ২০১৪ সালের রাতে আসলে কী হয়েছিল।"
কল কেটে গেল।
কিছুক্ষণ পর
মাইশা চুপচাপ বসে ছিল।
তার চোখ লাল।
রায়হান সামনে দাঁড়িয়ে।
মোমো, লামিয়া, সিফাত আর আয়ানও সব শুনেছে।
মোমো ধীরে বলল,
"মানে পশ্চিম ঘরে ফোন আছে?"
রায়হান বলল,
"হুম।"
সিফাত বলল,
"কিন্তু হেমেশ চাচা তো আমাদের ওই ঘরে ঢুকতে নিষেধ করেছিল।"
আয়ান বলল,
"আর সেটাই তো প্রমাণ করে ঘরের ভেতরে কিছু আছে।"
লামিয়া মাইশার পাশে এসে বসে তার হাত ধরল।
"তুই ভয় পাচ্ছিস?"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"হুম।"
লামিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।
"ভয় পাস না।"
মাইশা চোখ মুছে বলল,
"আমি মাকে নিয়ে এতকিছু জানি না কেন, লামিয়া?"
লামিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।
পুরোনো বাড়ির পথে
পরদিন বিকেলে সবাই মিলে পুরোনো বাড়ির দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
তবে এবার রায়হান একা যেতে রাজি হলো না।
সে বলল,
"আমরা সবাই যাব।"
মাইশা বলল,
"হেমেশ চাচা যদি আবার বাধা দেয়?"
রায়হান বলল,
"তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করব—কেন।"
পুরোনো বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই অদ্ভুত একটা নীরবতা সবাইকে ঘিরে ধরল।
বাড়িটা যেন দিনের আলোতেও অন্ধকার।
দেয়ালের পুরোনো দাগগুলো এখনও স্পষ্ট।
মাইশা ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজায় সেই একই তালা।
রায়হান পকেট থেকে চাবিটা বের করল।
G.B.B — 2014
মাইশা চাবিটার দিকে তাকাল।
"এই চাবিটা মা কেন রেখেছিল?"
রায়হান বলল,
"সম্ভবত এই দরজার জন্য।"
সে চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাল।
ক্লিক।
তালা খুলে গেল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
"তোমরা আবার এখানে?"
সবাই ঘুরে তাকাল।
হেমেশ চাচা।
তার মুখে আগের চেয়েও বেশি ভয়।
রায়হান বলল,
"আমরা শুধু একটা জিনিস নিতে এসেছি।"
হেমেশ চাচা কঠিন গলায় বললেন,
"কী জিনিস?"
মাইশা বলল,
"আমার মায়ের ফোন।"
হেমেশ চাচার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
রায়হান সেটা লক্ষ্য করল।
"আপনি জানেন?"
হেমেশ চাচা কিছু বললেন না।
মাইশা এগিয়ে গিয়ে বলল,
"চাচা, আপনি যদি কিছু জানেন, আজকে আমাকে বলতেই হবে।"
হেমেশ চাচা মাইশার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
"তোমার মা আমাকে বলেছিল, একদিন তুমি আসবে।"
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"আমার মা?"
"হ্যাঁ।"
"কখন?"
"সেই রাতের কিছুদিন আগে।"
রায়হান বলল,
"কোন রাত?"
হেমেশ চাচা চুপ।
তারপর বললেন,
"যে রাতে তানিয়া হারিয়ে গিয়েছিল।"
মাইশার শরীর কেঁপে উঠল।
হেমেশ চাচা দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"ও আমাকে বলেছিল—যদি মাইশা কোনোদিন এই ঘরে আসে, তাকে থামাবি না।"
রায়হান বলল,
"তাহলে এতদিন আমাদের থামাচ্ছিলেন কেন?"
হেমেশ চাচা মাথা নিচু করলেন।
"কারণ আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল।"
"কে?"
হেমেশ চাচা এবার রায়হানের দিকে তাকালেন।
"যে মানুষটা চায়নি তানিয়ার গল্প কোনোদিন বাইরে আসুক।"
"কে সে?"
হেমেশ চাচা উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে একটা গাড়ির শব্দ হলো।
তিনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন।
"ভেতরে যাও।"
মাইশা অবাক।
"আপনি তো এতক্ষণ—"
"যাও!"
তার কণ্ঠে এবার ভয়।
রায়হান মাইশার হাত ধরে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।
পশ্চিম ঘর
ঘরের ভেতর ধুলোর গন্ধ।
এক পাশে পুরোনো কাঠের আলমারি।
অন্য পাশে কয়েকটা ভাঙা চেয়ার।
দেয়ালে পুরোনো ছবি।
মাইশা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল।
"ফোনটা কোথায়?"
রায়হান বলল,
"খুঁজতে হবে।"
সে আলমারি খুলতে শুরু করল।
একটার পর একটা ড্রয়ার।
পুরোনো কাপড়।
কাগজ।
ফাইল।
হঠাৎ মাইশার চোখ একটা ছোট কাঠের বাক্সে আটকে গেল।
"ওটা দেখো।"
রায়হান বাক্সটা নামিয়ে আনল।
ভেতরে একটা পুরোনো কালো মোবাইল ফোন।
ফোনটা দেখে মাইশার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
"এটাই?"
রায়হান ফোনটা হাতে নিল।
ব্যাটারি নেই।
কিন্তু পাশে একটা ছোট মেমোরি কার্ড ছিল।
মাইশা বলল,
"চালু হবে?"
রায়হান বলল,
"ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চার্জ দিতে হবে।"
ঠিক তখনই মাইশা বাক্সের ভেতর একটা ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পেল।
সে কাগজটা খুলল।
মাত্র এক লাইন—
"ফোনটা চালু করার আগে রাশেদের ঘড়িটা দেখো।"
মাইশা ধীরে ধীরে রায়হানের হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাল।
R.B.
তারপর ফোনটার দিকে।
দুটো যেন একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
রায়হান নিচু গলায় বলল,
"তাহলে ঘড়িটাই হয়তো পাসওয়ার্ড।"
মাইশা বলল,
"কিন্তু কীভাবে?"
রায়হান ঘড়িটা উল্টে দেখল।
পেছনে খুব ক্ষীণ করে চারটা সংখ্যা খোদাই করা।
0217
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"২টা ১৭!"
রায়হান স্থির হয়ে গেল।
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
যে সময় প্রথমবার মাইশাকে ফোন করা হয়েছিল।
যে সময় থেকে তার মায়ের গল্প আবার শুরু হয়েছিল।
রায়হান ফিসফিস করে বলল,
"এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা না।"
মাইশার চোখে ভয়।
"তাহলে?"
রায়হান ফোনটার দিকে তাকাল।
"এই ফোনে হয়তো এমন কিছু আছে... যেটার জন্য তোমাকে ঠিক রাত ২টা ১৭ মিনিটে ফোন করা হয়েছিল।"
মাইশা ফোনটা শক্ত করে ধরে বলল,
"আমি মায়ের কণ্ঠ শুনতে চাই।"
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"শুনবে।"
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
"কিন্তু আমরা একসঙ্গে শুনব।"
বাইরে তখন হঠাৎ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
ধাম!
সবাই চমকে উঠল।
মাইশা রায়হানের হাত চেপে ধরল।
রায়হান দরজার দিকে তাকাল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
"কেউ আমাদের সঙ্গে এই ঘরের ভেতরেই আছে।"
আর সেই মুহূর্তেই ফোনটার স্ক্রিন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।
কালো স্ক্রিনে শুধু একটা লেখা—
02:17
