ধাম!
পুরোনো পশ্চিম ঘরের দরজাটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতেই মাইশা চমকে উঠল।
সে অজান্তেই রায়হানের হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
"রায়হান..."
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"ভয় পেয়ো না।"
মাইশা ফিসফিস করে বলল,
"কেউ কি আমাদের সঙ্গে ভেতরে আছে?"
রায়হান চারপাশে তাকাল।
ঘরের ভেতর অন্ধকার।
জানালাগুলো প্রায় বন্ধ। পুরোনো পর্দা বাতাসে সামান্য নড়ছে। দেয়ালের এক কোণে মাকড়সার জাল, মেঝেতে ধুলো, আর বহু বছর ধরে ব্যবহার না করা আসবাবপত্র।
কিন্তু মানুষ?
কেউ নেই।
রায়হান ধীরে ধীরে ঘরের শেষ প্রান্তে গেল।
"কেউ নেই।"
মাইশা তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।
"কিন্তু দরজাটা বন্ধ হলো কীভাবে?"
রায়হান দরজাটা পরীক্ষা করল।
ভেতর থেকে কোনো লক লাগানো নেই।
সে দরজা খুলতে গেল।
কড়াৎ...
দরজা খুলে গেল।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল হেমেশ চাচা।
মাইশা চমকে বলল,
"আপনি এখানে?"
হেমেশ চাচার মুখে চিন্তার ছাপ।
"তোরা ফোনটা পেয়েছিস?"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,
"আপনি জানতেন ফোনটা এখানে আছে?"
হেমেশ চাচা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
"জানতাম।"
মাইশা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
"তাহলে এতদিন আমাকে বলেননি কেন?"
হেমেশ চাচা নিচু গলায় বললেন,
"কারণ তোমার মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম—তুমি নিজে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি কিছু বলব না।"
মাইশা এবার আরও অবাক।
"আমার মা আপনাকে কী বলেছিল?"
হেমেশ চাচা দরজার দিকে তাকালেন।
"তোমার মা বলেছিল, একদিন তার মেয়ে এই বাড়িতে ফিরে আসবে।"
"আর তখন?"
"তখন তাকে সবকিছু নিজের চোখে দেখতে দিতে হবে।"
মাইশার চোখ ভিজে উঠল।
"কিন্তু আমি তো কিছুই জানি না।"
হেমেশ চাচা ধীরে বললেন,
"জানার জন্যই তো এই ফোন।"
রায়হান ফোনটা হাতে তুলে ধরল।
স্ক্রিনে এখনও একই লেখা—
02:17
সে বলল,
"ফোনটা চালু হচ্ছে না।"
হেমেশ চাচা বললেন,
"চালু হওয়ার কথা না।"
"মানে?"
"এটা সাধারণ ফোন না।"
রায়হান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"কী বলতে চাইছেন?"
হেমেশ চাচা বললেন,
"তোমার মা ফোনটা রেখে যাওয়ার সময় বলেছিল, এটা যেন সাধারণভাবে খোলা না হয়।"
মাইশা বলল,
"তাহলে কীভাবে খুলব?"
হেমেশ চাচা মাইশার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"তুমি চেষ্টা করো।"
"আমি?"
"হ্যাঁ।"
মাইশা ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে আবার ভেসে উঠল—
02:17
তার নিচে একটা ছোট লাইন—
ENTER CODE
মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।
"কোড?"
রায়হান ঘড়িটার দিকে তাকাল।
"০২১৭।"
মাইশা ধীরে ধীরে চারটি সংখ্যা চাপল।
0 — 2 — 1 — 7
কয়েক সেকেন্ড কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
তারপর—
টিক।
স্ক্রিন খুলে গেল।
মাইশার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ফোনে মাত্র তিনটা ফাইল।
VOICE 01
VOICE 02
PHOTO 01
রায়হান বলল,
"আগে ভয়েসটা শুনি।"
মাইশা মাথা নাড়ল।
রায়হান ফোনটা একটা টেবিলের ওপর রাখল।
সবাই চুপ হয়ে গেল।
সে VOICE 01 চাপল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর...
একটা নারীকণ্ঠ।
খুব পরিচিত।
খুব আপন।
মাইশার বুক কেঁপে উঠল।
"মাইশু..."
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"মা..."
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
সে ফোনটার দিকে ঝুঁকে গেল।
রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।
"যদি তুই কোনোদিন এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝব... তুই সত্যিটা খুঁজতে শুরু করেছিস।"
মাইশার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
কণ্ঠটা কিছুক্ষণ থামল।
তারপর—
"আমি চাইনি তুই এই গল্পের মধ্যে বড় হোস।"
মাইশা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
"আমি চেয়েছিলাম তুই একটা সাধারণ জীবন কাটাস। স্কুলে যাস, বন্ধুদের সঙ্গে হাসিস, নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচিস..."
কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।
"কিন্তু কিছু সত্যি মানুষ লুকিয়ে রাখতে চাইলেও লুকিয়ে রাখা যায় না।"
রায়হান নিঃশব্দে মাইশার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
"২০১৪ সালের সেই রাতে আমি যা দেখেছিলাম... সেটা যদি সবাই জানত, তাহলে শুধু আমার জীবন না, আরও কয়েকটা পরিবারের জীবন বদলে যেত।"
মাইশার বুক ধড়ফড় করছিল।
তার মা বলছে—
"রাশেদকে নিয়ে যে কথাগুলো শুনবি, তার সব বিশ্বাস করিস না।"
রায়হান স্থির হয়ে গেল।
মাইশা তার দিকে তাকাল।
রেকর্ডিং চলল।
"রাশেদ খারাপ মানুষ না। কিন্তু সে ভয় পেয়েছিল। আর ভয় পাওয়া মানুষ কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।"
মাইশা ধীরে বলল,
"তাহলে রাশেদ..."
রায়হান চুপ করে শুনছিল।
রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
"যে মানুষটাকে সবাই দোষ দেবে, সে একা দায়ী না।"
একটু বিরতি।
তারপর—
"সেদিন রাতে রায়হানের বাবাও সেখানে ছিলেন।"
মাইশার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল।
রায়হানও চোখ নামিয়ে ফেলল।
কণ্ঠটা বলল,
"কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষতি করতে আসেননি।"
মাইশা অবাক হয়ে তাকাল।
রেকর্ডিংয়ের পরের কথাগুলো আরও ধীর।
"তিনি আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন।"
রায়হান ফিসফিস করে বলল,
"আমার বাবা..."
মাইশা চুপ করে রইল।
তারপর মায়ের কণ্ঠ—
"আমি যদি কখনো ফিরে না আসি, তাহলে মাইশুকে বলবি—তার বাবা তাকে কোনোদিন মিথ্যা বলেনি। শুধু সব সত্যি বলতে পারেনি।"
মাইশার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
"কেন মা?"
সে যেন নিজের মাকে উদ্দেশ্য করেই বলল,
"কেন?"
রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠ যেন সেই প্রশ্নের উত্তরই দিচ্ছিল।
"কারণ আমাকে কিছুদিনের জন্য লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।"
মাইশা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
"লুকিয়ে?"
রায়হানও তাকাল।
"মানে তোমার মা তখন..."
মাইশা কাঁপা গলায় বলল,
"মা মারা যায়নি?"
ঘরের ভেতর সবাই নিস্তব্ধ।
কিন্তু রেকর্ডিং তখনও চলছে।
"আমি জানি না এই রেকর্ডিং তোর হাতে পৌঁছাতে কত বছর লাগবে।"
"কিন্তু যদি তুই এটা শুনিস, তাহলে একটা জিনিস মনে রাখিস—"
"আমি তোকে ছেড়ে যাইনি।"
মাইশার মুখ দিয়ে কান্না বেরিয়ে এল।
রায়হান তার পাশে এসে দাঁড়াল।
মাইশা তার হাত ধরে ফেলল।
মায়ের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়ে গেল।
"আমাকে খুঁজতে হলে প্রথমে সেই মানুষটাকে খুঁজিস, যে ২০১৪ সালের রাত ২টা ১৭ মিনিটে শেষবার আমাকে দেখেছিল।"
রেকর্ডিং শেষ।
ঘরে নিস্তব্ধতা।
কেউ কথা বলছে না।
মাইশা ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
তার চোখে পানি।
কিন্তু সেই পানির ভেতর এবার একটা নতুন অনুভূতি—
আশা।
"রায়হান..."
"হুম?"
"আমার মা বেঁচে থাকতে পারে।"
রায়হান তার দিকে তাকাল।
"হ্যাঁ।"
"তাহলে আমি ওনাকে খুঁজব।"
রায়হান মাথা নাড়ল।
"আমরা খুঁজব।"
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে গেল
রায়হান ফোনের দ্বিতীয় রেকর্ডিংয়ের দিকে তাকাল।
VOICE 02
সে বলল,
"এটাও শুনতে হবে।"
মাইশা চোখ মুছে বলল,
"হুম।"
রায়হান প্লে করল।
এবার কণ্ঠটা মাইশার মায়ের নয়।
একজন পুরুষ।
গভীর, ক্লান্ত কণ্ঠ।
"যদি এই রেকর্ডিং কেউ পেয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে আমি আর চুপ করে থাকতে পারিনি।"
মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।
পুরুষের কণ্ঠটা আবার বলল,
"তানিয়া চলে যাওয়ার পর সবাই ভেবেছিল রাশেদ দায়ী।"
"কিন্তু আসল ঘটনা অন্য।"
"সেই রাতে তানিয়াকে আমি নদীর ঘাটে দেখেছিলাম।"
রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।
"নদীর ঘাট..."
মাইশা ফিসফিস করে বলল,
"যে পুরোনো ঘাটে তুমি আমাকে প্রথম চিঠি দিয়েছিলে?"
রায়হান ধীরে মাথা নাড়ল।
রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠটা বলল,
"রাত ২টা ১৭ মিনিটে তানিয়ার সঙ্গে একজন নারী ছিল।"
মাইশা হঠাৎ থেমে গেল।
"একজন নারী?"
কণ্ঠটা বলল,
"আমি তাকে চিনতাম।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
"কিন্তু তার নাম বলা যাবে না।"
রেকর্ডিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
মাইশা হতবাক।
"এইটা কী?"
রায়হান আবার প্লে করল।
একই জায়গায় এসে রেকর্ডিং থেমে যাচ্ছে।
"ফাইলটা কাটা।"
আয়ান বলল,
"ইচ্ছে করে কাটা হয়েছে?"
রায়হান ফোনটা পরীক্ষা করল।
"সম্ভবত।"
মোমো বলল,
"তাহলে ওই নারী কে?"
কেউ উত্তর দিল না।
PHOTO 01
রায়হান এবার তৃতীয় ফাইলটা খুলল।
ছবিটা প্রথমে ঝাপসা।
তারপর স্ক্রিনে ধীরে ধীরে একটা ছবি পরিষ্কার হয়ে উঠল।
পুরোনো নদীর ঘাট।
সময়—
02:17 AM
এক পাশে মাইশার মা।
তার সামনে একজন পুরুষ।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন নারী।
মাইশা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জমে গেল।
"এই নারীটা..."
রায়হান বলল,
"চেনো?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
"না।"
হেমেশ চাচা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
হঠাৎ ছবিটা দেখে তিনি এক পা পিছিয়ে গেলেন।
মাইশা সেটা দেখে ফেলল।
"চাচা?"
হেমেশ চাচা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
রায়হান কঠিন গলায় বলল,
"আপনি ওনাকে চেনেন।"
হেমেশ চাচা চুপ।
"চেনেন, তাই না?"
কিছুক্ষণ পর তিনি খুব আস্তে বললেন,
"হ্যাঁ।"
মাইশার বুক ধক করে উঠল।
"কে উনি?"
হেমেশ চাচা উত্তর দিতে পারলেন না।
রায়হান আবার বলল,
"নাম বলুন।"
হেমেশ চাচা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
"তোমরা এখনো প্রস্তুত না।"
মাইশা এবার দৃঢ় গলায় বলল,
"আমি আমার মাকে খুঁজছি।"
"জানি।"
"তাহলে আমাকে থামাবেন না।"
হেমেশ চাচা মাইশার দিকে তাকালেন।
তার চোখে অদ্ভুত একটা মায়া।
"তোর মায়ের মতোই কথা বলিস।"
মাইশার চোখ ভিজে গেল।
"তাহলে নামটা বলুন।"
হেমেশ চাচা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন—
"ওই নারী..."
তিনি থেমে গেলেন।
তারপর দরজার বাইরে তাকালেন।
"ওই নারীই জানে তোর মা এখন কোথায়।"
মাইশার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
"উনি এখন কোথায়?"
হেমেশ চাচা বললেন,
"ঢাকায় না।"
রায়হান জিজ্ঞেস করল,
"নোয়াখালীতেও না?"
হেমেশ চাচা মাথা নাড়লেন।
"না।"
"তাহলে?"
হেমেশ চাচা ধীরে বললেন,
"চট্টগ্রাম।"
মাইশা অবাক হয়ে গেল।
"চট্টগ্রাম?"
হেমেশ চাচা মাথা নেড়ে বললেন,
"কিন্তু যাওয়ার আগে তোমাদের আরেকটা সত্যি জানতে হবে।"
রায়হান বলল,
"কী সত্যি?"
হেমেশ চাচা উত্তর দিলেন,
"তোমার মা একা হারিয়ে যায়নি।"
মাইশা স্তব্ধ।
"মানে?"
হেমেশ চাচা ধীরে বললেন,
"আর যে মানুষটা তাকে সেদিন সাহায্য করেছিল..."
তিনি রায়হানের দিকে তাকালেন।
"সে ছিল তোমার বাবা।"
রায়হানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
আর মাইশা?
সে প্রথমবার বুঝতে পারল—
তার বাবা, তার মা, রায়হানের বাবা, রাশেদ—
চারজনের জীবনই সেই এক রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা এখনো বাকি—
ছবির সেই অচেনা নারী কে?
আর যদি হেমেশ চাচা সত্যি বলে থাকেন—
মাইশার মা কি সত্যিই চট্টগ্রামে জীবিত?
রাত নামার আগেই রায়হানের ফোনে আবার সেই অচেনা নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল।
"ছবির নারীকে খুঁজতে চট্টগ্রাম যাওয়ার দরকার নেই।
কারণ সে নিজেই তোমাদের খুঁজে বের করবে।"
মাইশা মেসেজটা পড়ে রায়হানের দিকে তাকাল।
রায়হান ধীরে ফোনটা নামিয়ে বলল,
"মাইশু..."
"হুম?"
"আমাদের সময় খুব কম।"
