সকালটা অন্য দিনের মতো ছিল না।
মাইশা ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারল, গত রাতের ভিডিওটা তার মাথা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরেনি।
নদীর ঘাট।
মা।
রাশেদ।
অচেনা নারী।
আর সেই ছায়ামূর্তি।
সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা তাকে অস্থির করে তুলেছিল, সেটা হলো শেষ মেসেজটা—
“তোমার বাবার কাছে তার খবর আছে।”
মাইশা বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ তার মনে হচ্ছিল, চারপাশটা এখনও অন্ধকার।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
"মাইশু, উঠেছিস?"
নানির কণ্ঠ।
মাইশা দ্রুত দরজা খুলে দিল।
কামরুল নাহার ঘরে ঢুকে মেয়েটার মুখের দিকে তাকালেন।
"কী হয়েছে? সারারাত ঘুমাসনি?"
মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"নানি, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
"কর।"
"রাশেদ কে?"
প্রশ্নটা শুনেই নানির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়লেন।
"তুই এই নাম কোথায় শুনলি?"
"তুমি আগে উত্তর দাও।"
নানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
"রাশেদ ব্যাপারী।"
মাইশার বুক ধক করে উঠল।
"তুমি তাকে চেনো?"
"চিনতাম।"
"এখন?"
নানি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"এখনও বেঁচে আছে কি না, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।"
মাইশা অবাক হয়ে তাকাল।
"কিন্তু রায়হান বলেছিল—"
"রায়হান কী বলেছে?"
"তার পরিবারের কাগজপত্রে রাশেদের নাম আছে। আর আমরা একটা ঘড়ি পেয়েছি।"
মাইশা টেবিল থেকে সেই পুরোনো ঘড়িটা এনে নানির সামনে রাখল।
ঘড়ির পেছনে খোদাই করা—
R.B.
নানি ঘড়িটা হাতে নিয়েই স্থির হয়ে গেলেন।
তার আঙুল কেঁপে উঠল।
"এটা..."
"তুমি চেনো?"
নানি ঘড়িটার পেছনে হাত বুলিয়ে বললেন,
"এই ঘড়িটা আমি শেষবার তোর মায়ের হাতে দেখেছিলাম।"
মাইশা যেন কথা হারিয়ে ফেলল।
"মায়ের হাতে?"
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু এটা তো রাশেদের!"
নানি মাথা নাড়লেন।
"রাশেদেরই ছিল। তোর মা সেটা আমার কাছে একবার রেখে গিয়েছিল।"
মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
"কেন?"
নানি এবার অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"কারণ সে জানত, একদিন এই ঘড়িটাই প্রমাণ হবে যে সে মিথ্যা বলেনি।"
কিছুক্ষণ পর রায়হানও ঘরে এল।
তার হাতে একটা ফাইল।
"নানি, আমরা গত রাতের ভিডিওটা—"
কথা শেষ করার আগেই সে নানির হাতে ঘড়িটা দেখতে পেল।
রায়হান থেমে গেল।
"এটা আপনি কোথায় পেলেন?"
নানি বললেন,
"মাইশা এনেছে।"
রায়হান মাইশার দিকে তাকাল।
"তুমি নানিকে সব বলেছ?"
"হ্যাঁ।"
"ভিডিওটার কথাও?"
মাইশা মাথা নাড়ল।
রায়হান চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
"তাহলে আমাদের এখন একটা জিনিস বুঝতে হবে।"
"কী?"
"রাশেদকে খুঁজে বের করতে হবে।"
নানি ধীরে বললেন,
"রাশেদকে খুঁজে পাওয়া এত সহজ না।"
রায়হান তাকালেন নানির দিকে।
"আপনি জানেন সে কোথায়?"
"না।"
"কিন্তু আপনি জানেন, সে কোথায় যেতে পারে।"
নানি কোনো উত্তর দিলেন না।
রায়হান ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখল।
"আমি বাবার পুরোনো কাগজপত্রে একটা ঠিকানা পেয়েছি।"
মাইশা তাড়াতাড়ি ফাইলটা খুলল।
একটা পুরোনো কাগজ।
তারিখ—
২০১৪
নিচে লেখা—
“রাশেদ — চরবাগান, নদীর ওপারের পুরোনো গুদাম।”
মাইশা তাকিয়ে বলল,
"এটা কি এখনো আছে?"
রায়হান বলল,
"জানি না।"
"তাহলে যাব।"
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"একা না।"
মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
"আমি জানি।"
"আর আজ সন্ধ্যার আগে না।"
"কেন?"
"কারণ জায়গাটা পুরোনো। কেউ থাকে কি না জানি না।"
মাইশা একটু চুপ করে বলল,
"রায়হান..."
"হুম?"
"তুমি ভয় পাচ্ছ?"
রায়হান হালকা হেসে বলল,
"তোমাকে নিয়ে হলে, হ্যাঁ।"
মাইশা কিছু বলল না।
বিকেলের দিকে মাইশা, রায়হান, মোমো আর লামিয়া পুরোনো গুদামের দিকে রওনা হলো।
যাওয়ার আগে রায়হান তার বাবাকে ফোন করেছিল।
কিন্তু ফোন ধরেননি তিনি।
রায়হান দ্বিতীয়বার ফোন করল।
তবুও কোনো উত্তর নেই।
মাইশা সেটা খেয়াল করল।
"আঙ্কেল ফোন ধরছেন না?"
রায়হান মাথা নাড়ল।
"হুম।"
"উনি কি কিছু জানেন?"
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
"জানলেও এখনো আমাকে বলেননি।"
"তুমি কি উনার ওপর রাগ করেছ?"
"রাগ না।"
"তাহলে?"
"উত্তর চাই।"
নদীর ওপারের জায়গাটা অনেকটাই নির্জন।
পুরোনো গুদামটা দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল।
দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ ভেঙে গেছে।
জং ধরা টিনের দরজা।
চারপাশে আগাছা।
মোমো ফিসফিস করে বলল,
"এখানে মানুষ থাকে?"
লামিয়া বলল,
"দেখে তো মনে হচ্ছে না।"
রায়হান সামনে এগিয়ে গেল।
দরজায় হাত রাখতেই একটা কর্কশ শব্দ হলো।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে ধুলোর গন্ধ।
পুরোনো কাঠের বাক্স।
এক কোণে ভাঙা চেয়ার।
মাইশা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
"রাশেদ..."
কেউ উত্তর দিল না।
রায়হান একটা পুরোনো বাক্স খুলল।
ভেতরে কয়েকটা কাগজ।
একটা পুরোনো ছবি।
আর একটা ছোট কাপড়ের থলে।
মাইশা ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
তার মা।
রাশেদ।
আর রায়হানের বাবা।
মাইশার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
"রায়হান..."
রায়হান ছবিটা হাতে নিল।
তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
"এটা..."
মাইশা বলল,
"তোমার বাবা এখানে ছিলেন।"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে উনি সত্যিই ওই রাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।"
রায়হান ধীরে বলল,
"কিন্তু এর মানে এই না যে উনি দোষী।"
মাইশা মাথা নিচু করল।
ঠিক তখনই মোমো চিৎকার করে উঠল।
"এই যে!"
সবাই তার দিকে তাকাল।
মোমোর হাতে একটা ছোট ধাতব বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা—
02:17
রায়হান বাক্সটা নিল।
তালা নেই।
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
মাত্র কয়েকটি লাইন—
“যে ঘড়ি সময় থামিয়ে রেখেছিল, তার কাঁটা সত্যি বলবে।
রাশেদকে খুঁজতে হলে সময়ের দিকে তাকিও না।
ঘড়ির ভেতরে দেখো।”
মাইশা অবাক হয়ে ঘড়িটার দিকে তাকাল।
"ঘড়ির ভেতরে?"
রায়হান ঘড়িটা হাতে নিল।
"এটা খুলতে হবে।"
"কিন্তু নষ্ট হয়ে যাবে না তো?"
"সাবধানে করলে না।"
রায়হান ঘড়িটার পেছনের ঢাকনাটা খুব সাবধানে খুলল।
ভেতরে একটা অতি ছোট কাগজ গুঁজে রাখা।
মাইশা সেটা বের করল।
কাগজে একটা নাম—
সায়রা।
তার নিচে একটা ঠিকানা।
মাইশা ফিসফিস করে পড়ল,
"সায়রা হক..."
রায়হান স্থির হয়ে গেল।
"এই নামটাই..."
"কী?"
"গত রাতের ভিডিওতে যে নারী ছিল, তার নাম হয়তো এটাই।"
মাইশার বুক ধক করে উঠল।
"তাহলে সায়রা কে?"
রায়হান কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই গুদামের বাইরে একটা শব্দ হলো।
কেউ যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটল।
সবাই চুপ।
রায়হান দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে কেউ নেই।
শুধু দূরে নদীর পানি।
মাইশা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"কেউ ছিল?"
"জানি না।"
রায়হান নিচে তাকাল।
মাটিতে একটা জিনিস পড়ে আছে।
একটা পুরোনো খাম।
রায়হান সেটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
“মেহেজাবিনের জন্য।”
মাইশার শরীর কেঁপে উঠল।
"আমার জন্য?"
রায়হান খামটা তার হাতে দিল।
মাইশা ধীরে ধীরে খাম খুলল।
ভেতরে একটা চিঠি।
মায়ের হাতের লেখা।
প্রথম লাইনটাই ছিল—
“মাইশু, যদি কখনো রাশেদের ঘড়ির ভেতর থেকে এই চিঠিটা খুঁজে পাও, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে সত্যিটা বলার মতো সময় পাইনি।”
মাইশার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
চিঠির পরের লাইন—
“রাশেদ খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু সে এমন একটা সত্য জানে, যেটা জানলে তুই হয়তো নিজের বাবাকেও অন্য চোখে দেখবি।”
মাইশা থেমে গেল।
রায়হান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চিঠির শেষদিকে লেখা—
“আর একটা কথা মনে রাখিস—রায়হানের বাবা আমাকে সেদিন বাঁচাতে এসেছিল। তাকে কখনো সেই রাতের অপরাধী ভাবিস না।”
মাইশা ধীরে ধীরে রায়হানের দিকে তাকাল।
রায়হানের চোখেও বিস্ময়।
তার বাবা যে সত্যিই মাইশার মাকে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন—এটা এবার তানিয়ার নিজের লেখা প্রমাণ।
কিন্তু চিঠির একদম শেষ লাইনটা আরও ভয়ংকর—
“যে মানুষটা আমাদের সবাইকে আলাদা করে দিয়েছিল, সে আমাদের পরিবারের বাইরের কেউ ছিল না।”
মাইশার হাত কাঁপতে লাগল।
"পরিবারের বাইরের কেউ ছিল না..."
রায়হান ধীরে বলল,
"মানে?"
মাইশা মাথা তুলল।
"মানে, যে মানুষটা মাকে লুকাতে বাধ্য করেছিল..."
সে থেমে গেল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
"সে আমাদের পরিচিত কেউ।"
ঠিক তখনই মাইশার ফোনে একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
“সায়রাকে খুঁজে পেয়েছ?”
মাইশা উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকটা মেসেজ এল—
“তাহলে এবার জেনে যাও—রাশেদ কোথায় আছে।”
তারপর তৃতীয় মেসেজ—
“কিন্তু তার আগে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো, ২০১৪ সালের সেই রাতে তিনি কাকে নদীর ওপারে পাঠিয়েছিলেন।”
মাইশা স্থির হয়ে গেল।
রায়হান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কী হয়েছে?"
মাইশা ফোনটা তার হাতে দিল।
রায়হান মেসেজগুলো পড়ল।
তারপর অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
কারণ এবার রহস্যটা শুধু মাইশার মাকে ঘিরে নেই।
২০১৪ সালের সেই রাতে রাশেদ কোথায় গিয়েছিল—তার উত্তর হয়তো মাইশার বাবাই জানেন।
আর ঘড়ির ভেতর থেকে পাওয়া “সায়রা হক” নামটাই ছিল সেই সত্যের পরের দরজা।
