নদীর ঘাট থেকে ফেরার পরও মাইশার মাথা থেকে সেই পুরোনো চিঠিটার কথা যাচ্ছিল না।
বিশেষ করে একটা নাম—
রাশেদ।
কে এই রাশেদ?
তার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল?
আর রায়হানের বাবা কেন এমন একটা চিঠি রেখে গিয়েছিলেন, যার ওপর লেখা ছিল—
“আমার মেয়ের জন্য।”
প্রশ্নগুলো যত বাড়ছিল, উত্তর যেন তত দূরে সরে যাচ্ছিল।
পরদিন বিকেলে মাইশা বারান্দায় বসে ফোন ঘাঁটছিল। হঠাৎ একটা মেসেজ এল।
রায়হান ব্যাপারী।
"চিঠিটা পড়েছ?"
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
"হ্যাঁ। কিন্তু রাশেদ কে?"
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
"এখনই সব বলা যাবে না।"
মাইশা বিরক্ত হয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার মেসেজ।
"রাগ করেছ?"
মাইশা লিখল,
"না।"
উত্তর এল—
"তোমার ‘না’টা দেখে মনে হচ্ছে তুমি বেশ রেগে আছ।"
মাইশা এবার হেসে ফেলল।
"আপনি খুব বেশি বুঝে ফেলেন নিজেকে।"
রায়হান লিখল,
"তুমি খুব সহজে রেগে যাও।"
"আপনি আমাকে কতদিন ধরে চেনেন যে এমন কথা বলছেন?"
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর—
"তোমার মায়ের কাছ থেকে তোমার ব্যাপারে কিছু শুনেছিলাম।"
মাইশার হাসিটা মিলিয়ে গেল।
আবার সেই রহস্য।
সে লিখল,
"আমার মা আমার ব্যাপারে কী বলেছিল?"
রায়হান এবার উত্তর দিতে একটু বেশি সময় নিল।
"সেটা একদিন বলব।"
মাইশা ফোনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
"এই লোকটার ‘একদিন বলব’ ছাড়া আর কোনো উত্তর নেই নাকি?"
দুদিন পর আবার তাদের দেখা হলো।
পুরোনো কিছু কাগজ দেখানোর জন্য রায়হান মাইশাকে দেখা করতে বলেছিল। এবার জায়গাটা ছিল নদীর ঘাটের কাছের একটা শান্ত ক্যাফে।
মাইশা এসে বসতেই রায়হান বলল,
"তুমি সবসময় এত দেরি করো?"
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আমি মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করেছি।"
"পাঁচ মিনিটও দেরি।"
"আপনি তাহলে আগে এসেছেন কেন?"
রায়হান হেসে বলল,
"তোমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে জানতাম।"
মাইশা চোখ ছোট করে তাকাল।
"আপনি আমাকে নিয়ে অনেক কথা বলেন।"
"তুমি সুযোগ দাও।"
"আমি?"
"হুম।"
মাইশা আর কথা বাড়াল না।
রায়হান টেবিলের ওপর কয়েকটা কাগজ রাখল।
"এগুলো আমার বাবার পুরোনো নোট। তোমার মায়ের নাম কয়েক জায়গায় আছে।"
মাইশা কাগজগুলো দেখতে শুরু করল।
হঠাৎ রায়হানের চোখ তার মুখের দিকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে বলল,
"একটা প্রশ্ন করি?"
মাইশা কাগজ থেকে চোখ না তুলে বলল,
"করেন।"
"তোমার চোখের পাশে ওই ছোট্ট তিলটা..."
মাইশা এবার তাকাল।
"কী হয়েছে?"
রায়হান ভ্রুয়ের ঠিক ওপরের দিকে ইশারা করে বলল,
"ওটা কি তুমি বসিয়েছ?"
মাইশা অবাক।
"বসাবো কেন?"
রায়হান হেসে বলল,
"অনেক মেয়েই তো কিউট দেখানোর জন্য, একটু মায়াবী লাগার জন্য চোখের পাশে তিল আঁকে। তাই ভাবলাম—তুমিও হয়তো..."
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"না।"
রায়হান হেসে জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে?"
মাইশা একটু গর্বের সঙ্গে বলল,
"ন্যাচারাল।"
"সত্যি?"
"হ্যাঁ। আমার এটা বসাতে হয় না।"
রায়হান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
"বুঝলাম।"
মাইশা সন্দেহের চোখে তাকাল।
"কী বুঝলেন?"
"কিছু না।"
"না, কিছু একটা বুঝছেন।"
রায়হান হালকা হাসল।
"বুঝলাম, তোমার আত্মবিশ্বাসটা কম না।"
মাইশা গম্ভীর মুখে বলল,
"আত্মবিশ্বাস থাকলে সমস্যা কী?"
"সমস্যা নেই।"
"তাহলে?"
রায়হান কাগজের দিকে তাকিয়ে বলল,
"তবে মাঝে মাঝে তোমার এই আত্মবিশ্বাসটা একটু বিপজ্জনক।"
মাইশা হেসে ফেলল।
"আপনি না, অনেক অদ্ভুত।"
রায়হানও হেসে বলল,
"তুমি এখনো আমাকে ঠিকমতো চেনো না।"
মাইশার হাসি একটু থেমে গেল।
সে আবার কাগজের দিকে তাকাল।
"হয়তো।"
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ।
তারপর মাইশা আস্তে জিজ্ঞেস করল,
"রায়হান ভাই..."
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
"হুম?"
"আপনি কি আমার মাকে ভালোভাবে চিনতেন?"
রায়হানের মুখের হাসিটা এবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"আমি তোমার মাকে চিনতাম না যতটা তুমি ভাবছ।"
মাইশা অবাক।
"তাহলে?"
"আমার বাবা চিনতেন।"
"আর আপনি?"
রায়হান একটু নিচু গলায় বলল,
"আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম।"
মাইশা এবার বুঝতে পারল—গত কয়েকদিন ধরে যে মানুষটাকে সে এত প্রশ্ন করছে, সেই মানুষটিও আসলে সবকিছুর সরাসরি সাক্ষী ছিল না।
রায়হান কাগজগুলো গুছিয়ে নিল।
তারপর বলল,
"আর একটা কথা।"
"কী?"
"আমাকে শুধু ‘ভাই’ বলে ডাকবে না।"
মাইশা অবাক হয়ে বলল,
"কেন?"
রায়হান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
"ভালো লাগে না।"
মাইশা মুচকি হেসে বলল,
"আচ্ছা, রায়হান ভাই।"
রায়হান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মাইশা হেসে ফেলল।
"কী হলো?"
রায়হান মাথা নাড়িয়ে বলল,
"কিছু না।"
কিন্তু তার মুখের বিরক্তিটা দেখে মাইশার হাসি আর থামল না।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
তাদের মাঝের রহস্যের পাশাপাশি
একটা অদ্ভুত, নামহীন সম্পর্কও যেন খুব ধীরে ধীরে তৈরি হতে শুরু করল।
