সিজন 1 অধ্যায় 30 পারিবারিক ড্রামা #পারিবারিক ড্রামা #স্বীকারোক্তি মাইশারফিকুল ইসলাম মিলনরায়হান ব্যাপারীকামরুল নাহার

বাবার চোখে গভীর অনুশোচনা

•8 মিনিট পড়া•1,262 শব্দ
বাবার চোখে গভীর অনুশোচনা

সায়রার ফোন কেটে যাওয়ার পরও মাইশা অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাতে মায়ের কালো ডায়েরি।

সামনে রাশেদের ঘড়ি।

আর মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে সায়রার শেষ কথাগুলো—

“সেদিন তোমার বাবা রাশেদকে নদীর ওপারে পাঠিয়েছিলেন।”

রাশেদকে।

সায়রাকে।

তাহলে ২০১৪ সালের সেই রাতে সবাই একই জায়গায় ছিল।

মাইশার মা তানিয়া।

রাশেদ।

সায়রা।

আর তার বাবা রফিকুল ইসলাম মিলন।

কিন্তু এখনও একটা মানুষ অদৃশ্য।

ভিডিওর শেষের সেই ছায়ামূর্তি।

মাইশা ধীরে বলল,

"রায়হান..."

"হুম?"

"আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে হবে।"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"আজই।"

মোমো আর লামিয়া একে অপরের দিকে তাকাল।

মোমো আস্তে বলল,

"তুই চাইলে আমরা বাইরে থাকি।"

মাইশা মাথা নাড়ল।

"না। তোমরা থাকো। এতদূর এসে এখন কাউকে একা ছাড়ব না।"

রায়হান মাইশার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

"এই জন্যই তুমি অন্যরকম।"

মাইশা তাকাল।

"কী জন্য?"

"ভয় পেলেও পিছিয়ে যাও না।"

মাইশা কোনো উত্তর দিল না।

শুধু ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে রাখল।

সন্ধ্যা নামার আগেই তারা নতুন বাড়িতে ফিরে এল।

মাইশার বাবা তখন বারান্দায় বসে ছিলেন।

মুখে ক্লান্তি।

হাতে ফোন।

তাদের দেখে তিনি মাথা তুললেন।

"এতক্ষণ কোথায় ছিলে?"

মাইশা কিছু বলল না।

সে সরাসরি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

রায়হান একটু দূরে থেমে গেল।

মাইশা ধীরে বলল,

"বাবা, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।"

রফিকুল ইসলাম মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন।

"কী হয়েছে?"

মাইশা ব্যাগ থেকে কালো ডায়েরিটা বের করল।

ডায়েরিটা দেখেই তার বাবার মুখের রং বদলে গেল।

কয়েক সেকেন্ড তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না।

তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন,

"এটা তুমি কোথায় পেলে?"

মাইশা বলল,

"পুরোনো বাড়ির পশ্চিম ঘরে।"

তার বাবা চোখ বন্ধ করলেন।

"তোমার মা এটা রেখে গিয়েছিল..."

মাইশার গলা কেঁপে উঠল।

"তুমি জানতেও?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?"

তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"কারণ তোর মা আমাকে নিষেধ করেছিল।"

মাইশা অবাক হয়ে গেল।

"মা?"

"হ্যাঁ।"

"কেন?"

রফিকুল ইসলাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

"ভেতরে আয়।"

সবাই বসার ঘরে গেল।

রোকেয়া বেগমও এসে বসেছেন।

কামরুল নাহার একটু দূরে চুপ করে বসে আছেন।

রায়হানও উপস্থিত।

রফিকুল ইসলাম চারপাশে তাকিয়ে বললেন,

"আজ যা বলব, তার কিছু কথা আমি এত বছর কাউকে বলিনি।"

মাইশার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

"শুরু করো।"

তার বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।

"২০১৪ সালে তোর মা একটা সমস্যায় পড়েছিল।"

"কী সমস্যা?"

"কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছিল।"

"কে?"

"প্রথমে আমরা জানতাম না।"

মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"রাশেদ?"

"না।"

উত্তরটা শুনে মাইশা থেমে গেল।

রফিকুল ইসলাম বললেন,

"রাশেদ তখন আমাদের সাহায্য করছিল।"

রায়হানও চুপ করে শুনছিল।

তার বাবা সম্পর্কে কথা উঠতেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

মাইশা জিজ্ঞেস করল,

"তাহলে মা রাশেদকে বিশ্বাস করত?"

"হ্যাঁ।"

"আর সায়রা?"

রফিকুল ইসলাম এবার আরও অবাক হলেন।

"সায়রার নাম তুমি কোথায় পেলে?"

মাইশা বলল,

"সায়রা নিজেই ফোন করেছিল।"

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

"তাহলে সে এখনও বেঁচে আছে..."

মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"আপনি তাকে চিনতেন?"

"হ্যাঁ।"

"সে মায়ের সঙ্গে ছিল?"

"ছিল।"

"তাহলে ওই রাতে আসলে কী হয়েছিল?"

রফিকুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"তোর মা জানতে পেরেছিল, কেউ আমাদের পরিবারের ভেতরের তথ্য বাইরে দিচ্ছে।"

মাইশার চোখ বড় হয়ে গেল।

"আমাদের পরিবারের ভেতর থেকে?"

"হ্যাঁ।"

"কে?"

তার বাবা মাথা নাড়লেন।

"নামটা তখনও নিশ্চিত ছিল না।"

রায়হান বলল,

"কিন্তু আপনারা কাউকে সন্দেহ করেছিলেন।"

রফিকুল ইসলাম তার দিকে তাকালেন।

"হ্যাঁ।"

"কে?"

তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন,

"সেদিন রাতে তোর মা আমাকে ফোন করেছিল।"

২০১৪ সালের সেই রাত

রাত তখন প্রায় দুইটা।

রফিকুল ইসলাম ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন—

তানিয়া কল করছে।

তিনি ফোন ধরলেন।

"তানিয়া?"

ওপাশ থেকে তানিয়ার কাঁপা কণ্ঠ—

"মিলন, তুমি এখন কোথায়?"

"বাড়িতে।"

"তুমি কি কাউকে আমার কাছে পাঠাতে পারবে?"

"কোথায়?"

তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

"নদীর ঘাটে।"

মিলন অবাক হয়ে গিয়েছিল।

"এত রাতে?"

"আমার সময় নেই।"

"কী হয়েছে?"

তানিয়া বলেছিল,

"আমি এখন সব বলতে পারব না। শুধু একজনকে পাঠাও। এমন একজন, যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি।"

মিলন তখন রাশেদের কথা ভেবেছিল।

কারণ রাশেদ আগে থেকেই তানিয়াকে সাহায্য করছিল।

তিনি রাশেদকে ফোন করেছিলেন।

"রাশেদ, তুমি কোথায়?"

"বাড়িতে।"

"এখনই নদীর ঘাটে যাও।"

"কেন?"

"তানিয়া সেখানে আছে।"

রাশেদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিল।

তারপর বলেছিল,

"আমি যাচ্ছি।"

কিন্তু রাশেদ একা যায়নি।

সায়রাও তার সঙ্গে গিয়েছিল।

কারণ সায়রা তখন তানিয়ার সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন ছিল।

মাইশা নিঃশ্বাস আটকে বাবার কথা শুনছিল।

"তারপর?"

রফিকুল ইসলাম বললেন,

"রাশেদ আমাকে ফোন করে বলেছিল, তোর মা খুব ভয় পেয়েছে।"

"তারপর?"

"আমি তাকে বলেছিলাম, তানিয়াকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যেতে।"

মাইশা বলল,

"তাহলে মা তোমার কাছ থেকে পালায়নি?"

"না।"

"তুমি তাকে লুকাওনি?"

"না।"

"তাহলে মা কোথায় গেল?"

তার বাবা এবার চোখ নামিয়ে ফেললেন।

"সেটাই আমি জানি না।"

মাইশা হতভম্ব হয়ে গেল।

"মানে?"

"আমি রাশেদকে নির্দেশ দিয়েছিলাম তানিয়াকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর রাশেদ আমাকে ফোন করে বলেছিল—তানিয়া আর তার সঙ্গে নেই।"

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।

মাইশা ধীরে বলল,

"কীভাবে নেই?"

"রাশেদ বলেছিল, নদীর ঘাটে একটা গাড়ি এসেছিল। তোর মা কারও সঙ্গে কথা বলেছিল। তারপর..."

তিনি থেমে গেলেন।

রায়হান জিজ্ঞেস করল,

"তারপর?"

"তারপর তানিয়া সেই গাড়িতে ওঠে।"

মাইশার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

"কে ছিল গাড়িতে?"

রফিকুল ইসলাম মাথা নাড়লেন।

"রাশেদ দেখতে পারেনি।"

মাইশা হঠাৎ ডায়েরির একটা পৃষ্ঠা খুলে বাবার সামনে ধরল।

"কিন্তু মা লিখেছে—‘ওকে আমি চিনতাম।’"

তার বাবা ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

"হ্যাঁ।"

"মানে মা সেই মানুষটাকে চিনত?"

"সম্ভবত।"

"আর তুমি?"

রফিকুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"আমি সন্দেহ করেছিলাম।"

মাইশা দ্রুত বলল,

"কাকে?"

তিনি উত্তর দিলেন না।

মাইশার গলা শক্ত হয়ে গেল।

"বাবা, এত বছর ধরে সবাই আমাকে অর্ধেক সত্য বলেছে। এবার তুমি পুরোটা বলো।"

রফিকুল ইসলাম মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।

তারপর বললেন,

"আমি যে মানুষটাকে সন্দেহ করেছিলাম, সে ছিল আমাদের পরিবারের খুব কাছের একজন।"

"নাম?"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর তিনি ধীরে নামটা বললেন।

মাইশার মুখের রং বদলে গেল।

রায়হানও স্থির হয়ে গেল।

কারণ নামটা তারা দুজনেই চিনত।

কিন্তু রফিকুল ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

"তবে শোন—আমি কখনো নিশ্চিত প্রমাণ পাইনি যে সে দোষী।"

মাইশা হতভম্ব।

"তাহলে এতদিন বলোনি কেন?"

"কারণ সন্দেহের ওপর একটা পরিবারের মানুষকে অপরাধী বানানো যায় না।"

তিনি আরও বললেন,

"আর তোর মা চেয়েছিল, তুই বড় না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয় থেকে দূরে থাকিস।"

মাইশা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"কিন্তু মা তো আমাকে একা রেখে গেল!"

তার বাবা ধীরে বললেন,

"তোর মা তোকে ছেড়ে যেতে চায়নি।"

এই কথায় মাইশার চোখ আরও ভিজে উঠল।

"তাহলে?"

"সে তোকে বাঁচাতে চেয়েছিল।"

রায়হান এতক্ষণ চুপ করে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

"আঙ্কেল..."

রফিকুল ইসলাম তাকালেন।

"আমার বাবার কথা?"

মাইশাও তাকাল।

রায়হান বলল,

"২০১৪ সালের ওই রাতে আমার বাবা কী জানতেন?"

রফিকুল ইসলাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

"তোমার বাবা অনেক কিছু জানতেন।"

"কী?"

"তোমার বাবা রাশেদকে বিশ্বাস করতেন।"

রায়হান অবাক।

"আর আমাকে?"

"তোমাকে তখন এসবের মধ্যে আনা হয়নি। তুমি খুব ছোট ছিলে।"

রায়হান মাথা নিচু করল।

রফিকুল ইসলাম আবার বললেন,

"তোমার বাবা তানিয়াকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। সে কারণে তোমার বাবাকে কখনো আমি দোষী ভাবিনি।"

মাইশা রায়হানের দিকে তাকাল।

রায়হানের চোখে অদ্ভুত একটা স্বস্তি।

তার বাবা এই রহস্যের অপরাধী নন—এটা এবার আরও পরিষ্কার হলো।

হঠাৎ মাইশার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।

অচেনা নম্বর।

একটা ছবি পাঠানো হয়েছে।

মাইশা ছবিটা খুলল।

পুরোনো নদীর ঘাট।

এক পাশে তানিয়া।

তার পাশে সায়রা।

কিছুটা দূরে রাশেদ।

আর পেছনে—

একজন মানুষ।

মাইশা ছবিটা জুম করল।

তারপর হঠাৎ তার মুখ থেকে শব্দ বের হলো না।

রায়হান ফোনটা হাতে নিল।

সে কয়েক সেকেন্ড ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

"এই মানুষটা..."

মাইশা ফিসফিস করে বলল,

"তুমি চেনো?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

"হ্যাঁ।"

"কে?"

রায়হান ধীরে ছবির পেছনের মানুষটার দিকে আঙুল দেখাল।

"এটা সেই মানুষ, যাকে আমি ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দেখেছি।"

মাইশার বুক কেঁপে উঠল।

"কে?"

রায়হান উত্তর দেওয়ার আগেই নতুন মেসেজ এল।

“এবার বুঝতে পারছ, ২০১৪ সালের সেই রাতে আসলে কে ছিল?”

তারপর আরেকটি—

“তোমাদের দুজনের পরিবারই সত্যিটা জানে।”

শেষ মেসেজটি ছিল—

“কিন্তু সত্যিটা পুরোপুরি জানতে হলে রাশেদকে খুঁজে বের করো। সে এখনও বেঁচে আছে।”

মাইশা স্থির হয়ে গেল।

রায়হানও।

কারণ এতদিন তারা রাশেদকে শুধু অতীতের একজন মানুষ ভেবেছিল।

কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো তারা নিশ্চিত হলো—

রাশেদ এখনও জীবিত।

আর সে-ই হয়তো জানে—

২০১৪ সালের সেই রাতে তানিয়াকে শেষবার কে নিয়ে গিয়েছিল।

মাইশা ধীরে বাবার দিকে তাকাল।

"বাবা..."

রফিকুল ইসলাম মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।

মাইশা বলল,

"রাশেদ কোথায়?"

তার বাবা এবার আর চুপ করলেন না।

তিনি ধীরে বললেন—

"আমি জানি।"

ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

আর মাইশার মনে হলো— সবচেয়ে বড় সত্যিটা এখন আর দূরে নেই।

অধ্যায় 30 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রকমারি কালেকশন

বইপ্রেমীদের জন্য রকমারি বেস্টসেলার

অধ্যায় পাঠ শেষে সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের ঘরানার সেরা বই ও বিশেষ ডিসকাউন্ট

বাবার চোখে গভীর অনুশোচনা

অনুচ্ছেদ 1 / 1 • চলছে
বিজ্ঞাপন