রাতের অনুষ্ঠানবাড়িটা আলোয় ঝলমল করছিল। চারপাশে মানুষের হাসি, গল্প আর আনন্দের কোলাহল। অথচ এত কিছুর মাঝেও মাইশার কাছে সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।
এত দিন পর সে তার মাকে ফিরে পেয়েছে। যে মানুষটার অভাব তাকে বছরের পর বছর কষ্ট দিয়েছে, সেই মানুষটাই আজ তার পাশে।
মাইশা বারবার মায়ের হাতটা ধরে দেখছিল। যেন একটু অসতর্ক হলেই আবার সব হারিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
“মাইশু!”
মাইশা ঘুরে তাকাতেই থমকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার মেজো খালা তিথি, খালু মোরশেদ আর তাদের ছোট্ট ছেলে আনাস। তাঁদের পাশেই সেজো খালা তনিমা, খালু সাইফ আর মেয়ে সাইফা।
আর সবার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য—তার ছোট ভাই, যে এত দিন অস্ট্রেলিয়ায় ছিল।
মাইশা কয়েক মুহূর্ত কারও দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের সামনে দেখা মানুষগুলোকে বিশ্বাস করতে তার সময় লাগছিল।
মাইশা: “তোমরা... সত্যি এসেছ?”
তিথি হেসে বললেন, “কী রে, আমাদের দেখে চিনতে পারছিস না?”
মাইশার চোখ ভিজে উঠল।
মাইশা: “তোমরা তো বলেছিলে দশ বছর পর ফিরবে! আমি ভেবেছিলাম, আরও সাত বছর অপেক্ষা করতে হবে!”
তনিমা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
তনিমা: “পাগলি মেয়ে! তোকে চমকে দেব বলেই তো কিছু বলিনি।”
মাইশা একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরল। অরণ্যকে দেখে তার চোখেমুখে আবারও হাসি ফুটে উঠল।
মাইশা: “এই! তুই এত বড় হয়ে গেছিস কখন?”
অরণ্য: “তুই কি ভেবেছিলি, আমি সারাজীবন ছোট থাকব?”
মাইশা: “চুপ কর! এত দিন কোথায় ছিলি?”
অরণ্য: “তোর কাছে আসার জন্যই তো ফিরলাম!”
মাইশা তাকে আবার জড়িয়ে ধরল।
সেদিনের আনন্দের মধ্যে তার পুরোনো অভিমানগুলোও যেন একটু একটু করে গলে যাচ্ছিল। যে মানুষগুলোর জন্য সে এত দিন অপেক্ষা করেছে, তারা আজ সত্যিই তার সামনে।
দূরে দাঁড়িয়ে রায়হান দৃশ্যটা দেখছিল।
মাইশার হাসিমাখা মুখ দেখে তার নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
মেয়েটাকে এভাবেই হাসতে দেখতে চাই।
কথাটা সে কাউকে বলল না। কিছু অনুভূতি নিজের কাছেই রেখে দিতে তার ভালো লাগত।
---
ফোনের স্ক্রিনে লুকানো গল্প
পরিবারের সবাই যখন ছবি তুলতে ব্যস্ত, তখন মাইশার ফোনে একটা মেসেজ এল।
Rayhan: “সবাইকে ফিরে পেয়ে কেমন লাগছে?”
মাইশা চারপাশে তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে রায়হান ফোন হাতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
Maisha: “অনেক ভালো। কিন্তু তুমি এত দূরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
Rayhan: “তোমার পরিবারকে সময় দিচ্ছি।”
Maisha: “বাহ! আজকে এত ভদ্রতা কোথা থেকে আসছে?”
Rayhan: “সব সময় এমনই থাকি। তুমি খেয়াল করো না।”
মাইশা হেসে উত্তর দিল—
Maisha: “নিজের প্রশংসা নিজেই করো, তাই না?”
Rayhan: “তোমার কাছ থেকে শিখেছি।”
মাইশার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই মোমো পাশে এসে দাঁড়াল।
মোমো: “কী রে, ফোনে কার সঙ্গে এত হাসাহাসি?”
মাইশা: “কারও সঙ্গে না!”
মোমো সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
মোমো: “আচ্ছা, কারও সঙ্গে না। তাহলে ফোনের দিকে তাকিয়ে তোর মুখে এত হাসি কেন?”
মাইশা: “মোমো, তুই কিন্তু বেশি কথা বলছিস!”
মোমো হেসে উঠল।
মোমো: “ঠিক আছে, আর কিছু বলব না। তবে তোর হাসিটা কিন্তু অনেক কিছু বলে দিচ্ছে!”
মাইশা আর উত্তর দিল না। ফোনের স্ক্রিনটা লক করে দিল।
তার ওয়ালপেপারে ভেসে উঠল একজোড়া হ্যাজেল-বাদামি চোখ। আলো পড়লে সেই চোখে সোনালি আর সবুজের আভা দেখা যায়।
রায়হানের চোখ।
মাইশা কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা সরিয়ে রাখল।
অন্যদিকে রায়হানের ফোনের ওয়ালপেপারেও ছিল তাদের দুজনের একসঙ্গে তোলা একটি ছবি।
দুজনের ফোনে দুটো আলাদা ছবি।
কিন্তু দুটো ছবির মাঝখানে লুকিয়ে ছিল একই অনুভূতি।
কিছুক্ষণ পর মাইশা মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বন্ধুদের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ একবার চারপাশে ঘুরে অবশেষে রায়হানের ওপর গিয়ে থামল।
রায়হান কালো পাঞ্জাবি পরে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে সেই পরিচিত শান্ত ভাব, মুখে হালকা হাসি।
মাইশা এগিয়ে আসতেই সিফাতের মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
সিফাত: “মামা, আমার শালি আসতেছে!”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের কাঁধে হাত রেখে বলল—
আয়ান: “Bro, আমাদের ভাবি তোর কাছে আসতেছে!”
আয়ান আর সিফাত দুজনেই হাসতে শুরু করল।
সিফাত: “চালায়ে যাও, প্রেম!”
রায়হান বিরক্তির ভান করে ওদের দিকে তাকাল।
রায়হান: “তোদের কি আর কোনো কাজ নাই?”
আয়ান: “আছে। কিন্তু তোর প্রেমের দৃশ্য দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কী হতে পারে?”
ততক্ষণে মাইশা তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মাইশা: “কী হয়েছে? আমাকে দেখে এত হাসাহাসি করছিস কেন?”
সিফাত: “কই? আমরা তো কিছুই করতেছি না, শালি!”
মাইশা: “সিফাত!”
সবাই হেসে উঠল।
রায়হান মাইশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর শান্ত গলায় বলল—
রায়হান: “Looks like an angel, walks like an angel, talks like an angel...”
মাইশা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
মাইশা: “কী বললে?”
রায়হান: “কিছু না।”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
আয়ান: “চালায়ে যাও, প্রেম!”
মাইশা এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে গেল।
মাইশা: “তোরা সবাই অসহ্য!”
রায়হান হেসে মাথা নাড়ল। তারপর পাশে রাখা গোলাপের তোড়াটা হাতে তুলে মাইশার দিকে এগিয়ে দিল।
মাইশা অবাক হয়ে ফুলগুলোর দিকে তাকাল।
মাইশা: “এগুলো আমার জন্য?”
রায়হান: “না, পাশের বাড়ির মেয়েটার জন্য এনেছিলাম। তুমি সামনে চলে এলে।”
মাইশা চোখ বড় করে তাকাল।
মাইশা: “তুমি না!”
রায়হান এবার হেসে বলল—
রায়হান: “আচ্ছা, আচ্ছা। তোমার জন্যই এনেছি।”
সে গোলাপের তোড়াটা মাইশার হাতে দিয়ে বলল—
রায়হান: “আমি এক ফুলকে আরেকটা ফুল দিতেছি।”
মাইশা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ফুলগুলো হাতে নিয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল, যেন নিজের হাসিটা লুকাতে পারে।
সিফাত আর আয়ান একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
“ওওওও! মামা, চালায়ে যাও, প্রেম!”
মাইশা: “আর একটা কথাও বলবি না তোরা!”
রায়হান মুচকি হেসে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
She is crazy, but she is mine.
দূর থেকে আয়ান মাইশার লজ্জা দেখে মজা করে বলে উঠল—
আয়ান : “নতুন বউ এত লজ্জা পায় না—যতটা তুই পাইলি!”
মাইশা: “আয়ান ! তুই কী শুরু করলি?”
সবাই আবার হেসে উঠল। মাইশা মুখে বিরক্তি দেখালেও গোলাপের তোড়াটা কিন্তু হাত থেকে নামাল না।
রায়হান সেটা লক্ষ করল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ছোট্ট একটা হাসি।
রাত আরও গভীর হলে মোমো সবাইকে ডেকে বলল—
মোমো: “এই যে সবাই! এত ছবি তোলা হয়েছে, এত আড্ডা হয়েছে—এবার একটা খেলা হোক!”
আয়াত: “কী খেলা?”
মোমো: “Truth or Dare!”
সিফাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
সিফাত: “আমি আছি!”
লামিয়া তার পাশে বসে বলল—
লামিয়া: “তুই থাকলেই তো বিপদ!”
সিফাত: “তুমি আবার আমার বিপক্ষে গেলে কেন?”
লামিয়া: “কারণ তোকে আমি ভালো করেই চিনি!”
সবাই হেসে উঠল।
সাতজন গোল হয়ে বসল—মাইশা, মোমো, লামিয়া, রায়হান, সিফাত, আয়ান আর আয়াত।
খেলা শুরু হলো।
কেউ Truth বেছে নিয়ে নিজের গোপন কথা বলল, কেউ Dare পেয়ে হাস্যকর কাজ করল। সবার হাসি-ঠাট্টায় সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, কেউ খেয়ালই করছিল না।
একসময় বোতল ঘুরতে ঘুরতে থামল মাইশার সামনে।
মোমো: “Truth or Dare?”
মাইশা: “Dare!”
মোমো: “ভেবে বলেছিস তো?”
মাইশা: “আমি কোনো কিছুতে ভয় পাই নাকি?”
লামিয়া মুচকি হেসে বলল—
লামিয়া: “ঠিক আছে। তোকে একটা গান গাইতে হবে।”
মাইশা কাঁধ ঝাঁকাল।
মাইশা: “এইটুকু?
মোমো সঙ্গে সঙ্গে শর্ত যোগ করল—
মোমো: “গান গাওয়ার সময় রায়হানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে!”
মাইশা: “কী?”
চারপাশে হাসি আর চিৎকার শুরু হয়ে গেল।
সিফাত: “মামা, প্রস্তুত হ! তোর জন্য বিশেষ পরিবেশনা!”
রায়হান শান্তভাবে মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল—
রায়হান: “আমি তো শুধু গান শুনব।”
মাইশা: “বেশি খুশি হওয়ার দরকার নেই।”
রায়হান: “আমি কি খুশি হয়েছি?”
মাইশা: “তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে!”
রায়হান হাসি চাপতে পারল না।
মোমো হাততালি দিয়ে বলল—
মোমো: “আচ্ছা, শুরু কর!”
মাইশা প্রথমে একটু ইতস্তত করল। তারপর রায়হানের চোখের দিকে তাকিয়ে গান শুরু করল—
I'll be your baby on the Sunday, oh,
Why don't we get out on town?
Call me your baby, catch the same wave, oh,
No, no, there's no slowin' down, let's go, you and I.
গাইতে গাইতে মাইশার চোখ বারবার রায়হানের চোখে আটকে যাচ্ছিল। সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রায়হানের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা তাকে আরও অপ্রস্তুত করে তুলছিল।
গান শেষ হওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ করে রইল।
তারপর আয়ান হাততালি দিয়ে উঠল।
আয়ান: “বাহ! কী ব্যাপার, মাইশু!”
সিফাত: “মামা, তোর জন্য গান গাইছে—এখন অন্তত কিছু বল!”
রায়হান মাইশার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
রায়হান: “ভালো গেয়েছ।”
মাইশা চোখ সরু করে তাকাল।
মাইশা: “শুধু ভালো?”
রায়হান: “অনেক ভালো।”
মাইশা: “হুম, এবার ঠিক আছে।”
মোমো আর লামিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
লামিয়া: “কী হলো? গাইতে তো বেশ সাহস ছিল, এখন কথা বলতে এত লজ্জা কেন?”
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে একটা কুশন তুলে তার দিকে ছুড়ে দিল।
মাইশা: “তুই চুপ কর!”
লামিয়া হাসতে হাসতে কুশনটা ধরে ফেলল।
লামিয়া: “আচ্ছা, আচ্ছা! আর বলব না!”
কিন্তু মাইশার লজ্জা আর রায়হানের হাসি দেখে কারও বিশ্বাস হলো না যে কথাটা এখানেই শেষ।
রাত তখন প্রায় বারোটা।
অনুষ্ঠানবাড়ির চারপাশে আলো ঝলমল করছে। সবাই নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ ফোনে ভিডিও করছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছে, আবার কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে শেষ কয়েকটা মুহূর্তের।
মাইশা তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এক হাতে মায়ের হাত, অন্য হাতে সেই গোলাপের তোড়া। মাঝে মাঝে সে ফুলগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল, তারপর অজান্তেই চোখ চলে যাচ্ছিল রায়হানের দিকে।
রায়হানও বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু চারপাশের এত মানুষের মাঝেও তার চোখ বারবার মাইশাকেই খুঁজছিল।
হঠাৎ আয়ান চিৎকার করে উঠল—
আয়ান: “এই যে সবাই! আর দশ সেকেন্ড!”
সবাই একসঙ্গে গুনতে শুরু করল।
সবাই: “Ten!”
সিফাত লামিয়ার হাত ধরে হাসতে হাসতে বলল—
সিফাত: “নতুন বছরে কিন্তু আমার সঙ্গে ঝগড়া করা কমাতে হবে!”
লামিয়া: “আগে তুই নিজের জ্বালাতন কমা, তারপর দেখা যাবে!”
চারপাশে হাসির রোল উঠল।
সবাই: “Nine! Eight! Seven!”
মোমো আয়াতের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তিথি, তনিমা, অরণ্য আর পরিবারের অন্য সবাইও একসঙ্গে কাউন্টডাউনে যোগ দিল।
সবাই: “Six! Five! Four!”
মাইশা হঠাৎ রায়হানের দিকে তাকাল।
রায়হানও ঠিক তখনই তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখাচোখি হলো। চারপাশে সবাই যখন কাউন্টডাউন নিয়ে ব্যস্ত, তখন তাদের মাঝখানে যেন কয়েকটা মুহূর্তের জন্য সবকিছু থেমে গেল।
সবাই: “Three! Two! One!”
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
“HAPPY NEW YEAR!”
চারদিকে আনন্দের চিৎকার, হাততালি আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। সবাই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
মাইশা মাকে জড়িয়ে ধরল।
মাইশা: “Happy New Year, আম্মু!”
তানিয়া মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন।
তানিয়া: “Happy New Year, মা। এই বছরটা যেন তোর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বছর হয়।”
মাইশা মৃদু হেসে বলল—
মাইশা: “তুমি পাশে থাকলেই আমার বছর সুন্দর।”
কথাটা শুনে তানিয়ার চোখ ভিজে উঠল। তিনি মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
অন্যদিকে সিফাত লামিয়াকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে আবারও খুনসুটি শুরু করল। আয়ান আর রায়হান তাদের দুজনকে দেখে হাসতে লাগল। মোমো আর আয়াতও একসঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানাল।
এই আনন্দের মাঝেই মাইশা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রায়হানকে দেখতে পেল।
রায়হান তার দিকে এগিয়ে এল।
রায়হান: “Happy New Year, মাইশা।”
মাইশা: “Happy New Year।”
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর রায়হান মাইশার হাতে থাকা গোলাপের তোড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল—
রায়হান: “ফুলগুলো ফেলে দিও না যেন।”
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল—
মাইশা: “ফেলে দেব কেন?”
রায়হান: “এমনি। তোমাকে তো বিশ্বাস করা যায় না।”
মাইশা: “তোমাকে কে বলেছে আমার জন্য ফুল আনতে?”
রায়হান মৃদু হেসে বলল—
রায়হান: “কেউ বলেনি। ইচ্ছা হয়েছে, তাই এনেছি।”
মাইশা আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু গোলাপগুলো একটু শক্ত করে ধরে রাখল।
রায়হান তার চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
মাইশা মুখ ঘুরিয়ে নিলেও নিজের হাসিটা লুকাতে পারল না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে সিফাতের গলা ভেসে এল—
সিফাত: “মামা! নতুন বছর শুরু হইছে, আর তুই এখনও এখানেই আটকে আছিস?”
আয়ান: “Bro, নতুন বছরের প্রথম মিনিটটাও ভাবির নামে লিখে দিলি নাকি?”
রায়হান পেছনে তাকিয়ে বলল—
রায়হান: “তোরা দুইজন এক মিনিটও চুপ থাকতে পারিস না?”
সিফাত: “না মামা! এই প্রেমের সাক্ষী তো আমাদের থাকতেই হবে!”
মাইশা হেসে ফেলল। রায়হানও আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।
কিছুক্ষণ পর সবাই আবার একসঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাইশা পরিবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসছিল। তার চোখে ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ, আর মনে ছিল নতুন বছরের একরাশ আশা।
দূর থেকে রায়হান তাকে দেখছিল।
মাইশা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে পড়ল। দুজনের চোখ আবারও মিলল।
এবার কেউ চোখ সরিয়ে নিল না।
নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তারা কেউই জানে না। হয়তো আরও রহস্য, আরও প্রশ্ন, আরও না-বলা কথা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
কিন্তু এই রাতের স্মৃতিটুকু তাদের দুজনের কাছেই আলাদা হয়ে থাকবে।
একটা বছর শেষ হলো। আরেকটা বছর শুরু হলো।
মাইশা ফিরে পেল তার পরিবারকে, আর রায়হানের নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা রয়ে গেল অজানা এক গল্প হয়ে।
হয়তো কোনো একদিন মাইশা সেই নীরবতার অর্থ বুঝতে পারবে।
হয়তো কোনো একদিন রায়হানও তার মনের কথাগুলো বলতে পারবে।
কিন্তু আজ নয়।
আজ শুধু নতুন বছরের প্রথম রাত, একগুচ্ছ গোলাপ, দুটো মৃদু হাসি আর চোখে চোখ রেখে বলা কিছু না-বলা কথা।
মাইশা শেষবারের মতো রায়হানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
রায়হানও হাসল।
কোনো কথা হলো না।
তবু যেন অনেক কিছু বলা হয়ে গেল।
সিজন ১ সমাপ্ত।
“কিছু ভালোবাসা মুখে বলা হয় না—একটা দৃষ্টিই তার জন্য যথেষ্ট।”
