কয়েকটা দিন কেটে গেল।
রায়হানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে মাইশার মাথার ভেতর যেন সবসময় একটা কথাই ঘুরছিল—
"আপনি বেশি লুকান।"
সেদিন ক্যাফেতে কথাটা মজা করে বললেও এখন মনে হচ্ছিল, কথাটার ভেতরে সত্যিই কিছু ছিল।
রায়হান সবকিছু জানে না—এটা সে বুঝতে পেরেছিল।
কিন্তু সে যে কিছু একটা লুকাচ্ছে, সেটাও মাইশার চোখ এড়ায়নি।
তার ওপর সেই পুরোনো খাম।
খামের ভেতরের চিঠিতে শুধু কয়েকটা নাম, কয়েকটা অসম্পূর্ণ কথা আর একটা ঠিকানা—
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি।
আর সবচেয়ে বেশি মাথায় ঘুরছিল একটা নাম।
রাশেদ।
কে এই রাশেদ?
তার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?
আর বারো বছর আগে আসলে কী হয়েছিল?
সেদিন বিকেলে পড়ার টেবিলে বসে মাইশা পদার্থবিজ্ঞানের বই খুলে বসেছিল।
বইয়ের একটা পৃষ্ঠা প্রায় দশ মিনিট ধরে খোলা।
কিন্তু পড়া হচ্ছিল না।
সে বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করে বলল,
"Physics আমাকে পড়ছে, আমি Physics-কে না।"
তারপর চেয়ার থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে বসতেই ফোনটা হাতে নিল।
রায়হানের চ্যাট ওপেন করল।
শেষ মেসেজটা ছিল আগের দিনের।
রায়হান:
"পুরোনো কাগজগুলো ভালো করে দেখো। সব উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যাবে না।"
মাইশা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর টাইপ করল—
মাইশা:
"আপনি কি সত্যিই মনে করেন আমার মা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না?"
কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল।
রায়হান:
"তুমি যা জানো, সেটা মিথ্যা নয়।"
মাইশার ভ্রু কুঁচকে গেল।
আরেকটা মেসেজ এল।
রায়হান:
"কিন্তু পুরো সত্যিও নয়।"
মাইশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে আর কিছু লিখল না।
ফোনটা পাশে রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল।
মায়ের পুরোনো জিনিসগুলো।
বহু বছর ধরে যেগুলো সে খুব একটা ছুঁয়েও দেখেনি।
মাইশা নিচতলায় বাবার স্টাডি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে বাবা ছিলেন না।
সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে পুরোনো আলমারিটার সামনে দাঁড়াল।
আলমারির নিচের তাকে কিছু পুরোনো ফাইল, কয়েকটা ছবি আর একটা ছোট কাঠের বাক্স রাখা ছিল।
মাইশা বাক্সটা হাতে তুলে নিল।
ধুলো ঝেড়ে ঢাকনাটা খুলতেই তার চোখ আটকে গেল।
ভেতরে একটা পুরোনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে তার মা।
অনেক ছোট বয়সের।
চোখে সেই একই শান্ত দৃষ্টি, যেটা মাইশা নিজের চোখেও দেখতে পেত।
ছবিটা হাতে নিয়ে মাইশা আস্তে করে বলল,
"আম্মু..."
শব্দটা বের হতেই তার বুকটা ভারী হয়ে গেল।
তানিয়া তার জীবনের একটা অদ্ভুত অধ্যায়।
মাইশা ছোটবেলায় যতটুকু মনে করতে পারে, তার মায়ের উপস্থিতি ছিল খুব অল্প সময়ের মতো—কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি, কিছু ছবি, কিছু কথা।
তারপর শুধু নীরবতা।
বারো বছরের নীরবতা।
মাইশা ছবিটা উল্টে দেখল।
পেছনে কালো কালিতে লেখা—
"যেদিন মাইশু সত্যিটা জানতে চাইবে, সেদিন তাকে এটা দিও।"
মাইশার হাত কেঁপে উঠল।
"মাইশু..."
এই নামে তাকে ডাকতেন মা।
সে দ্রুত বাক্সটার ভেতরের জিনিসগুলো দেখতে লাগল।
একটা পুরোনো রুমাল।
দুটো ছবি।
একটা শুকিয়ে যাওয়া ফুল।
আর সবশেষে—
একটা কালো খাম।
খামের ওপর কোনো নাম নেই।
শুধু ছোট করে লেখা—
"মাইশুর জন্য।"
মাইশা কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব সাবধানে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা ভাঁজ করা চিঠি।
কাগজটা অনেক পুরোনো।
কালির কিছু অংশ ফিকে হয়ে গেছে।
মাইশা পড়তে শুরু করল।
"মাইশু,
যদি কোনোদিন এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে তুমি এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গেছ, যেগুলোর উত্তর তোমাকে কেউ সহজে দেবে না।
কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করো না।
আবার কাউকে শুধু সন্দেহের কারণে দোষীও ভেবো না।
সত্যিটা খুঁজবে।
কিন্তু তাড়াহুড়ো করবে না।
আর যদি কখনো তোমাকে গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ির কথা বলা হয়, তাহলে মনে রেখো—সেখানে এমন কিছু আছে, যা তোমার জন্মেরও আগের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।"
মাইশা থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি।
একই ঠিকানা।
যেটা রায়হানের বাবার পুরোনো চিঠিতেও ছিল।
চিঠির নিচের অংশটা ছিঁড়ে গেছে।
শুধু শেষের কয়েকটা শব্দ দেখা যাচ্ছে—
"...সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলাম যাকে..."
তারপর কিছু নেই।
মাইশা চিঠিটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
"কাকে?"
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা শব্দ হলো।
খট।
মাইশা চমকে পেছনে তাকাল।
দরজার কাছে কেউ নেই।
সে দ্রুত উঠে দরজার দিকে গেল।
করিডোরটা ফাঁকা।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার ঘরে ফিরে এল।
কিন্তু এবার তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর।
সেখানে সে একটা জিনিস আগে খেয়াল করেনি।
একটা পুরোনো ছোট চাবি।
চাবিটার সঙ্গে কোনো তালা নেই।
মাইশা চাবিটা হাতে তুলে নিল।
পেছনে ছোট করে খোদাই করা—
G.B.B — 2014
তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
G.B.B.
Gunhaji Bepari Bari.
২০১৪।
ঠিক সেই বছর—
যে বছর তার মায়ের গল্প হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
মাইশা আর দেরি করল না।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে রায়হানকে কল করল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বারে রায়হান ফোন ধরল।
"হ্যালো?"
মাইশার গলা নিচু।
"রায়হান ভাই..."
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
"হুম?"
"আমি একটা জিনিস পেয়েছি।"
"কী?"
"মায়ের একটা চিঠি।"
রায়হান কিছু বলল না।
মাইশা বুঝতে পারল, ওর কথাটা তাকে অবাক করেছে।
সে আবার বলল,
"আর একটা চাবি।"
"কী লেখা আছে?"
"২০১৪... আর G.B.B."
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রায়হান খুব ধীরে বলল,
"মাইশা, চাবিটা এখনই কাউকে দেখিয়ো না।"
মাইশার চোখ সরু হয়ে গেল।
"কেন?"
"কারণ আমি নিশ্চিত না, ওই চাবিটা ঠিক কোন দরজার।"
"আপনি জানেন?"
রায়হান এবারও সরাসরি উত্তর দিল না।
"আমি শুধু অনুমান করছি।"
মাইশা একটু রেগে গেল।
"আপনি সবসময় অনুমান করেন। কিন্তু কিছু বলেন না।"
রায়হান নরম গলায় বলল,
"কারণ ভুল কিছু বলে তোমাকে বিপদে ফেলতে চাই না।"
মাইশা চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
"চিঠিতে একটা কথা আছে।"
"কী?"
"মা লিখেছে—'সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলাম যাকে...'"
ওপাশে আবার নীরবতা।
এবার রায়হানের কণ্ঠটা একটু বদলে গেল।
"চিঠিটা তোমার কাছে রাখো। কারও হাতে দিও না।"
"আপনার কাছেও না?"
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
"না।"
মাইশা অবাক হলো।
"কেন?"
রায়হান ধীরে বলল,
"কারণ এবার থেকে তোমার পাওয়া জিনিসগুলোর উত্তর তোমাকেই খুঁজতে হবে।"
কলটা কেটে গেল।
মাইশা ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার হাতে তখনও সেই পুরোনো চাবি।
চাবিটা ছোট।
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—
এই ছোট্ট চাবিটাই হয়তো বারো বছরের একটা বন্ধ দরজার সামনে নিয়ে যাবে তাকে।
আর সেই দরজার ওপাশে—
তার মায়ের গল্পের সবচেয়ে বড় সত্যিটা অপেক্ষা করছে।
