পরদিন বিকেলটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল।
বৃষ্টির পর আকাশটা পরিষ্কার হয়ে এলেও বাতাসে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। মাইশা বারান্দায় বসে Chemistry-এর খাতা খুলে রেখেছিল। কিন্তু পড়ার চেয়ে খাতার এক কোণে আঁকিবুঁকি করতেই তার বেশি মন বসছিল।
তার মাথায় বারবার ঘুরছিল সেই ছোট্ট চাবিটা।
G.B.B — 2014
এই তিনটা অক্ষর আর চারটা সংখ্যা যেন কোনো একটা বন্ধ দরজার দিকে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ফোনে মেসেজ এল।
রায়হান ব্যাপারী:
“চাবিটা নিয়ে কিছু ভেবেছ?”
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিল,
মাইশা:
“ভেবেছি। কিন্তু আপনি তো কিছুই পরিষ্কার করে বলেন না।”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
রায়হান:
“সবকিছু একসাথে পরিষ্কার করে দিলে রহস্য থাকে কোথায়?”
মাইশা চোখ ছোট করে ফোনের দিকে তাকাল।
মাইশা:
“আপনি নিজেই একটা রহস্য।”
রায়হানের উত্তর এল কয়েক সেকেন্ড পর।
রায়হান:
“হয়তো।”
মাইশা আর কোনো উত্তর দিল না।
বিকেল গড়িয়ে একটু পরে সে পুরোনো জিনিসপত্র রাখার ঘরের দিকে গেল।
দরজা খুলতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল। ঘরের এক পাশে পুরোনো বই, অন্য পাশে কয়েকটা কাঠের বাক্স। মাইশা ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তাকগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটা ছোট কালো বাক্স তার চোখে পড়ল।
বাক্সটার ওপর ধুলোর আস্তরণ।
সে হাত দিয়ে ধুলো সরাতেই নিচে লেখা দেখতে পেল—
২০১৪
মাইশার বুকটা ধক করে উঠল।
“আবার ২০১৪…”
সে মেঝেতে বসে বাক্সটা খুলল।
ভেতরে কয়েকটা পুরোনো ছবি।
একটা ছবিতে তার মা—তানিয়া।
আরেকটায় তার মায়ের পাশে একজন অপরিচিত মহিলা।
মাইশা ছবিটা হাতে নিয়ে উল্টে দেখল।
পেছনে লেখা—
“তানিয়া ও সায়রা।”
“সায়রা…”
নামটা তার কাছে নতুন নয়।
কোথাও যেন এই নামটা সে আগে শুনেছে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
রায়হান।
মাইশা কল রিসিভ করল।
“হ্যালো?”
“কোথায় তুমি?”
“বাসায়।”
“কী করছ?”
“পুরোনো জিনিসপত্র দেখছি।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রায়হান জিজ্ঞেস করল,
“কিছু পেয়েছ?”
মাইশা একটু থেমে বলল,
“একটা ছবি।”
“কিসের ছবি?”
“আমার মায়ের সঙ্গে একটা মহিলা। নাম সায়রা।”
ওপাশে আবার নীরবতা।
এবার মাইশা বুঝতে পারল—নামটা রায়হানের কাছে অচেনা নয়।
“আপনি সায়রাকে চেনেন?”
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
তারপর ধীরে বলল,
“চিনি না বললে মিথ্যা হবে।”
মাইশা ভ্রু কুঁচকাল।
“তাহলে?”
“সায়রা তোমার মায়ের খুব কাছের একজন ছিল।”
“ছিল?”
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“মাইশা, সব কথা ফোনে বলা ঠিক হবে না।”
“আবার শুরু করলেন!”
রায়হান হালকা হেসে বলল,
“তুমি রাগ করলে তোমার গলার স্বর বদলে যায়।”
“আপনার এসব খেয়াল করার দরকার নেই।”
“ঠিক আছে, করব না।”
“সত্যি?”
“না।”
মাইশা বিরক্ত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে ফেলল।
“আপনি আসলেই পাগল।”
“এই কথাটা তুমি আগেও বলেছ।”
“কারণ আপনি সত্যিই পাগল।”
রায়হান এবার হেসে ফেলল।
“আচ্ছা, একটা কথা বলি?”
“বলেন।”
“ছবিটা ভালো করে রেখে দিও। আর কারও হাতে দিও না।”
মাইশার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কেন?”
রায়হানের গলা এবার একটু গম্ভীর।
“কারণ সায়রার নামটা তোমার মায়ের গল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ।”
কলটা কেটে গেল।
মাইশা কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার ছবিটা হাতে নিল।
ছবির পেছনে লেখা নামটার দিকে তাকিয়ে রইল—
সায়রা।
পরদিন বিকেলে মাইশা রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে বের হলো।
রায়হান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মাইশাকে দেখেই সে ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
“এত দেরি?”
“আমি দেরি করি নাই। আপনি আগে চলে আসছেন।”
“ওহ, তাই?”
“হ্যাঁ।”
রায়হান হেসে মাথা নাড়ল।
“ছবিটা এনেছ?”
“হ্যাঁ।”
মাইশা ছবিটা তার হাতে দিল।
রায়হান ছবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখ এবার আগের মতো শান্ত ছিল না।
মাইশা সেটা খেয়াল করল।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“আপনি যখন ‘কিছু না’ বলেন, তখনই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।”
রায়হান ছবিটা ফেরত দিয়ে বলল,
“তুমি অনেক বেশি প্রশ্ন করো।”
“আর আপনি অনেক বেশি লুকান।”
দুজনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
হঠাৎ রায়হান গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে একটা গান গুনগুন করতে শুরু করল।
মাইশা ছবিটার দিকে তাকিয়েই ছিল।
রায়হানের কণ্ঠ খুব নিচু—
“Secrets I have held in my heart
Are harder to hide than I thought
Maybe I just wanna be yours…”
মাইশা হঠাৎ তার দিকে তাকাল।
“কী গান গাইতেছেন?”
রায়হান গুনগুন থামিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“গান।”
“সেটা তো বুঝতেই পারছি। হঠাৎ গান কেন?”
“এমনি। ভালো লাগে।”
মাইশা চোখ সরু করে তাকাল।
“আপনার মাথায় সমস্যা আছে।”
রায়হান মুচকি হাসল।
“তোমার এই ডায়লগটা নতুন না।”
“কারণ আপনিও নতুন না।”
রায়হান হেসে আবার গুনগুন করতে লাগল।
মাইশা আর কিছু বলল না। সে আবার ছবিটার দিকে মন দিল।
সে বুঝতেই পারল না—রায়হানের গাওয়া গানটা শুধু একটা গান ছিল না।
তার নিজের মনে লুকিয়ে রাখা কিছু কথা হয়তো সুরের আড়ালে বেরিয়ে আসছিল।
কিন্তু মাইশা তখনও সেসব বোঝার মতো জায়গায় পৌঁছায়নি।
তার চোখ আটকে ছিল ছবির পেছনে দেখা পুরোনো বাড়িটার দিকে।
হঠাৎ সে ছবিটা রায়হানের সামনে ধরে বলল,
“এই বাড়িটা কোথায়?”
রায়হান গান থামিয়ে ছবিটার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ছবির এক পাশে পুরোনো কাঠের দরজা।
দরজার ওপর অস্পষ্ট একটা চিহ্ন—
G.B.B
রায়হান ধীরে ধীরে বলল,
“গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ি।”
মাইশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“তাহলে…”
রায়হান তার দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ। এবার মনে হয় আমাদের সেখানে যেতেই হবে।”
আর মাইশা তখনও জানত না—
গুনহাজী ব্যাপারী বাড়ির সেই পুরোনো দরজার ওপাশেই লুকিয়ে আছে তার মায়ের গল্পের আরও একটা অধ্যায়।
