আরোহি সাইডে আসতেই আরোহির ফোনে একটা কল আসলো, কলটা অর্ণবের মা করেছেন, আরোহি কলটা রিসিভ করলো,,
-আসসালামু আলাইকুম (আরোহি)
– ওয়ালাইকুমুসসালাম, মা ভালো আছো? (অর্ণবের মা)
– আলহামদুলিল্লাহ আন্টি, আর আপনি?
– আরে, সেইদিন না কল দিয়ে ডাইরেক্ট মা বলে আবদার করেছিলে, আজকে আবার আন্টি বলছো যে?
– (আরোহি লজ্জা পেয়ে গেলো) না মা..মানে
– কোন মানে না,, আহান আমাকে ছোট মা বলে কিন্তু তুমি আমাকে মা বলো,, এটা শুনে আমি কতো খুশি হয়েছিলাম জানো!? জানো আমার আহানটা অনেক কষ্ট পেয়েছে জীবনে, ওকে আর কষ্ট পেতে দেখতে পারবো না, তুমি আমায় কথা দাও ওর খেয়াল রাখবে
– (উনার কথায় আরোহি বেশ অবাক হলো) জ্বি, একটা প্রশ্ন করবো যদি কিছু মনে না করেন?
– হ্যাঁ করো
– আহান আপনাকে ছোট মা কেন বলে? আর ও কষ্ট পেয়েছে মানে?
– কারণ আমি ওকে জন্ম দেইনি ।
– মানে?
-আহানের মায়ের নাম ছিলো অহনা। অহনা চৌধুরী। আর ওর বাবার নাম ছিলো আবিদ মাহমুদ। অহনা আমার বেস্টফ্রেন্ড ছিলো আর আবিদ ছিল অর্ণবের বাবার বন্ধু। অহনা আর আবিদ দুজনেই বেশ গাইতো। আহানের যখন বয়স ৭ বছর তখন অহনা ক্যান্সারে মারা যায়, তারপর থেকে আমার ছেলেটা একদম চুপচাপ হয়ে যায়। না ঠিক মতো খেতো, আর না কোথাও যেত,, সারাদিন ওর মায়ের কাপড় জড়িয়ে ধরে কাদতো। অহনা আর আবিদের লাভ ম্যারেজ ছিলো আর আহান ওদের একমাত্র সন্তান ছিলো, বুঝতেই পারছো আহান ওদের কতটা ভালোবাসার ছিলো। অহনা মারা যাওয়ার পর থেকে আবিদও গান বন্ধ করে দেয়,, আহানকে স্বাভাবিক করতে আবিদ একদিন আহানকে আমাদের বাসায় নিয়ে এলো। আমি আহানকে একটু স্নেহ করতেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে যেন কতোদিন পর মাকে খুজে পেলো। এরপর থেকে প্রায়ই আহানকে আবিদ আমাদের বাসায় দিয়ে যেত। অর্ণব আর আহান খেলতো। এক সময় আহান আর অর্ণব বেস্টফ্রেন্ড হলো। দেখতে দেখতে ৩ টা বছর কেটে গেলো, আহান আর আবিদ মোটামুটি স্বাভাবিক হলো। আমার আহান হাসতে শিখলো, গাইতে শুরু করলো।
একদিন আমরা সবাই একসাথে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ একটা ট্রাক ব্রেক ফেল করে আমার অর্ণবকে আঘাত করতে নেয় আর তখন আবিদ অর্ণবকে বাচাতে দিয়ে নিজের প্রাণ হারায়। আহান নিজের চোখের সামনে ওর জীবনের দুইটা খুটিকে হারিয়েছে। সেইদিন আমার আহানটা স্তব্ধ হয়ে গেছিলো,, অনেক্ষন পর আহান আবিদের গায়ে হাত রেখে ঝাকিয়ে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করেছিলো,
– ” বা..বাবা, ঘুমাচ্ছো কেন? উঠো না,, তোমার গায়ে লাল রক্ত কেন? মা আমাকে রেখে চলে গেলো,, তুমিও মায়ের মতো করো না। প্লিজ। আমি আর দুষ্টুমি করবো না। কেন সবাই চলে যাচ্ছো? ফিরে এসো”
কথা গুলো বলতে বলতে অর্ণবের মা হুহু করে কেদে উঠলেন, আর আরোহি নিঃশব্দে কেদে চলেছে, খুব কষ্ট হচ্ছে ওর আহানের জন্য। ইচ্ছা করছে দৌড়ে গিয়ে আহানকে জড়িয়ে ধরে আহানের কষ্ট গুলো শোষণ করে নিতে।
অর্ণবের মা আবার বলতে শুরু করলেন,
– জানো আমি আর অর্ণব আহানকে তারপর শুধু দুইবার কাদতে দেখেছিলাম। প্রথম কাদতে দেখেছিলাম যখন অহনা মারা যায় আর দ্বিতীয় বার ছিলো যখন আবিদ মারা যায়। এরপর আমার আহানটা একদম শক্ত হয়ে গেছিলো। আর কাদতো না। আমাদের মুখের দিকে চেয়ে স্বাভাবিক হয়েছিলো। অর্ণব অনেক চেষ্টা করতো ওকে স্বাভাবিক করার। কম বয়সেই কষ্ট পেয়ে পেয়ে মাইন্ড থেকে এডাল্ট হয়ে গেছিলো। এরপর আর কাদেনি। কিন্তু যেদিন তুমি ওকে কলেজে ওকে তোমার থেকে দূরে থাকতে বলেছিলে সেদিন আহানটা প্রচুর কেদেছিলো। আমি সবটাই জানি। আমি চেয়েছিলাম এগুলো তোমাকে সামনাসামনি বলতে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কোনো কারণে তুমি আহানের উপর নারাজ। যেন কোনো ভুল স্টেপ না নাও সেজন্যই এভাবে ফোনে বললাম।
° আরোহি মনে মনে ঠিক করে, ”নাহ আর আহানকে কষ্ট দিবে না সে, এতোদিন কষ্ট দিয়েছিলো এটা ভেবে যে, আহান হয়তো ভালোবাসার মানুষের কাছে পাওয়া ব্যাথাটা বোঝে না । কিন্তু আজ বুঝলো আহান কতটা কষ্ট পেয়েছে আজ পর্যন্ত। ”
অর্ণবের মাঃ তুমি কি শুনছো?
আরোহিঃ (কান্না আটকে অনেক কষ্টে বললো) জ্বি
অর্ণবের মাঃ আচ্ছা, রাখি। ভালো থেকো
আরোহিঃ আপনিও ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ
অর্ণবের মাঃ আল্লাহ হাফেজ
আজ আহানের প্রতি আরোহির ভালোবাসাটা আরও বেড়ে গেছে। না, এটা দয়া না। এখন আহানের পুরো ভালোবাসা পুরো দুনিয়াটা জুড়ে আরোহি এটা ভেবেই আহানকে আরও ভালোবেসে ফেলছে।
______________________________
তাবুগুলো গোল করে টানানো হয়েছে। আর মাঝে আগুন জ্বালিয়ে আগুনের চারপাশে গোল করে সবাই বসে আছে। ডিসেম্বরের শেষ। এই সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে হালকা শীত থাকে। রংপুর জেলার মতো আহামরি শীত থাকে না জন্য সবাই আগুনের তাপেই মোটামুটি আরামে বসে আছে। আরোহি ধীরে ধীরে তাবুর কাছে এসে তাবুতে হালকা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আহানকে দেখতে লাগলো আরোহি। আগুনের লাল আভা আহানের ফর্সা গায়ে মুখে পড়ছে। আহান সাদা টি-শার্ট, ব্লু ট্রাওজার পড়ে আছে। আহানকে এমনিতেই সাদাতে দেখতে ড্যাসিং লাগে। আরোহি আবার নতুন করে আহানের প্রেমে পড়লো। আরোহি মনে মনে বললো, ” আহান তোমায় আর কষ্ট দিবো না, আজই তোমায় বলবো আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি ”
আরোহিকে দেখেই মিতু আরোহিকে টেনে ওদের সাথে বসালো। এখন ওরা সবাই মিলে গান গাইবে। প্রথমেই আহানকে গান গাইতে বলা হলো।
আহান আরোহির দিকে তাকিয়ে গিটারে সুর তুলে গান শুরু করলো,
আমার কল্পনা জুড়ে যে গল্পেরা ছিল
আড়ালে সব লুকনো
সেই গল্পরা সব রঙিন হলো পলকেই
তোমাকে হঠাৎ পেয়ে যেন
প্রেম তুমি আসবে এভাবে
আবার হারিয়ে যাবে ভাবিনি
আজও আছে সে পথ
শুধু নেই তুমি
বলো, কোথায় আছ অভিমানী
সব থেকেও কী যেন নেই
তোমাকে তাই খুঁজে যাই প্রতি ক্ষণে
আমার ভাল লাগাগুলো সব
তোমায় ভেবে সাঁজে রোজ রোজ এই মনে
প্রেম তুমি আসবে এভাবে
আবার হারিয়ে যাবে ভাবিনি
আজও আছে সে পথ
শুধু নেই তুমি
বলো, কোথায় আছ অভিমানী
গানের সময় আরোহিও আহানের দিকে ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো। গানের প্রতিটা লাইন যে আরোহিকে ডেডিকেট করা হচ্ছে সেটা আরোহি ভালোই বুঝতে পারছে।
