কাস্ত্রোরুজ থর্পের ধূসর আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মৃ’ত্যুর সমাচার। গ্রামটির বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায় মানুষের র’ক্তশূণ্য ফ্যাকাশে মৃ’তলাশ। মানুষগুলো সব ভয়াবহ আতংকে মিইয়ে যায়। কেউ কেউ উইজার্ড পরিবারের কাছে ছুটে আসে ক্রিসক্রিংগল এবং ডিয়েটসকে খবর পৌঁছে দিতে। অথচ তাদের বাড়ির সামনে এসে মানুষগুলো প্রচন্ড ভড়কে যায়।

ভোর হতে না হতেই বাইরে থেকে ভেসে আসা তীব্র শোরগোল আর কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যায় সিয়ার। ও কান পেতে শোনে। বিস্মিত হয়ে কপাল কুঁচকে নেয়। মেঝেতে খাঁচার ভিতর কিচ দৌড়াদৌড়ি করে। সিয়া দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। দরজা খুলে কামরার বাইরে বেরিয়ে যায়। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উচ্চস্বরে ডাকে,

– মা!

– ইনায়া!

– দাদিন!

কেউ সিয়ার ডাকে সাড়া দিল না। সবাইকে ডাকতে ডাকতে ও সিঁড়ি বেয়ে নিচের তলায় নেমে গেল। কিন্তু বারান্দায় বা উঠানেও কাউকে দেখতে পেল না। রান্না ঘরেও কেউ নেই। বাড়ির পেছন দিক থেকে ভেসে আসা শোরগোল আর কান্নার আওয়াজ অনুসরণ করে সেদিকে দৌড়ে গেল সিয়া। পশ্চাদ্ভাগের উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছাতেই ও থমকে দাড়াল। কতগুলো মানুষের জটলা দেখতে পেল।

– ওখানে এতোগুলো মানুষের ভিড় কিসের? কে কাঁদছে এভাবে? কেনোই বা কাঁদছে সে?

সিয়া মনে মনে ভাবল। আশেপাশে নজর বুলিয়ে বাড়ির বাকিদের উপস্থিতি টের পেল। ক্রিসক্রিংগলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ডিয়েটস। দু’জনের চেহারায় ভয়াবহ আতংকের রেশ। সিয়া ক্লিন্ন গতিতে পা চালাল। ওকে দেখে ইনায়া এগিয়ে এলো। মেয়েটার মুখাবয়ব মাত্রারিক্ত বিষন্ন দেখাল। চোখ দু’টোও কেমন অশ্রুসিক্ত। গাল, নাক লালবর্ণ হয়ে আছে। ইনায়া সিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সিয়ার একহাত মুঠোবন্দি করে ধরে সহজ সাবলীল কন্ঠে বলল,

– ওখানে যেও না। নিজের কামরায় ফিরে যাও।

– কেনো? ওখানে কি হয়েছে? এতো মানুষের ভিড় কিসের? কে কাঁদছে এভাবে?_______সিয়া কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল।

– এতো কেনো প্রশ্ন করো? তোমার শরীর অসুস্থ। কামরায় গিয়ে বিশ্রাম নাও।

– আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। সামনে থেকে সরে দাড়াও।

ইনায়া ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সিয়া তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। ভিড় ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল। সকলের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিচের দিকে তাকাতেই ওর হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো। যেন সমগ্র দুনিয়া দুলে উঠল।

রক্তশূণ্য ফ্যাকাশে চেহারার দু’টো ছেলে-মেয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে রাস্তায়। চোখ দু’টো খোলা। কুচকুচে কালো ঠোঁটগুলো একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে ছিল। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সিয়া একবার ছেলেটা আরেকবার মেয়েটার দিকে তাকাল। হৃদপিণ্ডে অদম্য, অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব করল। না চাইতেও ওর চোখ থেকে শব্দহীন অশ্রুকনা গড়িয়ে পড়ল। ও অস্ফুট স্বরে ডাকল,

– এমিল! অ্যাদ্রি!

ইলমাহা অ্যালিয়েভ সিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। সিয়া তার মায়ের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– ওরা কখন এসেছিলো মা? এভাবে রাস্তায় পড়ে আছে কেনো? বেঁচে আছে তো!

সিয়ার কন্ঠস্বর ভীষণ করুণার্ত শোনাল। কেমন অবুঝের মত একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকল। ইলহামা অ্যালিয়েভ দু’চোখের পাতা বুজে নিলেন। তার কপোল বেয়ে অবাধ নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। মৃতদেহ দু’টোর পাশে বসে থাকা মহিলাটার দিকে তাকাতেই সিয়ার হৃদয় মুষড়ে উঠল।

ছোট শিশুদের মতো আকুল হয়ে কেঁদে যাচ্ছিলেন উরসুলা ভনডারলেন। এই প্রথম তাকে কাঁদতে দেখছে সিয়া। শুনতে পাচ্ছিলো নিজের দাদিনের হৃদয়বিদারক কান্নার সুর। সিয়ার সবকিছুই অবিশ্বাস্য মনে হলো। তবুও ওর শরীর কাঁপতে শুরু করল। কোনোভাবেই দু’ দুটো প্রিয়জনের এমন আকস্মিক মৃ’ত্যু মেনে নিতে পারল না ও। দপ করে মাটিতে বসে পড়ল। দু’হাতে এমিলের দু’গালে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল,

– ভাই! ভাই উঠো।

সিয়ার ডাকে এমিল সাড়া দিল না। সিয়া আন্দ্রেয়ার হাত ঝাঁকিয়ে ব্যথাতুর কন্ঠে ডাকল,

– অ্যান্দ্রি কথা বলো।

সিয়ার মনে হলো এই বুঝি আন্দ্রেয়া সাড়া দিবে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ডেকে উঠবে সিয়া বলে। কিন্তু আন্দ্রেয়ার রক্তহীন নিথর দেহখানা বিন্দুমাত্র নড়চড় করল না। সিয়া কাঁপা কাঁপা হাতে আন্দ্রেয়ার পেট স্পর্শ করল। মুহূর্তেই র’ক্তশূন্য মুখে ইলহামা অ্যালিয়েভের দিকে তাকাল। বিমর্ষ চিত্তে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– মা, অ্যান্দ্রির বাচ্চাটা?

উরসুলা ভনডারলেনের কান্নার বেগ বেড়ে গেল। ইনায়া নিঃশব্দে দু’চোখের অশ্রু ঝরাল। ও উরসুলাকে সামলানোর চেষ্টা করল। ক্রিসক্রিংগল কেমন জ্ঞানশূন্যবোধ করলেন। ডিয়েটস প্রাণহীন প্রস্তর মূর্তির ন্যায় স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মেয়ে ক্যালভিন কোলিজের একমাত্র ছেলে এমিল। পিতৃ-মাতৃহীন হয়ে উইজার্ড পরিবারে লালিত পালিত হয়েছিল। পড়াশোনার সুবাদে খারকিভ শহরের পাড়ি জমিয়েছিল। হঠাৎ একদিন আন্দ্রেয়াকে বিয়ে করে কাস্ত্রোরুজ থর্পে ফিরে এসেছিলো। উইজার্ড পরিবারের সবাই আন্দ্রেয়াকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিলো।

সিয়াদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে এমিল নিজের নতুন বাড়ি বানিয়েছিল। সেখানেই আন্দ্রেয়াকে নিয়ে সংসার সাজিয়েছিল। মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা ছিলো। কয়েকদিন পূর্বে নিজের পরিবারের সাথে দেখা করতে এমিলকে সাথে নিয়ে খারকিভ শহরে গিয়েছিলো। কিন্তু কে জানতো তারা কাস্ত্রোরুজ থর্পে ফিরে আসবে র’ক্তহীন দেহের দু’টো মৃত লাশ হয়ে?

এমিলকে ভীষণ ভালবাসে সিয়া। নিজের সহোদর ভাইকেও এতোটা ভালবাসা যায় কিনা জানা নেই ওর। এমিলের কাছে সিয়া ছিলো সবচেয়ে আদরের। ওর সব আবদার নিমিষেই পূরণ করে দিতো। বহুবার ইনায়া, আর্নি আর সিয়াকে নিয়ে দূরের পাহাড়ে ঘুরতে যেতো। পাহাড়ি জঙ্গলে শিকার খুঁজে বেড়াতো।
তিনডোরা কাঠবিড়ালি কিচকেও উপহার দিয়েছিলো এমিল।

ভাবতেই সিয়ার যন্ত্রণার পরিমাণ বেড়ে গেল। ও কেমন অস্থির হয়ে উঠল। প্রিয় ভাই এমিলের মৃত্যু মেনে নিতে দুর্দম্য কষ্ট হল। আন্দ্রেয়াসহ তার অনাগত সন্তানের এই নির্মম মৃ’ত্যু মেনে নিতে পারল না। সিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এমিল আর আন্দ্রেয়ার ঘাড়ে দু’টো স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেল। জায়গাটুকুতে কেমন রক্ত জমে গেছে। সেই ক্ষতচিহ্নের দিকে চোখ পড়তেই সিয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। ওর কাঁধে থাকা ক্রুশ চিহ্ন’টা জ্বলতে শুরু করল। জায়গাটুকুতে সিয়ার অসহ্য যন্ত্রনা অনুভব হলো। এরকমটা সেদিনও হয়েছিলো, যেদিন ইনায়ার ঘাড়ে র’ক্তচোষা পি’শাচের দেওয়া কামড়ের দাগ দেখেছিলো ও। এমিল আর আন্দ্রেয়ার ক্ষতচিহ্ন দু’টো অবিকল ইনায়ার ক্ষতচিহ্নের মতো।

– তাহলে রক্তচোষা পিশাচ’ই ওদের মৃ’ত্যর কারন?____বিরবির করে বলে উঠল সিয়া।

অসামান্য বিতৃষ্ণায় ওর বুক ভরে গেল। উজ্জ্বল বাদামী চোখজোড়ায় যেন ভয়াবহ আক্রোশের অনল জ্বলে উঠল। ঘৃনা আর ক্রোধের সমন্বয়ে সিয়ার সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করল। মূহুর্তেই প্রতিশোধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকল ওর হৃদপিণ্ড। যেন সামনে পেলে নিমিষেই শয়তানগুলোকে ধ্বংস করে দিবে ও।

– কতটা নিষ্ঠুর নরপি’শাচগুলো। নিজেদের পিপাসা মেটাতে নির্মমভাবে নিরীহ মানুষগুলোর প্রাণ নিয়ে নেয়। ওদের মতো হিংস্র প্রানীদের বেঁচে থাকার কেনো অধিকার নেই। পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে ওদের নাম ও নিশানা মুছে যাক। ঈশ্বর ওদের পাপের শাস্তি দিক। ধ্বংস হোক ওরা, ধ্বংস হোক।

সিয়া চিৎকার করে কথাগুলো বলল। ইলহামা অ্যালিয়েভ ওকে দু’হাতে আগলে নিলেন। সিয়া আকুল হয়ে কাঁদল। বারবার ওর চোখের সামনে এমিলের হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা ভেসে উঠল। আন্দ্রেয়ার আদর, ভালবাসা আর অনাগত বাচ্চাটার কথা ভেবে সিয়া হিংস্রাত্মক হয়ে গেলো। হঠাৎই শান্তশিষ্ট অলস মেয়েটার মাঝে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হলো। সিয়া দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাতে গাউন খামচে ধরল। চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। যেন নিজেই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

সহসা ভীড় ঠেলে কুরী পরিবারের সদস্যরা এসে দাড়াল। এমিল আর আন্দ্রেয়ার মৃতদেহ দেখে ক্রিস্তিয়ানের গলা শুকিয়ে গেলো। আর্নি অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করল। সাসোলি কুরী ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। স্ট্রিকল্যান্ড কুরীর কোমল হৃদয় ভীষন ব্যথিত হলো। উইজার্ড পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেলেন না।

আশেপাশের মানুষজনের কোলাহল বাড়ল। যেহেতু মৃ’ত্যু দু’টো স্বাভাবিক ছিল না, সুতরাং অতি দ্রুত অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রয়োজন মনে করল। কারন মানুষগুলো ভাবল,

– দেরি করলে এরাও যদি রক্তচোষা পি’শাচে পরিণত হয়?

– এই মৃ’ত লাশগুলোর অন্তেষ্টিক্রিয়া করার কোনো দরকার নেই। আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া উচিত। কারন এই লাশগুলো রাতের অন্ধকারে র’ক্তচো’ষা পি’শাচ হয়ে আবার ফিরে আসবে।

ভিড়ের মাঝখান থেকে কথাটা বলে উঠল কেউ। ক্রিসক্রিংগল কথা বলা লোকটার দিকে শান্ত চোখে তাকালেন। তার চোখে চোখ পড়তেই লোকটা চুপসে গেল। ইতস্তত বোধ করল। ভিড়ের মাঝে মুখ লুকাল। ক্রিসক্রিংগলের উদ্দেশ্যে ডিয়েটস ক্ষীণস্বরে বললেন,

– ওদের বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।

ক্রিসক্রিংগল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কিন্তু মানুষগুলো কেউ মৃতদেহ স্পর্শ করার সাহস পেল না। একে একে সবাই যে যার গন্তব্যে ফিরে গেল। উইজার্ড পরিবারের সবাই বেশ অবাক হলো। সবথেকে বেশি আশ্চর্য হলো সিয়া। ও বুঝতে পারলো না মানুষগুলো এতোটা অকৃতজ্ঞ কি করে হয়? অগ্যতা কুরী পরিবার আর উইজার্ড পরিবারের সদস্যরা মিলে ধরাধরি করে এমিল আর আন্দ্রেয়ার মৃত লাশ দু’টোকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল।

_________★★________

গগনচুম্বী পাহাড়ের উপর সুবিশাল রিসোর্ট। রিসোর্টের বারান্দায় আব্রাহাম দাঁড়িয়ে ছিলো। যেখান থেকে দূরের গ্রামগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বাড়ি-ঘরগুলো যেন ছোট ছোট পিঁপড়ের সমান মনে হলো। বরাবরের মতো আজও পাহাড়ি প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যে আব্রাহাম বিমোহিত হলো। নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। মৃদুমন্দ বাতাস তাকে ছুঁয়ে দিচ্ছিল। তার সোনালী রঙা চুলগুলো আনন্দে দোল খাচ্ছিলো। প্রকৃতি যেন উদার হয়ে তার সৌন্দর্যের ডানা মেলে দিল।

– এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়।_____কথাটা বলে আব্রাহামের বান্ধবী অ্যামারিলিস বেলাডোনা।

আব্রাহাম কিছু বলল না। একনজর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আকাশের দিকে চোখ সরিয়ে নিল। পুরো আকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ উড়ে যাচ্ছিলো। কাছে দূরে ছোট-বড় অসংখ্য সবুজ পাহাড়ের সমারোহ। সবুজ পাহাড়ে লাল নীল আর কমলা রঙ যেন খেলা করছিলো।

– পাহাড়ের সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের অপরুপ সৌন্দর্য দেখার জন্যই এই রিসোর্টে আসা।____বেলাডোনা পুনরায় কথা বলল।

– পাহাড়ের আকা বাঁকা রাস্তা পেরিয়ে এই রিসোর্টে পৌঁছাতে আমার দম বেরিয়ে আসছিলো। আর একটু হলেই প্যান্ট ভিজে যেত।

দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে নিয়ে পাশ থেকে কথা বলে উঠল অন্য একটা ছেলে। বেলাডোনা নাক কুঁচকে ফেলল। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

– অপদার্থ।

– আর একবার অপদার্থ বলে দেখ। তোকে এই পাহাড় থেকে খাদে ফেলে দিবো।

– ফেলে দেখা।

বেলাডোনা বুক ফুলিয়ে তেড়ে গেল ছেলেটার দিকে। ছেলেটাও দু’পা এগিয়ে গেল বেলাডোনার দিকে। আব্রাহাম বিরক্ত হলো। কপট রাগমিশ্রিত কন্ঠস্বরে বলল,

– বেলা! বন্ধ কর তোদের এই ঝগড়াঝাঁটি।

– তুই সবসময়ই আমাকেই কেনো বকিস? স্টুয়ার্ড কি বললো শুনতে পাস নি?

– আমি দু’জনকেই থামতে বলেছি।

– না তুই শুধু আমার নাম ধরে ডেকেছিস।

– ঠিক আছে। এখন যা এখান থেকে। দেখ বাকিরা কি করছে। আর নিলসোনকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিস।

বেলা রেগে মেগে চলে গেল। স্টুয়ার্ড তার পিছু নিল। আব্রাহাম পুনরায় সেই গ্রামগুলোর দিকে তাকাল। অদূরে থাকা কাস্ত্রোরুজ থর্পের উপর তার দৃষ্টি স্থির হলো। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিলসোন চলে এলো। আব্রাহামকে উদ্দেশ্য করে নত মস্তকে সম্মান জানিয়ে বলল,

– এস্টীম রুলার। আমাকে আসতে বলেছিলেন।

– এই তোমার জন্য আমি একদিন সবার কাছে ধরা পড়ে যাবো। কতবার বলেছি আমাকে রুলার বলে ডাকবে না?

নিলসোন কোনো কথা বলল না। নিশ্চুপ হয়ে বারান্দার ফ্লোরের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল।

– আমি আবারও কাস্ত্রোরুজ থর্পে যেতে চাই। সেটা আজ রাতেই। ওভারলর্ড এখনো ফিরে আসেননি। তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

নিলসোন নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল। আব্রাহাম তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– হাসছো কেনো?

নিলসোন থতমত খেল। আমতা আমতা জানতে চাইল,

– আপনি দুশ্চিন্তা করছেন ভ্যাম্পায়ারদের ওভারলর্ডকে নিয়ে?

– বুড়োটা বিপদজ্জনক। তাছাড়া জানো তো! শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তি বরাবর হেরে যায়।

– তিনি অসীম শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান। এতো সহজে হেরে যাওয়ার পাত্র নন।

– তবুও আমি যেতে চাই।

নিলসোন দিরুক্তি করল না। কারন সে জানে, রুলার একবার যখন বলেছেন তখন তার মত পরিবর্তন হবে না। কিছু কিছু ব্যক্তি এরকমই হয়। নিজেদের সিদ্ধান্তে সর্বদা অটল রয়।

________★★________

দুপুরের দিকে আন্দ্রেয়া আর এমিলের অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গ্রামের মানুষগুলোর অনুরোধে দু’জনের মুখে রসুন, কফিনের ভিতর অগণিত পপির বীজ দিয়ে তাদের মৃত লাশ দু’টো সমাধিস্থ করা হয়। এতে করে মৃ’ত লাশগুলো র’ক্তচোষা পিশাচ হয়ে পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না।

উইজার্ড পরিবারে যেন ভয়াবহ শোকের ছায়া নেমে আসে। সিয়া কেমন পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে রয়। উরসুলা ভনডারলেন গুনগুনিয়ে কাঁদেন। ইলহামা অ্যালিয়েভ রান্না করতে চলে যান। তাকে সাহায্য করে ইনায়া।

সারাদিনে কারো কিছু খাওয়া হয়নি। কুরী পরিবারেও আজ রান্না হয়নি। সকাল থেকে সবাই সিয়াদের বাড়িতেই ছিলো। ওদিকে বাড়িতে উপস্থিত ছিলো একজন অতিথি। তিনি আবার না বলেই চলে যায় যদি? ভাবতেই সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে চাইল আর্নির পরিবার। যদিও ইলহামা অ্যালিয়েভ তাদের থেকে যাওয়ার জন্য জোর করছিলেন, কিন্তু সাসোলি কুরী তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

কুরী পরিবারের সদস্যরা সবাই বিকেলের দিকে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসে। তারা এদুয়ার্দোকে কোথাও দেখতে পায় না। স্ট্রিকল্যান্ড কুরী দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তিনি এদিক সেদিক খুঁজে উচ্চস্বরে ডাকেন,

– এদুয়ার্দো!

– ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন!

এদুয়ার্দো থমথমে পায়ে বাড়ির পেছন দিক থেকে স্ট্রিকল্যাডের সামনে এসে দাড়ায়। তাকে দেখে লোকটা যেন দেহে প্রাণ ফিরে পায়। আর্নি বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে রয়। এই মানুষটাকে দেখলে মেয়েটা নিমিষেই সবকিছু ভুলে যায়। সাসোলী কুরীর মায়া হয়। তিনি মনে মনে ভাবেন,

– ছেলেটা সারাদিন ধরে না খেয়ে আছে। দ্রুত কিছু রান্না করা দরকার।

ক্রিস্তিয়ানের এদুয়ার্দোকে বেশ সন্দেহ হয়। সে দ্রুত পা ফেলে নিজের কামরায় চলে যায়। বাকি সবার সব চিন্তায় জল ঢেলে দিয়ে এদুয়ার্দো রাশভারি কন্ঠে বলে উঠে,

– আমি এখন ফিরে যেতে চাই।

স্ট্রিকল্যান্ডের মুখখানা কেমন শুকিয়ে যায়। তিনি কিছু বলতে চান। কিন্তু তার পূর্বেই এদুয়ার্দো বলে,

– আপনার অনুরোধ রাখতে গতকাল রাতটা আমি এখানেই থেকে গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমাকে ফিরে যেতে হবে।

– তুমিতো আজ সারাদিনে কিছুই খাওনি। অন্তত কিছু খেয়ে যাও।_____উদ্বিগ্ন কন্ঠে কথাটা বলে উঠেন সাসোলি কুরী।

– আমি খেয়ে নিয়েছি বাজারের একটা ছোট রেস্তোরাঁ থেকে। অনুমতি দিন।

স্ট্রিকল্যান্ড কুরীর আর কিছু বলার থাকে না। তিনি সম্মতি দেন এদুয়ার্দোকে ফিরে যেতে। আর্নির চোখ দু’টো ছলছল করে উঠে। এদুয়ার্দো ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসে। এ বাড়িতে তার একরাত থেকে যাওয়ার উদ্দেশ্য সম্পন্ন। এরপর যখনই চাইবে আর্নিকে গুটি হিসাবে ব্যবহার করে সহজেই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে পারবে।

________★★_________

খারকিভ, ওয়াভেল কোট।

বিস্তৃত ছাদ। অন্ধকার রাত। রুফটপে বসে উদ বাজায় ইজাবেল। পরনে তার নীলরঙা গাউন। আকাশে ঘনকালো মেঘ। আজকের দিনটা বেশ অদ্ভুত ছিলো। কয়েকবার আকাশের বুকে মেঘ দেখা গেলেও বৃষ্টি হয়নি একবারও। স্নিগ্ধ উত্তুরে হাওয়ায় ইজাবেলের মন-প্রায় জুড়িয়ে যাচ্ছিলো। দু’চোখ বুজে গভীর মনোযোগ দিয়ে সে উদ বাজাচ্ছিল। মুহূর্তেই চিত্তপটে ভেসে উঠল প্রানপ্রিয় মুখ। চোখ বুঝে রেখে অনুচ্চ স্বরে উচ্চারণ করল,

– অ্যাভোগ্রেডো।

তার কানে কানে কেউ একজন ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

– প্রিন্সেস।

ইজাবেল চমকাল। সহসা নেত্রপল্লব মেলে ডানপাশে তাকালো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ইজাবেল মিষ্টি করে হাসল। প্রশস্ত ডানা মেলে হঠাৎই পিদর্কা স্যাভেরিন তার সামনে এসে দাড়াল। ইজাবেল পুনরায় চমকাল। খানিকটা ভড়কে গেলো। বিস্মিত কন্ঠে ডাকল,

– মা!

– ইজাবেল, তোমাকে এখনই আমার সাথে ক্যাসলে ফিরে যেতে হবে।

– কিন্তু কেনো?

– কোনো প্রশ্ন করবে না। এখানে থাকা তোমার জন্য নিরাপদ নয়।

– অ্যাভোগ্রেডো আর ক্যারলোয়েন?

– ওরাও আমাদের সাথে ক্যাসলে ফিরে যাবে।

ইজাবেল বুঝে উঠতে পারলো না, হঠাৎ করে তার মায়ের এমন উদ্বিগ্নতার কারন।

______★★_____

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

রাত গভীর হয়। আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। যেন সাগরের উত্তাল তরঙ্গের মতো শো শো শব্দ করে বাতাস বয়। ধূলো-বালিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারদিক। কামরার জানালাটা বন্ধ করে দেয় সিয়া। কিছুক্ষণ পর বাতাসের সাথে শুরু হয় প্রচন্ড বৃষ্টি। ক্রমে ক্রমে বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। একের পর এক বজ্রপাতের বিকট আওয়াজ শোনা যায়। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকানোয় মনে হয় প্রলয়ঙ্কারী ঝড় আসবে। বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দে শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। সিয়ার কামরার দু’পাশে দু’টো লন্ঠন জ্বলছে। প্রবল বাতাসে সেগুলোও নিভু নিভু হয়ে আসে। এদিকে ঝড়ের বেগ বাড়ে। প্রকৃতি যেন কোনো এক ভয়াল ধ্বংসলীলায় মেতে উঠে।

সিয়া মনে মনে মন্ত্র পাঠ করে। আচম্বিতে ওর কামরার লন্ঠন নিভে যায়। সাথে সাথে বিকট আওয়াজ তুলে ভয়ংকর বাজ পড়ে। সিয়া আতঙ্কে শিউরে উঠে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে কাঁচের স্বচ্ছ জানালা দিয়ে পশ্চাদ্ভাগের উঠানে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। পুনরায় বিদ্যুৎ চমকায়। সিয়া এবার পশ্চাদ্ভাগের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা আর্নিকে স্পষ্ট দেখতে পায়।

– এই ঝড় বৃষ্টির রাতে আর্নি কেনো আমাদের বাড়িতে আসবে?

সিয়া মনে মনে ভাবে। বাইরে থেকে আর্নির করা করুণ আর্তনাদ শুনতে পায়। ও চিৎকার করে বলছে,

– সিয়া আমাকে বাঁচা। এই রক্তচোষা পিশাচ টা আমাকে মে’রে ফেলবে।

সিয়া জানালার কাচ ঈষৎ ফাঁক করে উঠোনের দিকে তাকায়। মুহূর্তেই ওর শরীরের সমস্ত রক্তবিন্দু হিম হয়ে যায়। প্রশস্ত কালো কুচকুচে ডানার একটা বিশালাকৃতির প্রাণী আর্নির গলা চেপে ধরে। যার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে ধারালো দু’টো শদন্ত বেরিয়ে আসে। ভয়ংকর দেখতে প্রাণীটা আর্নির ঘাড়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে। সিয়া ওর নাম ধরে ডেকে বীভৎস চিৎকার দিয়ে উঠে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।