কাস্ত্রোরুজ থর্প।

গ্রামের সবগুলো বাড়ির দরজায় ঝুলছিলো রসুনের মালা আর ছোট আকারের কাঠের ক্রস। ভ্যাম্পায়ার’রা রসুনের সংস্পর্শে আসা তো দূরের কথা, রসুনের গন্ধও সহ্য করতে পারে না। ওরা রসুনের কথা চিন্তা করলেই অস্থির হয়ে উঠে। প্যানিক এ্যাটাকের শিকার হয়। গ্রামের মানুষগুলো বিশ্বাস করেন, রসুনের পাশাপশি গগণার বিষয়টাও ভীষণ অপছন্দ করে র’ক্তচোষা পি’শাচেরা।

কোনো ভ্যাম্পায়ার যদি কারো পিছু নেয়, তার দিকে একমুঠো পপির বীজ ছুঁড়ে দিলে সেগুলো গুনে শেষ করা না পর্যন্ত সে জায়গা টা থেকে নড়তে পারে না। মৃত ব্যক্তিদের সমাধিস্থ করার পূর্বে তাদের কফিনে রাখা হয় অগনিত পপির বীজ। যাতে গণনার ভয়ে মৃত লা’শগুলোকে কামড়াতে না পারে কোনো র’ক্তচোষা পি’শাচ। এতে করে মৃ’ত লা’শগুলো ভ্যাম্পায়ার রুপে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা। সেই পন্থা অবলম্বন করে নিজেদের বাড়িতে প্রবেশ করার রাস্তায় অগনিত পপির বীজ ছড়িয়ে রেখেছিলো গ্রামের লোকজন। কিন্তু গতকালকে হওয়া ঝড়ের ফলে সেগুলো সব ধুয়ে গেছে। তাই বিকেল হতে না হতেই মহিলারা পুনরায় বাড়ির আঙ্গিনার চারপাশে পপির বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ দরজায় একাধিক ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে। সন্ধ্যার আগেই পুরুষগুলো সব যে যার বাড়িতে ফিরে আসবে। দরজা জানালা বন্ধ করে কামরায় বসে থাকবে। রাতের বেলা গ্রামটা পুরোপুরি জনমানবহীন হয়ে উঠবে। ঠিক ততদিন পর্যন্ত তারা আতঙ্কিত জীবনযাপন করবে যতদিন না পর্যন্ত উইজার্ড ডিয়েটস পুনরায় গ্রামটাকে পি’শাচমুক্ত করবেন। গ্রামের মানুষগুলো ভীষন ভীত হলেও তারা ভরসা করে ডিয়েটসকে। তাই তার নির্দেশে প্রত্যেকে গলায় ক্রুশ লকেটের হার পরে থাকে। এরপরও দেখা যাক, কোনো র’ক্তচোষা পি’শাচ নিরীহ মানুষগুলোকে শিকার বানায় কি করে?

হৃদের উপকূলবর্তী তটরেখা বরাবর সুদীর্ঘ বেলাভূমি। নির্জন নিস্তব্ধ প্রকৃতি। কোথাও কোনো মানুষজনের চিহ্নমাত্র নেই। জুতোর নিচে গিজগিজ করছে অর্ধভেজা বালি। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় নাম না জানা কতগুলো পাখি। মিষ্টি শীতল বাতাসে সিয়ার মন জুড়িয়ে যায়। ও ধীরে ধীরে লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। যা পরবর্তীতে যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘশ্বাস রুপে বহির্গত হয়।

আর্নির চঞ্চল আঁখিদ্বয় আশেপাশে কাঙ্ক্ষিত পুরুষটাকে খুঁজে। সিয়া একটা গাছের গুড়ির উপর বসে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে হৃদের জলের দিকে। ওর মাঝে কোনো ধরনের চাঞ্চল্য দেখা যায় না। কয়েক রাত্রির ব্যবধানে সিয়া কেমন পাথর হয়ে গেছে। পুরোপুরি অনুভূতিশূন্য লাগে দেখতে। আর্নি সিয়ার পাশে এসে বসে। হৃদের জলের দিকে চোখ রেখে সিয়া ওকে ম্লান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– কোথায় সে?

– চলে আসবে এখুনি।

আর্নি পুনরায় আশে পাশে নজর বুলিয়ে নেয়। কিন্তু দূর-দূরান্তে কাউকে দেখতে পায় না ও।

– কবে থেকে চিনিস? কতদিনের সম্পর্ক?_____শান্ত এবং গম্ভীর স্বরে জানতে চায় সিয়া।

আর্নি লাজুক হাসে। যেন লজ্জায় মিইয়ে যায় ওর সর্বাঙ্গ। সলজ্জিত কন্ঠে বলে,

– একদিন একরাতের পরিচয়।

সিয়া সরু চোখে তাকায়। ওর ভ্রু কুঁচকে যায়। বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– এরই মাঝে প্রেমে পড়ে গেলি? এও কি সম্ভব?

আর্নি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছোট করে উত্তর দেয়,

– জানিনা।

– কি জানিস না? তোর মাথায় কি চলছে বলতো? ছেলেটাকে নিয়ে তোর মনের মধ্যে জাগা অনুভূতি কেমন?

– যেমনটা তুই বললি। প্রেমে পড়ে গেছি।

– কিভাবে?

আর্নির চোখদু’টো উজ্জ্বল হয়ে উঠে। উচ্ছ্বসিত দেখায় মুখাবয়ব। পুলকিত চিত্তে বিমুগ্ধ কন্ঠে বলে,

– একজোড়া জাদুকরী চোখের শান্ত চাহনি। লাল টকটকে ওষ্ঠদ্বয়ে নজরকাড়া হাসি। আমি ফেঁসে গেছি। ঘায়েল হয়েছি। চেয়েও চোখ ফেরাতে পারিনি। তার মাঝে কিছুতো আছে, যা আমাকে প্রতিনিয়ত তার দিকে আকর্ষিত করে। শুধু আমি নই। তুই যদি তাকে দেখিস, তোর হৃদয়েও একই অনুভূতি হবে। মনে হবে, সে এই পৃথিবীর কেউ নয়। স্বর্গ থেকে আসা কোনো স্বর্গীয় দেবতা। দু’চোখের দৃষ্টি ঝলসে যায়, তবুও তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়।

সিয়া ওর দু’চোখে বিমুগ্ধতা দেখতে পায়। যেন নিমেষেই আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। সিয়ার চোখের সামনে সেদিনকার দেখা সেই মানুষটার মুখশ্রী ভেসে উঠে। যে ওকে বাঁচিয়েছিল গুহা থেকে পড়ে যাওয়ার সময়। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার করা আঘাত আর হিংস্র দৃষ্টি ওকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। কতটা নির্মমভাবে মানুষটা ওর গলা চেপে ধরেছিলো। কয়েক সেকেন্ড ওভাবে ধরে থাকলে সিয়ার আত্মা দেহ ত্যাগ করে স্বর্গে পাড়ি জমাতো। ভাবতেই সিয়ার গা শিউরে উঠল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলো। ও বুঝতে পারল না, উইজার্ড পরিবারের সাথে সেই অচেনা অজানা পুরুষটার কি এমন শত্রুতা ছিলো।

– সিয়া?

আর্নির ডাকে সিয়া সম্বিত ফিরে পেল। অস্পষ্ট স্বরে বলল,

– হুম?

– কি ভাবছিস?

– কিছুনা। অনেকক্ষণ হলো। সে আসবে না বোধহয়। চল বাড়িতে ফিরে যাই।

সিয়ার কথা শুনে আর্নির মুখখানা কেমন শুকিয়ে গেলো। ও ব্যথিত হলো। করুন চোখে পেছন ফিরে দেখল। সহসা ওর চোখেমুখে অসাধারণ খুশির ঝলকানি খেলে গেলো। অকস্মাৎ দাড়িয়ে পড়ে স্ফীত কন্ঠে বলল,

– সে এসে গেছে।

উত্তরীয় হাওয়া বইছে। সিয়া উঠে দাড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে তাকাতেই ওর হৃৎস্পন্দন থেমে গেলো। হাত পা কেমন নিশ্চল অসাড় মনে হলো। দু’চোখের পলক পড়ল না। স্থির নয়নে এদুয়ার্দোর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। একজোড়া এমারেল্ড সবুজ চোখ, লাল টকটকে ঠোঁট আর সবল সুগঠিত দেহের সেই গম্ভীর মানুষটা হেঁটে আসছিলো। শিরশিরে বাতাসে এদুয়ার্দোর মসৃণ কালো চুলগুলো মৃদুমন্দ উড়তে শুরু করল। এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলেও মানুষটাকে দেখে সিয়ার নিঃশ্বাস আঁটকে এলো।

– এদুয়ার্দো।_____অনুচ্চ স্বরে ডেকে উঠল আর্নি।

সিয়া চমকাল। এতক্ষণ ভেবেছিলো চোখের সামনে দেখা মানুষটা ওর দৃষ্টিভ্রম হয়তো। কিন্তু আর্নি ওর ধারণা বদলে দিল। এদুয়ার্দো থমথমে পায়ে ওদের কাছে এসে দাড়াল। কালো রঙের ট্রেঞ্চকোট আর কালো প্যান্ট পরনে ছিলো। সিয়ার চোখে ঘোর লেগে গেল। এদুয়ার্দো আর্নির দিকে তাকাল। বারকয়েক চোখের পলক ফেলল সিয়া। আর্নি এদুয়ার্দোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সহাস্যে বলে উঠল,

– অবশেষে তুমি এলে। আমি ভেবেছিলাম আসবে না হয়তো।

এদুয়ার্দো কোনো কথা বলল না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দু’চোখের দৃষ্টি যেন শিকারী নেকড়ের মতো মনে হলো। সিয়া এদুয়ার্দোর শান্ত চাহনির আড়ালে থাকা ভয়াবহ হিমেল হিংস্রতা দেখতে পেল। ও নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। মরুভূমির মতো ওর গলা শুকিয়ে গেল। সেদিনকার এদুয়ার্দো আর আজকের এদুয়ার্দোর মাঝে বেশ পার্থক্য অনুভব করল। এদুয়ার্দো সিয়ার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে গম্ভীর কন্ঠস্বরে বলল,

– তোমার আর আমার মাঝখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি আমি আশা করিনি।

আর্নি বুঝতে পারল না কথাটা কাকে বললো এদুয়ার্দো। অথচ সিয়া খুব সহজেই বুঝে নিল। সাথে বেশ অপমানবোধ করল। প্রচন্ড রাগে ওর শরীর কাঁপতে শুরু করল। কাঁধসহ গলা পর্যন্ত ঢাকা ফ্রক পরেছে ও। ঢেকে গেছে ওর বাম কাঁধে থাকা ক্রুশচিহ্ন। এটাই বোধহয় সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না এদুয়ার্দো। সে এক পা দু’পা করে এগিয়ে যায় ওর দিকে। সিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে পাথরের মূর্তির ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

– এদুয়ার্দো!____

আর্নির ডাক শুনে থেমে যায় এদুয়ার্দো। ক্রোধ সংবরণ করতে নেত্রচ্ছদ বুজে নিল। একেতো সিয়াকে দেখে ওর ভেতরের হিংস্র পি’শাচ সত্তা জেগে উঠল। তন্মধ্যে আর্নির বলা তুমি সম্বোধন আর নাম ধরে ডাকা তার একদমই সহ্য হল না। আর্নি ছুটে গিয়ে তার এক বাহু জাপ্টে ধরল। অকস্মাৎ দুর্দমনীয় আক্রোশ এদুয়ার্দোকে কাবু করে ফেলল। সে আর্নির কবল থেকে আলগোছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। অনুচ্চ অথচ রাশভারি কন্ঠে বলল,

– একটা তুচ্ছ মেয়েকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের ড্রামা করতে হলো। যা অত্যধিক বিরক্তকর ছিলো।

আর্নি মনে মনে ভীষণ কষ্ট পেল। এদুয়ার্দোর বলা কোনো কথাই বুঝতে পারল না ও। বিস্মিত দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল। সিয়া বেশ মনোযোগ দিয়ে এদুয়ার্দোর গতিবিধি খেয়াল করছিল। এদুয়ার্দো চোখের পলকে ওর পেছনে গিয়ে দাড়াল। আর্নি ভড়কে গেলো। ওর বিস্ময় ভয়াবহ আতঙ্কে বদলে গেল। ও শঙ্কিত কন্ঠস্বরে বলল,

– একজন মানুষের দ্বারা এটা কিভাবে সম্ভব?

– মানুষ নয়। পি’শাচ।

সিয়ার ডান কাধের কাছে মুখ নিয়ে কথাটা বলে উঠে এদুয়ার্দো। মুহূর্তেই তার চোখ দু’টো রক্তবর্ণ ধারণা করল। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো ঝকঝকে সাদা দু’টো ধারালো শ্বদন্ত। এদুয়ার্দো হিংস্র গর্জন করে উঠল। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াল আর্নি। রক্তশূণ্য মুখে চিৎকার দিয়ে ডাকল,

– সিয়া!

সিয়া বুঝতে পারল এদুয়ার্দোর অপার্থিব এই সৌন্দর্যের রহস্য। দেবতা নয়, রক্তচোষা পি’শাচ সে। সিয়া ভয় পেল না। অসামান্য রাগে থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করল। ওর শিরায় শিরায় জেগে উঠল প্রতিশোধ স্পৃহা। চোখের সামনে ভেসে উঠল আন্দ্রেয়া আর এমনিলের ফ্যাকাশে মৃ’তদেহ। ও সমীকরণ মিলালো। যেদিন এই শয়তান’টা গ্রামে এসেছিলো সেদিন রাতেই কতগুলো মানুষের নৃশংস মৃ’ত্যু হয়েছিলো। বাদ যায়নি তার প্রাণপ্রিয় ভাই এমিল আর অন্তঃসত্ত্বা অ্যান্দ্রিও।

সমস্ত আতংক কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ওর পোশাকের নিচে কাঁধের উপর থাকা ক্রুশচিহ্নটা জ্বলতে শুরু করল। মুহূর্তেই সিয়া দুঃসাহসী হয়ে উঠল। দু’হাতে এদুয়ার্দোর ঘাড়ে সজোড়ে আঘাত করে বসল। মোক্ষম এক আঘাতে ব্যথা পেয়ে এদুয়ার্দো চোখ কুচকে ফেলল। আর্নি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সিয়া আর্নিকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে বলল,

– আর্নি! আমি জানি না এই শ’য়’তানকে কতক্ষণ সামলাতে পারবো। বাঁচতে চাইলে পালিয়ে যা এখান থেকে।

– আমি তোকে ছাড়া যাবো না সিয়া।

এদুয়ার্দো দুর্বোধ্য হাসল। তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে সিয়ার বাহুতে আঘাত করে বসল। ওকে ছিটকে ফেলে দিলো দূরে। বিদ্রুপের স্বরে বলল,

– অতিশয় নির্বোধ তুমি।

সিয়া গাছের গুড়িটার সাথে বারি খেয়ে মাথায় আঘাত পেল। সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল। আর্নিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

– তাহলে আক্রমণ কর। একসাথে আক্রমণ করলে হয়তো আমরা জিততে পারবো।

আর্নি শুকনো ঢোক গিলে নিলো। মনে মনে ভাবল,

– সাধারণ কোনো মানুষ হলে না হয় একটা কথা ছিলো। কিন্তু একজন রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারের সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া কিভাবে সম্ভব?

এদুয়ার্দো ঈষৎ ঠোঁট বাকিয়ে তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে হাসল। থমথমে ভরাট কন্ঠে বলল,

– নির্ধারিত সময় সমাপ্ত।

এদুয়ার্দো ঝড়ের বেগে সিয়ার পেছনে গিয়ে দাড়াল। সিয়া এমনিতেই অদক্ষ যোদ্ধা, তন্মধ্যে মার্শাল আর্টে পারদর্শী হলেও কোনো ভ্যাম্পায়ারের সাথে যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। তবুও সিয়া এদুয়ার্দোকে প্রতিহত করার চেষ্টা করল। কিন্তু এদুয়ার্দো ওকে কোনো সুযোগ দিল না। বরং হাতের সাহায্যে ওর কানের পাশে সজোরে আঘাত করল। সিয়া অচেতন হয়ে এদুয়ার্দোর বুকের উপর ঢলে পড়ল। আর্নি বীভৎস চিৎকার দিয়ে উঠল,

– সিয়া!

এদুয়ার্দো সিয়াকে কোলে তুলে নিল। আর্নিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

– বনিফেসিও পাহাড়। উইজার্ড ডিয়েটসকে বলে দিও নিজের নাতনিকে আমার কাছ থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে।

কথাটা বলে এদুয়ার্দো সিয়াকে নিয়ে হাওয়ায় মিশে গেলো। আর্নি কেমন জ্ঞানশূন্য বোধ করল। অসহায় হয়ে দু’হাটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে পড়ল।

_________★★_________

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

তিনদিন হয়ে গেছে। তবুও এদুয়ার্দো ফিরে আসেনি। অ্যাভোগ্রেডোর দুশ্চিন্তা হয়। নিজের কামরায় টেবিলের কাছে টেয়ার টেনে বসে। ওভারলর্ডের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখতে শুরু করে। হঠাৎ দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পায়। অ্যাভোগ্রেডো অনুমতি দেয়,

– এসো।

দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করল ইজাবেল। অ্যাভোগ্রেডো চমকাল। ইজাবেলের মুখখানা ভীষণ বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। চোখ দু’টোও কেমন ফোলা ফোলা লাগছিল। ফর্সা নাক আর গালগুলো আরক্তিম হয়ে আছে। অ্যাভোগ্রেডোর হৃদয় মুষড়ে উঠল। বক্ষস্থলে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল। উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইল,

– আপনি কেঁদেছেন প্রিন্সেস?

ইজাবেলের আঁখিযুগল থেকে নিঃশব্দে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল। সে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে থেমে থেমে বলল,

– রুলার সেদিন কাস্ত্রোরুজ থর্প থেকে আহত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু আজ তিন দিন পেরিয়ে যাচ্ছে ওভারলর্ড এখনো ফিরে আসেননি। তার সাথে খারাপ কিছু ঘটে যায়নি তো?

– আপনি অহেতুক দুশ্চিন্তা করছেন। ওভারলর্ডের কিছুই হয়নি। তিনি খুব শীঘ্রই ফিরে আসবেন।

ইজাবেলকে আশ্বস্ত করে কথাগুলো বলল অ্যাভোগ্রেডো। ইজাবেল স্বস্তি পেল না। আখিঁদ্বয় বুজে নিল। তার কান্নার বেগ বাড়ল। অ্যাভোগ্রেডো ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। দু’পা এগিয়ে গেল। হাতের চার আঙ্গুলের ডগা দিয়ে ইজাবেলের কপোল স্পর্শ করে অশ্রুকনা মুছে দিল। ইজাবেল নেত্রপল্লব মেলে তাকাল। অ্যাভোগ্রেডো সম্বিত ফিরে পেল। নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় দু’কদম পিছিয়ে গেল। বেশ ইতস্তত বোধ করল। আমতা আমতা করে বলল,

– ঘুরতে যাবেন?

– কোথায়?______ইজাবেল অকপটে জানতে চাইল।

– দুর্গের বাইরে কোথাও।

ইজাবেল সম্মতি জানাল। অ্যাভোগ্রেডো মিষ্টি করে হাসল।

★★

স্যাভেরিন ক্যাসলের একটি দ্বারবন্ধ গুপ্ত কামরা থেকে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলার হৃদয় বিদারক কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। দরজায় পাহারারত দ্বাররক্ষী দু’জন ভীষণ ব্যথিত হল। একজন অপরজনকে বলল,

– দু’দিন যাবৎ বন্দী মহিলা’কে খাবার দেওয়া হয়না। ক্ষুধার জ্বালায় এভাবে কাঁদছে কিনা কে জানে!

– জানলেও আমাদের কিছু করার নেই।

তাদের কথার মাঝখানে দু’জন দাসীকে সাথে নিয়ে পিদর্কা স্যাভেরিন চলে এলেন। দ্বাররক্ষী দু’জন মাথা নামিয়ে নিল। নত মস্তকে সম্মান জানিয়ে সবিনয়ে বললো,

– অনারেবল এমপ্রেস।

– দরজা খোলো।

দ্বাররক্ষীদের একজন দরজা খুলে দিল। দরজা খোলার শব্দে মহিলার কান্না থেমে গেল। দাসী দু’জনকে সাথে নিয়ে পিদর্কা স্যাভেরিন কামরায় প্রবেশ করলেন। মহিলাটা সেদিকে তাকিয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে নিলেন। দাসীদের হাতে খাবার আর পানীয়। তারা খাবারের প্লেটগুলো তার সামনে রেখে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। বন্দী মহিলার চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উন্মাদের ন্যায় খাবার খেতে শুরু করল। যেন কতশত বছর ধরে বুভুক্ষিত ছিল। হঠাৎই তার গলায় খাবার আঁটকে গেল। খুক খুক করে কেশে উঠল। পিদর্কা স্যাভেরিন সহাস্যে বললেন,

– ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে খাও। খাবারগুলো পালিয়ে যাচ্ছে না।

মহিলা গ্লাস হাতে নিয়ে পানি পান করলেন। দু’হাতে খাবারগুলো ঠেলে খানিকটা দূরে সরিয়ে দিলেন। রিনরিনে কন্ঠে বলে উঠলেন,

– শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে তোমার দেওয়া অনুগ্রহ আমাকে গ্রহন করতে হচ্ছে। কারন মৃত্যুর আগে আমি তোমার শেষ দেখতে চাই।

– আমিও তোমাকে যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মা’রতে চাই। আজ থেকে আগামী তিনদিন তোমার খাবার পানীয় সব বন্ধ। নিজের পাপের শাস্তি ভোগ করো।

মহিলা ম্লান হাসলেন। তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,

– অপেক্ষা করো। তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে প্রায়।

– আমার ছেলেরা থাকতে দুশ্চিন্তা নেই। ওরা সময় থমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

– তোমার ছেলেরা?___অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন মহিলা।

– হ্যাঁ। আমার ছেলেরা।

মহিলা বিদ্রুপ করে হাসলেন। পিদর্কা স্যাভেরিন রাগান্বিত হলেন। প্রবল বেগে মহিলার দিকে ছুটে গেলেন। শক্তহাতে গলা চেপে ধরলেন। মহিলার শ্বাস রোধ হয়ে এলো। কিন্তু তার ঠোঁটের ফাঁকে হাসিটুকু তখনো বজায় ছিলো।

_________★★________

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়। চারদিকে আবছা আবছা অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। দ্রুত পায়ে আর্নিদের বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে ইনায়া। সিয়া এখনো বাড়ি ফিরে আসেনি। অজানা আতঙ্কে ওর আত্মা ধুকপুক করে উঠে। সিয়াদের বাড়ি থেকে আর্নিদের বাড়ি বেশ খানিকটা দূরে। মাঝখানে ছোট একটা বন। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় ঝোপঝাড়। লম্বা লম্বা দাতুরা মেটেল গাছের ঝোপের আড়ালে কি যেন সড়সড় করে উঠে।

ইনায়া দাঁড়িয়ে পড়ল। সতর্ক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকালো। কিছু দেখতে না পেয়ে পুনরায় হাঁটতে শুরু করল। ক্রিসক্রিংগল মাঠে গেছেন। উইজার্ড বাজারে ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে ইনায়া বনের কাছাকাছি চলে এলো। আচমকা বাতাসের বেগে কি যেন ওর পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। গলায় হাত দিতেই ভীষণ চমকাল। ক্রুশ লকেটের হারটা নেই। গোসলের সময় খুলে রেখেছিলো। সেটা আর পরা হয়নি। এখন উপায়?

আর একটুখানি দুরুত্ব। পাঁচ মিনিটের এই জঙ্গলটা পেরুতে পারলেই আর্নিদের বাড়িতে পৌঁছে যাবে। ইনায়া যেন চোখ বন্ধ করে দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু হঠাৎই কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় উল্টে পড়ল। হাঁটু আর হাতের কনুইয়ে প্রচন্ড ব্যথা পেল। ভীত ভীত দৃষ্টিতে ইনায়া সামনের দিকে তাকাল। সাথে সাথে ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো লোমহর্ষক কণ্ঠস্বর,

– কে তুমি?

ইনায়ার সামনে দাড়িয়ে আছে সুঠাম দেহের একজন যুবক। মাথাভর্তি সোনালী চুল আর হালকা নীলাভ চোখ। লাল টুকটুকে ঠোঁটে নিদারুণ হাসির রেশ। সে ঈষৎ ঘাড় কাত করে নিষ্পলক চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ইনায়া থমকাল। ক্ষণকাল নির্বাক নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন বিমোহিত হল। আব্রাহাম ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসল। ইনায়া ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। মনে হলো কেউ একজন সম্মোহিত করেছে ওকে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।