কাস্ত্রোরুজ থর্প।

অদ্ভুত সৌন্দর্যে ঘেরা রুপকথার রাজ্যের মতো গ্রাম। যেন রং তুলি দিয়ে কোনো চিত্রকরের আঁকা অকল্পনীয় চিত্রকর্ম। গ্রামের চারপাশে দাড়িয়ে আছে অগনিত সুউচ্চ পাহাড়। ফসলি জমিতে রঙ বেরঙের ফসল। ভোর হতেই গ্রামের মানুষগুলো তাদের পোষা মেষ আর ভেড়াগুলোকে মাঠে নিয়ে যায়। কেউ কেউ ঘোড়া চরায়। ক্ষেতে খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাইরের মানুষগুলোর কাছে কাস্ত্রোরুজ থর্প ছিলো সম্পূর্ণ রহস্যে ঘেরা গ্রাম। কারণ খারকিভ ওব্লাস্টের মানচিত্রে এই গ্রামটার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। যারা খারকিভ শহর থেকে প্রায় দু’শো মাইল দূরে পাহাড়গুলোতে ভ্রমণে আসতো, তারাই শুধু পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখতে পেতো এই গ্রাম। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারনে বাইরের মানুষগুলো কেউ গ্রামে প্রবেশ করতে পারতো না। মুলত রাস্তা খুঁজে পেতো না। তাদের কাছে সবটাই গোলকধাঁধার মতো মনে হতো।

কাস্ত্রোরুজ থর্পের অধিপতি ক্রিসক্রিংগল। বৃদ্ধ ডিয়েটস যেন গ্রামের প্রতিটা মানুষের রক্ষাকর্তা ছিলেন। নিজের প্রাণপ্রিয় গ্রাম আর গ্রামের মানুষগুলোকে অশুভ শক্তি এবং বাইরের সব বিপদ থেকে রক্ষা করতে শক্তিশালী অদৃশ্য ব্যারিয়ার দিয়ে রাখতেন। তাছাড়া গ্রামে প্রবেশ করার রাস্তাগুলোও ছিলো গুপ্ত। কাস্ত্রোরুজ থর্পের গ্রামবাসী ব্যতীত সেগুলো সম্পর্কে বাইরের মানুষগুলো অবগত ছিলো না। কিন্তু এতোকিছুর পরেও কি ডিয়েটস নিজের গ্রাম আর গ্রামের মানুষগুলোকে রক্ষা করতে পেরেছেন?

বেশকিছু দিন আগেও গ্রামের মানুষগুলো কত হাসি-খুশি ছিলো। সারাক্ষণ লোকজনের কোলাহলে সম্পূর্ণ গ্রামটা মুখরিত হয়ে থাকতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে র’ক্ত’চোষা পি’শাচদের কবলে পড়ে সবাই কেমন আতংকে জর্জরিত। সম্পূর্ণ গ্রামটাই যেন নির্জন, নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শুধু শোনা যায় শিশুদের কান্নার শব্দ।

কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে ক্রিসক্রিংগলের সম্পূর্ণ শরীর। পায়ের পাতা ছিঁড়ে চুঁয়ে চুঁয়ে রক্ত পড়ছিলো। কোলের উপর পড়ে ছিলো সিয়ার অচেতন দেহ। ক্রিসক্রিংগল নিজের শরীরটাকে আর টেনে নিয়ে যেতে পারছিলেন না। ধীরে ধীরে যেন তার দেহের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলো। এদিকে আবারও আকাশ থেকে টুপ টাপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। পিচ্ছিল হয়ে গেল পথ-ঘাট। দু’চোখের সামনে ঝাপসা ঠেকল সবকিছু। এই চরম দুঃসময়ে ক্রিসক্রিংগলের পা দু’টোও যেন নিশ্চল হয়ে এলো। শক্তিশালী দেহের কঠিন হৃদয়ের মানুষটাও কাঁদলেন। বাবার জন্য নিঃশব্দে দু’চোখের অশ্রু ঝরালেন। কে জানে কি আছে তার বাবার ভাগ্যে। ক্রিসক্রিংগল স্তব্ধ হয়ে আসা কন্ঠস্বরে মেয়েকে ডাকলেন,

– সিয়া!

সিয়া সাড়া দিল না। তিনি পুনরায় ডাকলেন। অসাড় হয়ে আসা দেহটাকে কোনো রকমে টেনে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে সেই সাঁকোর কাছে এসে দাঁড়ালেন। এক বাঁশ দিয়ে সাঁকোটা বানানো হয়েছিল। আরেকটা বাঁশ ধরে হাঁটার জন্য খুঁটির সাথে উপরে সোজাসুজি বেঁধে রাখা ছিল। সিয়াকে দু’হাতে ধরে রেখে তিনি কিভাবে সাঁকো পার হবেন? ক্রিসক্রিংগলের চিন্তাশক্তি যেন একেবারেই শূন্যের কোটায় গিয়ে দাড়াল। মানসিকভাবেও ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছেন। কান্নার তোড়ে দু’চোখের দৃষ্টি আরও ঝাপসা হয়ে এলো। তীব্র যন্ত্রণায় হৃদপিণ্ড মুষড়ে উঠল। পাহাড়ি লতা জাতীয় শক্ত উদ্ভিদ তুলে নিয়ে সিয়াকে নিজের সাথে শক্ত করে বেঁধে নিলেন। অতঃপর উপরের বাঁশটা ধরে সাবধানী পা ফেলে ধীরে ধীরে সাঁকো পেরিয়ে গেলেন। এখনও বাড়িতে পৌঁছাতে অনেকটা রাস্তা হাঁটতে হবে। ক্রিসক্রিংগল মনোবল দৃঢ় করেন। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে বাকিদের কি উত্তর দিবেন? ভাবতেই যন্ত্রণা আর অপরাধবোধ তার বুকের ভিতর আরো ঘন হয়ে চেপে বসল যেন।

_______★★_______

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

কামরাজুড়ে ইতস্তত পায়চারি করছিলেন পিদর্কা স্যাভেরিন। সোফার উপর বসে থেকে তার গতিবিধি খেয়াল করছিল একটা মেয়ে। এরই মাঝে দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। পিদর্কা স্যাভেরিন অনুমতি দিলেন,

– এসো।

চোখে মুখে উচ্ছ্বসিত হাসির রেশ ফুটিয়ে কামরায় প্রবেশ করল ভিক্টোরিয়া আর ক্যারলোয়েন। মেয়েদের এতো খুশি দেখে পিদর্কার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। ক্যারলোয়েন কিঞ্চিৎ ঝুঁকে সম্মান জানাল। ঠোঁটে বিস্তর হাসির রেখা টেনে বলল,

– মা, কিছুক্ষণ আগে ওভারলর্ড ফিরে এসেছেন। এখন নিজের কামরায় আছেন।

পিদর্কা স্যাভেরিনের চোখ দু’টো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তার পুর্বেই বসে থাকা মেয়েটা বাতাসের গতিতে দরজার সামনে গিয়ে দাড়াল। সশব্দে দরজা খুলে কামরার বাইরে বেরিয়ে গেল। পিদর্কা স্যাভেরিন উচ্চস্বরে ডাকলেন,

– অ্যালিস। যেয়ো না, দাড়াও।

ততক্ষণে অ্যালিস জায়গাটা থেকে উধাও হয়ে গেল। পিদর্কা স্যাভেরিন হতাশার দীর্ঘশ্বাস টেনে নিলেন। অনুচ্চ স্বরে বললেন,

– মেয়েটা ভীষণ অবাধ্য।

পিদর্কা স্যাভেরিনের ছোট ভাই উড্রো উইলসনের মেয়ে অ্যালিস। গতকাল রাতে নিজের বাবার সাথে দুর্গে এসেছে ও।

ক্যাসলে ফিরে প্রথমে গোসল সেরে নিল এদুয়ার্দো। বাথরোব গায়ে জড়িয়ে ভেজা চুলে কামরায় এসে দাঁড়াল। সহসা দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেল। ভেবেছিলো অ্যাভোগ্রেডো এসেছে হয়তো। সে অনুমতি দিল,

– এসো।

নিঃশব্দে কামরার দরজা খুলে পা টিপে টিপে কামরায় প্রবেশ করল অ্যালিস। এদুয়ার্দোর পিঠ পেছনে কিছুটা দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এদুয়ার্দো গম্ভীর স্বরে ডাকল,

– অ্যাভোগ্রেডো!

কোনো সাড়াশব্দ শুনতে না পেয়ে সে পেছন ফিরে তাকালো।নিমেষেই তার চোখ কুঁচকে গেলো। অনুচ্চ সরে বলল,

– তুমি?

অ্যালিসের কন্ঠস্বর যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এদুয়ার্দোর দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইল। যেন ওর চোখ দু’টোর শত বর্ষের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিল। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অলৌকিক সৌন্দর্যে মুড়ানো পুরুষটার দু’চোখের গভীর দৃষ্টির অতলে হারিয়ে গেলো। এদুয়ার্দো পুনরায় জোর গলায় ডাকল,

– অ্যালিস!

অ্যালিস সম্বিত ফিরে পেল। কম্পিত কন্ঠে প্রত্যুত্তর দিল,

– হুম?

– কবে এবং কার সাথে এসেছো এখানে?

– গতকাল রাতে। বাবার সাথে।

– হঠাৎ?

– অনারেবল এমপ্রেস সংবাদ পাঠিয়ে আসতে বলেছিলেন বাবাকে।

– আচ্ছা। এখন যাও। পরে কথা হবে।

অ্যালিস মনঃক্ষুণ্ন হল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ওষ্ঠদ্বয়ে মুচকি হাসির ঝলকানি খেলে গেল। বাথরোব পরে থাকা এদুয়ার্দোর দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবল,

– এদু এখন পোশাক পরিধান করবে। তাই আমাকে চলে যেতে বলছে।

– কি হলো? যাও।__কিছুটা উচ্চস্বরে বলে উঠল এদুয়ার্দো।

– যাচ্ছি।

অ্যালিস দ্রুতপায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। এদুয়ার্দো আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সাদা রঙের একটা শার্ট আর কালো রঙের প্যান্ট পরিধান করল। ভেজা চুলগুলোতে আঙ্গুল চালিয়ে কিছুটা পরিপাটি নিল। তার ভীষণ রক্তের তৃষ্ণা পেল। হাঁটতে হাঁটতে পাশের কামরায় পৌঁছে গেল। মাঝারি আকারের একটি আইসবক্স খুলে সেখান থেকে কাঁচের বোতল বের করে নিল। বোতলটা হুবুহু রেড ওয়াইনের বোতলের মতো দেখতে লাগছিল। এদুয়ার্দো ছিপি খুলে বোতলে ঠোঁট লাগিয়ে ঢকঢক করে রক্ত পান করল। সবটুকু রক্ত পান করে খালি বোতলটা লম্বাকৃতির গোলাকার একটি কাঠের ঝুড়িতে রেখে দিল।

ক্যাসলে ফেরার পর থেকেই এদুয়ার্দোর অহেতুক অস্বস্তি লাগছিল। যেন তার অবচেতন মন বলছিল কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু ভুলটা কোথায়?

অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে রাগে পরিণত হলো। স্যাভেরিন ক্যাসলে থাকতে একদমই ভালো লাগছিলো না তার। এদুয়ার্দো দ্রুত ওয়াভেল কোটে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

– ফিরে যাওয়ার আগে মা’র সাথে কথা বলা দরকার।

এদুয়ার্দো ভাবল। ভাবতে ভাবতেই দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু পুনরায় দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেল। সে অনুমতি দিল,

– এসো।

হাস্যোজ্জ্বল মুখে কামরায় প্রবেশ করলেন পিদর্কা স্যাভেরিন। দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকলেন,

– এদুয়ার্দো, আমার বীর বাবা।

মায়ের হাসিমাখা মুখখানা দেখে এদুয়ার্দোর সমস্ত অস্বস্তি মিলিয়ে গেল। সে ঝকঝকে সাদা দাঁতে হাসল। পিদর্কা স্যাভেরিন এদুয়ার্দোর সামনে গিয়ে দাড়ালেন। ছেলের দু’গালে দু’হাত রেখে কপালে চুমু খেলেন। মিষ্টি মধুর হাসলেন। আনন্দ চিত্তে পুলকিত কন্ঠে বললেন,

– অনেকদিন পর তোমাকে দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেলো। ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম বাবা। কেমন আছো তুমি?

– ভালো আছি মা। আপনি কেমন আছেন?___শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল এদুয়ার্দো।

– এখন ভালো আছি। তোমাকে দেখে ভালো লাগছে। যেন দু’চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছি।

এদুয়ার্দো ঠোঁট ছড়িয়ে তৃপ্তিদায়ক হাসে। প্রশান্তিময় সুদীর্ঘ শ্বাস টেনে নেয়। পিদর্কা স্যাভেরিনের এক হাত আলতো করে ধরে বিছানার কাছে নিয়ে যায়।

– বসুন।

পরনের হালকা নীলরঙা গাউনটা তুলে ধরে বিছানার একপাশে বসেন পিদর্কা স্যাভেরিন। এদুয়ার্দো সটান হয়ে শুয়ে পড়ে তার মায়ের কোলে মাথা এলিয়ে দেয়। ভরাট-গম্ভীর কন্ঠস্বরে বলে,

– ডিয়েটসকে নিয়ে এসেছি মা। প্রাচীন কারাগারে বন্ধি করে রেখেছি।

পিদর্কা স্যাভেরিন অধিক বিস্ময়ে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন। তার চোখ দু’টো হঠাৎ’ই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলেন,

– কিভাবে? এতো সহজে সে কুপোকাত হয়ে গেল?

এদুয়ার্দো সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিল। তার কথা শেষ হতেই পিদর্কা স্যাভেরিন চমৎকৃত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

– তারমানে তুমি বলতে চাইছো, ব্যারিয়ারটা শুধুমাত্র একটা অদৃশ্য মায়া ছিলো?

– জ্বী মা।____ভাবলেশহীন কন্ঠে প্রত্যুত্তর দিলো এদুয়ার্দো।

– তাহলে ডিয়েটসের বাড়িতে দেওয়া ব্যারিয়ারটাও সেরকমই?

– হবে হয়তো।

একবুক স্বস্তির নিঃশ্বাস টেনে নিলেন পিদর্কা স্যাভেরিন। আনন্দিত হয়ে ছেলের মাথায় আদুরে স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিলেন। এদুয়ার্দো চমৎকার হেঁসে পরম আবেশে দু’চোখ বুজে নিলো।

_______★★______

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে দুপুরের দিকে বাড়িতে ফিরে এলেন ক্রিসক্রিংগল। সিয়াদের বাড়িতে কুরী পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলো। ক্রিসক্রিংগলের চেহারা অসম্ভব করুন দেখাল। মুখখানাও শুকিয়ে গেছে কেমন। তার দিকে প্রথমেই চোখ পড়ল ইনায়ার। ও মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠে ডাকল,

– সিয়া!

ওর চিৎকারে উপস্থিত প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ক্রিসক্রিংগল। তার কোলের উপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে সিয়া। ওর একহাত অসাড় হয়ে নিচের দিকে ঝুলছে। ক্রিস্তিয়ান আর আর্নি ভয়ার্ত কন্ঠে সমস্বরে বলে উঠল,

-মাস্টার! সিয়ার কি হয়েছে?

ক্রিসক্রিংগল কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। গলাটা ভয়াবহ শুকনো। কন্ঠনালিটাও যেন চেপে ধরে আছে কেউ। প্রত্যেকের মুখে একই প্রশ্ন,

– কি হয়েছে সিয়ার?

– কিছুই হয়নি। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।____ক্ষীণস্বরে উত্তর দিলেন ক্রিসক্রিংগল।

ইলহামা অ্যালিয়েভ সিয়ার মুখখানা আলতো হাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। তার দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে গেল। সিয়ার গোলাপী রঙা ঠোঁটজোড়া স্পর্শ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। ইনায়ার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সাসোলি কুরী সিক্ত দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। শুধুমাত্র আর্নি আর ক্রিস্তিয়ান উদ্বেগহীন হয়ে প্রশস্ত ঠোঁটে হাসল।

– তোমার বাবা কোথায়?

সবার মাঝখান থেকে কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন উরসুলা ভনডারলেন। এতক্ষণ যেন বাকিরা ডিয়েটসের কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন। উরসুলার করা প্রশ্নে এবার উত্তরের অপেক্ষায় প্রত্যেকে ক্রিসক্রিংগলের মুখের দিকে তাকালেন। কিন্তু ক্রিসক্রিংগল কোনো উত্তর দিলেন না। সিয়াকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলেন। সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে তার চলে যাওয়া দেখলেন। ইনায়া তার দাদিনকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্রিসক্রিংগলের পেছন পেছন দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন ইলহামা অ্যালিয়েভ। উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

– মা’য়ের প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেনো? বাবা কোথায়?

ক্রিসক্রিংগল নিশ্চুপ, নির্বাক। দরজা খুলে সিয়ার কামরায় প্রবেশ করলেন। খাঁচার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করছিলো কিচ। সিয়াকে দেখে হঠাৎই চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিল। সেদিকে একনজর তাকিয়ে ক্রিসক্রিংগল পুনরায় দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। ঘুমন্ত সিয়াকে বিছানায় আলগোছে শুইয়ে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেলেন। অতঃপর শরীর ছেড়ে দিয়ে সিয়ার পাশ ঘেষে বিছানায় বসে পড়লেন। মেয়েটাকে বাঁচাতেই তার বাবাকে আত্মবলিদান দিতে হলো। ক্রিসক্রিংগল ক্লান্ত। ভীষন ক্লান্ত। একফোঁটা শক্তিও শরীরে অবশিষ্ট নেই। ইলহামার দুশ্চিন্তা বাড়ল। স্বামীর নিরবতা তাকে ক্রমশই অস্থির করে তুলল। তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। ক্রিসক্রিংগলের দু’কাঁধ ঝেঁকে উচ্চস্বরে বললেন,

– আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। বাবা কোথায়?

ক্রিসক্রিংগল হঠাৎ করেই ইলহামা অ্যালিয়েভের দু’হাত আঁকড়ে ধরলেন। হুহু শব্দ তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললেন,

– ঐ পি’শাচ’টা আমার বাবাকে তার সাথে করে নিয়ে গেছে ইলহামা। আমি পারিনি তাকে রক্ষা করতে। কি করে বলতাম একথা মায়ের সামনে?

ইলহামা অ্যালিয়েভের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পায়ের নিচে অথৈয় শূন্যতা অনুভব করলেন। দু’দিকে মাথা নেড়ে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললেন,

– এটা হতে পারে না। বাবাকে কি করে একটা র’ক্তচোষা পিশাচ তুলে নিয়ে যেতে পারে? আপনি মিথ্যা কথা বলছেন তাইনা?

ক্রিসক্রিংগল অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তার কথাটা বিশ্বাস করতে ইলহামা অ্যালিয়েভের ভীষণ কষ্ট হলো। তিনি চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার দেখতে পেলেন। বৃদ্ধা শাশুড়ীকে এখন কিভাবে সামলাবেন?

পুনরায় ইলহামার দু’চোখ ছাপিয়ে বাধ ভাঙ্গা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি ডুকরে কাঁদতে শুরু করলেন। শঙ্কিত কন্ঠে জানতে চাইলেন,

– পি’শাচটা বাবাকে কেনো নিয়ে গেছে? তাকে মে’রে ফেলবে নাতো?

– জানিনা।

– আপনি কি এভাবেই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবেন?

– না। আমি যাবো। বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।

– রক্তচোষা পি’শাচগুলো কি আপনাদের দু’জনকে জীবিত ফিরে আসতে দিবে?

ক্রিসক্রিংগল উত্তর দিতে পারলেন না। কারন এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা নেই তার।

★★

গোধূলী লগ্ন। সূর্যটা ডুবে গেছে পশ্চিম আকাশে। অথচ এখনো ঈষৎ সোনালী আভা ছড়িয়ে আছে ইউক্রেনের ধূসর অন্তরীক্ষে। আব্রাহাম বাজারের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। গতকাল রাত থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে যাচ্ছে এদুয়ার্দোকে। কতবার যে ডিয়েটসের বাড়ির আশেপাশে গিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে তার কোনো হিসাব নেই।

– ওভারলর্ড কোথায় থাকতে পারে?___আব্রাহাম মনে মনে ভাবল।

তার ভাবনার মাঝেই বাজারে শোরগোল পড়ে গেল। মানুষগুলো কি যেন বলাবলি করছিল। সবার মুখেই দেখা গেলো ভয়াবহ আতংকের রেশ। আব্রাহাম কৌতুহল উদ্দীপক হয়ে উঠল। ভিড় জমে যাওয়া মানুষগুলোর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল। সবগুলো মানুষ একসাথে কথা বলায় কারো কথাই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারল না সে। হঠাৎ তার পাশ দিয়ে দশ-বারো বছর বয়সী একটা ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখল। আব্রাহাম তাকে ডাকল,

– এই ছেলে শোনো।

– জ্বি বলুন।

আব্রাহামের পরনে হুডিযুক্ত বাদামী রঙের জ্যাকেট ছিলো। হুডি মাথায় দিয়ে মুখের প্রায় অর্ধেকাংশ ঢেকে রেখেছিল। এতে করে অবশ্য গ্রামের লোকজন তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু আব্রাহাম সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ছেলেটাকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

– এখানে সবাই কি নিয়ে এতো শোরগোল করছে?

ছেলেটা আব্রাহামকে দেখে বেশ অবাক হল। ধবধবে সাদা, লাল টকটকে ঠোঁট আর হালকা নীলাভ চোখ। এরকম মানুষ ছেলেটা আগে কখনো দেখেনি। ধীরে ধীরে ওর মনে ভয়ের সঞ্চার হলো। ও শুকনো একটা ঢোক গিলে নিয়ে কম্পিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– আপনি জানেন না?

– উমহু।___আলা-ভোলা মুখে দু’দিকে মাথা নাড়াল আব্রাহাম।

তার আচরণে ছেলেটা হাসল। নিমিষেই যেন সমস্ত ভয় উবে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মুখখানা শুকনো দেখাল। ছেলেটা মলিন কন্ঠে বলল,

– গ্রামের মাথাল ব্যক্তি ক্রিসক্রিংগল। তার বাবা উইজার্ড ডিয়েটসকে কোন এক র’ক্তচোষা পি’শাচ ধরে নিয়ে গেছে। এখানে সবাই সেকথাই বলাবলি করছে।

– ওহ আচ্ছা।

– হ্যাঁ। এখন সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে যাবে। আপনিও তাড়াতাড়ি ফিরে যান নিজের বাড়িতে। পি’শাচগুলো খুব ভ’য়ংকর। মানুষের দেহের সব রক্ত চুষে খেয়ে মে’রে ফেলে একেবারে।

আব্রাহাম ছেলেটার কথা শুনে ভীত হওয়ার অভিনয় করে। চোখ বড় বড় করে শঙ্কিত গলায় বলে,

– তাই?

– হুম। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি এবার আসি তাহলে।

আব্রাহাম মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায়। ছেলেটা চলে যায়। কিছু একটা ভেবে আব্রাহাম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। অতঃপর চমৎকার হেসে সগর্বিত কন্ঠস্বরে বলে,

– আপনার দ্বারাই এটা সম্ভব ওভারলর্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন।

_______★★______

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

নিম্নবিস্তারী নিবিড় অন্ধকার রাত্রি। স্যাভেরিন ক্যাসল থেকে একটুখানি দূরেই রাজকীয় কালকুঠুরী। শতবর্ষ পুরনো। দেয়ালে দেয়ালে শৈবাল জমে কালো কুচকুচে হয়ে আছে। কোনো কোনো জায়গায় ইমারত ধসে গেছে। বাইরে থেকে অদ্ভুতুরে দেখতে। অথচ ভিতরে এখনো ঝকঝকে। সবগুলো সেল শূন্য খাঁখাঁ করছে। শুধু একটা মাত্র সেলে উইজার্ড ডিয়েটস বন্ধি হয়ে আছে। একমনে মন্ত্র আওড়ে যাচ্ছে। আচমকা তার শ্রবণেন্দ্রিয় ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছায় কোনো এক গম্ভীর নারী কন্ঠ,

– কেমন আছো ডিয়েটস?

ডিয়েটস চোখ তুলে তাকালেন। সেলের দরজায় পাহারত দু’জন রক্ষী দাঁড়িয়ে ছিলো। অদূরে একজন সুন্দরী রমনী দাঁড়িয়ে আছে। নাকের উপর ঝুলে থাকা গোল ফ্রেমের ভারী চশমা’টা ডিয়েটস এক আঙ্গুলে ঠেলে উপরে তুলে নিলেন। ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। রমনী ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন সেলের কাছে। শক্ত, মোটা লোহার শিকগুলো থেকে খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে দাড়ালেন। হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বলে উঠলেন,

– আবারও তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগছে।

– তুমি?____________বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ডিয়েটস।

– হুম। আমি, পিদর্কা স্যাভেরিন।

– ওহ। তাই বলো। এজন্যই এদুয়ার্দো তার বাবার নাম ডেভিড যোসেফ স্যাভেরিন বলেছিলো।

ডিয়েটস তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে হাসলেন। পিদর্কা স্যাভেরিনের সর্বাঙ্গে যেন আগুন লেগে গেল। তিনি রাগান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

– বইটা কোথায়? সাথে পাথর আর ম্যাজিক্যাল সোর্ড?

– বলবো না। ওগুলো তুমি কোনোদিনও পাবে না।

– তোমার বাড়িতে আছে নিশ্চয়ই? আমি আমার ভ্যাম্পায়ারগুলোকে পাঠিয়ে দিই?

আঁতকে উঠলেন ডিয়েটস। তার মৃদু মৃদু গলা কাঁপতে লাগল। তিনি শাসানোর স্বরে বললেন,

– পরিণাম ভালো হবে না।

– দেখা যাক। এবার আমি নিজেই তোমার বাড়িতে যাবো। কাস্ত্রোরুজ থর্প। পরিণাম কি হয়, তুমি সবটা এখানেই বসে থেকে দেখবে।

এতটুকু বলে পিদর্কা স্যাভেরিন বাতাসের বেগে কাল কুঠুরী থেকে বেরিয়ে যান। উইজার্ড ডিয়েটস দিশেহারা হয়ে পড়েন। এবার কি করবেন তিনি? নিজের পরিবারকে কিভাবে রক্ষা করবেন?

কোনো উত্তর খুঁজে পান না। অথচ তার মনে ভয় হয়। ভীষন ভয় হয়। ভয়াল আতংকে অস্ফুট স্বরে বলে উঠেন,

– ও কি সত্যিই আমার বাড়িতে চলে যাবে?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।