সময় বাধাহীন, দুর্বার। যার বেগ অপ্রতিরোধ্য। চোখের পলকে দু’দিন কেটে গেলো। সূচনা হলো শীতল, কাঠিন্য এক নতুন দিনের। জারিয়াঙ্কার সুমধুর কন্ঠস্বর বয়ে আনলো ভোরের আগমনী বার্তা।

ঘুম ভেঙ্গে গেলো ইনায়ার। আর্নি নড়েচড়ে কম্বল টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো আবার। বিছানায় সিয়া নেই। দরজাটা ভেতর থেকে খোলা দেখতে পেল। ইনায়া ধীরপায়ে নেমে দাঁড়াল। গায়ে চাদর জড়িয়ে নিলো। নিঃশব্দে দরজা খুলে পেছনের বারান্দায় চলে গেলো।

তখনো আবছা আবছা অন্ধকার। চারদিকে নজর বুলিয়ে ইনায়া বিস্মিত হলো। সিয়া নেই কোথাও। পশ্চাদ্ভাগের উঠোন পেরিয়ে জলাশয়। ইনায়া সেদিকে পা বাড়ালো। বারান্দা পেরুতেই হিমেল হাওয়া এসে গায়ে লাগল ওর। যেন হাড়মজ্জা পর্যন্ত তীব্র ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ইনায়া জলাশয়ের কাছে পৌঁছে গেলো।

স্বচ্ছ পানির ছোটখাটো জলাশয়। একপাশে মাঝ বরাবর ইটের বানানো সিঁড়ি। সিঁড়ির সপ্তম ধাপে দুই হাঁটুর উপর হাত রেখে বসে আছে সিয়া। ওর পাশে কিচ। কিচের ঝাঁকড়া লোমশ শরীরে জমেছে রেনু রেনু তুষারকণা। সিঁড়ির কাছে লম্বা খুঁটির সাথে একটা ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা। এটা দিয়ে জলাশয়ে জাল ফেলে মাছ ধরেন ফ্রাঙ্কলিন। তাকে অতি সাধারন কেউ বলে মনে হয়না সিয়ার। মনে হয় কোনো একসময় ফ্রাঙ্কলিন বেশ অবস্থা সম্পন্ন ছিলেন। তার কুঁচকে যাওয়া চামড়ার মুখখানায় এখনো যথেষ্ট আভিজাত্যের ভাব পরিলক্ষিত হয়। ফ্রাঙ্কলিনের দু’চোখের দৃষ্টিতে সিয়া নিজের জন্য অদ্ভুত একধরনের মায়া খুঁজে পায়।

অদূরে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। শ্বেতশুভ্র রঙের বরফ আস্তরণে ঢেকে গেছে সব। প্রকৃতি বড় অদ্ভুত! ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। ইম্যুভিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। তিনদিকে সবুজে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড় আর একদিকে প্রাসকোভিয়া জঙ্গল। কোনো এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই অতিপ্রাকৃত রহস্যে ঘেরা গহীন জঙ্গলের দিকে তাকালে নিমেষেই র’ক্ত হিম হয়ে যায়।

প্রাসকোভিয়ার দানবাকৃতির গাছপালাগুলোর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিলো সিয়া। নিঃশব্দে পা ফেলে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল ইনায়া। সন্তর্পণে হতাশার দীর্ঘশ্বাস টেনে নিল। কয়েকপল নিশ্চুপ থেকে ম্লান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– রাতে ঘুমাওনি?

সিয়া নিশ্চুপ, নির্বাক। ইনায়ার করা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না। চেয়েও মুখ থেকে একটা শব্দ বেরুলো না। যেন কথা বলার ইচ্ছেটাও ম’রে গেছে ওর। সহসা ইনায়ার গলার স্বর পরিবর্তন হলো। কঠিন কন্ঠে জানতে চাইল,

– তুমি কি ম’রে যেতে চাও? এই হিমশীতল বাতাসে এখানে বসে আছো কেনো? তোমার ঠান্ডা লাগছে না?

– বুকের অভ্যন্তরে থাকা হৃদপিণ্ডটা উত্তপ্ত আগুনে ভয়ংকরভাবে জ্বলছে। যার উত্তাপ আমার সর্বাঙ্গ ঝলসে দিচ্ছে। বাইরের ঠান্ডা গায়ে লাগবে কি করে? ——- শীর্ণ কন্ঠে উত্তর দিলো সিয়া।

ইনায়া বেদনার্ত দৃষ্টিতে সিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। ব্যথাতুর কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– কি করতে চাও? তোমার মন কি বলছে?

– শ’য়তানটাকে বি’নাশ করতে চাই। যতদিন না পর্যন্ত ওর কা’টা মাথা আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়বে, ততদিন পর্যন্ত আমি শান্তি পাবো না মনে।—-সিয়া দৃঢ় কন্ঠে বললো।

– পারবে ওদের সাথে লড়তে? সামর্থ্য আছে তোমার?

– মানুষের অসাধ্য বলে কিছু নেই। এমন তো নয়, ওরা চির অমর। কোনো না কোনো উপায় নিশ্চয়ই আছে ওদের ধ্বংস করার।

সিয়ার কন্ঠে প্রকাশ্য অমিত তেজ। শান্ত হয়ে বসে ছিলো কিচ।ইনায়া কিচকে কোলে তুলে নিলো। দুরন্ত কিচ কয়েকদিন ধরে বেশ নিশ্চুপ হয়ে গেছে। হয়তো ও সিয়ার যন্ত্রণাগুলো বুঝে। তাই সিয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে ওর সমস্ত চাঞ্চল্য। ইনায়া কিচকে বুকের কাছে আলতো স্পর্শে আগলে রেখে সিয়ার পাশে বসলো। ক্ষণকাল নীরব থেকে আদুরে কন্ঠে বললো,

– আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো। তোমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখবো। কিন্তু তুমি ওদের খুঁজে পাবে কোথায়?

– জানিনা। শুধুমাত্র এই একটা প্রশ্ন আমাকে প্রতিমুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। আমি বক্ষস্থলে লালন করছি ভয়াবহ দাবানল। যে যন্ত্রণায় আমি জ্বলছি সেই একই যন্ত্রণায় ওদেরকেও জ্বালাতে চাই।

ইনায়া সিয়ার দু’চোখের মনিতে তীব্র আক্রোশ দেখতে পেলো। সিয়ার একহাত শক্ত করে চেপে ধরে কঠিন কন্ঠে বললো,

– আমারও যন্ত্রণা হয়। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ওদের ধ্বংস করার ইচ্ছে পোষণ করি। যা তুমি হারিয়েছো, তা আমিও হারিয়েছি। লড়াইটা আমাদের দু’জনের। কিন্তু আমি তোমার মতো এতোটা এলোমেলো নই। তোমাকে বলছি, নিজেকে সামলাও। এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে তুমি নিজেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। ওদের মোকাবিলা করবে কি করে?

শত্রুকে হারাতে চাইলে প্রথমে নিজেকে শক্তিশালী করতে হবে। শুধু শক্তিশালী না বুদ্ধিমতীও হতে হবে। যুদ্ধে জেতার প্রধান অস্ত্র বুদ্ধি। আমাদের সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। আশা করি তোমাকে বোঝাতে পেরেছি। মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করো। তবে তোমার বুকের অভ্যন্তরে জ্বলতে থাকা এই আগুন নিভতে দিও না কখনো। একটু ধৈর্য ধরো।

নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিয়া। সবই বুঝতে পারে ও। কিন্তু নিজের মনকে শান্ত রাখতে পারে না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে না। ইনায়া বুদ্ধিমতী। এজন্যই সিয়া বলে সবধরনের গুন আছে ইনায়ার মধ্যে। যা সিয়ার মাঝে নেই। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই কিছু আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাঁচে। কেউ কারো মতো নয়। একজন ধীর, স্থির, শান্ত হলে অন্যজন অসামান্য ক্রোধের প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের মতো হয়।

চারপাশে স্নিগ্ধ ভোরের বর্ণোজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ল। ঘুমঘুম চোখে জলাশয়ের কাছে আর্নি চলে এলো। লম্বা একটা হাই তুলে দু’হাতে গায়ের চাদর আঁকড়ে ধরলো। আতংকিত কন্ঠে উচ্চস্বরে ডাকলো,

– সিয়া, ইনয়া!

আর্নির কন্ঠ শুনে দু’জনেই পেছনের দিকে তাকাল। ইনায়া অকপটে জানতে চাইলো,

– কি হয়েছে? এই ভোরবেলা এভাবে চেঁচাচ্ছো কেনো?

– আরেহ! চেঁচাবো না? এই গা হিম হয়ে আসা ঠান্ডায় তোমরা এখানে বসে আছো কেনো?

– গল্প করছি। ভালো লাগছে। তুমিও এসো।

আর্নির শরীর কাঁপতে শুরু করলো। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি বিস্ময়কর প্রকৃতি। কোথাও রোদ, কোথাও বৃষ্টি। এই যেমন কাস্ত্রোরুজে এখন বর্ষাকাল অথচ ইম্যুভিলে ভয়াবহ শীত। ভীষণ অদ্ভুত লাগে বিষয়টা। আর্নি ভাবছিলো। ভাবতে ভাবতেই ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সহসা ক্রিসক্রিংগল আর ক্রিস্তিয়ান এলো। ক্রিসক্রিংগল ওদের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– চলো। তোমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

আর্নির মুখখানা করুণ হয়ে উঠলো। এই বরফ ঝরা ভোরবেলায় প্রশিক্ষণ কি করে করবে? ও বিষণ্ণ বদনে ম্লান কন্ঠে বললো,

– মাস্টার। প্রচন্ড ঠান্ডা এখানে।

আর্নি নিজের বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলো না। তার পূর্বেই কঠিন কন্ঠে ক্রিসক্রিংগল বলে উঠলেন,

– কোনো অজুহাত শুনতে চাইনা। জলদি এসো।

সিয়া আর ইনায়া উঠে দাঁড়াল। দ্রুতপায়ে ক্রিসক্রিংগলের কাছে চলে গেলো। অগ্যতা নিরুপায় হয়ে আর্নিকেও যেতে হলো। কিচকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো ইনায়া। কিচ দৌড়ে বারান্দায় চলে গেলো। পশ্চাদ্ভাগের উঠোনটা বেশ বড়। ক্রিসক্রিংগলের পাশেই ক্রিস্তিয়ান দাঁড়িয়ে ছিলো। তার হাতে চার পাঁচটা কাঠের তলোয়ার দেখা গেলো।

– এতোদিন যাবৎ বাবা র’ক্তক্ষয়ী ধারালো তলোয়ার দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছেন। তাহলে আজ কাঠের তলোয়ার কেনো?

সিয়া বিস্মিত হয়ে ভাবলো। ইনায়ার দু’চোখে কৌতুহল প্রকাশ পেলো। মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো আর্নি। ক্রিসক্রিংগল তার ফারকোটের পকেট থেকে দু’টো সরু কালো কাপড় বের করে আনলেন। অতঃপর শান্ত গলায় বললেন,

– তোমাদের চোখের উপর কালো কাপড় বেঁধে দেওয়া হবে। প্রতিপক্ষের করা আক্রমণগুলো না দেখেই প্রতিহত করতে হবে। নিজেদের শ্রবণেন্দ্রিয় অত্যন্ত সজাগ রাখবে। চোখে না দেখে শুধুমাত্র শব্দ শুনে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমে কাঠের তলোয়ার দিয়ে অনুশীলন করবে। কারন এটা বিপজ্জনক। যখন তোমরা কাঠের তলোয়ার দিয়ে লড়াইয়ে পারদর্শী হয়ে উঠবে, তখন আমি তোমাদের আসল তলোয়ার দিয়ে প্রশিক্ষণ দিবো। বুঝতে পেরেছো?

– জ্বি বাবা।____দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠল সিয়া, ইনায়া। আর্নি মৃদু মৃদু কাঁপতে শুরু করলো। চোখ দু’টো কালো কাপড়ে বাঁধা থাকবে। আঘাতগুলো প্রতিহত করতে না পারলে শরীরে লাগবে। এই ঠান্ডায় আহত হলে তো শরীর থেকে আত্মাই বেরিয়ে যাবে। ভেবে শুকনো একটা ঢোক গিলে নিলো ও।

প্রথমে সিয়া আর আর্নির পালা। ওদের দু’জনের প্রতিপক্ষ ক্রিসক্রিংগল আর ক্রিস্তিয়ান। সিয়া আর আর্নির চোখ বেঁধে দিয়ে ওদের হাতে একটা করে কাঠের তলোয়ার তুলে দিলেন। ইনায়া উচ্ছ্বসিত নয়নে আগ্রহ নিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো।

আর্নির শরীর অবশ হয়ে এলো। কেমন জানি অজানা একটা ভয়। যখন চোখের উপর কালো কাপড় বাঁধা থাকে, তখন তো এমনিতেই অস্বস্তি হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে। কার সাথে কে লড়বে জানা নেই আর্নি আর সিয়ার। ওরা দু’জনে শুধু উৎকর্ণ কানে প্রস্তুত হয়ে রয়।

প্রশিক্ষণ শুরু হলো। আর্নির বিপক্ষে ক্রিস্তিয়ান। আর সিয়ার বিপক্ষে ক্রিসক্রিংগল। সজাগ হয়ে উঠলো সিয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। এটা ওর ঐশ্বরিক ক্ষমতার অংশ। বিপদ বুঝতে পারে ও।

ক্রিসক্রিংগলের করা আক্রমণগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করল। ঘাত কোনদিক থেকে ঘনিয়ে আসছে বুঝতে পেরেও রুখতে পারলো না ও। প্রতিপক্ষের কাঠের তরবারি দ্বারা কয়েকবার আহত হলো সিয়া। দু’চোখের সামনে নিষক কালো অন্ধকার দেখতে পেলো। তিমির অমানিশার কালো ছায়া ওকে গ্রাস করে নিতে চাইলো। সিয়া ডানদিক থেকে ক্রিসক্রিংগলের কন্ঠস্বর শুনতে পেলো,

– ভয়কে জয় করতে হবে সিয়া। দু’চোখের দৃষ্টিকে প্রাধান্য না দিয়ে শ্রবণশক্তিকে প্রাধান্য দাও। মনে করো তোমার প্রতিপক্ষ একজন ভয়ংকর র’ক্তচোষা পি’শাচ।

দপ করে সিয়ার মাথায় ভয়ংকর আগুন জ্বলে উঠলো যেনো। র’ক্তচোষা পি’শাচ শব্দটাকেই অসামান্য ঘৃনা করে ও। প্রখর হয়ে উঠলো ওর শ্রবণেন্দ্রিয়। ডানদিক থেকে একটা আক্রমণ ঘনিয়ে এলো। সিয়ার কাঁধে থাকা ক্রুশচিহ্নটা জ্বলজ্বল করতে শুরু করলো। দেখলো না কেউ। কারন ওর সম্পূর্ণ শরীরটাই এখন শীতবস্ত্রে আচ্ছাদিত।

চলতে থাকলো ঘাত-প্রতিঘাতের যুদ্ধ। আর্নি হাল ছেড়ে দিলো। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার আঘাত পেয়েছে ও। তলোয়ার ফেলে দিয়ে চোখের কালো কাপড় সরিয়ে নিলো। ক্রিস্তিয়ান ওকে সময় দিলো। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিতে বললো। অনুশীলন করে শরীর গরম হয়ে উঠলো। শীত শীত অনুভূত হচ্ছে না আর।

ক্রিস্তিয়ান একটা কাঠের গুড়ির উপর বসল। ক্রিসক্রিংগল আর সিয়ার কাঠের তলোয়ারের দ্বন্দ্বযুদ্ধ উপভোগ করছিলো। ইনায়া পুলকিত নয়নে লড়াই দেখছিলো। সিয়া ইতোমধ্যে বেশ দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। ওর বাবার সাথে সমান তালে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল।

যদিও ক্রিসক্রিংগলের আক্রমণগুলো গুরুতর ছিলো না। প্রথম প্রশিক্ষণেই তিনি খুব বেশি কঠিন পদক্ষেপ নিতে চাইছিলেন না। ধীরে ধীরে আক্রমণ মারাত্মক হবে।

প্রায় আধ ঘন্টা সময় গড়ালো। প্রশিক্ষণে বিরতি দিলেন ক্রিসক্রিংগল। এবার ইনায়ার পালা। সিয়া ঘেমে নেয়ে একাকার। পরিধেয় উলের তৈরী শীতবস্ত্রটা খুলে হাতের উপর রেখে ক্রিস্তিয়ানের পাশে গিয়ে বসলো। ক্রিস্তিয়ান মিষ্টি হাসি উপহার দিলো ওকে। সিয়া নিষ্প্রভ চোখে দেখে। ছেলেটাকে হাসলে বেশ সুন্দর লাগে দেখতে। সিয়ার উজ্জ্বল বাদামী আঁখিদ্বয় কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। ক্রিস্তিয়ানের হাসি উবে গিয়ে মুখখানা বিষণ্ণ হয়ে উঠে।

ইনায়া ক্রিস্তিয়ানের মতোই দক্ষ যোদ্ধা। ওকে করা ক্রিসক্রিংগলের আক্রমণগুলো বেশ গুরুতর ছিলো। কারন ইনায়াকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে। সিয়ার মধ্যে লুকায়িত কোনো শক্তি থেকে থাকলেও ইনায়ার মধ্যে তা নেই। সুতরাং আত্মরক্ষার স্বার্থে বড় মেয়েকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্তিধর করে তুলতে চান ক্রিসক্রিংগল।

★★

প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর অনুশীলন শেষ হলো। ঘড়িতে সকাল আটটা বাজে তখন। ইনায়া তড়িঘড়ি করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। গোসলখানা থেকে হাত মুখ ধুয়ে দ্রুতপায়ে রন্ধনশালার দিকে চলে গেলো। মাদাম ল্যারি একগাল হাসি উপহার দিলেন ওকে। ইনায়া স্মিথ হেঁসে বললো,

– সুপ্রভাত দাদিন।

– সুপ্রভাত ডিয়ার।

ল্যারির পোশাক আর চালচলন বেশ মার্জিত। পরনে অদ্ভুত এক ধরনের পোশাক। কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া ঢিলেঢালা লম্বা ফতুয়া আর স্কার্ট। ইম্যুভিলের অধিকাংশ মহিলাদের পরনে এরকম পোশাক দেখেছে ইনায়া। ফতুয়ার উপর ভেড়ার পশম দিয়ে বানানো শীতবস্ত্র আর মাথায় টুপি পরেছেন ল্যারি।

– অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেলো। আমি দুঃখিত। কি কি রান্না করতে হবে বলুন। বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দিন।

ল্যারি তৃপ্তিদায়ক হাসলেন। মেয়েটা বেশ আন্তরিক। বারণ করা সত্ত্বেও সব কাজ নিজ হাতে করে। মাদাম ল্যারি দ্বিমত করে শাসনের স্বরে বললেন,

– শোনো মেয়ে। মাত্রই অনুশীলন করেছো। এখন গোসল সেরে তৈরী হয়ে নাও। ক্রিসক্রিংগল আজ তোমাদেরকে মার্শাল আর্ট একাডেমিতে ভর্তি করাতে নিয়ে যাবে। ভুলে গেছো তুমি?

– ভুলে যাইনি। দ্রুত রান্না সম্পন্ন করবো। তারপর গোসল করে তৈরী হয়ে একাডেমিতে যাবো। আপনি বলুন না। আমি পারবো। ——— ইনায়া অনুরোধের স্বরে বললো।

– এই অনিন্দ্য সুন্দর গাল দু’টো আগুনের তাপে নষ্ট হতে দেই কি করে? নরম কোমল হাতগুলো তো মলিন হয়ে যাবে। তুমি যাওতো বাছা। গোসল সেরে নাও। আমি পারবো একা হাতে রান্না শেষ করতে।

ল্যারি নাছোড়বান্দা। ইনায়া ব্যর্থ হলো। অগ্যতা নিজের কামরার দিকে পা বাড়ালো। কামরায় প্রবেশ করে সিয়াকে পোশাক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো।

– গোসল করবে? ———- ইনায়ার অকপট প্রশ্ন।

– হ্যাঁ। ওকে ডেকে তোলো। অনুশীলন শেষ করে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে।

ইনায়া বিছানার দিকে তাকাল। আর্নির কাজে বেশ হতাশ হলো। শরীরে ধুলোবালি ছিলো। গোসল না করেই ঘুমিয়ে পড়লো? অন্তত হাত মুখ ধুয়ে নিতে পারতো। ইনায়া আর্নিকে ডেকে সিয়ার সাথে গোসলে পাঠিয়ে দিলো। ওদের গোসল করা শেষ হলে ইনায়া গোসল করতে যাবে। আপাতত বিছানা গোছাতে শুরু করলো।

ফ্রাঙ্কলিনের সাহায্যে স্ট্রিকল্যান্ড কুরী নিজের সাথে করে নিয়ে আসা রুবল থেকে বেশ কিছু রুবল খরচ করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজারে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। ক্রিস্তিয়ান সেখানে চলে গেলো। লোক দিয়ে দোকানটা পরিষ্কার করে জিনিসপত্র গোছাতে হবে। ক্রিসক্রিংগল অবশ্য নিজের জন্য মানসম্মত একটা চাকরি খুঁজে যাচ্ছিলেন। যা দিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণের খরচ যোগাতে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।

—————★

খারকিভ, ওয়াভেল কোট।

কামরা জুড়ে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো অ্যাভোগ্রেডো। তার সামনে রাগান্বিত মুখাবয়বে দাঁড়িয়ে আছে এদুয়ার্দো। হঠাৎ দু’হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল অ্যাভোগ্রেডো। দু’চোখের দৃষ্টিতে অসীম, অফুরন্ত আনুগত্য।নিজের মাথাটা সম্পূর্ণ ঝুঁকিয়ে সে দৃঢ় কন্ঠে বললো,

– অনারেবল ওভারলর্ড। আমি ব্যর্থ হয়েছি। খুঁজে পায়নি ওদের। সেদিন কাস্ত্রোরুজ ছেড়ে যাওয়া তিনটি ফিটনের মধ্যে একটি ফিটনও ফিরে আসেনি। আমি কোনো সূত্র খুঁজে পাইনি। আপনি আমাকে শাস্তি দিন।

– কোন কাজটা তোমাদের দ্বারা সম্পূর্ণ হয়েছে বলো। ——- এদুয়ার্দোর হিংস্রাত্মক শীতল কন্ঠ।

– আমি সব রকম চেষ্টা করেছিলাম।

সহসা দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেলো। অ্যাভোগ্রেডো ত্বরিত উঠে দাঁড়ালো। এদুয়ার্দো অনুমতি দিলো,

– এসো।

কামরায় প্রবেশ করলো ইজাবেল। ওর মুখখানা ভীষণ শুকনো। এদুয়ার্দোর হৃদয় মুষড়ে উঠলো। উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– কি হয়েছে? মুখখানা শুকিয়ে গেছে কেনো?

– আপনাকে একবার একাডেমিতে যেতে হবে। প্রিন্সিপাল দেখা করতে বলেছেন।

– এই তাহলে মন খারাপের কারন?— এদুয়ার্দোর আদুরে কন্ঠ।

ঠোঁট উল্টিয়ে উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো ইজাবেল। এদুয়ার্দো হাসলো। অ্যাভোগ্রেডো মেঝের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো। এদুয়ার্দো শান্ত গলায় বললো,

– তুমি মন খারাপ করো না। আমি যাবো।

ইজাবেল ভীষণ খুশি হলো। এদুয়ার্দোর থেকে অনুমতি নিয়ে কামরার বাইরে বেরিয়ে গেলো। অ্যাভোগ্রেডো তখনো প্রস্তর মূর্তির ন্যায় স্থির দাঁড়িয়ে ছিলো। এদুয়ার্দো গম্ভীর ভরাট কন্ঠে বললো,

– তোমাদের দ্বারা কিছু হবেনা। আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।

————-★

বেলা দ্বিপ্রহর।

খারকিভ শহরের একটি মার্শাল আর্ট একাডেমির প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল সিয়াদের ফিটন। ফিটন থেকে নেমে দাঁড়াল শ্বেতশুভ্র রঙের লম্বা ফ্রক পরিধেয় সিয়া। পেছনে আর্নি আর ইনায়া। হালকা গোলাপী রঙের লম্বা গাউন পরেছে ইনায়া।

আর্নির পরনে মখমলী কাপড়ের কালো রঙের ব্লাউজ আর সোনালী রঙের জর্জেট স্কার্ট। ওদের তিনজনের মুখাবয়ব পাতলা মসৃণ সাদা কাপড়ের নিকাব দিয়ে ঢাকা। গোল গোল চোখে একাডেমির নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো আর্নি। ক্রিসক্রিংগল তাগাদা দিয়ে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠস্বরে বললেন,

– এসো।

তার পিছন পিছন প্রধান ফটক পেরিয়ে একাডেমির একটি ভবনের দিকে এগিয়ে গেলো ওরা। চারপাশে কতশত ছেলে মেয়ে। কারো পরনে নিম্নমানের মলিন কাপড়চোপড় আবার কারো পরনে আভিজাত্যপূর্ণ পোশাক।

বিস্তৃত মাঠের কিছু জায়গায় ছেলে মেয়েরা অনুশীলন করছিলো মার্শাল আর্ট। থেকে থেকে মুখ দিয়ে উচ্চস্বরে অদ্ভুত শব্দ করছে তারা। তাদের হাত আর পায়ের দ্বারা প্রতিপক্ষকে করা আক্রমণে ছিলো অসাধারণ ক্ষিপ্রতা। একে অপরকে ধরাশায়ী করতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। আর্নি শুকনো একটা ঢোক গিলে নিলো। এই একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর না জানি কত মা’র খাবে ও। শরীরের হাড়গোড় গুলো আস্ত থাকলে হয়।

একাডেমির প্রধান দালানের নিচের তলার একটা কামরায় প্রবেশ করলেন ক্রিসক্রিংগল। কামরাটা বেশ বড়সড়। কতগুলো আলমারির মধ্যে যুদ্ধের অসংখ্য সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা ছিলো। টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে একজন মধ্যবয়স্ক লোক কালির সাহায্যে সাদা কাগজে কি যেন লিখছিল। ক্রিসক্রিংগল অনুমতি চাইলেন। স্পষ্ট রুশ ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন,

– ভিতরে আসতে পারি?

লোকটা লেখালেখি বন্ধ করে দিয়ে দরজার দিকে তাকালেন। বয়স পঞ্চাশ হবে হয়তো। ঠিক অনুমান করা যাচ্ছে না। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় ক্রিসক্রিংগলের থেকে বয়সে বড় হবেন। লোকটার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। হয়তো এই মুহূর্তে অন্য কারো উপস্থিতি আশা করেননি। ক্ষণকাল নিশ্চুপ থেকে রাশভারী কন্ঠে বললেন,

– আসুন।

সিয়া, ইনায়া আর আর্নিকে সাথে নিয়ে ক্রিসক্রিংগল ভিতরে প্রবেশ করলেন। এতো বড় কামরায় শুধুমাত্র একজন লোক। দেয়ালে বেশ কয়েকটি পেইন্টিং ঝুলানো ছিলো। একটা ছোট আলমারিতে গাদাগাদি করে রাখা বইপত্র। ওরা তিনজনে সম্পূর্ণ কামরা অভিনিবেশ সহকারে দেখছিল। নাম না জানা বেশ কিছু হাতিয়ার নজরে এলো। সিয়া নিজের অজ্ঞাতেই এক’পা এগিয়ে গেলো সেদিকে। ইনায়া ওর হাত টেনে ধরলো। অনুচ্চস্বরে সতর্ক করে বললো,

– কি করছো? কোথায় যাচ্ছো?

– কিছু না। এমনিই অস্ত্রগুলো কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম।

সিয়া নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। চেয়ারে বসে থাকা লোকটা অন্য একটি চেয়ার দেখিয়ে গম্ভীরস্বরে বললেন,

– বসুন।

ক্রিসক্রিংগল বসলেন। ওরা তিনজন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো।

– আমি এই একাডেমির প্রিন্সিপাল জাস্টিন লিবার্ট। বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?

ক্রিসক্রিংগল নিজের পরিচয় দিলেন। ওদের একাডেমিতে ভর্তি করানোর বিষয়ে কথা বললেন। তার কথা শেষ হতেই প্রিন্সিপাল শান্তস্বরে জানালেন,

– এখানে স্টুডেন্টদের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। তৃতীয় শ্রেণী-নিম্নবিত্ত, দ্বিতীয় শ্রেণী-মধ্যবিত্ত এবং প্রথম শ্রেণী-উচ্চবিত্ত। একাডেমির রুলস অনুযায়ী আপনার মেয়েরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারবে। শ্রেণী অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা আলাদা। এবং প্রশিক্ষণগুলোও ভিন্ন।

এতটুকু শুনেই মনে মনে ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন ক্রিসক্রিংগল। সিয়ার মুখখানা কেমন কঠিন হয়ে উঠল। ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রিন্সিপালের দিকে। ক্রিসক্রিংগল কঠিন কন্ঠে বললেন,

– মার্টিন লরেন্স কি নিজের প্রতিষ্ঠিত একাডেমির জন্যে এরকম অনৈতিক রুলস রেখে গেছেন?

– আপনি তাকে চিনেন? —— বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন জাস্টিন লিবার্ট।

– না। নাম শুনেছি। এই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন লরেন্স। তিনি প্রায় আঠারো বছর ধরে নিখোঁজ। এতটুকু সবাই জানে।

– আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। —— জাস্টিন লিবার্ট গম্ভীর কন্ঠে বললেন।

– বলুন। ——– ক্রিসক্রিংগল প্রত্ত্যুতর দিলেন।

– তৃতীয় এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর স্টুডেন্টদের জন্য একটা সুযোগ থাকে। ওরা নিজেদের দক্ষতা আর বিচক্ষণতা দিয়ে প্রমোশন পেতে পারে। কিন্তু এর জন্য তৃতীয় শ্রেণীর একজন স্টুডেন্টকে দ্বিতীয় শ্রেণীর সবচেয়ে সেরা স্টুডেন্টকে পরাজিত করতে হবে। সেরকমই প্রথম শ্রেণীর সবচেয়ে সেরা স্টুডেন্টকে মার্শাল আর্টে পরাজিত করতে পারলে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্টুডেন্ট প্রথম শ্রেণীতে প্রমোশন পাবে। এটা প্রথম ধাপ। এরপর আরও অনেকগুলো ধাপ থাকবে। সেগুলো সময় হলে জানতে পারবেন। এই শর্তে আপনি কি ওদের একাডেমিতে ভর্তি করাতে রাজি আছেন?

– আমি রাজি। আমার মেয়েদের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।

– ওকে। আমি তাহলে এখনই ওদের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করছি। কিন্তু ওরা কি পড়াশোনা জানে? লিখতে বা পড়তে পারে? বিশেষ করে রুশ ভাষা?

– জ্বি। আমি ওদের তিনজনকে রুশ ভাষা বলতে, পড়তে এবং লিখতে শিখিয়েছি। স্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে ওরা। আমাদের গ্রাম বা আশে পাশে কোথাও কলেজ ছিলো না। তাই আর পড়াশোনা করা হয়নি।

– ঠিক আছে। পাশের কামরায় যান। সব ফর্মালিটিস শেষ করে বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত ক্লাস। চাইলে এখানেই মেয়েদের আবাসিকে থাকতে পারবে ওরা।

– ধন্যবাদ।

একাডেমিতে ভর্তির সকল কার্যক্রম শেষ করে মেয়েদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন ক্রিসক্রিংগল। ভবন থেকে বেরিয়ে মাঠের কিছুদূর পর্যন্ত হাঁটতেই হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেলো তার। তিনি সিয়া আর ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– তোমরা এখানেই দাঁড়াও। আমি এখুনি আসছি।

ক্রিসক্রিংগল পুনরায় ভবনের দিকে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। ইনায়া বিস্মিত হলো। আর্নি আর সিয়া একপা দু’পা করে এগিয়ে যাচ্ছিলো। ইনায়া নিজের সম্বিত ফিরে পেতেই উচ্চস্বরে ডাকলো,

– সিয়া।

পেছন থেকে ইনায়ার কন্ঠ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো সিয়া। আর্নি তখনো হাঁটছিল। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে গিয়ে অসাবধানতাবশত কারো সাথে ধাক্কা খেল। ইনায়া আর সিয়া তখন পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো।

আর্নি চোখ তুলে সামনের দিকে তাকাতেই অসম্ভব সুন্দর একটা মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটার পরনে চোখ ধাঁধানো রাজকীয় পোশাক। মাথায় ছোট আকৃতির সাদা পাথরের ক্রাউন। গাঢ় সবুজ রঙের গাউনে দামী পাথরের কারুকাজ।

– আমি দুঃখিত। অন্যমনষ্ক ছিলাম। —– আর্নি ভীত-সন্ত্রস্ত কন্ঠে বলে।

মেয়েটি অমায়িকভাবে হাসলো। আর্নিকে আশ্বস্ত করে বললো,

– ইট’স ওকে।

মেয়েটার পাশে আরও একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ পেছন দিক থেকে একজন যুবকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

– ইজাবেল।

ইজাবেলের কাজল কালো চোখজোড়া আনন্দে পুলকিত হলো। পেছন ঘুরে দাঁড়াতেই আব্রাহামকে দেখতে পেল। আব্রাহাম ভারী ভারী, থমথমে পায়ে এগিয়ে এলো ইজাবেলের দিকে। মাথা ভর্তি সোনালী চুল, হালকা নীলাভ চোখ আর লাল টুকটুকে ঠোঁটের একজন সুদর্শন যুবক। আর্নি বাকরুদ্ধ হলো। ইজাবেল উচ্ছ্বসিত হয়ে ডাকলো,

– ভাই! ভাই!

ইজাবেল শব্দটা পরপর দু’বার আওড়ালো। নিজের দুই ভাইকে ঠিক কতটা ভালবাসে জানা নেই তার। র’ক্তপিপাসুদের স্বর্গ নেই। স্বর্গীয় সুখ থেকে চিরতরে বঞ্চিত ওরা। কিন্তু ইজাবেল সেকথা বিশ্বাস করে না। তার স্বর্গ আছে। সহোদর দুই ভাই। আছে স্বর্গীয় সুখ। ইজাবেলের থেকে সুখী আর কে আছে এই সমগ্র দুনিয়ায়?

ইনায়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো। নিজের চোখ দু’টোকেও যেনো বিশ্বাস করতে পারছিল না। অনুচ্চস্বরে বললো,

– আব্রাহাম স্যাভেরিন!

সিয়া স্পষ্ট শুনতে পেলো। নিশ্চিত হওয়ার জন্য অকপটে জানতে চাইলো,

– র’ক্তচোষা পি’শাচ? এই সেই শ’য়তান, যে আমাদের মা’কে হ’ত্যা করেছিলো?

ইনায়া উত্তর দিতে পারল না। যেন শক্তহাতে ওর কন্ঠনালী চেপে ধরে আছে কেউ। ভয়াবহ ক্রোধের আগুনে জ্বলে উঠল ওর হৃদপিণ্ড। সেই সাথে জ্বলছিলো শরীরের শিরা-উপশিরা। কিন্তু কোনো ভুল পদক্ষেপ নিলো না ও। অস্পষ্ট স্বরে বিরবিরিয়ে বললো,

– বাবাকে জানাতে হবে। বাবাকে জানাতে হবে, ওরা আমাদের পিছু নিয়ে এখানেও পৌঁছে গেছে।

আর্নি তখনো পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে। একটুও নড়চড় নেই। এর আগে এরকমই একজন সুদর্শন যুবককে দেখে বিমুগ্ধ হয়েছিলো ও। প্রতারিত হয়েছিলো। ওকে ধোঁকা দিয়েছিলো এদুয়ার্দো। এই ছেলে একদম তার মতোই দেখতে। যেন সহোদর জমজ ভাই। তফাৎ শুধুমাত্র মাথার চুল আর দু’চোখের মনিজোড়ায়।

ইনায়া ছুটে যাচ্ছিলো ভবনের দিকে। কিন্তু সিয়া ওর পথ আগলে দাঁড়ালো। ভয়ংকর কঠিন কন্ঠে বললো,

– বাবাকে বলবে না তুমি। জানাবে না কিছু। ঈশ্বরের দোহায়।

ইনায়া স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ওর মস্তিষ্কজুড়ে একটাই প্রশ্ন,

– সিয়া কি করতে চায়?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।