সিয়াদের এল আকৃতির কাঠের দোতলা বাড়ি। উপরের তলায় সরু বারান্দা, নিচের তলায় ছোটখাটো বাগান। বাড়িতে প্রবেশ করার রাস্তাটাও শক্ত কাঠের তক্তা দিয়ে সিঁড়ির মতো করে বাঁধানো ছিলো। রাস্তার একপাশে অসংখ্য বুনোফুল। অন্যপাশ দিয়ে বয়ে গেছে খাল। বাড়ির পশ্চাদ্ভাগে বিশাল উঠান। সামনে রান্নাঘর। তার পেছনে ঝোপঝাড়। পূর্বদিকের অনেকটা জায়গাজুড়ে খামার। বাড়ির আঙিনা ছাড়াও খানিকটা জমি আছে চাষাবাদ করার। যেখানে ব্র্যান্ডিওয়াইন টমেটো, ভুট্টা, আলু, গাজর, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেন সিয়ার দাদা। সাথে বেশ কয়েক জোড়া হাঁস, মুরগি ও কবুতর পোষেন। সিয়ার দাদী বৃদ্ধ বয়সেও মোটা ফ্রেমের চশমা পরে উলের বিভিন্ন পোশাক তৈরি করেন। ইলহামা অ্যালিয়েভ সংসারের সব কাজ শেষ করে শাশুড়ীর কাজে হাত লাগান। ইনায়া সময় পেলেই মা আর দাদীকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে। ক্রিসক্রিংগলের পরিবারের সবাই কোনো না কোনো কাজ করেন। অলস জীবন-যাপন মোটেই পছন্দ নয় তাদের। কিন্তু সিয়াটাই হয়েছে ভিন্ন ধাঁচের।

বৃষ্টি থেমে গেছে বেশ কিছুক্ষন। মাথায় স্কার্ফ পেঁচিয়ে সিয়া বাড়ির সম্মুখ বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। ওর পরনে ছিলো হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হালকা গোলাপী রঙের ফ্রক। সিয়ার হাবভাবে চোরের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সিঁড়ির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। দোতলায় নিজের কামরার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ইলহামা অ্যালিয়েভের কন্ঠস্বর শুনতে পায়,

– সিয়া!

ভয়ে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে সিয়া। অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বলে,

– আর বোধহয় শেষ রক্ষা হলো না।

– বৃষ্টি থেমে যেতেই কোথায় গিয়েছিলে? ___শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করেন ইলহামা অ্যালিয়েভ।

একহাতে পেছনের চুলগুলো স্কার্ফের নিচে লুকিয়ে ফেলে সিয়া। মেকি হেসে বলে,

– এইতো, আর্নিদের বাড়ি।

– ওখানে কেনো গিয়েছিলে?____ইলহামা অ্যালিয়েভের অকপট প্রশ্ন।

– ওর কাছে আমার একটা বই ছিলো মা।

– কিন্তু আমিতো তোমার হাতে কোনো বই দেখছি না!

দু’জনের কথার মাঝখানে ইনায়া এসে দাঁড়ায়। সিয়া বেশ খানিকটা ভড়কে যায়। আমতাআমতা করে বলে,

– আর্নির বইটা পড়া শেষ হয়নি। শেষ হলে ও নিজেই এসে দিয়ে যাবে।

– ওর কথায় ভেজাল আছে মা। দেখুন না কেমন চোরের মতো হাবভাব। এক কাজ করুন। ওর মাথা থেকে স্কার্ফ’টা সরাতে বলুন।

সিয়া দু’হাতে স্কার্ফ চেপে ধরে। শঙ্কিত গলায় বলে,

– স্কার্ফ কেনো সরাবো?

– তাহলে আসল ব্যাপারটা বোঝা যাবে। _____ ইনায়া প্রত্যুত্তর দেয়।

– না, আমি স্কার্ফ সরাবো না।_____ সিয়া তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে।

– স্কার্ফ সরাও সিয়া। _____ইলহামা অ্যালিয়েভ রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলেন।

সিয়া স্কার্ফ সরাতে চায়না। কিন্তু ওর মা টান দিয়ে স্কার্ফ খুলে নেন। ইনায়া চোখ বড় বড় করে তাকায়। ইলহামা অ্যালিয়েভের রাগ তরতরিয়ে বেড়ে যায়। তিনি ক্রুদ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,

– আমার কড়া নিষেধ থাকা সত্ত্বেও তুমি আবারও চুলগুলো কেটে কাঁধ পর্যন্ত করে ফেলেছো?

– লম্বা চুল সামলানো একটা ঝামেলা মা। যতক্ষণে চুল আঁচড়াবো ততক্ষণে একটা বইয়ের দু’টো পৃষ্ঠা পড়ে শেষ করবো। অথচ চুল ছোট রাখলে কোনো ঝামেলা থাকেনা।

– ইনায়ার চুলগুলো কিন্তু হাঁটু ছাড়িয়ে যায়। ও কিভাবে সামলায়?

– আপনার মেয়ে সর্বগুনে গুণান্বিত। আমি তা নই।

এই মেয়েকে কিভাবে বোঝাবেন ইলহামা অ্যালিয়েভ? কমতো শাসন করেন না। তবুও মেয়েটা একরোখা আর জেদিই থেকে যায়। ও যা বলবে, যা করবে তাই সঠিক। বাকিরা সবাই ভুল।

ইলহামা অ্যালিয়েভের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। তিনি রাগ প্রকাশ করে গটগটে পায়ে নিজের কামরার দিকে চলে যান। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে ক্রিসক্রিংগল সবটাই দেখেন। মা-মেয়েদের মধ্যকার কথাগুলোও শুনেন। মনে মনে ভাবেন,

– একটা শেষ চেষ্টা করে দেখি, মেয়েটাকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায় কিনা।

সিয়া ইনায়ার দিকে কটমটে দৃষ্টিতে তাকায়। ইনায়া পাত্তা দেয়না। লম্বা লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যায়। সিয়াও ওর পেছন পেছন নিজের কামরার দিকে চলে যায়।

★★

সিয়ার বিছানার একপাশে কাচের গোল জানালা। কামরার দু’পাশে বড় বড় আলমারি দু’টোতে বইয়ের ঠাসাঠাসি। টেবিলটাও বই-পুস্তকে ভর্তি। যেন সিয়ার কামরাটা’ই একটা ছোট খাটো লাইব্রেরি। মেঝেতে থাকা মাঝারি আকারের লোহার খাঁচাটিতে ছুটোছুটি করছিলো ধূসর রঙের তিনডোরা একটি কাঠবিড়ালি। সিয়া যার নাম রেখেছে কিচ।

মলিন মুখে কামরায় প্রবেশ করে সিয়া। শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয়। টেবিলের উপর পড়ে আছে খয়েরী রঙের মোটা প্রচ্ছদে মোড়ানো একটি পুরাতন বই। দু’দিন হলো বইটা ওর দাদুর পুস্তকশালা থেকে নিয়ে এসেছে ও। বেশ অদ্ভুত দেখতে। ভিতরের লেখাগুলো আরও বেশি উদ্ভুত। রুশ ভাষায় কিসব স্পেলের কথা লিখা। যদিও ওরা ইউক্রেনীয় ভাষায় কথা বলে, কিন্তু ওদের বাবা ক্রিসক্রিংগলের তাগিদে রুশ ভাষাটাও আয়ত্ত করেছে দু’বোন।

সিয়া টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে। বইটা খুলে পড়তে শুরু করে। এরকম আরও কিছু বই আছে উইজার্ড ডিয়েটসের পুস্তক শালায়। জাদুবিদ্যা শিখার বই। অলসতায় শ্রেষ্ঠ হলেও একটা বিশেষ গুন আছে সিয়ার। কোনো কিছু মনোযোগ দিয়ে পড়লে, দেখলে বা শুনলে সেটা ওর মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। কখনো ভুলে যায় না। দাদু ডিয়েটসের বইটা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলো ও। এরই মাঝে দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। বিরক্ত হয় সিয়া। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দরজা খুলে দেয়। বিচলিত ভঙ্গিতে কামরায় প্রবেশ করেন উইজার্ড ডিয়েটস। শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,

– আমার পুস্তকশালা থেকে কোনো বই নিয়ে এসেছিলে?

ভাবুক ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সিয়া। অতঃপর সহাস্যে বলে,

– হ্যাঁ। নিয়ে এসেছিতো। ঐ যে টেবিলের উপর পড়ে আছে এখনো।

একপ্রকার ছোঁ মেরে বইটা টেবিল থেকে তুলে নেন ডিয়েটস। সিয়াকে উদ্দেশ্য করে কঠিন কন্ঠে বলেন,

– আর কখনো এসব বই ছুঁয়েও দেখবে না।

সিয়া বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আজকের আগে ওর দাদু কখনো এভাবে কথা বলেননি ওর সাথে। কি এমন আছে ঐ অদ্ভুত বইটাতে? ও পড়লেই বা কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে?

ডিয়েটস দ্রুতপায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে যান। সিয়া বিছানার উপর দু’পা তুলে আরাম করে বসে। মনে মনে ভাবে,

– যেহেতু ওটা জাদু শিখার বই ছিলো। স্পেলগুলো লিখা ছিলো। স্পেল ব্যবহার করার নিয়ম এবং চিত্রও আঁকা ছিলো। সুতরাং একবার চেষ্টা করে দেখা যাক আমি কিছু পারি কিনা।

সিয়া খাঁচায় দৌড়াদৌড়ি করা কিচের দিকে তাকায়। বইয়ে পড়া একটা স্পেল আওড়ায়। চোখ দিয়ে ইশারা করে মনে মনে বলে,

– কিচ, শুয়ে পড়ো।

সিয়াকে অবাক করে দিয়ে কিচ সাথে সাথে শুয়ে পড়ে। সিয়া হা করে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। পুনরায় মনে মনে বলে,

– কিচ, উঠে দাড়াও।

কিচ উঠে দাড়িয়ে পড়ল। যতক্ষণ সিয়া কিছু না বলে, ও নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রইল।

– কিচ, লাফালাফি করো।

কিচ লাফাতে শুরু করে। এভাবে চলতেই থাকে। ক্ষনকাল সময় গড়ায়। কিচ হাঁপিয়ে গেছে ভেবে সিয়া ওর খেলাটা বন্ধ করে দেয়। কিছু একটা ভেবে খিলখিল করে হাসে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে অনুচ্চ স্বরে বলে,

– বিষয়টা ভীষণ মজার ছিলো।

________★★________

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

আলোয় আলোয় সুসজ্জিত সম্পূর্ণ দুর্গ। তরতাজা সব ফুলের সুবাশে মাতোয়ারা চারপাশ। আজ স্যাভেরিন ক্যাসলের মালকিন পিদর্কা স্যাভেরিনের জন্মদিন। দুর্গের বিশাল হলরুমে উপস্থিত সকল মেহমান। হলরুমের দুপাশে দু’টো সিঁড়ি। বল নাচে উন্মত্ত ছিলো কয়েক জোড়া কপোত-কপোতী। মেয়েগুলোর পরনে ওয়েস্টার্ন পোশাক। ছেলগুলোর পরনে স্যুট, প্যান্ট আর টাই। সোফায় বসে থাকা অতিথিদের হাতে গ্লাস ভর্তি লাল রঙের পানীয়। কেউ কেউ আবার দাঁড়িয়ে থেকে গল্প গুজবে ব্যস্ত।

হঠাৎই চার মেয়েকে সাথে নিয়ে সকলের মাঝে উপস্থিত হন পিদর্কা স্যাভেরিন। মেয়ে ভিক্টোরিয়া, ইজাবেল, হ্যারিয়েট এবং ক্যারলোয়েন। এদের প্রত্যেকের পদবী স্যাভেরিন। চার কন্যা ব্যতীত দু’জন সুযোগ্য পুত্র আছে তার।

হলরুমে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই মিষ্টি একটা হাসি উপহার দেন পিদর্কা স্যাভেরিন। স্বাগত জানান আমন্ত্রিত অতিথিদের। তার মেয়েরা সোফায় গিয়ে বসে। ইজাবেলের চঞ্চল আঁখিযুগল কাকে যেন খুঁজে। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটার দেখা না পেয়ে বেশ হতাশ হয় সে। কিছুক্ষন পর সহসা তার ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝলকানি খেলে যায়। ফ্রন্ট ডোর দিয়ে প্রবেশ করে সুদর্শন একটি ছেলে। প্রথমেই সে পিদর্কা স্যাভেরিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলে,

– হ্যাপি বার্থ ডে আওয়ার অনারেবল এমপ্রেস।

– ধন্যবাদ অ্যাভোগ্রেডো। _____ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

– মাই প্লেজার।

– এতো দেরি করলে যে! তোমাদের ওভারলর্ড কোথায়?

– তিনি ক্যাসলেই আছেন।

– আচ্ছা। আর তোমাদের রুলার? সে কখন আসবে?

– তিনিও এখুনি এসে পড়বেন।

বলতে না বলতেই ফ্রন্ট ডোর দিয়ে আরও একজন সুদর্শন যুবকের আগমন ঘটে। সব মেয়েরা তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিছু কিছু পুরুষ মনে মনে গালিগালাজ করে। অথচ সবাই বুকের কাছে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নত মস্তকে সম্মান জানায় তাকে। পিদর্কা স্যাভেরিনকে উদ্দেশ্য করে অ্যাভোগ্রেডো বলে উঠে,

– ঐ তো রুলার এসে গেছেন।

কালো শার্ট, কালো জ্যাকেট, কালো প্যান্টের সাথে কালো বুট জুতো। আদি অন্ত কালো পোশাকে মোড়ানো দীর্ঘ দেহী, প্রশস্ত বুকের অধিকারী একটি ধবধবে ফর্সা ছেলে পিদর্কা স্যাভেরিনের সামনে এসে দাঁড়ায়। রক্তলাল ওষ্ঠদ্বয়ে নিদারুন হেঁসে পিদর্কা স্যাভেরিনকে জড়িয়ে ধরে। মাথার একপাশে চুমু খেয়ে বলে,

– শুভ জন্মদিন মা।

– আব্রাহাম। আমার বাচ্চাটা।____আদুরে স্বরে ছেলেকে ডেকে উঠেন পিদর্কা স্যাভেরিন। কপালের মাঝখানে সশব্দে চুমু খেলেন।

ছেলেটার হালকা নীল চোখে মায়া ঠিকরে পড়ে। মায়ের প্রতি অগাধ ভালবাসার প্রকাশ পায়। কালো কুচকুচে ভ্রু যুগল নাচিয়ে মায়ের প্রশংসা করে বলে,

– আপনি এখনো আগের মতই অসম্ভব সুন্দরী রয়ে গেছেন।

পিদর্কা স্যাভেরিন সগর্বের হাসি হাসেন। এরই মাঝে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন। প্রথমেই যার চোখ পড়ে ছোট ভাই আব্রাহামের দিকে। বেশ বিরক্ত হয় সে। না চাইতেও দু’জনের পরিধেয় পোশাকের রঙ মিলে গেছে। আব্রাহাম দাঁত কপাটি বের করে হাসে। হুবুহু মিলে গেছে এমনটা কিন্তু নয়। এদের দুজনের মধ্যে মিল হতে হতেও বেশ অমিল থেকে যায়। সাদা শার্টের সাথে এদুয়ার্দো কালো স্যুট পড়েছে। হাতে কালো ঘড়ি। তার লাল টকটকে ঠোঁটের ফর্সা চেহারায় বিরক্তি ঝরে পড়ে। ভ্রু কুঁচকে আসে। দ্রুত পায়ে হেঁটে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।

পিদর্কা স্যাভেরিন দুই ছেলের মাঝে মিল-অমিল খুঁজে পান। অতঃপর ঠোঁট ছড়িয়ে হাসেন।

ওভারলর্ড ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন যখন হেঁটে যায় তখন চারদিক থেকে মেয়েরা তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার মতো সুদর্শন পুরুষ আর একটাও দেখা যায় না। যদিও আব্রাহাম তার মতোই সুদর্শন কিন্তু দু’জনের মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে। এদুয়ার্দোর লম্বা সবল সুগঠিত দেহ আর এমারেল্ড সবুজ রঙের চোখে তাকে সত্যিই ভীষন আকর্ষণীয় দেখায়। মুখাবয়বে থাকা গাম্ভীর্য আর তেজ তাকে অসাধারন করে তুলে। সদ্য কুমারী থেকে শুরু করে বিবাহিত রমনীরা পর্যন্ত তাকে কাছে পেতে চায়। তার দিকে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এদুয়ার্দো যখন কথা বলে তখন মেয়েরা তার একটুখানি দৃষ্টি আকর্ষণের আশায় মরিয়া হয়ে উঠে। ওকে দেখার সাথে সাথে মেয়েদের দেহের শিরায় শিরায় একটা গোপন লালসার কম্পন সৃষ্টি হয়। এদুয়ার্দো তাদের দিকে না তাকালেও মেয়েরা তাদের মুগ্ধ নিরব দৃষ্টিতে অনেক অব্যক্ত কথাই ব্যক্ত করে।

অন্যদিকে, বহুনারীগামি দোষ এবং উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য আব্রাহাম বেশ নিন্দিত। কিন্তু সেটা এমন কিছু দোষের মনে করে না সে। কোনো সুন্দরী মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে মেয়েটাকে যদি পছন্দ হয় তবে তাকে নিয়ে রাত্রিবাস করে। যদি এতে তাকে কেউ লম্পট বলে তো বলুক। তবে বেশ আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার এই বহুনারীগামির কথা জেনেও মেয়েরা তাকে ভালবাসে। মেয়ে মহলে যেমন তার সুনাম। পুরুষ মহলে তেমনি ঘোর বদনাম। উচ্চ পদস্থ কর্মচারী থেকে নিম্ন পদস্থ কর্মচারীদের অনেকেই এই দুই ভাইকে মনে মনে ভীষণ হিংসে করে।

এদুয়ার্দো তার মায়ের এক হাত নিজের একহাতে আলতোভাবে ধরে। করপুটে চুম্বন করে বলে,

– ১৭৫ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা মা।

– আমাকে কেমন লাগছে দেখতে?_____এদুয়ার্দোকে জিজ্ঞেস করেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

– পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী আপনি। আপনার মতো সুন্দরী আমি দ্বিতীয় কাউকে দেখি নি। এখনো আপনাকে ২৫ বছরের যুবতী মনে হয়।

পিদর্কা স্যাভেরিন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কপালে চুমু খেয়ে বলেন,

– আমি আমার থেকেও সুন্দর দেখতে মেয়ে খুঁজে আনবো তোমাদের দু’জনের জন্যে।

আব্রাহাম ফের ঝকঝকে সাদা দাঁতে হাসে। এদুয়ার্দো চোখ রাঙিয়ে তাকায়। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আব্রাহাম বলে উঠে,

– তাহলে অযথা সময় নষ্ট করবেন না মা। কারন আপনার থেকে সুন্দরী রমনী একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

পিদর্কা স্যাভেরিন ছেলের কান টেনে ধরেন। শাসনের স্বরে বলেন,

– আমার সাথে মজা করা হচ্ছে? অসভ্য ছেলে।

– ছাড়ুন মা। সবাই দেখছে।

একগাল হেসে ছেলের কান ছেড়ে দেন পিদর্কা স্যাভেরিন। আব্রাহাম এদুয়ার্দোর পাশে গিয়ে দাড়ায়। গলা ঝেড়ে স্পষ্ট স্বরে বলে,

– অনারেবল ওভারলর্ড। অন্তত আজকের রাতে আপনার একজন শয্যা সঙ্গীনি গ্রহন করা উচিত। লোক জানাজানি হলে সবাই ভাববে আপনার মধ্যে কেনো সমস্যা আছে নিশ্চয়ই।

এদুয়ার্দো বাঁকা হাসে। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,

– যা সহজে পাওয়া যায়, তা গ্রহন করে না ক্লিভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন। ওটা নিতান্তই তোমার স্বভাব। আমার বিছানার সঙ্গী হওয়ার জন্য যোগ্যতা প্রয়োজন। আমি তোমার মতো নই।

আব্রাহাম অপমানবোধ করে। কিন্তু কিছু বলার দুঃসাহস দেখায় না সে। এদুয়ার্দো ফের কথা বলে,

– রক্তের নেশা ব্যতীত পৃথিবীর অন্যকোন নেশা এদুয়ার্দো স্যাভেরিনকে কাবু করতে পারবে না।

– আমিও দেখতে চাই, আপনার এই আত্ম অহমিকা ঠিক কত যুগ ধরে চলে।

কথাটা বলে এদুয়ার্দোকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় সে। ভয়াবহ রক্তচক্ষু নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে ক্লিভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন।

ধীরে ধীরে রাত বাড়ে। স্যাভেরিন ক্যাসলে আয়োজিত জন্মদিনের অনুষ্ঠান জমকালো হয়ে উঠে। কতগুলো মেয়ে আব্রাহামকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। সোফায় বসে থাকা এদুয়ার্দোর দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। এখানে যারা উপস্থিত আছে, তারা সবাই রক্তচোষা পিশাচ। এদুয়ার্দোর শিকারের নেশা জাগে। সে সোফা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। তার দিকে পিদর্কা স্যাভেরিন এগিয়ে আসেন। অকপটে জিজ্ঞেস করেন,

– কোথায় যাচ্ছো?

– শিকারে।___ এদুয়ার্দো শান্ত গলায় বলে।

– তোমার কাছে কিছু চাওয়ার ছিলো আমার।

– একবার বলে দেখুন।

– কাস্ত্রোরুজ থর্প। উইজার্ড ডিয়েটস।

– আব্রাহামকে পাঠিয়ে দিন।

এদুয়ার্দো বাতাসের বেগে হলরুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার মা নিষ্পলক চোখে দেখেন। এদুয়ার্দো দুর্গের বাইরে এসে ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে যায়।

________★★_______

ইম্যুভিল।

মাঝরাত। সম্পূর্ণ বাড়িটায় প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। ঘুম থেকে জেগে উঠেন উইজার্ড ডিয়েটস। গভীর নিদ্রায় বুদ হয়ে আছেন উরসুলা ভনডারলেন। তার অতি সূক্ষ্ম নাক ডাকার শব্দ শোনা যায়। বিছানা থেকে নেমে দাড়ালেন ডিয়েটস। নিঃশব্দ পায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা লন্ঠনটা হাতে তুলে নিলেন। বৃদ্ধ বয়সে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে কষ্ট হয় বলে স্ত্রীকে নিয়ে নিচের তলায় একটি কামরায় থাকেন তিনি। গুটিগুটি পায়ে লন্ঠন হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। ইনায়া তখনো জেগে ছিলো। ফ্রান্সের নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত কবি এবং প্রাবন্ধিক স্যুলি প্রুদোমের “স্টানসান অ্যাট পোয়েমস” কাব্যগ্রন্থটি পড়ছিলো ও। জানালা খোলা ছিলো। ভীষণ মনোযোগ দিয়ে বইটা পড়ছিলো ইনায়া। হঠাৎ বাইরে কিছু একটা পরে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। অন্যমনস্ক থাকায় হোঁচট খেয়েছেন ডিয়েটস। পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়েছেন।পুনরায় হাঁটছেন। ইনায়া খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। লোকটাকে চিনে নিতে সময় লাগলো। চিনে ফেলা মাত্রই উচ্চস্বরে ডাকল,

– দাদু!

উইজার্ড ডিয়েটস সাড়া দিলেন না। হয়তো তিনি শুনতে পাননি। ইনায়া হন্তদন্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। জুতো পড়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো। লন্ঠন হাতে সিড়ি বেয়ে নিচে নামলো। দ্রুতপায়ে হেঁটে বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে গেল। সামনেই ডিয়েটস কে দেখতে পেলো। কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো হেঁটে যাচ্ছেন। কোনোদিকে খেয়াল নেই তার। ইনায়া তার পিছু নিলো। মনে মনে ভাবলো,

– এই মাঝরাতে দাদু কোথায় যাচ্ছেন?

অনেকটা রাস্তা হাঁটার পর পূর্ব দিকের একটি পাহাড়ে উঠতে শুরু করেন ডিয়েটস। পিছন থেকে ইনায়া তাকে বার কয়েক ডাকে,

– দাদু,

তবুও ডিয়েটস শুনতে পেলেন না। অনেকটা দুরে চলে গেছেন। শুধুমাত্র তার হাতে থাকা লন্ঠনের মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারে কাঁটাযুক্ত কতগুলো ঝোপঝাড় পেরিয়ে ইনায়া পাহাড়ের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটায় বেশ হাঁপিয়ে গেছে ও। ওর কানের পাশ দিয়ে ঘামের স্রোত গড়িয়ে পড়ে। কয়েক বার বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। সমস্ত ভয় ডর ভুলে যায় কোনো এক অদম্য কৌতুহলে। উত্তেজনার আধিক্যে কখন পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যায় বুঝতে পারে না ও। যেন কোনো এক ঘোরের মধ্যে ছিলো। সম্বিত ফিরে পেতেই ভয় পেয়ে যায়। সত্যি’ই কি মানুষটা ওর দাদু ছিলো?

লন্ঠনের আলো যতদুর পর্যন্ত পৌঁছেছে ততটুকুই শুধু আলোকিত হয়ে আছে। বাকিটা ঘোর অন্ধকার। ইনায়ার গলা শুকিয়ে আসে। ভীতু ভীতু চোখে এদিক সেদিকে দেখে। খুঁজে ফিরে নিজের দাদুকে। কিন্তু কোথায়ও খুঁজে পায়না। অতঃপর ও দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু আচম্বিতে ওর সামনে কতগুলো ভয়ংকর বাদুর উড়ে আসে। অদ্ভুত শব্দ করে ওকে আক্রমন করে বসে। ইনায়া দু’হাতের আঘাতে বাদুড়গুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। হঠাৎ করে করা এমন আক্রমনে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে আরও কিছু বাদুর উড়ে আসে। দু’পায়ের ধারালো নখের আঁচড়ে ইনায়াকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। সূঁচালো দাঁতে কামড়ে ধরে ওর গায়ে। ইনায়া ভীত কন্ঠে পরপর দু’বার বীভৎস চিৎকার দিয়ে উঠে ডাকে,

– দাদু!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।