কালো রঙের মোটা মলাটের দিনলিপি। মলাট উল্টাতেই প্রথম পাতায় ছোট ছোট অক্ষরে কালি দিয়ে লেখা ফিদেল আলেকজান্দ্রো কাস্ত্রোরুজের নাম। দিনলিপির পাতায় তিনি লিখে রেখে গেছেন দেড়শো বছরের পুরনো ইতিহাস।

আলেকজান্দ্রোর দিনলিপির পরবর্তী পৃষ্ঠা উল্টায় ইনায়া ইবতিসাম। মনের মাঝে দুর্দমনীয় ভয়। মৃদু মৃদু গলা কম্পিত হয়। তবুও ইনায়া পড়তে শুরু করে আবার,,,,,

সময় সর্বদা প্রবাহমান। মানুষ মা’রা যায়। কিন্তু তার অবর্তমানে শূন্য জায়গা কখনো শূন্য পড়ে থাকে না। মৃ’ত মানুষটার শূন্যতা পূরণ করতে নতুন কারো আগমন হয়। তেমনিভাবে ডেভিড যোসেফের মৃ’ত্যুর পর রাজ সিংহাসন বসেন ইউক্রেনের নতুন শাসক বাওলিও স্যাভেরিন। নিমেষেই স্যাভেরিন ক্যাসল থেকে মুছে যায় যোসেফ স্যাভেরিনের নাম। নিজের আপনজন বলতে শুধুমাত্র ছিলো তার একমাত্র ছোট ভাই বাওলিও। যোসেফের স্ত্রী উয়াসওয়াভার নেতৃত্বে বাওলিও ইউক্রেনের নতুন শাসক হিসাবে রাজ সিংহানে বসেন। বিনিময়ে ভাইয়ের অনাগত সন্তানকে নিজের সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি দেন। ঠিক তখন থেকেই ক্যাসলে ঘটতে শুরু করে একের পর এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। প্রতিদিন দুর্গ থেকে একাধিক মানুষ গায়েব হয়ে যেত। পরদিন দুর্গের বাইরে তাদের রক্তশূন্য মৃ’তলাশ পাওয়া যেত। ঠিক যোসেফের মৃ’তদেহের মতো। রক্তশূণ্য ফ্যাকাশে মুখে একজোড়া কুচকুচে কালো ঠোঁট নজরে আসতো।

সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর সম্পূর্ন দুর্গে আতংক ছড়িয়ে পড়তো। দুর্গের চারদিকে ভয়ংকর দেখতে বিশালাকৃতির অসংখ্য বাদুড় আর কতগুলো কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী ঘুরে বেড়াত।তীক্ষ্ণ ধারালো দাঁতের হিংস্র বাদুড়গুলোকে দেখা মাত্রই বুকের ভেতরটাও কেমন হিম হয়ে যেত। উচ্চপদস্থ কর্মচারী থেকে শুরু করে নিম্নপদস্থ কর্মচারী এবং দাস দাসীরা সবাই প্রতিটা মুহূর্তে তীব্র ভয়ে জর্জরিত হয়ে থাকতো। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা কেউই নিজেদের কাজ ছেড়ে দিয়ে দুর্গ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

শুধুমাত্র স্যাভেরিন ক্যাসল নয়, সমগ্র কিয়েভ শহর এবং আশেপাশের গ্রামগুলোতে মানুষের ভয়ংকর মৃ’ত্যু হতে শুরু করে। রাতের বেলা মায়ের অগোচরে তাদের বুক থেকে ছোট ছোট শিশুগুলোকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়। দু-একদিন পর যাদের মাথাহীন দেহ পড়ে থাকতো বাড়ির আনাচে কানাচে বা অন্যকোথাও। মায়েরা নিজেদের সন্তানগুলোকে চিহ্নিত করার সুযোগটুকুও পেত না। আফসোস! তারা ছিলো কতটা হতভাগ্য আর অসহায়। এ এক নিষ্ঠুর,নির্মম ইতিহাস। শিশুদের সাথে অসংখ্য সুন্দরী যুবতীরা হঠাৎই নিরুদ্দেশ হয়ে যেত, যাদের আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যেত না। চারদিকে কেবলই শোনা যেত হৃদয় বিদারক আর্তনাদ আর হাহাকার। যেদিন আকাশে সূর্যের তেজ থাকতো সেদিন শুধু মানুষগুলো বাইরে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজে পেত, কারন ক্রমে ক্রমে তারা বুঝতে পেরেছিলো আকাশে তেজস্বী সূর্য থাকাকালীন তারা সবাই নিরাপদ। এই সূর্যই কয়েক ঘন্টার জন্য তাদের জীবন রক্ষক।

সেসময় কোনো মানুষের এই বীভৎস মৃ’ত্যুর কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানা ছিলো না। কারন মানুষগুলো জানতোও না কিভাবে আর কাদের দ্বারা এই ভয়ানক মৃ’ত্যু হচ্ছিলো। রাতভোর মানুষগুলো নিদ্রাহীন সময় অতিবাহিত করতো। তাদের একমাত্র ভরসা ছিলো ঈশ্বর। মনেপ্রাণে ঈশ্বরের নাম স্বরণ করতো, অথচ অধিকাংশ সময় ভাগ্য ওদের সহায় হতো না। অপার্থিব সৌন্দর্যের কিছু নরনারীর সংস্পর্শে এসে ওরা বশীভূত হতো। অদৃশ্য কোনো আকর্ষণ বলে ওরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেত।

এভাবেই কয়েকটা বছর কেটে যায়। একসময় সবাই জানতে পারে, এই ভয়াবহ মৃ’ত্যুগুলোর জন্য র’ক্তপিপাসুরা দায়ী। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে উয়াসওয়াভা একজন র’ক্তচোষা পি’শাচিনী। ধীরে ধীরে বড় হওয়া তার কন্যা সন্তানটাও র’ক্তচোষা পি’শাচীনি ছিলো।

উয়াসওয়াভা বাওলিওকে বশ করে রেখেছিলো। ত্রিশ বছরের বাওলিওর এক বছরের একটা পু্ত্রসন্তান ছিলো। ছিলো অনিন্দ্য সুন্দরী একজন সহধর্মিণী। কিন্তু বাওলিও ছিলো উয়াসওয়াভার অনুগত। মানুষ হয়েও রক্তচোষা পি’শাচিনীর সব আদেশ নিষেধ পালন করতো। ক্ষমতা আর সিংহাসনের লোভ তাকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিয়েছিলো।

বাওলিও ছিলো পুতুলের মতো। তাকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজের সব উদ্দেশ্য হাসিল করতে শুরু করে উয়াসওয়াভা। কিন্তু বাওলিও বা তার পরিবারকে র’ক্তপিপাসুতে রুপান্তরিত করেনি সে। কারন তার লক্ষ্য ছিলো, যুগযুগ ধরে এভাবেই একজন মানুষরুপী পুতুলকে সিংহাসনে বসিয়ে রেখে ধীরে ধীরে সমগ্র ইউক্রেনে নিজের আধিপত্য ফলাবে। সবগুলো মানুষকে র’ক্তপিপাসুতে রুপান্তরিত করবে। ইউক্রেনের বুক থেকে মুছে দিবে ঈশ্বরের নাম। মুছে যাবে মানুষের অস্তিত্ব। চারদিকে প্রতিধ্বনিত হবে উয়াসওয়াভার জয়জয়কার।

যেখানে শাসক ছিলো র’ক্তপিপাসুদের একান্ত অনুগত। সেখানে সাধারণ প্রজাদের রক্ষা করার কথা কে ভাববে?

উয়াসওয়াভার মেয়ের বাবা কে ছিলো জানতো না কেউ। অনেকেই ধরে নিতো ওটা যোসেফ স্যাভেরিনের ঔরসজাত মেয়ে। আবার কেউ বা প্রচন্ড ঘৃণা থেকে বলতো,ওটা জারজ সন্তান।

ইউক্রেনের এমন একটা শহর বা জায়গা ছিলো না, যেখানের মানুষগুলো র’ক্তপিপাসুদের হিংস্রতার শিকার হয়নি। কিছু কিছু মানুষ নরপি’শাচগুলোর দ্বারা রুপান্তরিত হচ্ছিলো র’ক্তচোষা ভাম্পায়ার।

★________টানা দু’পৃষ্ঠা পড়ে থেমে যায় ইনায়া। প্রচন্ড গলা শুকিয়ে গেছে ওর। একটু পানি পান করা দরকার।

– কি হলো থেমে গেলে কেনো?___বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ক্রিস্তিয়ান। সুদীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস টেন নেয় ইনায়া। আর্নি ভয়াল আতংকে থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করে। ভীত ভীত স্বরে অনুরোধ করে বলে,,,

– আমি আর শুনতে চাই না। দয়া করে বন্ধ করো এসব।

সিয়া দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায়। এখুনি ইম্যুভিলের আকাশে অন্ধকার নেমে আসবে। কিভাবে এতোটা সময় পেরিয়ে গেলো,বুঝতে পারেনা ও। ইনায়া দু’ভ্রু কুঁচকে আর্নির দিকে তাকিয়ে রয়। অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,,,

– এতটা ভীতু কোনো মানুষ হতে পারে? তুমি না মার্শাল আর্ট জানা মেয়ে!

– মার্শাল আর্ট জানা থাকলেই কি হবে? এই যে তুমি একজন ভালো যোদ্ধা। পারবে? র’ক্তপিপাসুদের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে?

– আপ্রাণ চেষ্টা করবো। ___ইনায়া দৃঢ় কন্ঠে বলে।

– এই তুই থামতো। ইনায়া তুমি পড়ো।____ক্রিস্তিয়ান বলে উঠে।

-থাক। ও যখন চাইছে না, ওর শুনতে হবে না। তাছাড়া এখুনি সন্ধ্যা হয়ে যাবে।____সিয়া শান্ত গলায় বলে।

-কিন্তু সিয়া……..।

ইনায়া কিছু বলতে চায়। ঠিক তখনই দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা যায়।

– তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলো সবকিছু।___ সিয়া ব্যতিব্যস্ত কন্ঠস্বরে বলে।

দ্রুতহাতে সবাই মিলে জিনিসপত্রগুলো সব বাক্সের মধ্যে তুলে, বাক্সটা কম্বলের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। ইনায়া দরজা খুলে দেয়। সহাস্যে কামরায় প্রবেশ করেন মাদাম ল্যারি। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,,

– ওহ। তাহলে তোমরা সবাই এখানেই আছো! অনেকক্ষণ হয়ে গেলো কাউকে দেখতে পাইনি। তাই তোমাদের খোঁজ নিতে এসেছি।

ইনায়া স্মিত হাসে। চটপটে কন্ঠে বলে,,,

– জ্বি দাদিন। আপনি বসুন।

– বসতে পারবো না। অনেক কাজ পড়ে আছে। তোমরা গল্প করো। আমি আসি। কেউ অহেতুক বাড়ির বাইরে যাবে না,হুম?

– জ্বি দাদিন। কিন্তু আমিতো বাবাকে সাথে করে নিয়ে আসার জন্য বাজারে যাবো বলে ভাবছি।______ক্রিস্তিয়ান অকপটে বলে।

– তোমাদের দাদু গেছেন। স্ট্রিকল্যান্ডকে সাথে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসবেন।

– আচ্ছা। _____ক্রিস্তিয়ান প্রত্যুত্তর দেয়।

মাদাম ল্যারি ক্রিস্তিয়ানের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সিয়ার দিকে তাকান। সিয়ার সাথে তেমনভাবে কথা বলা হয়নি। মেয়েটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। খুব কম কথা বলে। প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলেনা বললেই চলে। ভীষণ শান্ত প্রকৃতির ও। এ বাড়িতে আসার পর মাদাম ল্যারি কখনো হাসতে দেখেনি ওকে। মাদাম নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন। একবারের জন্য সিয়াকে বুকে আগলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। এতটুকু বয়সে জীবনে সবকিছু হারিয়েছে ও। আরও কতকিছু হারাতে হবে কে জানে। আসন্ন সময়গুলো ওর জন্য খুব কঠিন আর বিপদজনক হয়ে দাড়াবে। ওর জীবন অনিশ্চিত। বাঁচা ম’রা সম্পূর্ণ ঈশ্বরের হাতে। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ডাইনীটা যদি ওর ব্যাপারে জেনে যায়, তাহলে কি হবে?

– আপাতত ওকে একমাত্র ওর বাবাই রক্ষা করতে পারবে।_____মনে মনে ভাবেন মাদাম ল্যারি। তার ভাবনার মাঝেই সিয়া জিজ্ঞেস করে,,,

-আপনি কি কিছু বলতে চান দাদিন?

মাদাম সম্বিত ফিরে পান। চোখের কোণে অশ্রু জমে গেছে। সিয়াকে কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। ওকে শক্ত হতে হবে। থাক না, এখন যেভাবে আছে। এভাবেই ধীরে ধীরে দৃঢ় হোক আরো।

– না। কিছু না।

মাদাম তড়িঘড়ি করে কামরার বাইরে বেরিয়ে যান। সিয়া ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

_____

কিয়েভ,স্যাভেরিন ক্যাসল।

ঘড়িতে রাত আটটা বাজে। কামরার চারপাশে কতগুলো মোমবাতি জ্বলছে। মাথার উপরে সাদা রঙের বৃহৎ ঝাড়বাতি। ঠিক তার নিচেই পিদর্কা স্যাভেরিনের বিশাল কামরায় লম্বা সোফাটার উপর সটান হয়ে সুয়ে আছে আব্রাহাম। দেয়ালে টানানো তৈলচিত্রগুলোর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিলো ইজাবেল। অপ্রত্যাশিত হলেও সত্যি তাদের মা-বাবার অসম্ভব সুন্দর তৈলচিত্রগুলোর মধ্যে একটাতেও ইজাবেল নেই। নেই বাকিরাও। ওরা ছ’ভাই-বোন। কোনো একজনের সাথে বাবা-মায়ের ছবি থাকার কথা ছিলো নিশ্চয়ই। বিষয়টা এদুয়ার্দো আর আব্রাহামও ভাবেনি এমন নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে নিজেদের মা’কে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। যদি তিনি কোনোভাবে কষ্ট পান।

সহসা দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করেন পিদর্কা স্যাভেরিন। ইজাবেল উঠে দাড়ায়। দু’পা ভাঁজ করে মাথা ঝুৃঁকিয়ে সম্মান জানায়। আহ্লাদী কন্ঠে ডাকে,,,

– মা।

পিদর্কা স্যাভেরিন ঠোঁট ছড়িয়ে হাসেন। ত্বরিত সোফা থেকে উঠে দাড়ায় আব্রাহাম। তাকে দেখে কিছুটা বিস্মিত হন পিদর্কা স্যাভেরিন। হতবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,,,,

– তুমি?

– জ্বি। আমাকে দেখে খুশি হননি?__আব্রাহাম অকপটে জিজ্ঞেস করে।

– হ্যাঁ। অবশ্যই। কেনো খুশি হবো না? তোমাদের একসাথে পেয়ে ভীষণ আনন্দবোধ করছি। কিন্তু তোমারতো ওডেসায় থাকার কথা ছিলো। হঠাৎ এখানে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছি।

আব্রাহাম ম্লান হাসে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় তার মায়ের কাছে।
সামনে দাড়িয়ে খুব কাছ থেকে দু’চোখ ভরে দেখে। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে,,,,

-আপনাকে সবসময়ই দেখতে ইচ্ছে করে মা। আপনার আশে পাশে থাকতে ইচ্ছে করে। আপনাকে ভীষণ মনে পড়ে।

পিদর্কা স্যাভেরিন মেকি হাসেন। কোনো কথা বলেন না। দরজার ওপাশ থেকে করাঘাতের শব্দ শোনা যায়। তিনি অনুমতি দেন,,

-এসো।

কামরায় প্রবেশ করে ভিক্টোরিয়া,ক্যারলোয়েন,অ্যালিস,ব্রাংকো আর উড্রো উইলসন। সবাই যে যার মতো সোফায় গিয়ে বসে। পিদর্কা স্যাভেরিন চাঞ্চল্য কন্ঠে ইজাবেলের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেন,,,,

– এদুয়ার্দো কোথায়?

– তিনি নিজের কামরায় আছেন। চলে আসবেন।

ইজাবেল বলতে না বলতেই এদুয়ার্দো চলে আসে। থমথমে পায়ে হেঁটে গিয়ে তার মায়ের সামনে দাড়ায়। রাশভারি কন্ঠে ডাকে,,

-মা।

– এদুয়ার্দো। আমার সাহসী ছেলে। ___প্রাণোচ্ছল হেঁসে আলতো স্পর্শে এদুয়ার্দোর চিবুকে হাত রাখেন পিদর্কা স্যাভেরিন। আবেশ ভরে চুমু খান ছেলের কপালের মাঝখানে। ইজাবেল সবটাই দেখে। ওর খুব মন বিষন্ন হয়। মায়ের তিনজন সন্তানের প্রতি তিন ধরনের আচরণ খেয়াল করে। হৃদয়কোণে নিজের থেকেও বেশি আব্রাহামের জন্য কষ্ট অনুভব হয়। পিদর্কা স্যাভেরিন একটা সোফায় বসে এদুয়ার্দোকেও বসতে বলেন। পরনের গাঢ় মিষ্টি রঙের লম্বা গাউন দু’পাশে ছড়িয়ে রেখে গলা উঁচু রেখে সামনের দিকে তাকান। এদুয়ার্দো তার মায়ের পাশে বসে। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,,,,

– হঠাৎ কেনো ডেকে পাঠিয়েছেন মা?

-খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে তোমার মতামত জানতে চাই।

– হুম। বলুন।

সামনে থাকা মাঝারি আকারের টেবিলের উপর রেড ওয়াইনের বোতল আর কয়েকটা গ্লাস রাখা ছিলো। পিদর্কা স্যাভেরিন ভিক্টোরিয়াকে ইশারায় গ্লাসগুলো তরল দ্বারা পূর্ণ করতে বলেন। ভিক্টোরিয়া দ্রুতহাতে ওয়াইনের গ্লাস থেকে রক্ত ঢেলে বাকিদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ইজাবেল গ্লাস হাতে নিয়ে অল্প অল্প করে রক্ত পান করে। আব্রাহাম গ্লাস হাতে নিয়ে পিদর্কার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়।

– তুমি তো জানো, আমি যেকোন কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রথমে তোমার মতামত জানতে চাই। সেখানে আজকের সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণই তোমার ব্যক্তিগত বিষয়। ইউক্রেনের শাসক ইয়েলোৎসিন মার্টেল একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তার একমাত্র মেয়ের সাথে তোমার বিয়ে দিতে চান।

নিজের কথা শেষ করতে পারেন না পিদর্কা স্যাভেরিন।তার আগেই এদুয়ার্দো ভয়ংকরভাবে রেগে যায়। ক্রুদ্ধ কন্ঠে গর্জন ছেড়ে বলে,,,

-এতোবড় দুঃসাহস কি করে হয় ওর?

– অহেতুক রেগে যাচ্ছো। প্রথমে শোনো।

এদুয়ার্দো পুনরায় কিছু বলতে চায়। কিন্তু পিদর্কা স্যাভেরিন তার একহাত নিজের দু’হাতের মাঝখানে নিয়ে আদুরে কন্ঠে বলেন,,,

– মেয়েটা তোমাকে পছন্দ করে। ভালবাসে তোমাকে। তোমার জন্য স্বইচ্ছায় পি’শাচ সত্তা গ্রহন করতে চায়। সে নিঃসন্দেহে ভীষণ সুন্দরী এবং তোমার জন্য সুযোগ্য পাত্রী।

– ইয়েলোৎসিন বোধহয় নিজের অবস্থান ভুলে গেছে। ওকে মনে করিয়ে দিতে হবে আমি কে। সাথে ওর মেয়েকেও। ___এদুয়ার্দো হিংস্রাত্মক শীতল কন্ঠে বলে।

– তুমি ওদের কোনো ক্ষতি করবে না। বিয়ের প্রস্তাব দিতেই পারে। আচ্ছা,অন্তত এটা বলো। তুমি কি কখনোই বিয়ে করবে না?

– ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিনের জীবন সঙ্গী হওয়া এতোটা সহজ নয় মা। তাকে অবশ্যই বিশেষ হতে হবে। যে সব দিক থেকেই আমার সাথে প্রতিযোগীতা করার ক্ষমতা রাখবে।

– আদৌও কি তুমি এরকম কোনো মেয়ে খুঁজে পাবে? আমি তোমাকে জোর করছি না। তবে অন্তত একবার বিষয়টা ভেবে দেখো। ____পিদর্কা স্যাভেরিন ম্লান কন্ঠে বলেন।

এদুয়ার্দো কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না। ত্বরিত উঠে দাড়ায়। গম্ভীর কন্ঠে বলে,,,

-ভালো থাকবেন মা। আব্রাহাম আর ইজাবেলকে নিয়ে ওয়াভেল কোটে ফিরে যাচ্ছি।

এদুয়ার্দো আর এক মুহূর্তও দাড়ায় না। ধোঁয়ার কুন্ডলী হয়ে কামরার বাইরে বেরিয়ে যায়। পিদর্কা স্যাভেরিনের থেকে বিদায় নিয়ে ইজাবেল আর আব্রাহামও চলে যায়। ওরা চলে যেতেই চিন্তিত কন্ঠে উড্রো উইলসন বলে উঠেন,,,

– এবার কি হবে? এদুয়ার্দো তো রাজি হলো না।

অ্যালিস মুচকি মুচকি হাসে। ও খুব ভালো করে জানতো এদুয়ার্দো কখনো এই বিয়েতে রাজি হবে না। ক্যারলোয়েন আর ভিক্টোরিয়া যদিও বয়সে বড়,কিন্তু ওরা কেউই এদুয়ার্দো আর পিদর্কা স্যাভেরিনের কথার মাঝখানে কথা বলার দুঃসাহস দেখায় না। যমের মতো ভয় পায় এদুয়ার্দোকে। ব্রাংকো নিরব দর্শক। পিদর্কা স্যাভেরিন রাগমিশ্রিত কন্ঠে বলেন,,,,

– এখুনি কামরা থেকে বেরিয়ে যাও।

খুব সুন্দর একটা পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এই মুহূর্তে তাকে একা থাকতে দেওয়া প্রয়োজন। বাকিরা এরকমটাই ভাবে। অতঃপর সবাই কামরার বাইরে বেরিয়ে যায়। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে ঠায় বসে থাকেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

___________

সকাল বেলা। অনেকদিন পর গতকাল রাতে খুব ভাল ঘুম হয়েছে সিয়ার। ঘুম ভাঙ্গতেই ভড়কে যায় ও। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা বেজেছিলো। সিয়াকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় ইনায়া। ঘুম থেকে ডেকে তুলেনি ওকে। কি এমন ক্ষতি হবে যদি একদিন অনুশীলন না করে।

তড়িঘড়ি করে তৈরী হয়ে আটটার দিকে একাডেমির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে ওরা। ক্রিস্তিয়ান সাথে যাবে। আর্নি যেতে চায়ছিলো না। কিন্তু ইনায়া জোর করে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। আজ একটু তাড়াতাড়ি বের হয়েছিলো। যাতে করে সবার পেছনে না দাড়াতে হয়।

সাড়ে আটটার দিকে সিয়াদের ফিটন একাডেমির প্রধান ফটকের সামনে এসে দাড়ায়। ক্রিস্তিয়ান ভাড়া পরিশোধ করে ওদের সাথে মিলনায়তন ভবনের দিকে যায়। ভবনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দাঁড়িয়ে পড়ে সে। ক্রিস্তিয়ান সিয়া আর ইনায়কে উদ্দেশ্য করে বলে,,,

– আমার মাথামোটা বোনটার খেয়াল রেখো। ছুটি হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবো। এখন যাও।

আর্নি ভীষণ মন খারাপ করে। ইনায়া ক্রিস্তিয়ানকে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি উপহার দেয়। খুব ভাগ্য করে এমন ভালো বন্ধু পাওয়া যায়। সবদিকে খেয়াল রাখে। সিয়া পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। পেছনে আর্নি আর ইনায়া। কামরার দ্বারপ্রান্তে দাড়াতেই আজকেও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। সামনের সবগুলো জায়গা দখল হয়ে গেছে। শুধু পেছনে দু’টো সারি ফাঁকা পড়ে আছে।

– এরা কখন একাডেমিতে আসে? এতো তাড়াতাড়ি এসেও পেছনে দাড়াতে কার ভালো লাগে? সামনে দাড়ানোর জন্য কি আমাদের তিনজনকে ভোর ছয়টায় মিলনায়তন ভবনের সামনে লাইন লাগাতে হবে?

– বাদ দাও। চলো ভেতরে যাওয়া যাক।___ সিয়া নিষ্প্রভ কন্ঠে বলে।

আর্নি ভয় পায়। প্রশিক্ষণ দিবে একজন র’ক্তচোষা পি’শাচ,ভাবতেই ওর শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়াবহ আতংকের শীতল স্রোত গড়িয়ে যায়। ফাঁকা জায়গা দিয়ে তিনজনে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করে। কামরাটা বেশ বড়। অনেকগুলো শিক্ষার্থী। সবাই ওদের তিনজনের দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে অনিমেষ তাকিয়ে থাকে। সবার মাঝখানে ডোনার দু’চোখের দৃষ্টি ছিলো প্রচন্ড ক্রুদ্ধ। কে জানে মেয়েটা আজ আবার কোনো গন্ডগোল পাকাতে চাইছে কিনা।

সিয়া,ইনায়া আর আর্নি সবার পেছনে গিয়ে দাড়ায়। একটু একটু করে সময় গড়ায়। অস্বাভাবিক কিছু ঘটে না ওদের সাথে। ঠিক নয়টা বাজতেই ইজাবেল’কে সাথে নিয়ে এদুয়ার্দো কামরায় প্রবেশ করে। ওয়েসলি সামনের সারিতে একটা ফাঁকা জায়গা রেখেছিলো। ইজাবেল মিষ্টি হেঁসে সেখানেই গিয়ে দাড়ায়। যথারীতি ক্লাস আরম্ভ হয়। এদুয়ার্দো শিক্ষার্থীদের শৈলী শিখিয়ে দেয়। আজই তার একাডেমিতে শেষ ক্লাস ছিলো।

এদুয়ার্দোর সাথে শুধু মাস্টার জোডিথ ছিলেন। তিনি কামরার একপাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের গতিবিধি খেয়াল করছিলেন। এমন সময় সিয়ার ডান পাশে থাকা মেয়েটা ইচ্ছে করে ওকে আঘাত করতে চায়। ওর চিবুকের কাছে শক্তপোক্ত একটা মোক্ষম ঘুষি মা’রতে উদ্যত হতেই মেয়েটার হাত ধরে ফেলে সিয়া। মাস্টার জোডিথ খেয়াল করেন সেটা। সহসা কামরার পেছনের দিকটা শোরগোল পড়ে যায়। এদুয়ার্দো ভীষণ বিরক্তবোধ করে। এমনিতেই তার মাথা গরম ছিলো। তন্মধ্যে এই শোরগোল। সে ভারি ভারি পা ফেলে এগিয়ে যায়। সিয়া মেয়েটার একহাত মুচড়ে ধরেছিলো। মেয়েটা করুন কন্ঠে আর্তনাদে করতে শুরু করে। এদুয়ার্দো থমথমে ভরাট কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,,,

-এখানে কি হচ্ছে?

সিয়া তখনো মেয়েটার হাত মুচড়ে ধরে আছে। এদুয়ার্দো ক্রুদ্ধ কন্ঠে উচ্চস্বরে বলে,,,,

– ওর হাত ছেড়ে দাও।

সিয়া হাত ছেড়ে দেয়। মাস্টার জোডিথ সবিনয়ে বলেন,,,

-মহামান্য মাস্টার। আজ এই মেয়েটার কেনো দোষ ছিলো না। ওকে প্রথমে আঘাত করা হয়েছিলো।

– আমার কেনো দোষ নেই। আমি একজন তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্রী। আমাকে ভয় দেখিয়ে এটা করতে বাধ্য করেছিলো ডোনা।____মেয়েটা কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে।

-ডোনা কে?____এদুয়ার্দো জিজ্ঞেস করে।

– এই মেয়েটা মিথ্যা বলছে। আমি কিছু করিনি। অহেতুক আমার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে।___ ভীত-সন্ত্রস্ত কন্ঠে পেছন থেকে কথাটা বলে উঠে ডোনা।

এদুয়ার্দো ওর মন পড়ে নেয়। নিজের রাগটুকু খুব কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রেখে শান্ত গলায় বলে,,,,

– আমার ক্লাসে বেয়াদবি করার শাস্তি অবশ্যই পাবে। তোমাদের দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ হবে। যে জিতবে সে আমার সাথে লড়াই করার সুযোগ পাবে। আর যে হারবে, তাকে আজই এই একাডেমি থেকে বহিষ্কার করা হবে।

ইনায়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। ডােনা প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ওর সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে সিয়া কিভাবে জিততে পারে?ডোনার মুখে ক্রুর হাসি ফুটে উঠে। যুদ্ধে জিততে পারলে সে দু’দিক থেকেই লাভবান হবে। একদিকে কাঙ্ক্ষিত সুদর্শন পুরুষটার সাথে লড়াই করার সুযোগ, অন্যদিকে অসহ্যকর,অসভ্য মেয়েটা একাডেমি থেকে বহিষ্কার হয়ে যাবে।

– ক্ষমা করবেন মহামান্য মাস্টার। আমার একটা বিনীত নিবেদন ছিলো।____সিয়া শান্ত গলায় বলে।

এদুয়ার্দোর ভ্রু কুঞ্চিত হয়। সরু চোখে তাকিয়ে থাকে সে। কিছুদিন যাবৎ সিয়ার থেকে এতো বেশি সম্মান পাচ্ছে, যা একদমই হজম হচ্ছে না তার। যদিও একজন স্টুডেন্ট হিসাবে চিফ মাস্টারকে সর্বোচ্চ সম্মান করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। ও কখনো মন থেকে এদুয়ার্দোকে মানে না। মাস্টার বলে সম্মান করে না। ওর মনের মধ্যে কি চলে এদুয়ার্দো তা খুব ভালো করেই জানে। পছন্দ করে না তাকে। বরং সুযোগ পেলেই হ’ত্যা করবে। এতটাই ভয়াবহ ক্রোধ সিয়ার জ্বলজ্বল বাদামী চোখজোড়াতে।

– মহামান্য মাস্টার অনুমতি দিন।___সিয়া পুনরায় বলে।

– হুম।____এদুয়ার্দোর গম্ভীর কন্ঠস্বর।

– আমি আপনার সাথে তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতে চাই।

ক্লাসে উপস্থিত সকল শিক্ষারর্থীরা উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করে।
সিয়া নিশ্চুপ,নির্বাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়। এদুয়ার্দো রাজি হয়। প্রতিযোগী দু’জন প্রস্তুত হয়ে দাড়ায়। মাস্টার জোডিথ শুরু করো বলার সাথে সাথে ডোনা আর সিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।