ফ্লোরেনসিয়া – ৪২ (প্রথম অংশ)

ইম্যুভিলের আকাশে ক্রমে ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে। দোকানের মালপত্র গুছিয়ে বাড়িতে ফিরে যাওযার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্ট্রিকল্যান্ড কুরী। ক্রিস্তিয়ান গেছে ফিটনের খোঁজে। এমন সময় দোকানে একজন আগন্তুক প্রবেশ করে।

লোকটি বৃদ্ধ। সাদা রঙের আলখাল্লা পরনে ছিলো। স্ট্রিকল্যান্ড বেশ বিস্মিত হন। বৃদ্ধ লোকটির কুঁচকে যাওয়া চামড়ার লম্বাটে মুখখানায় একজোড়া এমারেল্ড সবুজ চোখের মনি দেখতে পান। সূঁচালো নাক আর লাল টকটকে ঠোঁটগুলোও ছিলো ভয়াবহ আকৃষ্ট হওয়ার মতো। লোকটি কুঁজো হয়ে দুর্বল পায়ে হাঁটেন। মুখের কাছে হাত রেখে পরপর দু’বার কেশে উঠেন। স্ট্রিকল্যান্ডের ঘোর কেটে যায়। নড়চড় করে সোজা হয়ে বসেন।

বৃদ্ধ লোকটি অলৌকিক সৌন্দর্যের অধিকারী। নিমেষেই যে কারো হৃদয় বিমোহিত হবে। তার সবল সুগঠিত দীর্ঘদেহ নুয়ে পড়েছে বার্ধক্য জনিত কারণে। লোকটি গলা খাঁকারি দেন। স্ট্রিকল্যান্ড সম্বিত ফিরে পান। ব্যতিব্যস্ত হয়ে একটি কাঠের টুল সামনে এগিয়ে দিয়ে সবিনয়ে বলেন,,,

– আসুন জনাব। বসুন। বলুন, আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?

লোকটি সাবধানে বসেন। শীর্ণ কন্ঠে থেমে থেমে বলেন,,

– আমাকে নতুন নকশার কিছু শীতবস্ত্র দেখাও তো বাছা।

স্ট্রিকল্যান্ডের মন বিষন্ন হয়। সবেমাত্র সবগুলো পোশাক আর শীতবস্ত্র গুছিয়ে রেখেছেন। কয়েকপল সময় গড়ায়। তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে লোকটি ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করেন,,

– কি হলো? দেখাও।

স্ট্রিকল্যান্ড বৃদ্ধের চোখের দিকে তাকান। কিছু একটা বলবেন, এমন সময় লোকটির সবুজ মনির চোখজোড়া থেকে একধরনের অদ্ভুদ দ্যুতি ছড়ায়। স্ট্রিকল্যান্ড আরও গভীর দৃষ্টিতে তাকান। যেন ওগুলো চোখ নয়, মহামূল্যবান সবুজ রত্ন। সবচেয়ে সুন্দর এবং শক্তিশালী এমারেল্ড সবুজ রঙের পান্না পাথর। যা অপার্থিব সুন্দর। মনে হয় এই চোখজোড়ায় লুকিয়ে আছে কোনো দুর্লভ রহস্য। স্ট্রিকল্যান্ড বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন। বশীভূত হয়ে যান। বৃদ্ধ লোকটি তার কপালের মাঝখানে নিজের ডানহাতের চার আঙ্গুল রাখেন। অতঃপর স্ট্রিকল্যান্ডের চোখের মনি জোড়ায় স্পষ্ট কিছু ভিশন দেখতে পান।

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

সূর্যটা ডুবে গেছে পশ্চিম আকাশে। চারদিকে আবছা আবছা অন্ধকার নেমে আসে। ভর সন্ধ্যায়, উইজার্ড ডিয়েটসের বাড়ির সম্মুখ বারান্দায় সোফার উপর বসে আছেন স্ট্রিকল্যান্ড আর সাসোলি কুরী। তাদের সামনে টি টেবিলের উপর দু’কাপ গরম কফি থেকে ধোঁয়া উঠছে। দাড়িয়ে থেকে হেসে হেসে কথা বলছেন ইলহামা অ্যালিয়েভ। অতি সাবধানে পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিচ তলায় নেমে আসেন উরসুলা ভনডারলেন। মলিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,,,

– কখন এলে?

– এইতো একটু আগে। আপনি বসুন।___সহাস্যে বলেন সাসোলি কুরী।

উরসুলা বসেন। ইলহামা রান্না ঘরের দিকে চলে যান। বাকি তিনজনে টুকিটাকি কথা বলতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে বারান্দায় ফিরে আসেন ইলহামা অ্যালিয়েভ। উরসুলার পাশে বসেন। সবাই মিলে গল্প করতে শুরু করেন।

ধীরে ধীরে সময় গড়ায়। তাদের গল্পের মাঝখানেই হঠাৎ করে ঝাঁকে ঝাঁকে অসংখ্য বাদুড় উড়ে আসে। কতগুলো কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করে বাড়ির চারপাশে, উঠোনে। বারান্দায় উপস্থিত থাকা চারজন মানুষের পিলে চমকে যায়। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ত্বরিত দাঁড়িয়ে পড়ে। বাদুড়গুলো তীক্ষ্ণ ধারালো দাঁত খিঁচিয়ে তাদের আক্রমণ করে বসে। পায়ের সূচালো নখ আর দাঁত বসিয়ে আঁচড়ে কামড়ে ধরে।

চারজন মানুষ দু’হাতের সাহায্যে বাদুড়গুলোকে তাড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। কিন্তু অসফল হয়। ভয়! ভয় তাদেরকে দূর্বল করে দেয়। গলা শুকিয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পড়ে। এতোগুলো বাদুড়ের মোকাবেলা করা কিভাবে সম্ভব? বুঝতে পারে এগুলো কোনো সাধারণ বাদুড় নয়, ভয়কর দেখতে বিশালাকৃতির র’ক্তচোষা বাদুড়। কালো কুচকুচে। কি বীভৎস দেখতে! শরীরের র’ক্ত হিম হয়ে আসে। সহসা কালো ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো মানুষের অবয়ব ধারন করে। কয়েকটা অচেনা অজানা চোখ ঝলসে যাওয়ার মতো সুন্দর মুখশ্রী নজরে আসে। মূল্যবান অলংকার আর দামী পোশাক পরিধেয় একজন রমনী আর তিনজন যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। তুষারের মতো শ্বেতশুভ্র মুখখানায় ওরা লাল টুকটুকে ঠোঁটে হাসে। চারজন মানুষ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে।

রমনী আর যুবতী তিনজনের পেছনে চারজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। দৈহিক উচ্চতায় বেশ লম্বা ছিলো ওরা। ব্রাংকো, উড্রো উইলসন,স্যান্ড্রি আর জ্যাসন মিকারলি। রমনী হাত দিয়ে ইশারা করতেই র’ক্তচোষা বাদুড়গুলো দল বেঁধে উড়ে যায় আকাশে। রমনী একপা দু’পা করে এগোয়। যুবতী তিনজন স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

– তোমরা কারা?___শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন স্ট্রিকল্যান্ড কুরী।

রমনী ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে। উরসুলার দিকে তাকিয়ে থেকে মিষ্টি মধুর স্বরে ডাকে,,,

– উরসুলা ভনডারলেন।

উরসুলা বারকয়েক দু’চোখের পল্লব নাড়ান। রমনীকে চেনার চেষ্টা করেন। পরিচিত মনে হয়। হয়তো দেখেছিলেন কোথাও।

– তুমিতো আমাকে চেনো। তোমার অর্ধাঙ্গের হস্তে আমার অর্ধাঙ্গের মৃ’ত্যু হয়েছিলো। এতো সহজে ভুলে গেলে?

উরসুলার দৃষ্টি সরু হয়ে আসে। মনে করার চেষ্টা করেন। অকস্মাৎ বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকান। শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,,,,

– তুমি এখানে? কেনো এসেছো? ডিয়েটসের সাথে কি করেছ?

– ডিয়েটস এখনো জীবিত। সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসবে। যদি তুমি বলো, বই,পাথর আর তলোয়ারটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সে?____পিদর্কা সহাস্যে বলেন।

– আমি জানিনা।___উরসুলার দৃঢ় কন্ঠ।

– উরসুলা! বলো, ওগুলো কোথায় আছে?

– জানি না। যদি জানতাম, তবুও তোমাকে বলতাম না।

স্ট্রিকল্যান্ড আর সাসোলি কুরী ভীত চোখে একে অপরের দিকে তাকান। ইলহামা হতবাক চোখে দেখেন। তিনি নিশ্চিত হন, এই রমনী রক্তচোষা পিশাচিনী। যার নির্দেশে ডিয়েটসকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

– শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি। বলে দাও।___পিদর্কা রাগমিশ্রিত কন্ঠে বলেন।

– বলবো না।____উরসুলা নাছোড়বান্দা। কিছুতেই বলতে চান না।

– ঠিক আছে। তাহলে ম’রো। স্ব পরিবারে স্বর্গীয় বাসিন্দা হও।

পিদর্কা ক্যারলোয়েন আর ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকান। চোখ দিয়ে ইশারা করেন। ঝড়ের বেগে সাসোলি কুরীর কাছে ছুটে যায় ক্যারলোয়েন। কাছাকাছি দাড়ায়। লোলুপ দৃষ্টিতে দেখে। রক্তের স্বাদ গ্রহন করার তীব্র লালসা ডাইনিটার চোখে। ভিক্টোরিয়া কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী হয়ে ছুটে গিয়ে ইলহামার গলা চেপে ধরে। লকলকে জিব বের করে ঠোঁট ভেঁজায় সে। চোখে মুখে হিংস্র, ক্রুর অভিব্যক্তি ফুটে উঠে। লাল টুকটুকে ঠোঁটের দু’পাশ থেকে দু’টো সাদা ঝকঝকে তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত বেরিয়ে আসে।

– স্ট্রিকল্যান্ড, সিয়ার কামরায় রসুনের মালা আর কাঠের গজাল রাখা আছে। জলদি নিয়ে আসুন।____ইলহামা উচ্চস্বরে বলেন।

ভিক্টোরিয়া তাকে ছুঁড়ে ফেলে দুরে। উরসুলা চিৎকার দিয়ে উঠেন। স্ট্রিকল্যান্ড কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইলহামাকে ছুঁড়ে ফেলতেই দৌড়ে যান সিঁড়ির দিকে। কয়েক ধাপ উপরে উঠার পর তার পথ আগলে সামনে দাড়ায় উড্রো উইলসন। বিশ্রি ভঙ্গিমায় দাঁত খিঁচিয়ে হাসে। পিদর্কা স্যাভেরিন বাকি ভাম্পায়ারদের সবগুলো কামরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখার নির্দেশ দেন।

ব্রাংকো, স্যান্ড্রি আর জ্যাসন দোতলায় পৌঁছে যায়। সবগুলো কামরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে। উরসুলা কেমন জ্ঞানশূন্য বোধ করেন। মনে প্রাণে ঈশ্বরের নাম জপতে থাকেন। ছুটে যান ইলহামার কাছে। পিদর্কা স্যাভেরিন প্রশান্তিময় হাসেন। ক্যারলোয়েন ঠোঁট ছোঁয়ায় সাসোলির ঘাড়ে। জোঁকের মতো কামড়ে ধরে চুক চুক করে রক্ত পান করে।

সাসোলি মৃদু আর্তনাদ করে উঠেন। শরীর অবশ হয়ে আসে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। নীরবে নিভৃতে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেন। দু’চোখের সামনে সন্তানদের নিষ্পাপ, স্নিগ্ধ হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো ভেসে উঠে। অথচ মৃ’ত্যু তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাচ্চা দু’টোকে শেষ বারের মতো দেখার ইচ্ছে। যা আর কখনো পূরণ হবে না। সাসোলী ক্ষীণ স্বরে ডাকেন। বুজে আসা চোখে ব্যথাতুর কন্ঠে বলেন,,,

– স্ট্রিকল্যান্ড, পালিয়ে যাও। ক্রিস্তিয়ান আর আর্নিকে দেখো।

স্ট্রিকল্যান্ড পেছন ফিরে দেখেন। সাসোলির দেহের সবটুকু রক্ত শুষে নেয় ক্যারলোয়েন। তৃপ্তি ভরে র’ক্ত পান করে মেঝেতে ফেলে দেয় তার রক্তশূন্য মৃতলাশ। স্ট্রিকল্যান্ড স্তম্ভিত। তার মুখখানা মাত্রারিক্ত ফ্যাকাশে হয়ে যায়। দৃষ্টির সম্মুখে ঘটা সবকিছুই কেমন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।

অ্যালিসের দাঁত নিশপিশ করে। আদেশের অপেক্ষায় থাকে ও। উড্রো উইলসন স্ট্রিকল্যান্ডের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। সহসা আরও একটি কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়ে আসে। শুরু হয় প্রলয়ঙ্কারী ঝড়। দমকা বাতাস বয়। বাড়ির জিনিসপত্রগুলো সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। কালো ধোঁয়ার কুন্ডলীটা ছ’ফুট উচ্চতার একজন সুদর্শন যুবকে রুপান্তরিত হয়। পরনে রাজকীয় পোশাক। হালকা নীলাভ চোখ আর সোনালী চুলের যুবকটা ছিলো ভয়াবহ সুন্দর দেখতে। যেন কোনো স্বর্গীয় রাজপুত্র দাঁড়িয়ে। যার মুখখানায় ভয়াল হিংস্রতা ফুটে উঠে। ছুটে যায় ইলহামার কাছে। একহাতে চুলের মুঠি খামচে ধরে ইলহামাকে দাঁড় করায় সে। উরসুলা বাঁধা প্রদান করেন। কিন্তু বলশালী একজন যুবকের অসীম শক্তির সাথে পেরে উঠেন না। ছিটকে পড়েন মেঝেতে। পিদর্কা স্যাভেরিন উরসুলাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে বলেন,,,

– আমার ছোট ছেলে। আব্রাহাম স্যাভেরিন। চিনতে পেরেছ ওকে?

উরসুলা বিস্ফোরিত চোখে দেখে। আব্রাহাম ক্রুর হাসে। ঠোঁট চেপে ধরে ইলহামার ঘাড়ে। তীক্ষ্ণ ধারালো শ্বদন্ত বসিয়ে রক্ত পান করে।

– কেউ যেন বাঁচতে না পারে।___পিদর্কা ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলেন।

অনুমতি পেয়ে উরসুলাকে নিজের শিকার বানায় অ্যালিস। উড্রো উইলসনের রাক্ষুসে শ্বদন্ত দু’টো স্ট্রিকল্যান্ডের ঘাড়ের চামড়া ভেদ করে রক্তনালীতে গিয়ে পৌঁছে। তীব্র ব্যথায় কুকিয়ে উঠে বেচারা। এইতো আর কিছুক্ষণের মধ্যে মৃ’ত্যুর দোড়গোড়ায় পৌঁছে যাবে। শরীরে অসাড় হয়ে আসে। ইলহামার প্রাণহীন মৃ’তদেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। সোফার পাশে। চোখ দু’টো খোলা। ওষ্ঠদ্বয় কালচে বর্ণ হয়ে গেছে। অ্যালিসের হিংস্রতার শিকার হয়ে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বৃদ্ধা উরসুলা মৃ’ত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্ট্রিকল্যান্ড নিভু নিভু চোখে দেখেন। শ্বাস অবরোধ হয়ে আসে। নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় না। ম’রে গেছে ভেবে তাকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ির উপর ফেলে দেন উড্রো উইলসন।

স্ট্রিকল্যান্ড মা’রা যাননি। তখনো জীবিত ছিলেন। কিন্তু অচেতন হয়ে যাওয়ায় সেদিন রাতের পরবর্তী ঘটনাটুকু স্মৃতিতে ছিলো না তার। বৃদ্ধ লোকটি এদুয়ার্দো ছিলো। সে স্ট্রিকল্যান্ডের চেতনা ফিরে আসার পরবর্তী ঘটনাটুকু জানতে চায়। কিন্তু বাইরে থেকে ক্রিস্তিয়ানের কন্ঠস্বর শুনতে পায়,,,,

– বাবা, বাইরে ফিটন দাঁড়িয়ে আছে। একটু তাড়াতাড়ি এসো।

ক্রিস্তিয়ানের ডাক শুনতে পেয়ে স্ট্রিকল্যান্ডের হুশ ফিরে আসে। তিনি চোখের পলক ফেলে বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকান। ম্লান কন্ঠে সবিনয়ে বলেন,,,,

– ক্ষমা করবেন। আমি ভীষণভাবে দুঃখিত। দোকান বন্ধ করে বাড়িতে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।

এদুয়ার্দো তার কথাটুকু শুনেছে কি না কে জানে। যন্ত্রমানবের মতো বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে পড়ে সে। এলোমেলো পায়ে হাঁটতে শুরু করে। যেন কোনো দিকে খেয়াল নেই তার। স্ট্রিকল্যান্ড হতবাক। বয়োজ্যেষ্ঠ কি কষ্ট পেলেন? তিনি মনে মনে ভাবেন। জোর গলায় ডাকেন,,,

– জনাব। আপনি বসুন। আমি না হয় কিছুক্ষণ পর বাড়িতে যাবো।

এদুয়ার্দো দাড়ায় না। দোকানের বাইরে বেরিয়ে যায়। কঠোর ব্যক্তিত্বের পুরুষটা কেমন অসহায় বোধ করে। ক্রিস্তিয়ানকে পাশ কাটিয়ে ম্যানহোল বরাবর হাঁটতে থাকে সে। তার মন চঞ্চল হয়ে উঠে। বুকের ভেতরে খচখচানিটা বাড়ে। নিঃশ্বাস আঁটকে আসে। রক্তপিপাসুদের মহারাজ এতোটা দুর্বল? নাকি সে সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়?

বক্ষস্থলে থাকা হৃদপিণ্ড’টা বাজে ভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। পায়ের নিচে অথৈয় শূন্যতা অনুভব করে। মাকে ঘিরে তৈরী করা বিশ্বাসের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। মাটির সাথে মিশে যায়। তবুও হৃদয়ের এক কোণে ক্ষীণ আশা জন্মায়। মন বলে, এসব দুঃস্বপ্ন। সবকিছু মিথ্যা। যা দেখেছ, সব ভুল। চোখের ভ্রম।

ক্যারলোয়েন আর ভিক্টোরিয়াকে সে বিন্দুমাত্র পছন্দ করে না। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে ওদের সাথে কথা বলে না। দেখতেও ইচ্ছে করে না। অকস্মাৎ দেখা হয়ে গেলে তুচ্ছ অবজ্ঞা করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ওরা ইচ্ছে করে দেখা করতে চাইলে বারণ করে দেয়। এদুয়ার্দোর বোন হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই ওদের। কারণ ওরা নিষ্ঠুর, নির্মম। ওদের করা অপরাধের শেষ নেই। কিন্তু আব্রাহাম? বাইরে থেকে যতই রাগ দেখাক এদুয়ার্দো, নিজের ছোট ভাইকে এক মুহূর্তের জন্যও শত্রু ভাবেনি কোনোদিনও। ভালোবাসে কিনা তা নিজেও জানে না, কিন্তু আব্রাহামের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ববান ছিলো। কতশত ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে সে। কিন্তু শোধরায়নি ও। শোধরাবে না কোনোদিনও। শেষ পর্যন্ত কিনা ফ্লোরেনসিয়ার মাকেও মে’রে ফেললো?

এদুয়ার্দো এলোমেলো পায়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটে। সবকিছু মেনে নিতে পারলেও নিজের মায়ের করা অপরাধ মেনে নিতে পারে না সে। রাস্তার পাশে কংক্রিটের বানানো আসনের উপর বসে। তাহলে কি সেনাধ্যক্ষ থমাস কিম্বার্লির অভিযোগও সত্যি ছিলো? প্রতিনিয়ত ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য সুন্দরী যুবতী নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনেও কি তার মা দায়ী? মৃ’ত্যুর আগে জেলেনস্কি নামের ঐ অসভ্যটাও কিয়েভের একটি ক্যাসলের কথা বলেছিলো।

কিম্বার্লির কথাগুলো এদুয়ার্দোর কানে কানে বাজে। একসময় শ্রবণেন্দ্রিয় ভোঁতা হয়ে আসে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপ্সা মনে হয়। যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। বক্ষস্থলে দুর্দম্য পীড়া অনুভব করে। এতোটা অসহায়!! র’ক্তপিপাসুদের ওভারর্লড এভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে?

গতকাল রাতে ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে আক্রমণ, পিদর্কা স্যাভেরিনের সব জেনে যাওয়া, ইজাবেলের থেকে জানতে পেরেছে কথাটা বলা, এদুয়ার্দোর কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়। এ সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনো ভাবে তার মা সম্পৃক্ত ছিলো।

এদুয়ার্দো দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে। তার বুকের অভ্যন্তরে বয়ে যায় ভয়ংকর ঝড়। বড় বড় নিঃশ্বাস নেয় কিছুক্ষণ। অশান্ত হৃদয়টাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। শক্ত হতে হবে তাকে। সত্যি যত বেশি তিক্তই হোক, তার সম্মুখীন হতে হবে। এতো সহজে ভেঙ্গে পড়বে না সে। প্রয়োজনে আরও হিংস্র হয়ে উঠবে। বিশ্বাস ভাঙ্গার শাস্তি পাবে প্রত্যেকে। বাদ যাবে না তার মাও, যদি না সে নিজের করা অপরাধের যুক্তিযুক্ত কারণ দেখাতে পারে। কেনো তার এই নির্মমতা? কেনো এই অচেনা অজানা বিধ্বংসী রুপ? এর পেছনে কি কোনো যন্ত্রণাদায়ক রহস্য লুকিয়ে আছে?

রহস্য যাই থাকুক। নিজের সন্তানের কাছ থেকে সত্যি লুকানো, বিশেষ করে সাম্রাজ্যের মহারাজের অগোচরে কিছু করা অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এমন অপরাধ তার মা জেনে বুঝে কিভাবে করতে পারে?

এদুয়ার্দো অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব করে। স্বর্গীয় দেবীদের মতো পূজনীয় মা’য়ের সম্পর্কে এত বড় সত্যি জেনে একজন সন্তানের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে? তার এই বিশ্বাস ভঙ্গ করার শাস্তি কি? বাকিদের মতো কি তাকেও মৃত্যুদন্ড দেওয়া উচিত? এদুয়ার্দো মনে মনে ভাবে। কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় সে। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ একজন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে,,,,

– না। একজন মা যত বড় অপরাধীই হোক না কেনো, কোনো সন্তান তাকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারে না। কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি তাকে অবশ্যই পেতে হবে। নিজের করা অন্যায়ের কৈফিয়ত দিতে হবে।

অসামান্য রাগে এদুয়ার্দোর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। রাগ দমাতে না পেরে দু’চোখ বুজে ফেলে। কিছুক্ষণ স্থির বসে থাকে। অতঃপর ধোঁয়ার কুন্ডলী হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।