মুখের উপর তুলতুলে কিছুর স্পর্শ পেয়ে সিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল। কিচ নিজের লেজ দিয়ে ওর মুখে সুরসুরি দিচ্ছিলো। সিয়া চোখ মেলে তাকাল। মশালের আলোয় আলোকিত গুহার চারদিকে নজর বুলাল। ক্ষণকাল নির্বাক চোখে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করল এখন কোথায় আছে ও। সহসা রাতের ঘটনা মনে পড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতে গিয়ে সারা শরীরে ব্যথা অনুভব করল। ক্ষীণস্বরে ডাকল,

– কিচ!

কিচ দৌড়ে এসে ওর কোলে চড়ে বসল। গুহার দরজার কাছে এদুয়ার্দো দাঁড়িয়ে ছিলো। মেয়েটার ঘুম ভেঙ্গে গেছে বুঝতে পেরে গুহার ভিতরে প্রবেশ করল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে সিয়ার দৃষ্টি আঁটকে গেল। এলোমেলো চুল, একজোড়া এমারেল্ড সবুজ চোখের নজরকাড়া সুদর্শন যুবকটাকে দেখে সিয়া দ্বিতীয় বারের মতো থমকাল। পরমুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো। মানুষটার মাঝে কিছুতো আছে, যা ওর দু’চোখে ঘোর লাগিয়ে দেয়। ভয়াবহ গম্ভীর অথচ অলৌকিক সুন্দর।

সিয়া এদুয়ার্দোর দিকে পুনরায় তাকানোর সাহস পেল না। মেঝের দিকে দৃষ্টি রেখে মৃদুস্বরে বলল,

– ভোর হয়ে গেছে? আমি কি সারা রাত এখানেই ছিলাম?

এদুয়ার্দো ওর প্রশ্নের উত্তর দিল না। সিয়ার রাগ হলো। ভীষণ অপমানবোধ করল। মনে মনে ভাবল,

– এতো কেনো ইগো লোকটার? কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেওয়ার সহবত টুকুও কি শিখেননি তিনি?

এদুয়ার্দো সরু চোখে তাকাল। সিয়ার মনে মনে বলা কথাটুকু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিল। কিচ লাফ দিয়ে মেঝেতে নেমে দাঁড়াল। চৌকির নিচে প্রবেশ করে শব্দ করে উঠল। সিয়ার মনে হলো, কিচ ওকে কিছু দেখাতে চাইছে। ও নিচু হয়ে চৌকির নিচে উঁকি দিতে যাবে, কিন্তু তার আগেই এদুয়ার্দোর গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতে পেল,

– সোজা হয়ে দাড়াও।

সিয়া অবাক হয়। কপট রাগ মিশ্রিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– আপনার সমস্যা কি?

এদুয়ার্দো কথা বলেনা। গতকাল রাতের কথা ভাবে।

তখন রাত বারোটা বাজে। পাহাড়ের চূড়া থেকে সরাসরি গুহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। ভিতরে মশাল জ্বলতে দেখে ভেবেছিলো গুহায় ভিতরে হয়তো কোনো মানুষ থাকবে। এদুয়ার্দোর ভাবনা সঠিক ছিলো। সে গুহার ভিতরে প্রবেশ করতেই একজন সুঠাম দেহের লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। লোকটা প্রথমে তাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভীত ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলো,

– কে তুমি?

– ভয় পাবেন না। আমি কাস্ত্রোরুজ থর্পের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। আপনি কি কোনোভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারবেন?

এদুয়ার্দোর কথা শুনে লোকটা একগাল হাসল। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

– ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আমিও সেই গ্রামেই থাকি। আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাও। আগামীকাল সকালে তোমাকে সাথে নিয়ে কাস্ত্রোরুজ থর্পে যাবো।

এদুয়ার্দো দুরুক্তি করল না। একটা চারকোণা পাথরের উপর বসে পড়ল। দু’চোখ বুজে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ সময় গড়াল। লোকটার মনে হয়েছিল ছেলেটা ঘুমিয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে এদুয়ার্দোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। একটা ঝকঝকে ধারালো ছুরি এদুয়ার্দোর গলায় চেপে ধরে বলল,

– বাঁচতে চাইলে তোর কাছে যা কিছু আছে সবকিছু আমাকে দিয়ে দে।

চট করে চোখ মেলে তাকাল এদুয়ার্দো। বুঝতে পারল লোকটা লুণ্ঠনকারী হয়তো। নতুবা তাকে একা পেয়ে সুযোগ নিতে চাইছে।

– সবকিছু দিয়ে দিলে প্রাণে বেঁচে যাবো?___ এদুয়ার্দো ভীত স্বরে জিজ্ঞেস করল।

– হ্যাঁ।________ থমথমে কন্ঠে লোকটা উত্তর দিলো।

অকস্মাৎ এদুয়ার্দোর চোখজোড়া আরক্তিম হয়ে উঠল। সবুজ মনি দু’টো রক্তবর্ণ ধারন করল। লোকটা ভয়াবহ চমকালো। এদুয়ার্দোর থেকে দু’কদম পিছিয়ে গেলো। হাত থেকে ছুরিটা মেঝেতে ছিটকে পড়লো।

এদুয়ার্দো ভয়ংকর হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল। গর্জন ছেড়ে বলল,

– আমিতো কোনোদিনও মরবো না। কিন্তু তুই প্রাণে বাঁচবি না।

লোকটা গুহার দরজার দিকে ছুটতে শুরু করল। এদুয়ার্দো চোখের পলকে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটা কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

– কে তুমি?

– পি’শাচ। র’ক্তচোষা পি’শাচ।

এদুয়ার্দোর লাল টকটকে ঠোঁটজোড়ার ফাঁক গলিয়ে তীক্ষ্ণ ক্ষুরের ন্যায় ধারালো শ্বদন্ত বেরিয়ে এলো। লোকটার আত্মা শুকিয়ে গেল। সে দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল। এদুয়ার্দো মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলল। ঘাড়ে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল। লোকটা ছটফট করতে শুরু করলো। এদুয়ার্দোর তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত দু’টো তার রক্তনালিতে গিয়ে পৌঁছাল। শুষে নিতে থাকল শরীরের সমস্ত রক্ত। ধীরে ধীরে লোকটা নিস্তেজ হয়ে গেল। এদুয়ার্দো তৃপ্তি ভরে রক্ত পান করল। একসময় লোকটার প্রাণহীন দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

এদুয়ার্দো শিস দিয়ে ডাকল। ঝাঁকে ঝাঁকে কতগুলো বাদুড় উড়ে এলো। কামড়ে ধরল লোকটার প্রাণহীন দেহ। অবশিষ্ট রক্তটুকু পান করে লোকটার চেহারা ফ্যাকাশে করে তুলল। তারপর উড়ে গিয়ে ঝুলে রইলো পাথুরে চার দেয়ালে। এদুয়ার্দো লোকটার মৃতদেহ চৌকির নিচে রাখে। মশালগুলো নিভিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ গুহাটা অন্ধকার করে ফেলে। কারন র’ক্তচোষাদের অন্ধকার ভীষণ প্রিয়।

– আপনি কি কানে কম শুনেন?______উচ্চস্বরে বলে উঠে সিয়া।

এদুয়ার্দোর ভাবনার ছেদ ঘটল। সিয়ার করা প্রশ্নে ক্রোধিত হল। রাগান্বিত কন্ঠস্বরে বলল,

– এখনই বেরিয়ে যাও গুহা থেকে।

সিয়া বিস্মিত হল। কথাটা ওর গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো লাগল। হঠাৎই রেগে গেল যেন। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কিচকে কোলে তুলে নিয়ে গুহার দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। হুশে ফিরে এলো এদুয়ার্দো। মেয়েটা যদি চলে যায় তাহলে সে কাস্ত্রোরুজ থর্পে কিভাবে পৌঁছাবে?

– দাড়াও।

সিয়া দাঁড়াল না। কথাটা শুনেও শুনতে পেলে না যেন। একমনে এক ধ্যানে হাঁটতে লাগল ও।

– আই সেড্ স্টপ।

সিয়া তবুও থামল না। এদুয়ার্দোর রাগ বেড়ে গেল। ঝড়ের বেগে সিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। একহাতের কনুই ধরে সিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। কিচ ভয় পেয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলো। সিয়া খেয়াল করে দেখল ছেলেটার সবুজ চোখের মনির দু’পাশের সাদা অংশটুকুতে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।

– তোমাকে দাঁড়াতে বলেছি আমি। শুনতে পাওনি?

– শুনতে বাধ্য নই আমি।

এদুয়ার্দো সিয়ার কনুইয়ের চামড়া ছিলে যাওয়া অংশটুকু সজোরে চেপে ধরল। সিয়া করুন স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। এদুয়ার্দো কঠিন কন্ঠে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। এই মেয়েটাকে তার প্রয়োজন।

– ওভারলর্ড এদুয়ার্দোকে কিনা তুচ্ছ একটা মেয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে!

ভাবতেই উইজার্ড ডিয়েটসের প্রতি এদুয়ার্দোর আক্রোশ বেড়ে গেল। নেহাত আর কোনো উপায় নেই আপাতত, নাহলে এতক্ষণে সামনে দাড়ানো মেয়েটার রক্তশূণ্য মৃতদেহ পড়ে থাকতো। ওভারলর্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিনের সাথে বেয়াদবি করার পরিণাম বুঝিয়ে দিতো।

– তুমি কাস্ত্রোরুজ থর্পে থাকো?

এদুয়ার্দোর প্রশ্নের উত্তর দিলো না সিয়া। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এদুয়ার্দোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। খুব কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিলো।

– আমি কাস্ত্রোরুজ থর্পে পৌঁছানোর রাস্তা চিনি না। তুমি আমাকে সাথে নিয়ে যাবে।

– কেনো নিয়ে যাবো?___অকপটে জানতে চাইল সিয়া।

– আমি বলেছি তাই।

– কিন্তু আমি শুনতে বাধ্য নই।______সিয়া দৃঢ় কন্ঠে বললো।

– অকৃতজ্ঞ।

– আমাকে প্রাণে বাঁচানোর বিনিময়ে সাহায্য চাইছেন?

এদুয়ার্দো প্রত্যুত্তর দিল না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে সিয়া কিছু একটা ভাবল। অতঃপর বলল,

– ঠিক আছে। আমি আপনাকে সাহায্য করে আমাকে বাঁচানোর ঋণ শোধ করবো। ফ্লোরেনসিয়া কারো কাছে ঋণী থাকতে পছন্দ করে না।

কথাটা বলার সময় সিয়ার দু’চোখে এদুয়ার্দো প্রগাঢ় আত্ম অহমিকা দেখতে পেল। যেন ওর উজ্বল বাদামী চোখজোড়া আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কন্ঠস্বরে দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছিল। এদুয়ার্দো তাচ্ছিল্যভাবে কিঞ্চিৎ ঠোঁট বাঁকাল।

– অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আমাকে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে পৌঁছাতে হবে। আপনি আসুন আমার সাথে।

সিয়া ধীরপায়ে হাঁটে। ক্ষুধায় ওর পেট ব্যথা করছে। হাঁটতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। পেটে কিছু পড়লে দুর্বল দেহে আবারও শক্তি ফিরে পাবে। তখন আহত শরীরের সমস্ত ব্যথা হাওয়াই মিলিয়ে যাবে।

এদুয়ার্দো সিয়াকে অনুসরণ করে হাঁটে। কিন্তু সিয়ার হাঁটার গতি দেখে বেশ বিরক্তবোধ করে। এতো ধীরগতিতে হাঁটলে কাস্ত্রোরুজ থর্পে পৌঁছাতে কয়েক ঘন্টা সময় লেগে যাবে।

________★★_______

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

ঘুম থেকে খুব ভোর বেলায় জেগে উঠে ইনায়া। ফ্রেশ হয়ে সিয়ার কামরার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজার হুড়কোর দিকে খেয়াল না করে সজোরে করাঘাত করে ডাকে,

– সিয়া।

কামরার ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। ইনায়া পুনরায় উচ্চস্বরে ডাকে,

– সিয়া।

তবুও সিয়া কোনো সাড়া দেয়না। ইনায়া দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। বার কয়েক ডাকার পর দরজার হুড়কোর দিকে নজর দিল। হুড়কোটা বাইরে থেকে লাগানো ছিলো। ইনায়া বিস্মিত হলো। হুড়কো খুলে দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করল। প্রথমেই চোখ পড়ল বিছানার দিকে। কিন্তু সিয়াকে বিছানায় দেখা গেল না। সম্পূর্ন কামরায় নজর বুলিয়ে ওকে কোথাও খুঁজে পেল না। ভীষন ভীত হয়ে পড়ে ইনায়া। দৌড়ে বেরিয়ে যায় কামরা থেকে। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচের তলায় নেমে আসে। বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন উইজার্ড ডিয়েটস। তার পাশেই বসে আছেন উরসুলা ভনডারলেন। ইনায়াকে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামতে দেখে জিজ্ঞেস করেন,

– কি সমস্যা? তোমাকে এমন বিচলিত দেখাচ্ছে কেনো?

– সিয়া ওর কামরায় নেই।____ইনায়া শঙ্কিত গলায় কথাটা বলে।

– আর্নিদের বাড়ি গেছে হয়তো।____বলেন উরসুলা ভনডারলেন।

রান্নাঘর থেকে ইলহামা অ্যালিয়েভ বেরিয়ে আসেন। ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

– এখনই যাও। আর্নিদের বাড়িতে গিয়ে খুঁজে এসো একবার।

– অনেক হয়েছে। আমি যাচ্ছি ক্রিসক্রিংগলকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। ওর দুশ্চিন্তায় সিয়া অসুস্থ হয়ে পড়বে।___কথাটা বলেন উইজার্ড ডিয়েটস।

ইনায়া আর্নিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। ডিয়েটস বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান ক্রিসক্রিংগলকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মুখাবয়বে ঠায় বসে রইলেন উরসুলা ভনডারলেন। ইলহামা অ্যালিয়েভ নিশ্চিন্তে পুনরায় রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

________★★________

ওডেসা, দুভিল কোট।

প্রাচীর ঘেরা দুর্গের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল একটি বিশালাকৃতির ফিটন। কোচওয়ানের আসন থেকে একজন ছিপছিপে অল্পবয়সী ছেলে নেমে এলো। ফিটনে থাকা মেয়েগুলোকে নামতে বলল সে। মেয়েগুলো দাস বাজার থেকে কিনে আনা দাসী ছিলো। ওদেরকে উপহার হিসাবে রুলারের দুর্গে পাঠিয়েছেন পিদর্কা স্যাভেরিন। যাতে তার ছেলের সেবা যত্নে কোনো প্রকার ত্রুটি না থাকে। রুলারের দুর্গে তার সাথে থাকে প্রিন্সেস হ্যারিয়েট। সাথে থাকেন পিদর্কা স্যাভেরিনের বিশ্বস্ত সেবিকা মাদাম কামালি। মুলত তিনিই নজর রাখেন মেয়েগুলোর উপর। যেন তারা কোনো বিশৃঙ্খলা না করে।

রুলারের দুর্গের একপাশে যুবতীদের মহল। যেখানে অনেক অসহায়, দুস্থ মেয়েগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে রুলার আব্রাহাম স্যাভেরিন। প্রায়ই দাস বাজার থেকে বিপুল সংখ্যক দাসী ক্রয় করে সে। যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাদের দুর্গে আশ্রয় দেয়, আবার যাদের পরিবার জীবিত আছে তাদের মুক্ত করে দেয়। সে কখনো কোনো মেয়েকে জোরপূর্বক ব্যবহার করেনি। স্বইচ্ছায় যে মেয়ে তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে শুধুমাত্র তার সাথেই রাত্রিবাস করেছে আব্রাহাম স্যাভেরিন। কারন তার সান্নিধ্য লাভ করাকে মেয়েরা সৌভাগ্য মনে করে।

আব্রাহামের জীবনে প্রেম, ভালবাসা বলে কিছু নেই। কখনো কারো প্রতি কোনো প্রকার অনুভূতি অনুভব করেনি। একজন রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার হয়েও মানুষের মতো জীবন-যাপন করে। অসম্ভব বিশ্বস্ত কিছু ভ্যাম্পায়ার সেবক ব্যতীত বাকিরা তাকে অভিজাত্য পুরুষ বলেই জানে। তার বিশ্বস্ত সেবকগুলোকে অনুসরণ করে দুর্গের বাকিরাও তাকে রুলার বলে সম্বোধন করে। একজন শাসকের মতই সম্মান করে। অথচ কারো মনে কখনো প্রশ্ন জাগেনি তিনি রুলার কি করে হলেন? সবাই কেনো তাকে রুলার বলে ডাকে? কেনো এতো সম্মান করে তাকে?

রুলার আব্রাহাম স্যাভেরিন এক দুর্বোধ্য রহস্য। যা ভেদ করার চেষ্টা করেনি কেউ। প্রতিমাসে হঠাৎই কয়েকদিনের জন্য দুভিল কোটে আসেন। বাকি দিনগুলোতে তিনি কোথায় থাকেন সে ব্যাপারে কিছুই জানে না কেউ। কিন্তু তিনি যখন দুর্গে আসেন সম্পূর্ণ দুর্গে তখন আনন্দের ফোয়ারা নামে যেন। তাকে পছন্দ করা মেয়েগুলো খুশির জোয়ারে ভাসে। প্রতিক্ষায় থাকে তাকে শুধুমাত্র একনজর দেখার জন্য। তার লাল টুকটুকে ঠোঁটের এক চিলতে নিদারুন হাসির দর্শন পেয়ে নিজেদের ধন্য করার জন্য।

দুর্গের প্রধান ফটক থেকে পাথর বিছানো রাস্তা ধরে আব্রাহাম হাঁটছিলো। তার পেছনে দু’জন বিশ্বস্ত সেবক ছিলো। একজন নিলসোন অন্যজন ম্যাক্সিমিলিয়ান। হাঁটতে হাঁটতে যুবতীদের মহলের কাছাকাছি চলে এলো। মেয়েরা সবাই তাকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখছিলো। উচ্চস্বরে শোরগোল শুরু করছিল। একনজর সেদিকে তাকাল আব্রাহাম। অতঃপর চোখ সরিয়ে নিল। পেছনে থাকা ভ্যাম্পায়ার দু’জনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

– অনারেবল ওভারলর্ডের আদেশ। স্লোভাকিয়ায় ফিরে যেতে হবে।

– এস্টীম রুলার। আপনি কি সত্যিই ফিরে যাচ্ছেন তবে?____নিলসোন সবিনয়ে জিজ্ঞেস করল।

– একদমই না।________আব্রাহাম সহাস্যে বলল।

– তিনি আপনাকে রুলারের পদ থেকে বরখাস্ত করতে পারেন।______শঙ্কিত কন্ঠে কথাটা বলে উঠল ম্যাক্সিমিলিয়ান।

– আমিও তাই চাই।

– অপরাধ ক্ষমা করবেন। কিন্তু আপনি এরকমটা কেনো চাইছেন?____জিজ্ঞেস করল নিলসোন।

– কারন আমি এখানেই থাকতে চাই। আমার দেশে।

– আমার মন বলছে আপনার অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে।

ম্যাক্সিমিলিয়ানের বলা কথাটা শুনে আব্রাহাম হেঁসে উঠল। ম্যাক্সিমিলিয়ানের কাঁধে একহাত রেখে বলল,

– তোমার ধারনা সঠিক।

ম্যাক্সিমিলিয়ান থতমত খেল। আমতা আমতা করে জানতে চাইল,

– কি সেই পরিকল্পনা?

– একটা মেয়ের র’ক্ত পান করেছিলাম। র’ক্তের স্বাদটা বেশ মিষ্টি ছিলো। আমি একটু একটু করে প্রতিদিন ওর র’ক্ত খেতে চাই।

– কিন্তু এতে করে সে মা’রা যেতে পারে।

– এমনিতেও ওকে ম’রতে হবে। রুলার আব্রাহাম স্যাভেরিনের গায়ে হাত তুলেছে ও।_______আব্রাহাম বিরবির করে কথাটা বলল।

– জ্বি? বুঝতে পারলাম না।

– কিছুনা। চলো ভেতরে যাওয়া যাক।

রুলার আব্রাহাম স্যাভেরিন কোনো একটা মেয়ের হাতে মা’র খেয়েছিল, এটা কেউ জানতে পারলে তার মানসম্মানের কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে? ভাবতেই আব্রাহামের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে উঠল।

_________★★_________

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

উঁচু পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এসেছে জলপ্রপাত। পাহাড়টা দুর্গ থেকে একটুখানি দূরে। প্রায়ই এই ঝর্নার কাছে এসে সময় কাটায় অ্যাভোগ্রেডো। সুউচ্চ পাহাড় থেকে পানির স্রোত এসে বড় বড় পাথরের উপর আছড়ে পড়ছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে একদৃষ্টে ঝর্নার দিকে তাকিয়ে ছিলো অ্যাভোগ্রেডো। হঠাৎ তার কানের কাছে মিষ্টি মধুর এক কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

– অ্যাভোগ্রেডো!

অনুচ্চ স্বরে ডাকছিলো কেউ। অ্যাভোগ্রেডো নিজের অজান্তেই ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। কন্ঠস্বরটা তার ভীষণ পরিচিত। বরং পরিচিতের চেয়েও অনেক বেশি প্রিয়।

– অ্যাভোগ্রেডো!

এভাবে ডাকলে হৃদপিণ্ডে প্রলয়ংকরী ঝড় বয়। অ্যাভোগ্রেডোর নিজেকে মাতাল মনে হয়। মনে হয় সে হারিয়ে যাচ্ছে কোন এক উদ্ভুত নেশায়। পুনরায় সেই কন্ঠস্বর শুনতে পেল,

– অ্যাভোগ্রডো!

– কেনো এভাবে লুকোচুরি খেলছেন প্রিন্সেস। দয়া করে সামনে আসুন।

সহসা কন্ঠস্বরটা মিলিয়ে গেলো। অ্যাভোগ্রেডো আহত হলো। কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– চলে গেছেন?

অদূরে খিলখিল হাসির শব্দ শোনা যায়। পাহাড়ের উপর শ্বেতশুভ্র রঙের গাউন নজরে আসে। অ্যাভোগ্রেডো সেদিকে তাকিয়ে হাসে। প্রিন্সেস ইজাবেল তার একমাত্র প্রশান্তি যেন।

স্যাভেরিন ক্যাসলের বেসমেন্টে প্রবেশ করেন পিদর্কা স্যাভেরিন। বেসমেন্টের একটা কামরার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বড় বড় দু’টো লোহার তালা ঝুলানো দরজাটা খুলে দেয় একজন সাধারণ মানুষ। ভ্যাম্পায়ারগুলো লোহা থেকে দূরে থাকে। ভুল করেও লোহার সংস্পর্শে আসে না তারা। নিজেদের এরকম বিভিন্ন প্রয়োজনে কিছু সাধারণ মানুষদের ব্যবহার করে। অবশ্য এরা কেউই সজ্ঞানে নেই। সবগুলো বশীভূত। কিংবা প্রাণের ভয়ে বাধ্য হয়েছে র’ক্ত চোষাদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে।

দরজা খুলে দিতেই কামরায় প্রবেশ করেন পিদর্কা স্যাভেরিন। নিকষ কালো অন্ধকারে সম্পূর্ণ কামরা আচ্ছন্ন হয়ে ছিলো। ডানা ঝাপ্টে অসংখ্য বাদুড় উড়ে বেড়াচ্ছিলো। কি বীভৎস ওগুলোর চেহারা! পিদর্কা স্যাভেরিনকে দেখে সবগুলো কেমন শান্ত হয়ে গেল। কামরার মাঝখানে ছিলো ছয় ফুট লম্বাকৃতির একটা ওক কাঠের কফিন। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে ইশারায় কিছু একটা বোঝালেন পিদর্কা স্যাভেরিন। লোকটা কামরায় প্রবেশ করলো। কফিনের গায়ে ঝুলে থাকা তালাটা খুলে দিয়ে আতংকে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পাটা তুলে কফিনের দিকে তাকালেন পিদর্কা স্যাভেরিন। যেখানে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে কেউ। নাম ধরে ডাকতেই ভয়ংকর রক্তলাল চোখ দু’টো মেলে পিদর্কার দিকে তাকাল। ভয় পেয়ে পুনরায় কফিনের পাটা বন্ধ করে দিয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেলেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

_______★★_______

কাস্ত্রোরুজ থর্প।

দীর্ঘ দু’ঘন্টার রাস্তা হেঁটে বাড়ির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল সিয়া। পথিমধ্যে এদুয়ার্দো জেনে বুঝে একবার ওর হাত ধরেছিল। সিয়া ভীষণ রেগে গিয়েছিলো মানুষটার এমন অসভ্যতামির জন্য। কিন্তু এদুয়ার্দোর মধ্যে কোনো হেলদোল দেখতে পায়নি। একপ্রকার জোর জবরদস্তি করেও তার হাত থেকে সিয়া নিজের হাত ছাড়াতে পারেনি। অথচ এদুয়ার্দো দু’মিনিট পর নিজে থেকে এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দিল। একহাতে সিয়ার গলা চেপে ধরল। সিয়ার কোল থেকে কিচ পড়ে গেল। ও বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করল। এদুয়ার্দো ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল,

– তোমার গলার এই লকেট’টা যদি প্রথমেই চোখে পড়তো। তাহলে গুহাতেই তোমার রক্তশূণ্য লাশ পড়ে থাকতো। এই সেই লকেট, যা উইজার্ড পরিবারের মেয়েরা গলায় পরে থাকে। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। তুমি নিজে আমার হাত ধরে কাস্ত্রোরুজ থর্পে পৌঁছে দিলে। মৃ’ত্যুর পূর্বে জেনে নাও, এরপর এখানে যা কিছু অশুভ হবে, সবকিছুর দায়ভার তোমার।

এদুয়ার্দোর দু’চোখের দৃষ্টি কতটা হিংস্র। সিয়া স্তম্ভিত হলো। ওর গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুলো না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। দু’চোখের পাতায় গভীর ঘুম নেমে এলো। এদুয়ার্দো আরো শক্ত করে ওর গলা চেপে ধরল। সিয়া এদুয়ার্দোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে সিয়ার কাঁধ থেকে গাউন সরে গেলো। এদুয়ার্দো সেদিকে তাকাতেই সিয়ার কাঁধের উপর স্পষ্ট একটা ক্রুশ চিহ্ন দেখতে পেল। মুহূর্তেই যেন তার চোখ ঝলসে যেতে চাইল। সিয়াকে ছেড়ে দিয়ে ছিঁটকে দূরে সরে দাঁড়াল।

– এই ছেলেটা কে? অশুভ কিছু হবে মানে কি?

সিয়া কিছুই বুঝতে পারেনি। ওর ঘুম পাচ্ছে। ভীষন ঘুম পাচ্ছে ওর। ও শরীর ছেড়ে দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।